পটভূমি রাস্তা পুনরুদ্ধার

৪২ বছরের রাস্তা পুনরুদ্ধারের চেষ্টা চলছে
সাময়িক অসুবিধার জন্য দুঃখিত
(শাহবাগ আন্দোলনে বহুল প্রচারিত একটি ব্যানারভাষ্য)

২০১৩-র ফেব্রুয়ারিতে শাহবাগে বাংলার তারুণ্যের যে জাগরণ সূচিত হয়, সেটা ছিল আকস্মিক; তবে দেশে বিদ্যমান আপোসের রাজনীতির হাত ধরে এর পটভূমিটা রচিত হয়েছে ধীরে ধীরে, দীর্ঘ ৪২ বছর ধরে। সে বিবেচনায় বলা যায়, শাহবাগ আন্দোলনের ইতিহাস গড়ে উঠেছে গত ৪২ বছরে। সুতরাং শাহবাগকে বুঝতে হলে অতি অবশ্যই এর পটভূমিকে বুঝতে হবে।
একাত্তরে বাংলার নারী-পুরুষ একটি রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে পাকিস্তানি অপশাসনের নাগপাশ ছিন্ন করে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছিল। বিনিময়ে দিতে হয়েছিল একটু বেশিই। নয় মাসে ৩০ লক্ষ নারী-পুরুষের শহীদ হওয়া, আড়াই লক্ষ (মতান্তরে ৪ লক্ষ) নারীর যৌন নির্যাতনের শিকার হওয়া ও প্রায় এক কোটি মানুষের উদ্বাস্তু হতে হওয়া মোটেই ছোট ব্যাপার নয়। মানুষের শান্তিস্বস্তি—নাশের এই ব্যাপকতা পাক সেনাদের একার অবদান ছিল না, নেপথ্যে প্রণোদক-প্রভাবক-সহযোগ� �� হিসেবে এক্ষেত্রে ব্যাপক অবদান রেখেছিল এদেশেরই কিছু মানুষ। তারা ধর্মকে ধ্বজা বানিয়ে বাংলার মুক্তিকামী মানুষের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে বিভিন্ন যুদ্ধাপরাধ ও মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ সংঘটনে ভূমিকা রাখে। এসব অপরাধের মধ্যে ছিল গণহত্যা, ধর্ষণ, শারীরিক নির্যাতন, অগ্নিকাণ্ড, লুটতরাজ, ইত্যাদি।
পৃথিবীব্যাপী মানবসমাজ টিকে আছে ন্যায়ের ভিত্তিতে, যার যা প্রাপ্য তাকে তা দিয়ে। অর্থাৎ যে প্রশংসার ভাগীদার তাকে প্রশংসা ও যে অপ্রশংসার ভাগীদার তাকে অপ্রশংসা করে এবং অপরাধীকে শাস্তি দিয়ে। এই রীতির যেখানে ব্যত্যয় ঘটে, সেখানে অন্যায় মাথা তুলে দাঁড়ায়, ভেংচি কাটে। গত ৪২ বছর ধরে বাংলার মানুষ এই ভেংচিকে সহ্য করে এসেছে, কারণ যুদ্ধাপরাধীদের বিচার সম্ভব না-হওয়ায় স্বাধীন বাংলাদেশে তারা সামাজিক-সাংস্কৃতিক-অর� ��থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে প্রতিষ্ঠা অর্জন করে নিতে সক্ষম হয়েছে।
বিচারের চেষ্টা কখনো হয়ই নি, এমন নয়। হয়েছে কিন্তু সফল হওয়া যায় নি। বিচারের প্রথম উদ্যোগ বাহাত্তরেই নেয়া হয়েছিল দালাল আইন (বিশেষ ট্রাইব্যুনাল) আদেশ জারি করে। একই বছর তিন দফা সংশোধনীর মাধ্যমে আইনটি চূড়ান্ত হবার পর এই আইনের বলে তিয়াত্তরের ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত সারাদেশে ৩৭ হাজার ৪৭১ জন দালালকে গ্রেফতার করা হয়। ৭৩টি বিশেষ ট্রাইব্যুনালে এদের বিচার কাজ চলে এবং ২২ মাসে ২ হাজার ৮৪৮টি মামলার বিচার নিষ্পন্ন হয়। রায়ে তখন ৭৫২ জন অপরাধী বিভিন্ন মেয়াদে দণ্ডিত হন এবং ২ হাজার ৯৬ জন খালাস পান।
তিয়াত্তরের ৩০ নভেম্বর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করলে ২৬ হাজার গ্রেফতারকৃত ব্যক্তি মুক্তি পান। এই ক্ষমার আওতায় ছিলেন বাংলাদেশ দালাল (বিশেষ ট্রাইবুনাল) অধ্যাদেশ ১৯৭২ বলে আটক হওয়া সেসব ব্যক্তি, যাদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা অথবা হুলিয়া ছিল এবং যারা এই আইনে সাজা ভোগ করছিলেন। এ তালিকায় আটককৃত ও সাজাপ্রাপ্ত অনেক প্রাক্তন নেতা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের দালাল-শিক্ষকরাও ছিলেন।
সাধারণ ক্ষমা-বিষয়ক বক্তৃতায় শেখ মুজিবুর রহমান বলেছিন, যেসব লোক দীর্ঘদিন ধরে আটক রয়েছেন। এতদিনে তারা নিশ্চয়ই গভীরভাবে অনুতপ্ত। তারা নিশ্চয়ই তাদের অতীত কার্যকলাপের জন্য অনুশোচনায় রয়েছেন। আমি আশা করি তারা মুক্তিলাভের পর তাদের সকল অতীত কার্যকলাপ ভুলে গিয়ে দেশ গঠনের নতুন শপথ নিয়ে প্রকৃত দেশপ্রেমিকের দৃষ্টান্ত স্থাপন করবেন। মুক্তিপ্রাপ্তদের মুক্তি ত্বরান্বিত করতে তিনি স্বরাষ্ট্র দফতরের প্রতি নির্দেশ দেন যাতে সবাই ১৬ ডিসেম্বরের আগেই মুক্তি পান। তিনি মুক্তিপ্রাপ্তদের প্রতি বিজয় দিবসের উৎসবে একাত্ম হতে এবং দলমত নির্বিশেষে মহান জাতীয় দিবস ১৬ ডিসেম্বরে ঐক্যবদ্ধভাবে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে দেশ গঠনের পবিত্র দায়িত্ব ও দেশের স্বাধীনতা রক্ষার শপথ গ্রহণেরও আহ্বান জানান।
সরকারের পক্ষ থেকে সাধারণ ক্ষমার প্রেসনোটে বলা হয়, দণ্ডবিধির ৩০২ ধারা (হত্যা), ৩০৪ ধারা (হত্যাচেষ্টা), ৩৭৬ ধারা (ধর্ষণ), ৪৩৫ ধারা (গুলি অথবা বিস্ফোরক ব্যবহার করে ক্ষতিসাধন), ৪৩৬ ধারা (ঘর জ্বালানো) ও ৪৪৮ ধারায় (নৌযানে আগুন বা বিস্ফোরণ) অভিযুক্ত ও সাজাপ্রাপ্তগণ এক নম্বর অনুচ্ছেদে উল্লিখিত ক্ষমার আওতায় পড়বে না। অর্থাৎ হত্যা, হত্যাচেষ্টা, ধর্ষণ, ঘরবাড়ি বা জাহাজে অগ্নিসংযোগের দায়ে দণ্ডিত ও অভিযুক্তদের বিচার সাধারণ ক্ষমার পরও অব্যাহত থাকে।
এই পরম্পরায় তিয়াত্তরেই বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইন প্রণীত হয়, যা কার্যকর হয় একই বছর ২০ জুলাই থেকে। এটি প্রণয়নের সময় ন্যুরেমবার্গ ট্রায়ালের বিচারকার্যে জড়িত অভিজ্ঞ অধ্যাপক ইয়েশেখের কাছ থেকে পরামর্শও গ্রহণ করা হয়। কিন্তু শেষপর্যন্ত তখন বিচারকাজ সম্পন্ন করা যায় নি।
