১।

পর পর দু’দিন গরম পড়ার পর তিন নম্বর দিনে ভোর সাড়ে পাঁচটায় যখন টের পেলাম, আজও জ্বালাবে, তখনই গেল রাতের পরিকল্পনা মাফিক বেরিয়ে পড়লাম। স্টেশনের সামনে চা খেতে খেতেই চলে এলো সাড়ে ছটার ‘জলপাইগুড়ি – ওদলাবাড়ি ভায়া গজলডোবা’র স্টেট বাস। সাড়ে আটটার কাছাকাছি সেটা আমাকে তিস্তা ব্যারেজের মুখে নামিয়ে দিয়ে চলে গেল। তিস্তায় অনেক জল। ডানদিকে বড় একটা মাঠের কোনায় দু-তিনটে টিন আর বাঁশ দিয়ে নির্মিত ঘর। ওগুলো হোটেল। সস্তায় বোরলি মাছ ভাজা খাওয়ার উপযুক্ত জায়গা।
খাওয়ার দরকার ছিল না। আমি ক্যানেল বরাবর রাস্তাটা ধরে এগোতে লাগলাম। বাঁ দিকের জমি উঁচু হয়ে বৈকুন্ঠপুর জঙ্গলে ঢুকে পড়েছে আর ক্যানেলের অপর পাড়ে বাতাবাড়ি ফরেস্টের গাছ। সামনে তাকালে পাহাড়। এই রাস্তা ক্যানেল বরাবর ফুলবাড়ি চলে গেছে। এই মনোরম অথচ উষ্ণ দিনে আমি পদব্রজে চলতে চলতে কবিতা ভাবার চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু প্রথম লাইন হিশেবে আমার মাথায় এলো একটা কথা – ‘জীবন এত ছোট ক্যানে!’ এটা তারাশঙ্করের কবি উপন্যাসের নিতাই কবিয়ালের আক্ষেপ, কিন্তু আমার মনে এমন সুন্দর প্রাকৃতিক পরিবেশে, পেটে খিদে না থাকা সত্ত্বেও এই লাইনটা কেন এলো?
উত্তর পাওয়ার বদলে আমার মনে এলো দ্বিতীয় লাইন। ‘জীবন সব কিছুর চাইতে বড়ো’।
এভাবে আজকাল কবিতা লেখা হয় না। তাছাড়া দুটো লাইনের একটাও আমার স্বরচিত নয়। দ্বিতীয় লাইনটা কার রচনা, সেটাও জানি না। সুতরাং এগুলো কবিতার লাইন হিশেবে আমার মাথায় আসে নি। দুটো লাইনের মধ্যে একটা কার্য কারণ সম্পর্ক আছে এবং সেটা আমি লক্ষ্য করেছি বটে। তাহলে কি টানা উষ্ণ-আর্দ্র আবহাওয়ার কারণে আমার অন্তরে দার্শনিক ভাবের উদয় হলো? জীবনকে সবার ওপরে স্থান দিয়ে আমি হটাত চমকে ওঠার মত আবিষ্কার করলাম, জীবন কবিতার চাইতেও বড়ো। তখনই একটা গাছের নিচে থমকে দাঁড়িয়ে, প্রবহমান খালের জলের দিকে তাকিয়ে থেকে দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করলাম একটা। জলের অপর নাম জীবন। আমি জীবন প্রবাহের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতেই সেদিনের মত কবিতা লেখার চেষ্টা সমাপ্ত করে দিলাম।
ঘন্টা দুয়েক পর সেই হোটেলগুলোর একটায় বোরলি মাছ ভাজা দিয়ে ডাল ভাত খেতে খেতে তিস্তা থেকে উড়ে আসা হাওয়ায় শীতল হচ্ছি যখন, তখনও আমি জীবন থেকে মুক্ত হতে পারি নি। খেতে খেতে জানলা দিয়ে সামনে এঁটো কাঁটা ফেলার জায়গাটা পর্যবেক্ষণ করতে গিয়ে দেখি একটা বেড়াল পরম তৃপ্তিতে মাথা ঝাঁকিয়ে কাঁটা চিবুচ্ছে। আদিবাসী তরুণ হলুদ টি শার্ট আর নীল প্যান্টে ঝলমল করতে করতে প্রেমিকাকে কি যেন দেখাচ্ছে মোবাইলে। প্রেমিকা হাসছে খুব। ধূমপানের ভয়কে ফুঁৎকার দিয়ে পোড়া বিড়িতে আগুন দিয়ে ধোঁয়া উড়িয়ে গল্পে মেতে উঠছেন এক বৃদ্ধ। একজন মা তার বাচ্চার হাতে তুলে দিচ্ছেন সুস্বাদু বরফের টুকরো।
