সমর রায়চৌধুরী, তাঁর কবিতার অভয়ারণ্য জলপাইগুড়ি। এই কবিতাগুলির প্রতিটি অক্ষরের ফাঁকে ফাঁকে ড্রপার থেকে ফোঁটা ফোঁটা ঝরে পড়ছে সূর্যের ছায়া। যে কবিতা, হাওয়ায় হাওয়ায়, উড়োখবরের মতো হু হু ক’রে আমাদের টেনে নিয়ে যায় প্রকৃত কবিতার দিকে।

সমর রায়চৌধুরী, যিনি বিশ্বাস করেন, কবিতার অর্থ শ্বাসনালীর ভেতর আটকে থাকা এক কাঁচের গেলাস। কিংবা, অতল জলের কলসীর ভেতরে যে-রকম আত্মহত্যা করে মানুষের মরুভূমি, কবিতা সে-রকম…

ও হ্যাঁ, সমর রায়চৌধুরী কেউ নন, একজন পাখিচোর।

কতোদিন পর দ্যাখা, ১২ বছর না?
: তা হবে।

রোগা, কালো হয়ে গেছো ; চুল তো প্রায় ঝরেই গেল।
: নীরবতা

শুধু কবিতা লিখলেই হবে?
: নীরবতা

গদ্য লেখো, গল্প, উপন্যাস !
: নীরবতা

অসুখ আর দুঃস্বপ্ন ছাড়া আর কিছুই কি নেই?
: নীরবতা

কথা বলছো না কেন?
: নীরবতা


দ্যাখো, দূর কোনো পাহাড়ে, হিমালয়ে
এইসব কথার প্রত্যুত্তরে
বরফ পড়ছে, বরফ পড়ছে, বরফ পড়ছে, আর

বরফ পড়ছে নির্বাক

[page]
পাখিচোরের ডায়েরী

ওই নদী এক পাখির নখের আঁচড়
ওই রাস্তা এক পাখির লেজ
ওই মেঘ এক পাখির পালক
ওই পাহাড় এক পাখির ডিম
ওই চাঁদ এক পাখির চোখ, আর
আমি পাখিচোর
এক অন্ধকার থেকে তুলে এনে অন্য অন্ধকারে
                                                   ছড়িয়ে দিই
স্তব্ধ পাখির ডাক
পাখির স্তব্ধ ডাক, আর
নানারকম পাখির ডাকের নৈঃশব্দ্যময়
                                                   আত্মার অন্ধকার

চিল

মাছের কাঁটা বাছতে বাছতে শুনি চিল ডাকছে
খবরের কাগজ পড়তে পড়তে শুনি

চিলের ডাকে থেঁৎলে যায় আমার মুখ
আঙুলগুলি ফেটে চৌচির
চিল ডাকে, আর আমার হাড়গুলি ভেঙ্গে যায়

মাছের কাঁটা বাছতে বাছতে
খবরের কাগজ পড়তে পড়তে
হাড়গোর ভাঙ্গার মটমট শব্দে যেই ওকে ফুসলাই
একটা সুতোর মধ্যে তখন ডেকে ওঠে চিল
মাংসের মধ্যে ডেকে ওঠে
আমারই রক্তের চিল

মেঘ তাকে উস্কে দেয়, দুপুর তাকে উস্কে দেয়
ধূপগুড়ির আকাশ বাতাস, আর
গয়েরকাটার শ্মশান উস্কে দেয় তাকে

কবিতার অভিশাপ ভেঙ্গে পড়ে ওর পিঠে
যখন আমি বলি
ডাক, ডাক, ডাকতে ডাকতে অন্ধ হয়ে যা

[page]
সূচ

সকালবেলা ঘুম থেকে উঠেই দেখি
টেবিলের ওপর একটি সূচ
ছোঁয়ামাত্র সূচটা আমার হাতের সাথে
                                                   আটকে যায়
আর তাকে ছাড়াতে পারি না
বিকেলে সূচশুদ্ধ ওই হাত পকেটে ঢুকিয়ে
রাস্তায় নেমে ভাবি
সূচের সূক্ষ্মতা দিয়ে সময়ের সাথে নিজের ছায়াকে
                                                   সেলাই করার কথা
ভাবি, সূচের ফুটো দিয়ে নিজেকেও পার করে দেওয়ার কথা