একানব্বইয়ের ২৯ ডিসেম্বর গোলাম আযমকে জামায়াতে ইসলামী তাদের দলের আমীর ঘোষণা করলে বাংলাদেশে জনবিক্ষোভের সূত্রপাত হয়। বিক্ষোভের অংশ হিসেবে বিরানব্বইয়ের ১৯ জানুয়ারি জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে ১০১ সদস্যবিশিষ্ট একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি গঠিত হয়। তিনি হন এর আহ্বায়ক। এর পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী প্রতিরোধ মঞ্চ, ১৪টি ছাত্র সংগঠন, প্রধান প্রধান রাজনৈতিক জোট, শ্রমিক-কৃষক-নারী এবং সাংস্কৃতিক জোটসহ ৭০টি সংগঠনের সমন্বয়ে পরের বছর ১১ ফেব্রুয়ারি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন ও একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল জাতীয় সমন্বয় কমিটি গঠিত হয়। সর্বসম্মতিক্রমে এরও আহ্বায়ক নির্বাচিত হন জাহানারা ইমাম। এই কমিটি ওই বছর ২৬ মার্চ গণআদালত-এর মাধ্যমে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে একাত্তরের নরঘাতক গোলাম আযমের ঐতিহাসিক বিচার অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। গণআদালাতে গোলাম আযমের বিরুদ্ধে দশটি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ উত্থাপিত হয়। ১২ জন বিচারক সমন্বয়ে গঠিত গণআদালতের চেয়ারম্যান জাহানারা ইমাম গোলাম আযমের ১০টি অপরাধ মৃত্যুদণ্ডযোগ্য বলে ঘোষণা করেন এবং গণআদালতের রায় কার্যকর করার জন্য সরকারের কাছে দাবি জানান। কিন্তু ফল হয় উলটো।
তৎকালীন সরকার ২৪ জন বিশিষ্ট ব্যক্তিসহ জাহানারা ইমামের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগ এনে অজামিনযোগ্য মামলা দায়ের করে। পরবর্তী সময়ে হাইকোর্ট ২৪ জন বিশিষ্ট ব্যক্তির জামিন মঞ্জুর করলেও তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ বহাল থাকে। এরপর লাখো জনতার পদযাত্রার মাধ্যমে জাহানারা ইমাম ১২ এপ্রিলে গণআদালতের রায় কার্যকর করার দাবিসংবলিত স্মারকলিপি নিয়ে জাতীয় সংসদের মাননীয় স্পিকার, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ও বিরোধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনার কাছে পেশ করেন। ১০০ জন সংসদ সদস্য গণআদালতের রায়ের পক্ষে সমর্থন ঘোষণা করেন। জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় দেশব্যাপী গণস্বাক্ষর, গণসমাবেশ, মানববন্ধন, সংসদ অভিমুখে যাত্রা, অবস্থান ধর্মঘট, মহাসমাবেশ ইত্যাদি কর্মসূচি পালনের মাধ্যমে আন্দোলন আরো বেগবান হয়। তিরানব্বইয়ের ২৮ মার্চ নির্মূল কমিটির সমাবেশে পুলিশ বাহিনী হামলা চালায়। পুলিশের লাঠিচার্জে আহত হন জাহানারা ইমাম।
দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এমনকি বিদেশেও গঠিত হয় নির্মূল কমিটি এবং শুরু হয় ব্যাপক আন্দোলন। পত্র-পত্রিকায় সংবাদ শিরোনাম হয়ে উঠলে আন্তর্জাতিক মহলেও ব্যাপক পরিচিতি অর্জন করে ঘাতক-দালাল নির্মূলের এই গণউদ্যোগ এবং তার নেত্রী জাহানারা ইমাম। এরই অংশ হিসেবে গোলাম আযমসহ একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে গড়ে ওঠা আন্দোলনকে সমর্থন দেয় ইউরোপীয় পার্লামেন্ট। আন্দোলন ব্যাপকতা লাভ করে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে।
তিরানব্বইয়ের ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবসে গণআদালত বার্ষিকীতে জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে গণতদন্ত কমিটি ঘোষিত হয় এবং আরো আটজন যুদ্ধাপরাধীর নাম ঘোষণা করা হয়। এই আটজন ছিলেন আব্বাস আলী খান, মতিউর রহমান নিজামী, মোঃ কামরুজ্জামান, আবদুল আলীম, দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী, মওলানা আবদুল মান্নান, আনোয়ার জাহিদ এবং আবদুল কাদের মোল্লা।
চুরানব্বইয়ের ২৬ মার্চ গণআদালতের ২য় বার্ষিকীতে গণতদন্ত কমিশনের চেয়ারম্যান কবি বেগম সুফিয়া কামাল ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটের সামনে রাজপথের বিশাল জনসমাবেশে জাহানারা ইমামের হাতে জাতীয় গণতদন্ত কমিশনের রিপোর্ট হস্তান্তর করেন। এই সমাবেশে আরো আটজন যুদ্ধাপরাধীর বিরুদ্ধে তদন্তের ঘোষণা দেয়া হয়।
কিন্তু কিছুতেই কিছু হয় না। রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগ মাথায় নিয়েই জাহানারা ইমামকে চুরানব্বইয়ে শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করতে হয়। তাঁর মৃত্যু হয়, কিন্তু যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবির যে চেতনামশাল তিনি প্রজ্জ্বলিত করে গিয়েছিলেন, তা মিটমিট করে জ্বলতে থাকে বাংলার আকাশে।