খাওয়ার পর নদীর পাশে সিমেন্টের বেঞ্চে। ডানদিকে তাকিয়ে ভাবি, ওই দিকে আমার শহর। সেই শহরে শেষ বিকেলে ঘামে জবজবে হয়ে বাস থেকে নেমে দেখি রাস্তায় মহা ভিড়। আমি এক কোণায় দাঁড়িয়ে মানুষ দেখতে লাগলাম। মনে হলো, এই মানুষগুলির কারোর সাথে কবিতার যোগ নেই তথাপি এরা মানুষ। আমি বুঝতে পারলাম, মানুষ কবিতার চাইতে ব্যাপ্ত।

[page]
২।

পরের পরের দিন এক দোকানে দুপুরের দিকে বসে বসে টিভিতে দেখছি তিমি কী ভাবে শ্বাসকর্ম চালায়। টিপ টিপ বৃষ্টি এবং আবহাওয়া বেশ শীতল। ভুটান থেকে কম দামে আনা স্কচ পানীয়ের বোতল আনতে গেছে একজন। আমার মাথায় তখন জীবন ছিল না। মাথায় তখন কবিতা। দোকানের পাশে একটা সাংস্কৃতিক সংস্থার আপিস। সেখানে দেওয়ার জন্য কেউ একজন বর্তমান দোকানে রেখে গেছে একটা পত্রিকা। বেশ মোটা। আমি সহসা সেটা গোচর করে আগ্রহ বশত: টেনে নিলাম। ওল্টাতে ওল্টাতে একটা জায়গায় চোখ আটকাল। একজন কবি জানাচ্ছেন যে, তিনি এক একটি কবিতা লেখার পর মনে করেন এক একটি সন্তানের জন্ম দিলেন। প্রতিটি কবিতা তাঁকে প্রসব বেদনার অনুভূতি দেয়। তখনও পানীয়টি আনাই হয় নি অথচ আমি মনে মনে খুব রেগে গিয়ে সেই কবিকে বলতে চাইলাম,”এই! অতিশয়োক্তি বলে একটা অলংকার আছে সেটা তুই জানিস নে! তুই ব্যাটা ছেলে হয়ে লেবার পেইন-এর কী বুঝিস? জানিস নে জীবন অনেক বড়ো!”
বাস্তবে আমি পত্রিকাটা রেখে দিয়ে খানিকক্ষণ চুপ করে বসে থাকলাম। মাথার মধ্যে আবার জীবন চলে আসায় মনে হচ্ছিল আবার কবিতা থেকে সরে যেতে হবে। তবে আমিও ছাড়ার পাত্র নই। অনতিবিলম্বে কয়েকটি কবিতা রচনা না করলেই নয়। পাক্কা চার দিন আমি কোনও গোটা কবিতা লিখতে পারি নি। ভেবেছিলাম গরমের জন্য এমন হচ্ছে, অথচ তিরিশ দিন আগেও বেশ ঠাণ্ডা ছিল আবহাওয়া। তিস্তা ব্যারেজে যাওয়ার আগের দিন পর্যন্ত কবিতা লেখার তাড়নাই আসছিল না। সেখানে গিয়ে জীবনের ধাঁধায় পড়ে সব গোলমাল হয়ে গেছে। তাহলে আমি যে প্রতিজ্ঞা করলাম রোজ লিখব! অহোরাত্র কবিতায় না থাকলে কবিতাকে পাওয়া যায় না। এটা অবশ্য আমায় কেউ বলে নি। নিজে নিজেই ভেবে সিদ্ধান্তে এসেছিলাম। ভেবেছিলাম যাই ঘটুক না কেন, রোজ কবিতা লিখব। একটা লাইন হলেও লিখব।
