জার্নির জন্য রাজর্ষি আকষ্মিক ভাবে কিছু প্রশ্ন পাঠিয়ে দিল। তাই এবারঃ

১) কবিতা নির্মাণ না সৃষ্টিঃ

আমি তো প্রকৃতি নই। কি ভাবে সৃষ্টি করব! কবিতা রচনা করার প্রয়াস করি মাত্র। নির্মাণ করি। কবিতা আমার কাছে এক প্রকাশ, এক নির্মাণ।

২) কবির আকাঙ্ক্ষা না কবিতার আকাঙ্ক্ষাঃ

অবশ্য-ই কবির আকাঙ্ক্ষা। কবি-ই তো চাইছেন নিজেকে প্রকাশ করতে। মাধ্যম শব্দ, ছন্দ, প্রকরণ এবং আরো বহুকিছু।

৩) কবিতার স্কুলিং:

স্কুলিং ব্যাপারটা একটা প্রথাগত ধারণার মধ্যে ক্রমশ আমাদের নিয়ে যায়। আর কবি কখনও কোন নির্দিষ্ট প্রথায় বিশ্বাস করেন না। তাই স্কুলিং- এই শব্দে তার আস্থা নেই। এমন শব্দ ব্যবহার করতে পারেন তাত্ত্বিকজন।

৪) পি জি এম তার সমসাময়িক কবিদের বিষয়ে কি ভাবছেন এবং সাম্প্রতিক কবিতার হালহকিকত ও পরবর্তী সম্ভাবনাঃ

নিশ্চয়-ই বাংলা কবিতার কথাই বলছ। সে রকম কিছু ভাবছি না। নানান ধরনের প্রয়াস টের পাচ্ছি। পড়ছি, আনন্দ পাচ্ছি। সে এখন নিজেই নিজেকে অতিক্রম করে যাওয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছে। প্রতি মুহূর্তে। আন্তর্জাল পুষ্টি দিচ্ছে। বাংলা কবিতা এখন অপূর্ব আকাশ। হয়ত ছেঁদো হল কথাটা, কিন্তু এমনই আমার মনে হয়।

৫) পি জি এম-এর সঙ্গে কৌরব-এর সম্পর্কঃ
কৌরব একটা প্রতিষ্টান। কৌরব যখন নানান ভ্রমণে, ভাবনায়, বহু সন্ধানের মধ্যে দিয়ে গড়ে উঠছে, ধারেকাছেও আমি ছিলাম না। তারপর যা হয়। সেখানে কিছু ব্যক্তিত্ত্ব, তাঁদের এ যাবত কাজ, ভাবনা চুম্বকের মত আমাকে টেনেছে। যোগ্য ছিলাম না, তবু সেই টান অনুভব করেছি ভীষণ। অভিবাসী প্রেমিকের মত। আর অপেক্ষা করেছি। এটা কোন স্কুলিং না। আর হেঁটেছি। স্বপ্ন দেখেছি। এ সবেও তো সাহস লাগে। কৌরব সে সাহস আমাকে দিয়েছে। সে স্বাধ্যায় ফলপ্রসু হয়েছে কি না, কিছু নির্মিত হয়েছে কি না আদৌ, সে অন্য প্রশ্ন।

৬) পি জি এম-এর বিষয়ে পি জি এম-এর ভাবনাঃ

ভাল বলেছ। প্রশান্তর অনেক মুখ। মুদ্রিত পি জি এম তার মধ্যে অন্যতম। সত্যি কথা বলতে কি, কখনো সখনো প্রশান্ত তার সব কটা মুখ নিয়েই তো ভাবে। এই মুখটা নিয়ে প্রশান্ত কি ভাবে! সে দেখেছে, প্রতিষ্ঠানের সামনে, আর্থসামাজিক বিপন্নতায়, রাজনৈতিক হল্লায়, হাসপাতালে কিংবা লাম্পট্যে অথবা বিকালের নদীর শরীর ছুঁয়ে থাকার মূহুর্তে কাগজ কলমের পি জি এম-এর মুখ, দেখেছি, পাল্টে পাল্টে যায়। সামাজিক প্রাণী মনে করে সে, কখনো নিজেকে। অনেক কিছুই মনে করে। শোক দুঃখ ভয় লজ্জা আপন ভার শেয়ার করতে পি জি এম পারে না। কেবল সেই সব একটু একটু প্ররোচিত করে পি জি এম-কে এক ঘরে, না, ভাবনঘরের কথা বলছি না, হয়ত কবিতার। নিঃশব্দে সেখানে সে অদৃশ্য হয়। আর কোন লজ্জ্বাবোধ থাকে না তার সেই ঘরে একা ক্রমান্বয়ে দেয়াল এবং কেন্দ্রে চলাচল করে। এক অনিয়মের ঊর্ণনাভ সে সময়ে বোধহয় তাকে ঘিরে থাকে। সেখানে কখনো ভয়ংকর নৈঃশব্দ, সেখানে অভিসন্ধিমূলক অন্ধকার, এমন কি হয়ত তার তখন ক্লীব ঈশ্বর। তাদের নিয়ে নিভৃতে খেলা তখন পি জি এম-এর বিচিত্র থেকে বিচিত্রতর ঢঙে। “গড়া ও বানানো নিয়ে কথা বলো/তীব্র হও, পুরনো হয়ো না” -- শ্রদ্ধেয় স্বদেশ সেন-এর মত সে-ও হয়ত তখন এমন ভাবতে চায়। আবার শব্দে শব্দে এক বলয়, তাৎক্ষণিকভাবে নয়, পলুপোকার মত, অন্তত প্রয়াস করে তাবৎ অসহায়তার ক্রোধকে সেখানে নিস্ক্রিয় করার। ভয় হয়, এ কারণে পি জি এম-এর শব্দের রঙ আবার কালো, বিবর্ণ, লিঙ্গহীন এবং নিষ্প্রাণ।