ছিয়ানব্বইয়ে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় এলেও যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের গণদাবিটির প্রতি তারা মোটেই মনোযোগ দেয় নি। দুহাজার এক-এ আবার শাসন ক্ষমতার হাত বদল হয়। এবার শীর্ষ যুদ্ধাপরাধীরাও মন্ত্রিত্বের আসন পান। তাঁরা জাতীয় পতাকাবাহী গাড়ি হাঁকিয়ে চলাচলের অধিকার অর্জন করেন। মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ জন্ম নিতে থাকে। এই জনক্ষোভই পরের ধাপে দুহাজার আট-এ আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন প্রগতিশীল রাজনৈতিক জোটকে সরকার গঠনের সুযোগ করে দেয়। কারণ এই নির্বাচনের ইশতেহারে আওয়ামী লীগের অন্যতম অঙ্গীকার ছিল যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বাস্তবায়ন করা। এই অঙ্গীকারের ভিত্তিতেই আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইন ১৯৭৩ সংশোধনের মাধ্যমে দুহাজার দশ-এর নতুন করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়। যথাযথ প্রক্রিয়ায় দীর্ঘদিন ধরে তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা, রিপোর্ট প্রণয়ন ও পর্যালোচনা, সাক্ষ্যগ্রহণ ও জেরা শেষে ট্রাইব্যুনাল প্রথম রায় দেন দুহাজার তেরোর ২১ জানুয়ারি। রায়ে পলাতক অপরাধী আবুল কালাম আযাদ (বাচ্চু রাজাকার)-কে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়। ট্রাইব্যুনালের দ্বিতীয় রায় ঘোষিত হয় একই বছর ৫ ফেব্রুয়ারি কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে, যে রায়ে কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের শাস্তি দেন ট্রাইব্যুনাল, যাতে বাংলার মানুষ হতাশ হয়, ক্ষুব্ধ হয়। এই রায়ই ছিল শাহবাগ গণজাগরণের সূতিকাগার।
[page]


একটি সরল ঐকিক, তার গতিপ্রকৃতি ও সাধারণ বৈশিষ্ট্য
১ বছর = ১২ মাস
৩৪৪টা খুনের শাস্তি = ১৪ বছর জেল
অতএব ১টা খুনের শাস্তি = ২ মাস (প্রায়)

আমি কাদের মোল্লাকে খুন করে
দুই মাস কারাগারে থাকতে চাই
(শাহবাগ আন্দোলনে বহুল ব্যবহৃত একটি পোস্টারভাষ্য)

ট্রাইব্যুনালের রায়ের বিস্তারিত বিবরণ থেকে জানা যায়, আসামি কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে আনীত ৬টি অভিযোগের মধ্যে কবি মেহেরুন্নেসাকে হত্যা ও মিরপুরের আলুব্দি গ্রামে ৩৪৪ জন মানুষ হত্যাসহ মোট ৫টি অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়। আদালত প্রমাণিত ৩টি অপরাধের জন্য ১৫ বছরের কারাদণ্ড এবং ২টির জন্য যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। কিন্তু এতগুলো হত্যা ও ধর্ষণ, সর্বোপরী গণহত্যা ও মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের শাস্তি হিসেবে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য মনে হয় নি। তাছাড়া রায়ের আদেশ শোনার পর কাদের মোল্লা হাত দিয়ে ভিক্টরি চিহ্ন প্রদর্শন করেন, যাতে দেশের বিক্ষুব্ধ মানুষ অপমানিত বোধ করে। এর প্রতিবাদে রায়ের দিন দুপুর একটার দিকে ব্লগার অ্যান্ড অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট নেটওয়ার্ক (বোয়ান)-এর ব্যানারে শাহবাগে জাদুঘরের সামনে উপস্থিত হয়ে ট্রাইব্যুনাল ঘেরাওয়ের কর্মসূচি দিয়ে সোশ্যাল নেটওয়ার্কে একটি কর্মসূচি ঘোষণা করেন কয়েকজন ফেসবুক ব্যবহারকারী। একই দাবিতে তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির আন্দোলনকর্মীরাও ফেসবুকে প্রচার চালান শাহবাগে আসার জন্য। তাঁদের সবার প্রচারে শাহবাগে ৫০ জনের মতো মানুষ উপস্থিত হন। অল্প জমায়েতের কারণে বোয়ান ট্রাইব্যুনাল ঘেরাও না-করে মানববন্ধন করে শাহবাগে। উভয় দল মিলে শাহবাগে সব যানবাহন চলাচল বন্ধ করে দেয় বিকেল পাঁচটা নাগাদ। তাঁদের কণ্ঠে প্রতিবাদ ঝলসে ওঠে, আপোসের এ রায় জনগণ মানে না, কোনো আপোস মানি না, কাদের মোল্লার ফাঁসি চাই ও জয় বাংলা।
রায় প্রকাশকে কেন্দ্র করে ডাকা জামায়াত-শিবিরের হরতাল থাকায় ওইদিন ব্যস্ত শাহবাগে যানবাহন চলাচল বন্ধ করে দিতে খুব বেশি বেগ পেতে হয় নি এই ছোট দলটির পক্ষে। এদিকে সন্ধ্যায় বামপন্থী ছাত্র সংগঠনগুলোর মোর্চা প্রগতিশীল ছাত্রজোট-এর নেতৃত্বে টিএসসি থেকে মশাল মিছিল বের হয়। প্রায় ১৫০ জন মানুষের এ মিছিলটি রাজধানীর বাংলামোটর ঘুরে আবার শাহবাগে এসে বসে পড়ে। মশাল মিছিল ঘিরে বাড়তে থাকে মানুষের জমায়েত। রাত সাড়ে আটটার দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ-এর একটি মিছিলও এসে যোগ দেয় শাহবাগে অবস্থানকারীদের সঙ্গে, তবে রাত সাড়ে দশটার দিকে তাঁরা ফিরে যান। ক্রমশ সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের কর্মীসহ সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষ সেখানে যোগ দিতে থাকে। দেখতে দেখতে শাহবাগ হয়ে ওঠে জনারণ্য। কাদের মোল্লার ফাঁসির দাবিতে শাহবাগে লোকজন জমায়েত হয়েছে, ফেসবুকে এই খবর ছড়িয়ে পড়ায় রাত বাড়ার সাথে সাথে সেখানে এসে জড়ো হন আরো সহস্র তরুণ। পরদিন ফেসবুকে ব্যাপকভাবে চলো চলো শাহবাগ চলো ক্যাম্পেইন শুরু হলে শাহবাগের আন্দোলন দেশব্যাপী বিক্ষোভে রূপ নেবার সম্ভাবনা তৈরি হয়।