আমি জীবনকে অগ্রাহ্য করার চেষ্টায় রিমোট হাতে নিয়ে টিভির চ্যানেল বদলাতে লাগলাম। বদলাতে বদলাতে মোজার্ট। তাঁকে নিয়ে জড়ান ইংরেজিতে কেউ কিছু বলছেন। আমি আগ্রহী হয়ে কান পাতি। বক্তা শব্দের অর্ধেকটা গিলে নিয়ে বাকিটা উচ্চারণ করছেন। আমি আরও মনযোগী হয়ে পড়ি। উনি জুপিটার নিয়ে কিছু বলছেন। জুপিটার মানে মোজার্টের শেষ না হওয়া সিম্ফনির নাম। একচল্লিশ নম্বর। তবে চল্লিশ নম্বরের ফার্স্ট মুভমেন্টের মত ভালো জিনিশ মোজার্ট আর রচনা করেন নি। জুপিটার অবশ্যই ভালো। আটত্রিশ আর উনচল্লিশও দিব্যি। কিন্তু বক্তা জুপিটার নিয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেই চলেছেন। সেটা থামল বিজ্ঞাপনের বিরতির কারণে। আমি চোখ টিভি থেকে সরিয়ে আনলাম সামনের আকাশে। মন জুড়ে তখন মোজার্টের বাজনা। আমি ভেবে দেখলাম প্রায় বছর দুই তিনেক আমি তাঁকে শুনি নি। মোবাইল ফোনের মেমোরি কার্ডে কিছু কিছু গান বাজনা রেখে দিই। আমি সেই কার্ডে মোজার্টের কিছু আছে কি না তা দেখতে লাগলাম। কিন্তু সেই ধরনের নমুনা বের হলো মাত্র একটি। বিটোভেনের পয়লা সিম্ফনির ফাইনাল মুভমেন্ট। আমি তাঁর বিশ্বখ্যাত নবম সিম্ফনির চাইতে এটাকেই বেশি শুনেছি। এতে অংক কষে সুর বের করার দরকার হয় নি বিটোভেনের। তিনি তখনও শুনতে পেতেন। মুভমেন্টটা চালু করে দিয়ে আমি ভাবলাম,”জীবনের একটা অংশ তিনি বধির হয়ে কাটালেন কী করে!”

সেই বাদল দিনে মন আচ্ছন্ন করে দেওয়ার বদলে ঠিক সেই মুহূর্তে কবিতা আবার জীবনব্যপ্ত হয়ে গেল।খুব একটা বাজে ধরনের ষড়যন্ত্র চলছে নির্ঘাত! নইলে প্রতিবার কবিতার বদলে ফাঁকি দিয়ে কেন ব্যাটা জীবন আমার কানের ভিতর দিয়া মরমে, না, তার চাইতে মরমোত্তরে ঢুকে পড়তে চাইছে? যার উত্তর আছে, তা প্রশ্ন এবং যার নেই, সে জিজ্ঞাসা। এই যুক্তিটা বেশ মনে ধরল। আমি দ্রুত হতাশা ত্যাগ করে দোকানদারের রেখে যাওয়া ফ্লাস্ক থেকে চা ঢেলে নিয়ে চুমুক দিয়ে আসন্ন কবিতার লাইনটার জন্য প্রস্তুত হলাম। সামনের পাঁচ ফুট চওড়া রাস্তাটা সোজা একটা গেটের মধ্যে দিয়ে বড় রাস্তায় লাফিয়ে পড়েছে। আমি দেখলাম গেট দিয়ে একজন এসে ভেতরে ঢুকল। এই ছবিটা কি একটা কবিতার সূত্র দিতে এসেছে। আমি ভাবলামঃ
ফিতে দিয়ে গড়াল কোনায়।
একটু বেশি খোলা হলো কী? পাঁচ ফুট রাস্তাটা তো ফিতের মতই দেখাচ্ছে। আর ওই লোকটা কি কোনায় গিয়ে দাঁড়াল না? এই জন্যই আমি কিছু দিন ধরে কবিতা লিখতে পারছি না। এত স্পষ্ট বলতে চাইলে লেখা কি বেরুতে চায়! অতএব একটু বদলে দিতেই ব্যাপারটা হয়ে গেলঃ
ফিতে। আর তুমি কোনে স্থির।
অপূর্ব! আমার বোধদয় হলো। আসলে কেউ আমাকে আটকাতে চাইছে না। আমার ব্যারিয়ার হলাম আমি। এই তো সুর সুর করে চলে আসছে লাইনটার আরো একটা জবরদস্ত চেহারাঃ
ফিতে তুমি কোনেলা স্থির।
আমি লোকটাকে পাঁচ ফুটের রাস্তাটার সাথে তুলনা করেছি আবার লোকটাকেও ইঙ্গিত করছি। করছি, তা বলব না, তবে করছি যে না, সেটাও বলতে পারছি না। ভূটানাগত স্কচ কখন আসবে?
এই রকমই কাটছে এখন কবিতা না লেখা দিন।