[page]
৭) কবিতা ও যৌনতাঃ

ভালবাসা কবিতার অন্যতম শর্ত। যৌনতা অন্য ঘরে রেখে ভালবাসা কাঁঠালের আমসত্ত্ব। নেই। যৌনবোধ স্বাভাবিক এক প্রবৃত্তি। আলাদা কিছু কি? কিংবা আছে হয়ত। একটা কেমন যেন সুড়সুড়ি আছে। তাই এই শব্দটাকে তুলে নেওয়া হয়েছে। অথচ বেঁচে থাকার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে যৌনবোধ, ভালবাসা। কলম বদলের সঙ্গে সঙ্গে কবিতায় তার প্রকাশ কেবল ভিন্ন। পি জি এম-এর কবিতা তো সেই জীবনেরই আরেক উচ্চারণ! সুতরাং তার কবিতার শরীরেও রয়েছে যৌনতার অহংকার।

৮) কবিতা ও রাজনীতিঃ

রাজনীতি যখন বলছ, রাজনীতি-র সাম্প্রতিক এবং বহু পরিচিত ব্যবহার-এর কথাই তুমি বলছো, এ আমি ধরে নিচ্ছি। জানি, রাজনীতি আর কবিতা, দুটোই ভাষা ব্যবহার করে, কিছু প্রকাশ করতে চায়। তবু অডেন একবার বলেছিলেন, All poets adore explosions, thunderstorms, tornadoes, conflagrations, ruins, scenes of spectacular carnage. The poetic imagination is not at all a desirable quality in a statesman. In a war or revolution, a poet may do very well as a guerrilla fighter or a spy, but it is unlikely that he will make a good regular soldier, or, in peacetime, a conscientious member of a parliamentary committee. আবার প্লেটো একবার বললেন, The heaviest penalty for declining to rule is to be ruled by someone inferior to yourself. তা হলে দ্যাখো, ব্যাপারটা বেশ গোলমেলে। কিন্তু মোটামুটিভাবে কবি সচেতন একজন মানুষ। নীতিগতভাবে তার চিন্তা কাজ করে। সেখানে তথাকথিত বাম-অতিবাম-ডান-অতিডান বলে কিছু নেই। এবং সে সমাজ সংস্কারক নয়। তার লেখায় ক্রোধ ভালবাসা ঘৃণা- সবটুকু কেবল মানুষকে জড়িয়েই। সে মানুষের বিপক্ষে যে কোন ধরনের ক্ষমতায়নের বিরুদ্ধে। যদিও পৃথিবী এখনো ক্ষমতার-ই দাস। তবু এমন বিরোধিতাকে, বিরুদ্ধ ভাবনাকে যদি রাজনীতি বল, কবি বা কবিতার সঙ্গে রাজনীতির তবে এই হচ্ছে সম্পর্ক।

৯) কবির গদ্যঃ

একজন শিল্পীর মতই কবি সম্পূর্ন স্বাধীন। সে-ই ঠিক করবে, তার গদ্যের প্রকরণ, ভাষা। কতখানি সে বলবে, কতখানি সে রেখে দেবে আস্তিনের নিচে, তার পণ্যের বিক্রয়যোগ্যতা থাকবে কি না, বিক্রয়যোগ্যতা বাড়িয়ে তোলার জন্য কোন কৌশল সে গ্রহন করবে কি না, সে-ই হবে তার নির্ণায়ক। কবির কোন বিশেষ ধরনের গদ্য হয় বলে আমার জানা নেই।

১০) কাহাদের কথা-এই কাব্যগ্রন্থ নিয়ে কিছু কথাঃ

এই দুই মলাটের আগের গল্পটা একটু বলতে পারি। বইমেলা শুরু হয়েছে সবে। আমি আর তানিয়া গিয়েছি। সুদেষ্ণা আর বারীনদা আছেন। সন্ধ্যায় সল্ট লেকের একটা ঘরে বসা হল। কয়েকটি লেখা শোনানোর সুযোগ হল। ওদের খুব ভাল লাগলো। বারীনদা অনেক কথা বললেন। এবং আমাকে জানানো হল, কৌরব এই লেখাগুলি প্রকাশ করবে। বইটির নামকরন, প্রচ্ছদ সব কিছুই ওঁদের তত্ত্বাবধানে। আর কিছু বলার নেই আমার। কিচ্ছু না।

১১) এই জীবনের পরেও যদি আরেক জীবন থাকেঃ

না, অতদূর ভাবতে পারি নি এখনো। পারলে জানাব। প্রথমেই জার্নি 90s-কে। কথা দিলাম।