এটা খুবই স্পষ্ট যে, শুরুতে শাহবাগ আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী নারী-পুরুষদের সবাই ছিলেন তরুণ অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট, যাঁদের একাংশ রাজনীতি সচেতন কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে� � শিক্ষার্থী, বেকার ও কর্মজীবী। ক্রমশ এতে যোগ দেন প্রগতিশীল রাজনৈতিক দলের কর্মী ও সাধারণ মানুষ। দিনে দিনে শাহবাগ আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীদের ধরন সবরকম সীমারেখার বাইরে চলে যায়। মায়ের কোল বা বাপের কাঁধে চড়ে কয়েক বছরের শিশুকে যেমন এখানে হাজির হতে দেখা যায়, তেমনি হুইল চেয়ারে চড়ে আসেন অশীতিপর বৃদ্ধ-বৃদ্ধারাও। স্কুল থেকে ছুটি নিয়ে শিক্ষকদের নেতৃত্বে দলবেঁধে চলে আসে সমস্ত ছেলে-মেয়ে। পক্ককেশ বর্ষীয়ান মুক্তিযোদ্ধার পাশে দেখা যায় থ্রি কোয়ার্টার ও টিশার্ট পরা অনতিতরুণকে, রিক্সাচালক-ক্ষেতমজুর� �র পাশে দেখা যায় আধুনিক পোশাক পরিহিত উচ্চবিত্ত সমাজের নারীকে। কারো প্রতি কারো অবজ্ঞা নেই, সবাই এক কাতারে শামিল। সবার কণ্ঠেই এক জবান : কাদের মোল্লার ফাঁসি চাই, যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসি চাই।
এসময় শাহবাগ হয়ে ওঠে টক অব দা কান্ট্রি। পুরো ফেব্রুয়ারিজুড়ে দেশের বিভিন্ন বয়সী প্রায় সকল মানুষের আলোচনার প্রধান বিষয় ছিল শাহবাগ। ক্লিনিকে-হাসপাতালে, হাটে-মাঠে-ঘাটে, রেডিও-টিভি-পত্রিকায়, স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্য� ��লয়ে, ট্রেনে-বাসে-টেক্সিতে, গৃহে-পথে-রথে, অফিসে-আদালতে, পারিবারিক আড্ডায়, বন্ধু পরিমণ্ডলে সর্বত্র মানুষের আলাপচারিতায় শাহবাগ গুরুত্বপূর্ণ জায়গা দখল করে নেয়।
শাহবাগের অভূতপূর্ব গণজাগরণ দেশবাসীকে চমকে দেবার পাশাপাশি গণমাধ্যমকেও এর চরিত্র নিয়ে ভাবতে প্রলুব্ধ করে, যার ছাপ পড়ে এর নানা নামকরণে। নিকট অতীতে চীনের তিয়েনআনমেন স্কয়ার ও মিশরের তাহরির স্কয়ারে ঘটা আন্দোলনের কথা মনে করে তার সঙ্গে সাদৃশ্য খুঁজে পেয়ে অনেক মিডিয়া তাৎক্ষণিকভাবে এটিকে বাংলার তাহরির স্কয়ার, শাহবাগ স্কয়ার, ইত্যাদি অভিধা যুক্ত করে সংবাদ পরিবেশন করে। পরদিন থেকে এ বিষয়ে বিভিন্ন আলাপচারিতায়, লেখালেখিতে বিভিন্ন ফোরামে এর আরো নানা নাম উচ্চারিত হতে থাকে, যেমন সংহতি স্কয়ার, মুক্তিযুদ্ধ স্কয়ার, শাহবাগ চত্বর, চেতনা চত্বর, প্রজন্ম চত্বর, ইত্যাদি। যেহেতু শাহবাগের গণজাগরণটি প্রধানত বাংলাদেশের জন্মকাল ও এর কিছু আগে-পরে জন্মগ্রহণকারী নবপ্রজন্মেরই জাগরণ, সেহেতু প্রজন্ম চত্বর নামটিই পরে বিভিন্ন ফোরামে প্রস্তাবিত ও ব্যবহৃত অনেক নামের মধ্য থেকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে গণমাধ্যমসহ সকল মহলের কাছে স্বীকৃত ও গৃহীত হয়ে যায়।
শুরুতে শাহবাগ আন্দোলনের বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল এর নির্দলীয় অবস্থান। দেশের চলমান কোনো রাজনৈতিক দলের হাতেই এ আন্দোলনের নেতৃত্ব ক্ষমতা ছিল না। যাঁরা এখানে অংশ নিয়েছেন, তাঁদের কারো কারো কোনো কোনো প্রগতিশীল রাজনৈতিক দলের প্রতি সমর্থন থাকতে পারে, ছিলও, কিন্তু তা এ আন্দোলনে দলগত কোনো প্রভাব রাখে নি। আন্দোলনটি আগাগোড়া যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তি তথা ফাঁসির দাবি এবং তার পাশাপাশি ক্রমশ উঠে আসা ধর্মভিত্তিক সাম্প্রদায়িক রাজনীতি, বিশেষ করে জামায়াত-শিবিরের রাজনীতি আইন করে নিষিদ্ধ করা এবং যুদ্ধাপরাধী জামায়াত-শিবিরের অর্থের উৎস বিভিন্ন ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানকে বর্জন করার লক্ষ্যেই পরিচালিত হয়। কাজেই এ দাবির সাথে একমত নয় এমন দলসমূহ (প্রধান বিরোধী দল বিএনপি ও তার জোটে থাকা ডানপন্থী রাজনৈতিক দলসমূহ) ছাড়া প্রায় সকল রাজনৈতিক দলই পরবর্তী সময়ে আন্দোলনস্থলে গিয়ে ও না-গিয়ে এই আন্দোলনের সাথে সংহতি প্রকাশ করলেও কারোরই দলীয় বক্তব্য আন্দোলনস্থলে স্বাগত জানানো হয় নি। অর্থাৎ আন্দোলনটি সাধারণ জনতার নির্দলীয় আন্দোলন হিসেবে তার চরিত্র ধরে রাখতে পেরেছিল। মূলমঞ্চে কোনো দলীয় ব্যানারও রাখা হয় নি। এটি ছিল এ আন্দোলনটির গ্রহণযোগ্য ও দীর্ঘমেয়াদি হবার প্রধান কারণ।
গণজাগরণ আন্দোলনের আরেকটি বৈশিষ্ট্য ছিল এর বিরামহীন চলমানতা। ৫ ফেরুয়ারি বিকেল থেকে শুরু হয়ে এটি প্রায়-বিরামহীনভাবে চলেছে এবং প্রায় প্রতিদিনই আন্দোলন মঞ্চ থেকে দেশবাসী সকল মানুষের জন্য সংহতিসূচক নতুন নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে। তাতে আন্দোলনের কোথাও কোনো ভাটা পড়ে নি। এখানে লক্ষ করা গেছে একটি উৎসবমুখর আমেজও, যে কারণে আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীরা মূল দাবিতে স্থিত থেকে নানা উদ্ভাবনীমূলক কর্মসূচি নিয়ে এতে সরব হবার অবকাশ পেয়েছেন।
একক নেতৃত্বে নয়, গণজাগরণ মঞ্চের সকল সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে ফোরামে এবং মিডিয়াকেও ফেস করেছেন ফোরামের প্রায় সবাই। তবে ক্রমশ অবস্থা বদলে গেছে। শেষদিকে এসে গণজাগরণ মঞ্চের প্রধান মুখপাত্র হিসেবে ব্লগার অ্যান্ড অনলাইন অ্যাকটিভিস্ট ফোরামের আহ্বায়ক ডা. ইমরান এইচ সরকারকেই সর্বত্র প্রতিনিধিত্ব করতে দেখা গেছে।
গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলন ও এ সংক্রান্ত কার্যক্রম আগাগোড়াই অহিংস ছিল। আন্দোলনের বিরোধী পক্ষ থেকে এ আন্দোলনকে সহিংস করে তুলবার নানা ইন্ধন জোগানো হয়েছে, কিন্তু গণজাগরণ মঞ্চ তাদের মূলনীতিতে বরাবরই অটল ছিল।