তাস প্রণালী

ডান চোখ আর বাঁ চোখের মাঝখানে দূর-দূরান্ত, মরুভূমি
ওই মরুভূমির ওপর সারাক্ষণ তাস ওড়ে
আত্মহন্তারক তাসগুলি ওড়ে
প্রেমকাতর তাস
স্বপ্নপ্রচারক তাস
অশরীরী তাস
তাসের জননেন্দ্রিয় থেকে স্মৃতির সারাংশ
তাসের হৃদয় ফেটে কবিতা
রক্তের তাসগুলি উড়তে থাকে কেবল
আমার ডান চোখ আর বাঁ চোখের মাঝখানে যে মরুভূমি
                                                   তার মেঘের ওপরে


জুয়ো

সমুদ্রের জুয়াড়ী, হেসে ওঠে ঝড়ের জুয়াড়ী

জুয়ো আমাকে টেনে এনেছে পৃথিবীতে
দীর্ঘশ্বাস, বৃষ্টি আর জুয়োর দান
মাথার ওপর ভেঙ্গে পড়েছে কেবল
জুয়োই আমাকে নিয়ে এসেছে এখানে
জুয়োই ফিরিয়ে নেবে একদিন
শুধু মাঝে মাঝে জুয়োর জঙ্গল থেকে
                                                   ডেকে উঠবে বাঘ আর
জুয়ো খেলতে খেলতে টের পাবো
জুয়োর ঘুঁটির লোম খাড়া হয়ে উঠছে
শিউরে উঠছে আমার জুয়োর দানগুলি


জুতো

জুতোর ভেতর ডাকে মেঘ
সে পকেট থেকে বের করে তার বাড়ি
জুতোর ভেতর ডাকে মেঘ
ঘুড়ির ওপর দাঁড়িয়ে সে ওড়াতে থাকে তার খেলার মাঠ
ভেসে ওঠে সাতটা চাঁদ আকাশে
ঘরের সিলিংয়ে তারই পায়ের ছাপ

জুতোর ভেতর ডাকে মেঘ
আমার গলার ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে পাখি
জুতো পায়ে আমি তখন দাঁড়িয়ে থাকি
                                                   আমারই মাথার ওপরে
ঘুম ঘর

এখানে গম ভাঙ্গানো হয়

পড়ি আমি
এখানে ঘুম ভাঙ্গানো হয়

ভেসে ওঠে ব্যাগ-ভরতি ঘুমের দানা

হেসে ওঠে
আটা কলের মেশিন

ঘুমের দানাগুলি পেষা হতে থাকে সেখানে

[page]
বিরক্তি

বিরক্তি এসে ধাক্কা দিচ্ছে দরজায়
তুমি আমার রক্ত চুলকে দাও
আমার ঘুম চুলকে উঠছে
বিরক্তি এসে বিরক্ত ক’রছে আমাকে

ভিতরে কুকুর চকচক ক’রে চেটে খাচ্ছে জল
অবিরাম চাটছে রক্ত আমার
রক্ত চেটে খাওয়ার শব্দে আঁৎকে উঠছে ঘুম

এসো তুমি
আমার লোহিত ও শ্বেতকণিকাগুলি
                                                   একটু চুলকে দাও

বিরক্তিতে আমার রক্তের ভেতর অবধি চুলকে উঠছে


ভয়

চুল আঁচড়াতে গিয়ে চিরুনি অবাক!
দ্যাখে-মাথা উধাও
বদলে, লোকটার ঘাড়ের ওপর উঁচিয়ে আছে ফণা
                                                   সাপের ফণা
এক ঠান্ডা ভয় নেমে আসে চিরুনির শরীরে