আন্দোলন চলাকালে জাতীয় সংসদের প্রধান বিরোধী দল বিএনপি এবং যুদ্ধাপরাধীদের দল জামায়াত ও ছাত্রশিবির অজস্রবার তাদের ডাকা হরতালকে ঘিরে হরতালের দিন এবং এর আগে-পরে দেশব্যাপী ব্যাপক সহিংসতা চালায়। তাদের সহিংস আক্রমণে নিরপরাধ পথচারী, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য ও রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা আহত ও নিহত হয়েছেন। এমনকি ঢাকা ও সিলেটে আন্দোলনের সাথে যুক্ত কর্মীদেরও নৃশংসভাবে হত্যাও করা হয়েছে। হাজার হাজার গাড়ি, বাড়িঘর, মন্দির, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও মঞ্চে অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুর চালানো হয়েছে, জাতীয় পতাকা ও শহীদ মিনারকে অবমাননা করা হয়েছে, রেললাইন উপড়ে ফেলা হয়েছে, রাস্তাঘাট বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। গণজাগরণ মঞ্চ বিচারবিরোধীদের ডাকা এসব হরতাল প্রতিহত করার ডাক দিয়ে নানা কার্যক্রম পরিচালনা করেছে, রাস্তায় হরতালবিরোধী মিছিল-সমাবেশ করেছে; কিন্তু কখনোই অস্ত্রসহ বিরোধীপক্ষের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে নি।
শাহবাগের যে জায়গাটি প্রজন্ম চত্বর হিসেবে চিহ্নিত হয়, পিজি হাসপাতালের প্রিজন সেলের অবস্থান তার খুব কাছেই। আন্দোলন চলাকালে পিজির প্রিজন সেলে জামায়াতের সাবেক আমির যুদ্ধাপরাধীদের নেতা গোলাম আযম চিকিৎসাধীন ছিলেন। আন্দোলনটি অহিংস চেতনা দিয়ে গড়ে না-উঠলে ও সেখানেই স্থিত না-থাকলে এ সংক্রান্ত যেকোনো ইন্ধনে কয়েক মিনিটের নোটিশে বিক্ষুব্ধ জনতা প্রিজন সেল গুঁড়িয়ে দিয়ে গোলাম আযমকে শায়েস্তা করবার ভার নিজেদের হাতে তুলে নিতে পারত। দেশের টাকা দিয়ে জেলের ভেতর রাজাকার পোষার রায় মানি না, দেশের টাকায় জেলে কুত্তা পালবো না, ইত্যাদি স্লোগানসম্বলিত পোস্টার শাহবাগে দেখা গেছে। অর্থাৎ অর্থ খরচ করে যুদ্ধাপরাধীদের জেলে পোষার ব্যাপারে আন্দোলনকারীদের মধ্যে বিরূপতা ছিল। কিন্তু শাহবাগের অহিংস তারুণ্য এই বিরূপতার আগুনে কখনোই ঘি ঢালে নি।
জমজমাট আন্দোলনের সময় ৭ ও ৮ ফেব্রুয়ারি সন্দেহজনক কার্যক্রমের জন্য প্রজন্ম চত্বর থেকে আন্দোলনকারীরা কয়েকজনকে আটক করে। সহিংস দর্শনতাড়িত হলে এত বিক্ষুব্ধ আন্দোলনকারীদের ভিড়ে গণপিটুনিতে আটককৃতদের মৃত্যু হতে পারত। কিন্তু প্রতি ক্ষেত্রেই সন্দেহভাজনদের পরবর্তী জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নিরাপদে পুলিশের হাতে সোপর্দ করে দেয়া হয়েছে।
মঞ্চের আন্দোলনের এই অহিংস দর্শন ব্যাপক শ্রেণির মানুষের প্রশংসা পেয়েছে। ধারণা হয়, এই অহিংস পন্থাও এ আন্দোলনের প্রতি ব্যাপক সংখ্যক মানুষের সমর্থন আদায় ও এর স্থায়িত্বশীলতার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
গণজাগরণ আন্দোলনের কর্মসূচি ছিল সরব ও কালারফুল; কোনো কোনোটা দারুণভাবে উদ্ভাবনীমূলক। গণআন্দোলনে ব্যবহৃত প্রায় সব ধরনের উপায়ই এখানে ব্যবহৃত হয়েছে, তবে প্রায়ই তা হয়েছে নতুনভাবে, যেখানে তা সম্ভব। কিছু কিছু কর্মসূচি ছিল বহুলচর্চিত। তবে কোন গ্রুপ অন্য গ্রুপের চেয়ে বেশি কালারফুল কর্মসূচি হাতে নিতে পারে অনুষ্ঠানস্থলে তার প্রয়াসও লক্ষ করা গেছে। ছিল অবস্থান, সমাবেশ, মহাসমাবেশ, প্রতিবাদ মিছিল, মশাল মিছিল, সংহতি বক্তব্য, বিচিত্র স্লোগান, নাচ-গান-আবৃত্তি, বাউল গান, চরমপত্র পাঠ, লাঠিখেলা, পথনাটক, স্বাক্ষর সংগ্রহ, স্থাপনা, ভাস্কর্য ও কুশপুতুল স্থাপন, লাইভ ইনস্টলেশন, ইনস্টলেশন আর্ট, ছবি আঁকা ও প্রদর্শনী, কার্টুন বা ব্যঙ্গচিত্র প্রদর্শনী, আলোকচিত্র ও সংবাদচিত্র প্রদর্শনী, চলচ্চিত্র প্রদর্শন, সড়ক লিখন, দেয়াল লিখন, সাইবার ক্যাম্পেইন, শপথ পাঠ, ঘোষণা পাঠ, নীরবতা পালন, মোমবাতি প্রজ্জ্বলন, পদযাত্রা ও স্মারকলিপি পেশ, সংহতি সমাবেশ ও পতাকা উত্তোলন, শহীদদের কাছে চিঠি প্রেরণ, পোস্টার, ব্যানার, প্ল্যাকার্ড ও ফেস্টুন প্রদর্শন, বিশেষ দোয়া ও প্রার্থনা, ইত্যাদি।
এ ধরনের কর্মসূচির ভিতর দিয়ে শাহবাগ আন্দোলন সারাদেশ ও দেশের বাইরের বাঙালি অধ্যুষিত অঞ্চলকে এর সঙ্গে যুক্ত করে নিতে সক্ষম হয়, ব্যাপক জনসমর্থন ছিল যার প্রধান ভিত্তি। সাধারণ মানুষ যে এ আন্দোলনকে গ্রহণ করে নিয়েছে তার প্রমাণ মেলে প্রথম দিন রাত থেকেই। আন্দোলনের দাবির সাথে সহমত অনেক মানুষকে দেখা গেছে নিজেদের অর্থ ব্যয় করে কিনে কাঁধে বহন করে বা রিক্সা-ভ্যান ভর্তি করে পানি, শুকনা খাবার ও ফলমূল নিয়ে এসে আন্দোলনকারীদের মধ্যে বিতরণ করতে। সিরাজগঞ্জের এনায়েতপুর গ্রামের কিছু উদ্যমী দরিদ্র মানুষ চাঁদা তুলে খেজুরের রস দিয়ে তেলের পিঠা বানিয়ে এনে শাহবাগের আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীদের খাওয়ান। পরবর্তী সময়ে দেখা গেছে, অনেক ধনবান ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান আন্দোলনকারীদের প্যাকেট করা খাবারও সরবরাহ করেছে।

[page]
আন্দোলনস্থলে রাতদিন সব সময় হাজার হাজার মানুষ অবস্থান করায় জনউদ্যোগে হওয়া ব্যবস্থাপনাকে একসময় যথেষ্ট মনে হচ্ছিল না। ফলে প্রজন্ম চত্বরে নিয়মিত খাবার পানি ও টয়লেট সুবিধা, প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা করা প্রয়োজনীয় হয়ে ওঠে। এক্ষেত্রে ঢাকা সিটি করপোরেশন প্রয়োজনীয় সুবিধা নিয়ে এগিয়ে আসে। করপোরেশনের উদ্যোগে আন্দোলনস্থলে রাতদিন ২৪ ঘণ্টার জন্য একাধিক খাবার পানিবাহী গাড়ি ও মোবাইল টয়লেট পাঠানো হয়। পাশাপাশি প্রাথমিক চিকিৎসা দেবার জন্য কেন্দ্র স্থাপন ও চিকিৎসক পাঠানো, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য মনিটরিং সেল ও সংবাদকর্মীদের জন্য মিডিয়া ইউনিটও স্থাপন করা হয়। সিটি করপোরেশনের পাশাপাশি প্রাথমিক চিকিৎসা দেয় চিকিৎসকদের সংগঠন সন্ধানীও। এর বাইরে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করতে চত্বরে মেট্টোপলিটন পুলিশ স্থাপন করে অস্থায়ী পুলিশ কন্ট্রোল রুম। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সহায়তায় গণজাগরণ মঞ্চের সাইবার যুদ্ধ চালানোর জন্য প্রজন্ম চত্বরে ওয়াইফাই কানেকশনও চালু করা হয়, যাতে যে কেউ ল্যাপটপ নিয়ে আন্দোলনস্থলে পৌঁছে গেলে নিরবচ্ছিন্ন নেট কানেকশন পেতে পারে। আন্দোলনের খবর ও এ বিষয়ক নানা চিন্তা-ভাবনা-দর্শন নিয়ে বেরোয় অজস্র লিফলেট ও বুলেটিন। উইকিপিডিয়ায় যুক্ত হয় একাধিক এন্ট্রি। 2013 Shahbag protests (২০১৩-র শাহবাগ আন্দোলন) নামের প্রথম এন্ট্রির লিংক http://en.wikipedia.org/wiki/2013_Shahbag_protests। এ পর্যন্ত এই এন্ট্রিটি বাংলা, ইংরেজি, স্প্যানিশ, ফ্রেঞ্চ, হিন্দি, ইন্দোনেশীয়, পোলিশ ও তুর্কিসহ মোট ৯টি ভাষায় পাওয়া যায়। এর বাইরে Shahbag Square (শাহবাগ প্রজন্ম চত্বর) নামে উইকিপিডিয়ায় দ্বিতীয় আরেকটি এন্ট্রি খোলা হয়; যার লিংক http://en.wikipedia.org/wiki/Shahbagh_Square। এই এন্ট্রিটি ইংরেজি ছাড়াও বাংলা ও মালয় ভাষায় পাওয়া যায়। খোলা হয় অনেকগুলো অনলাইন পিটিশন পেজ।
শাহবাগ আন্দোলন সৃজনশীল কাজের সঙ্গে যুক্তদের বিশেষভাবে প্রভাবিত করেছে। একে ঘিরে রচিত ও গীত হয়েছে শতাধিক গান, লেখা হয়েছে শতাধিক কবিতা, আঁকা হয়েছে শত শত ছবি ও কার্টুন। তৈরি হয়েছে চলচ্চিত্র ও নাটক। ধারণা হয় যে, এখানেই শেষ নয়; এই আন্দোলন মানুষের মনে যে চেতনাকে পুনর্জাগরিত করে রেখে গেছে, তা সৃজনশীলদের কাজকর্মে ফিরে ফিরে আসবে।
আন্দোলনের সূচনা থেকে আগাগোড়াই গণজাগরণ মঞ্চের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে নারীদের অংশগ্রহণ ছিল উজ্জ্বল। হাতে হাত, কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে প্রজন্ম চত্বরে নারীদের সক্রিয় উপস্থিতি দিনে-রাতে সমানভাবে দৃশ্যমান ছিল। আন্দোলনের ধরন অনুযায়ী এখানে প্রতি মুহূর্তের গুরুত্বপূর্ণ কাজ ছিল বলিষ্ঠ কণ্ঠে স্লোগান দিয়ে চত্বরে উপস্থিত নারী-পুরুষকে উজ্জীবিত করে রাখা। মূল মঞ্চ এবং পার্শ্ববলয়ের প্রায় প্রতিক্ষেত্রেই এ কাজে সফল নেতৃত্ব দিতে দেখা গেছে প্রধানত নারীদেরই। স্লোগানে ব্যাপক সাফল্যের কারণে কয়েকজন নারী আন্দোলনকারী সাধারণ অংশগ্রহণকারীদের কাছে ও গণমাধ্যমে স্লোগানকন্যা, অগ্নিকন্যা, প্রভৃতি নামে নন্দিত হন।
আন্দোলনের শুরুর দিকে এর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত নারীরা স্বাভাবিকভাবেই ছিলেন তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারকারী ছাত্র সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত নেতা-কর্মী, কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে� � শিক্ষার্থী ও কর্মজীবী। ক্রমশ এ সীমারেখা উঠে যায়। পরে এর সঙ্গে যুক্ত হন প্রগতিশীল নারীনেত্রী, সংস্কৃতিকর্মী, উন্নয়ন প্রতিষ্ঠানের কর্মী ও কর্মকর্তা, শ্রমিক আন্দোলনের নেতা-কর্মী, শ্রমজীবীসহ বিভিন্ন পেশাজীবী, স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্য� ��লয়ের ব্যাপক সংখ্যক শিক্ষার্থী, গৃহবধূ, কিশোরী ও মেয়েশিশু।
শুনে অবিশ্বাস্য মনে হবে কিন্তু এটাই বাস্তব যে, শাহবাগে অংশগ্রহণকারী নারীরা নিরাপদ ছিলেন। এখানকার উপস্থিতি এমন এক চেতনায় উজ্জীবিত ছিল যে, শুরু থেকেই এখানে আসা কোনো নারীরই শারীরিক নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে হয় নি। অনেকের নির্ঘুম দিনরাত কেটেছে শাহবাগে, কিন্তু তাদের প্রতি নিপীড়ন বা টিজিং ঠেকাতে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রয়োজন হয় নি, বরং নারী-পুরুষ পরস্পর পরস্পরকে পাহারা দিয়েছেন। কিংবা বলা যায়, মানসিকভাবে এখানে কেউ নারী বা পুরুষ ছিলেন না, ছিলেন পরস্পরের সহযোদ্ধা মানুষ।
আন্দোলনের বিভিন্ন পর্যায়ে নারীদের এই উপস্থিতি যুদ্ধাপরাধী গোষ্ঠী ও তার মৌলবাদী দোসরদের ভীষণ ভাবিয়ে তোলে। নারীউপস্থিতিকে নিরুৎসাহিত করতে তারা তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন বিভিন্ন ফোরামে শাহবাগে নারী-পুরুষ মেলামেশার কল্পিত কাহিনি ছড়ায়। বলে যে, শাহবাগে যেসব মেয়েরা যায় ওরা পতিতা। কিন্তু এসব প্রচারণাও আন্দোলনে নারীউপস্থিতি কমাতে পারে নি। বরং আন্দোলনের সাথে যুক্ত নারীরা মোক্ষম স্লোগান উদ্ভাবন করে এর জবাব দেন। ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ ফোরাম ও আন্দোলনস্থলে প্রচার করা হয় : হ্যাঁ আমি শাহবাগের পতিতা, আমার রেট সকল যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসি, দিবি?