আমি গলায় হাত দিই-- এক গাছের গুঁড় !
চিরুনির দিকে তাকাতেই— চিরুনি করাত!
সারাদিন মাথাহীন আমি ঢুকে যেতে থাকি
                                                   আমার আরো ভেতরে
সারারাত হারিয়ে যাওয়া মাথা থেকে, চোখ থেকে
                                                   খুবলে আনি লোহা


খেজুর কাঁটা

একজন মরুভূমি এসে ঢুকে পড়লো আমার জলের কলসীতে
একজন নদী এসে রান্নাঘরের উনোনে ঢুকিয়ে দিলো তার হাত, পা
নদীর হাত পুড়ছে, নদীর পা
জলের কলসীর মধ্যে আত্মহত্যা করছে মরুভূমি

আমি একজন খেজুর কাঁটা

তোমার বুক থেকে একদিন জন্ম নিয়েছিল যে কাঁচের বেড়াল
তুমি তার ভাঙ্গা নাক
ফাঁকা মাঠে কি জানি কোন উদ্দেশ্যে বাজে ঢাক

কখনো আমাদের ঘরে গায়ে আগুন লাগিয়ে দাপিয়ে বেড়ায় নদী
কখনো আত্মহত্যা করে মরুভূমি জলের কলসীতে

[page]
শাদা দাগ

শাদা পৃষ্ঠার ওপর দিয়ে ছুটে আসছে শাদা দাগ
আলেয়ার বুক থেকে জখম

জখম একটা শাঁখা
যে বড় হ’তে হ’তে ফাঁসি
ফাঁসি ছোট হ’তে হ’তে এইটুকু একটা শাদা দাগ

শাদা দাগই হচ্ছে শাদা রঙের ঘুম, এবং
শাদা রঙের ঘুমের ভেতর শাদা দাগ হচ্ছে
                                                   আরও শাদা রঙের এক অদৃশ্য স্বপ্ন
যার গায়ে ছায়া পড়তেই
আমি বৃষ্টি বৃষ্টি আর বৃষ্টি

আমি শুধু ঝমঝম শব্দ


বিচিত্র বীর্য

আংটি খুলতে গিয়ে আঙুল খুলে আসে
চশমার সাথে উঠে আসে চোখ
কুলকুচি ক’রে জল ফেলতে যাই—
                                                   জিভ খ’সে পড়ে যায় বেসিনে

এক দমকা হাওয়া
টুপির সাথে উড়িয়ে নিয়ে যায় মাথা
হাততালি দিতেই তালির শব্দের সাথে ওড়ে
                                                   হাতের দুই তালু

ফুঁ দিয়ে ধুলো ঝাড়তে গেলে বেরিয়ে আসে
                                                   ফুসফুস
জুতো খুলতে যাই
                                                   শরীর থেকে খুলে আসে পা


ভাসমান সতর্কবার্তা

বাতাস থেকে একটা টিয়াপাখি তুলে নিয়ে চিবাতে দেখে
সবাই আমাকে সাবধানে থাকার কথা বলে
আমার দাঁত সবুজ
ঠোঁটের কোণ দিয়ে গড়িয়ে নামে টিয়ার সবুজ রং
সবাই আমাকে সাবধানে থাকার কথা বলে

সাবধান করি তোমাকে
তুমি যখন একটা জ্বলন্ত টিউব-লাইট ধরে চিবাও
আমি বলি— ‘সাবধান!’
তোমার ঠোঁটের কোণ উপচে
গালের কষ্ বেয়ে গড়িয়ে নামছে
ফ্ল্যুরোসেন্ট আলো

সাবধান ভাই, সাবধান!

কবিতাগুলি কবির ‘মেঘওয়ালা’ কবিতার বই থেকে নেওয়া হয়েছে। বানান অপরিবর্তিত।