শাহবাগ আন্দোলন চলাকালেই আন্দোলনের সপক্ষে নানা অগ্রগতির খবর পাওয়া যায়। যেমন ১০ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদে দেয়া এক বক্তৃতায় যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে আন্দোলনরত তরুণদের প্রতি সমর্থন জানান প্রধানমন্ত্রী ও জাতীয় সংসদের স্পিকার। বাংলাদেশ ট্রাইব্যুনালের আইন অনুযায়ী বাদীপক্ষের আপিল করার কোনো সুযোগ ছিল না। আন্দোলনের দাবির পক্ষে সাড়া দিয়ে কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে ঘোষিত রায় পুনর্বিবেচনার সুযোগ তৈরি করতে ১১ ফেরুয়ারি ট্রাইব্যুনাল আইন সংশোধনের জন্য প্রস্তাবিত খসড়া বাংলাদেশের মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত হয়, যা ১৭ ফেরুয়ারি জাতীয় সংসদে উত্থাপিত ও পাস হয় এবং ১৮ ফেব্রুয়ারি মহামান্য রাষ্ট্রপতির অনুমোদনের ভেতর দিয়ে আইনে পরিণত হয়। ১৩ ফেব্রুয়ারি চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধী কাদের মোল্লা ও কামারুজ্জামানের প্রেসক্লাবের সদস্যপদ বাতিল করা হয়। গণজাগরণ মঞ্চের প্রচারণায় প্রণোদিত হয়ে যুদ্ধাপরাধীদের দ্বারা পরিচালিত ইসলামী ব্যাংক থেকে সাধারণ জনগণ আমানত প্রত্যাহার করে নিতে শুরু করে। গণজাগরণ মঞ্চের লক্ষ্য পূরণের জন্য দীর্ঘমেয়াদি সাংস্কৃতিক লড়াইয়ের উদ্দেশ্যে গণজাগরণ সংস্কৃতি মঞ্চ গঠিত হয় ও প্রজন্ম চত্বরে স্থায়ী মঞ্চ স্থাপিত হয়। প্রথম ট্রাইব্যুনালে যখন আটটি মামলার বিচারকাজ চলছিল, তখন বিচারকাজ ত্বরান্বিত করতে ২২ মার্চ ২০১৩ দ্বিতীয় ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়।
অন্যদিকে বিরোধীপক্ষও তাদের তৎপরতা চালিয়ে যেতে থাকে। ১৫ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় ধর্মান্ধ মৌলবাদী গোষ্ঠী থাবা বাবা নামে পরিচিত প্রগতিশীল ব্লগার আহমেদ রাজিব হায়দার শোভনকে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে নৃশংসভাবে খুন করে বাড়ির সামনে লাশ ফেলে রেখে যায়, যিনি ছিলেন শাহবাগ গণজাগরণ মঞ্চের একজন সক্রিয় কর্মী। তাছাড়া ওইদিন রাত থেকেই ওয়ার্ডপ্রেসে নুরানী চাপা নামে একটা ব্লগ খুলে তাতে ধর্মবিরোধী বিভিন্ন ব্লগ পোস্ট করে ব্লগটি থাবা বাবার বলে বাঁশের কেল্লাসহ শিবির পরিচালিত অন্যান্য ফেসবুক পেজে প্রচারণা চালানো হয়। পাশাপাশি ডানপন্থী দৈনিক পত্রিকা ইনকিলাব ও আমার দেশ এই ব্লগ কনটেন্টগুলো ছেপে দিয়ে সাধারণ মানুষকে গণজাগরণ মঞ্চের বিরুদ্ধে খ্যাপিয়ে তুলবার প্রয়াস নেয়। এটা ছাড়াও এরা বিভিন্ন ছবিকে সুপারইম্পোজ করে ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ ফোরাম, ব্লগ ও দৈনিক পত্রিকায় প্রচার চালিয়ে সাধারণ ধার্মিকদের এ আন্দোলনের প্রতি বিতৃষ্ণ করে তোলা ও হেফাজতে ইসলামের মতো চরমপন্থী ইসলামি গ্রুপকে সংঘবদ্ধ হবার ইন্ধন দিয়ে যেতে থাকে। হেফাজতে ইসলাম গণজাগরণ মঞ্চের যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসি চাই-এর আদলে নাস্তিকদের ফাঁসি চাই ধরনের দাবি তুলতে শুরু করে এবং ইসলাম রক্ষার নামে ৬ এপ্রিল ঢাকা অভিমুখে লংমার্চ করার ঘোষণা দিয়ে বসে। সরকার এই পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে অদ্ভুত আচরণ করতে শুরু করে। তারাও যে ধর্মের মঙ্গল চায়, ধর্মের সমালোচনা করা পছন্দ করে না এটা বুঝাতে ২ ও ৩ এপ্রিল ইন্টারনেটে ইসলাম ধর্ম নিয়ে আপত্তিকর লেখালেখির অভিযোগে ঢাকা থেকে ৪ জন ব্লগারকে গ্রেপ্তার করে। সরকারের এই আচরণ তাকে সকল মহলেই বিতর্কিত করে তোলে। সরকারের এই ভূমিকা হেফাজতকে যেমন দমাতে পারে নি, তেমনি প্রগতিশীল মহলকেও আহত করে। এদিকে ৬ মে হেফাজতে ইসলামের মতিঝিল ঘটনার পর পুলিশ দিয়ে সরকার শাহবাগে স্থাপিত গণজাগরণের স্থায়ী মঞ্চটি ভেঙে দেয়। আশার কথা হেফাজতকাণ্ডের উত্তাপ থিতু হয়ে আসবারও অনেকদিন পর অতি সম্প্রতি ব্লগাররা জামিনে ছাড়া পেয়েছেন।

[page]
দলীয় নিয়ন্ত্রণ, একটি আন্দোলনের মৃত্যু ও চকিত মন্তব্য
সকল দলীয় প্রজাতির প্রতি আহ্বান
আমাদের এই মূল্যবোধকে দলীয় সংস্করণের মলাট পরাবেন না
(শাহবাগ আন্দোলনে ব্যবহৃত একটি ফেস্টুনভাষ্য)

এটা খুবই পরিষ্কার যে, শাহবাগের আন্দোলনটি ট্রাইব্যুনাল ১-এর দেয়া কাদের মোল্লার রায়ের প্রতি গণআনাস্থার প্রকাশ ঘটায়, যা বর্তমান সরকারেরও বিরুদ্ধে গেছে। কারণ অভিযোগ উঠেছে, নির্বাচনী রাজনীতির কৌশল হিসেবে আওয়ামী লীগ জামাতের সঙ্গে আঁতাত করে সাড়ে তিনশ মানুষ হত্যার নায়ককে ফাঁসি থেকে বাঁচিয়ে দিয়েছে। সরকার বিষয়টাকে সেভাবেই আমলে নেয় এবং সংগত কারণে আন্দোলনটিকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখবার প্রয়াস করে। কারণ সরকারের সামনে নিকট অতীতের তাহরির স্কয়ারের উদাহরণ ছিল।
সন্দেহ নেই যে, আন্দোলনটির স্পিরিট ছিল মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে, যেটা বর্তমান সরকার ও আওয়ামী লীগের প্রধান পুঁজি। ফলে এর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে মিশে গিয়ে একে নিজেদের সুবিধামতো পরিচালনা করার সুযোগ তাদের সামনে উন্মুক্ত ছিল। ধারণা হয়, তারা এ সিদ্ধান্ত শুরুতেই নিয়েছিল। নইলে রাজধানীর শাহবাগের মতো ব্যস্ত মোড় ব্যবহার করে দিনের পর দিন আন্দোলন চালাবার সুযোগ সরকার অচিরেই রহিত করে দিত। কিন্তু তারা সেটা তো করেই নি, বরং সিটি করপোরেশন থেকে আন্দোলনকারীদের জন্য সম্ভাব্য সব ধরনের সেবা সুবিধা নিশ্চিত করেছে।
গণজাগরণ মঞ্চের নেতৃবৃন্দ ও কর্মীবাহিনীতে যাঁরা ছিলেন, তাঁদের সাধারণ পরিচয় অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষশক্তি হলেও অধিকাংশেরই রাজনৈতিক সমর্থন ছিল; এবং বলা বাহুল্য যে, সে সমর্থনের মালিকানা একচ্ছত্রভাবে আওয়ামী লীগের নয়। ফলে সরকারের বিভিন্ন কর্তাব্যক্তি এবং সরকার সমর্থিত রাজনৈতিক দল ও তাদের ছাত্র সংগঠনের নেতৃবৃন্দ সংহতি জানাতে এসে আন্দোলনস্থলে দলীয় বক্তব্য রাখতে বারবারই বাধাপ্রাপ্ত হয়েছেন। গণমাধ্যমসূত্রে প্রকাশিত খবর থেকে জানা যায়, এরকম দরকষাকষির জের হিসেবেই আন্দোলনস্থলে স্লোগানকন্যা লাকীকে আহত হতে হয়েছিল।
কিন্তু শেষপর্যন্ত এই অবস্থা ধরে রাখা সম্ভব হয় নি গণজাগরণ মঞ্চের। ক্রমশ এর সঙ্গে ক্ষমতাসীন দল কর্তৃক নিয়োজিত কিছু অতিপরিচিত ব্যক্তি ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে যান এবং স্বাভাবিকভাবেই কোণঠাসা হয়ে যান ক্ষমতাসীন দলের বাইরের নেতৃবর্গ। ফলে আওয়ামী লীগ ও তার বিভিন্ন শাখা সংগঠন ছাড়া অন্য সকল প্রগতিশীল রাজনৈতিক দলই ক্রমশ গণজাগরণ মঞ্চ থেকে পুরোপুরি আলাদা হয়ে যায়।
একথা বলা যায় যে, শাহবাগের আন্দোলন সর্বজনীন ছিল পুরো ফেব্রুয়ারি মাস জুড়ে। প্রজন্ম চত্বর লাখো উপস্থিতি দেখেছে আন্দোলনের ফেব্রুয়ারিপর্বেই। মার্চ থেকে ক্রমশ যার জৌলুস কমতে থাকে। কারণ তখন থেকেই ক্ষমতাসীন দলের নিয়ন্ত্রণ অনেকখানি স্পষ্ট হতে থাকে মানুষের কাছে। পরিষ্কার হতে থাকে গণজাগরণ মঞ্চের দাবিদাওয়া বাস্তবায়নে সরকারের আন্তরিকতাহীনতাও। শহীদ রুমী স্কোয়াডের অনশন করতে হওয়াও তার একটি প্রমাণ। গণজাগরণ মঞ্চ সরকারের প্রতি যে আলটিমেটাম দেয়, তাতে বলা হয়েছিল ২৬ মার্চ মহান স্বাধীনতা দিবসের আগে জামায়াত-শিবিরকে নিষিদ্ধ করতে হবে। কিন্তু এই সময়সীমা পার হয়ে যাবার পরও সরকারের পক্ষ থেকে কোনো কার্যকর উদ্যোগ গৃহীত না-হওয়া এবং গণজাগরণ মঞ্চও এ দাবিতে নতুন কোনো কর্মসূচির ডাক না-দেয়ায় এ অবিশ্বাস পোক্ত হয় ও অনশনের কর্মসূচি হাতে নেয়া হয়।
অনশনে অংশ নেয়া শহীদ রুমী স্কোয়াডের কর্মীরা বাম রাজনৈতিক আদর্শে বিশ্বাসী। এঁরা গণজাগরণ আন্দোলনের সঙ্গে শুরুতে ওতপ্রোত থাকলেও পরে মূলমঞ্চের কর্মকাণ্ডের ওপরে আস্থা রাখতে পারেন নি। অনশনের সপ্তম দিন সরকারের পরিকল্পনামন্ত্রী সেক্টর কমান্ডার একে খন্দকার সরকার জামায়াত-শিবিরকে নিষিদ্ধের চেষ্টায় ব্যস্ত আছে জানিয়ে প্রয়োজনে এই দাবিতে অনশনকারীদের সঙ্গে তিনিও একই পোশাক পরে অনশনে শামিল হবেন জানালে তাঁরা ৪ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রীর কাছে গণজাগরণ মঞ্চের স্মারকলিপি দেয়ার দিন পর্যন্ত অনশন স্থগিতের ঘোষণা দেন। সরকার হয়ত এই জুলাইয়েও ওই লক্ষ্যে চেষ্টাই চালিয়ে যাচ্ছেন! কারণ এখনো পর্যন্ত ওরকম কোনো উদ্যোগ নেবার খবর পাওয়া যায় নি।
সর্বশেষ গত ৫ জুলাই গণজাগরণ মঞ্চ প্রজন্ম চত্বরে জামায়াত শিবিরের রাজনীতি নিষিদ্ধকরণ ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বাংলাদেশ বিনির্মাণ শীর্ষক যে গণসংলাপের আয়োজন করে সেখানেও শহীদ রুমী স্কোয়াডের সমর্থন ছিল না। তারা একই দাবিতে একইসময়ে মুখে কালো কাপড় বেঁধে মানববন্ধন করে।
গণজাগরণ আন্দোলন শুরু হবার পরে মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচারপ্রক্রিয়ার আরো অগ্রগতি হয়েছে। ফেব্রুয়ারির শেষদিকে দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী ও জুনে কামারুজ্জামানের ফাঁসির রায় হয়েছে। কিন্তু এসব রায় কার্যকর করবার কোনো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। এদিকে সংশোধিত আইনের বিধি অনুযায়ী কাদের মোল্লার রায়ের বিরুদ্ধে যে আপিল করা হয়েছিল, তার শুনানিও শেষ হয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালস (সংশোধন) আইনের ২১(৪) ধারা অনুসারে আপিল দায়েরের ৬০ দিনের মধ্যে তা নিষ্পত্তির বিধান রয়েছে। কিন্তু নির্দিষ্ট সময় পার হয়ে গেলেও ওরকম কোনো তৎপরতা দেখা যাচ্ছে না। সরকার এখন জানাচ্ছে, ৬০ দিনের মধ্যে শেষ করতে হবে এরকম কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। কারণ আইনে এটা বলা নেই যে, ৬০ দিনের মধ্যে শেষ না হলে কী হবে! এদিকে দুটি ট্রাইব্যুনালেরই কাজ পুরোদমে এগিয়ে চলেছে। গণমাধ্যমসূত্রে জানা গেছে, গোলাম আযমের মামলার রায়ও প্রস্তুত হয়ে আছে অনেকদিন ধরে। কিন্তু রায়ের ঘোষণা অজানা কারণে বিলম্বিত হচ্ছে।
প্রতিটা রায় ঘোষণাকে কেন্দ্র করেই জামায়াত-শিবির দেশে ভয়ানক নাশকতার ঘটনা ঘটিয়েছে। প্রতিবারই দেশবাসী দেখতে চেয়েছে, সরকারের এ ধরনের ঘটনা সাহসের সাথে মোকাবেলা করার সামর্থ্য ও সদিচ্ছা আছে। কিন্তু মানুষ দেখেছে উলটোটা। তাদের নাশকতার জবাবে সরকার ও সরকারের বাহিনী কখনোই যথাযথ ব্যবস্থা নেয় নি। কেমন যেন একটা গা-ছাড়া ভাব, কেমন যেন একটা দোদুল্যমানতা। ফলে সাধারণ মানুষ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠনের অনেক কর্মী জামায়াত-শিবিরের সহিংসতার শিকার হয়ে নিহত হয়েছে। সাধারণ মানুষ ও দেশের সম্পদের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। বর্তমান অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, নতুন কোনো রায় ঘোষণা করে ওরকম কোনো অবস্থা হয়ত সরকার আর তৈরি হতে চাইছে না। হয়ত ঝুলিয়েই রাখতে চাইছে। এদিকে সাধারণ নির্বাচন অত্যাসন্ন। ধারণা হয়, এই অসমাপ্ত বিচার সমাপ্ত করার প্রতিশ্রুতি বিক্রি করেই হয়ত আগামী নির্বাচনে আবার আওয়ামী লীগ নির্বাচনী বৈতরণী পার হবার চেষ্টা করবে।
নামকাওয়াস্তে গণজাগরণ মঞ্চ এখনো টিকে আছে, ঢাল নেই তলোয়ার নেই নিধিরাম সর্দারের মতো। কাজ চালিয়ে যাচ্ছে সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের মতো। এখন এর ১০০/২০০ জনের জমায়েত দেখলে বড়ো মনোকষ্ট হয়। মনে হয়, এই পরিণতিই যদি মেনে নিতে হবে, তাহলে কী দরকার ছিল একে এতদূর বয়ে নিয়ে আসার? গণজাগরণ-আন্দোলনের স্মৃতি বহনের জন্য সরকারপোষা একটা ফোরামের অধিক এটি এখন আর কিছুই নয়।


স্কেচঃ মেঘ অদিতি
ফোটোঃ লেখক