বৈজ্ঞানিক বস্তুবাদের তাত্ত্বিক ব্যাখ্যাতা রাহুল সাংকৃত্যায়ন (১৮৯৩-১৯৬৩) বিরাট এক পটভূমিতে লিখেছিলেন তাঁর শ্রেষ্ঠতম সাহিত্যকীর্তি ‘ভোলগা থেকে গঙ্গা’।
কাশীর পণ্ডিতমণ্ডলী তাঁকে দিয়েছিল ‘মহাপণ্ডিত’ উপাধি। আশ্চর্য এই মানুষটি ছিলেন হিন্দি, উর্দু, বাংলা, পালি, সংস্কৃত, আরবি, ফারসি, ইংরেজি, তিব্বতি ও রুশ ভাষায় অসামান্য দক্ষ। হাজারিবাগ সেন্ট্রাল জেল থেকে ১৯৪২ সালে এই বইয়ের প্রথম সংস্করণের ভুমিকায় তিনি লেখেন : ‘‘মানব-সমাজ আজ যে পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে সেখানে পৌঁছাতে প্রারম্ভিক সময় থেকে আজ পর্যন্ত বড় বড় সংঘর্ষের ভিতর দিয়ে তাকে আসতে হয়েছে। বিষয়টি সহজভাবেও লেখা যায় যাতে প্রগতির ধারা অনায়াসেই বুঝে নেওয়া সম্ভব। সেই কারণেই ‘ভোলগা থেকে গঙ্গা’ রচনায় প্রবৃত্ত হয়েছি।’’
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, এ বছর তাঁর মৃত্যুর পঞ্চাশ বছর পূর্ণ হলো।

[page]
নিশা
দেশ : ভোলগা নদীর তীর ।। কাল : ৬০০০ খৃষ্টপূর্ব

বেলা দ্বিপ্রহর, অনেক দিন পরে আজ সূর্যের দেখা পাওয়া গেল। এখন দিনগুলি পাঁচ ঘণ্টার মধ্যেই সীমাবদ্ধ, তবুও এ সময় রৌদ্রের তীব্রতা নেই ; মেঘঝঞ্ঝাহীন, তুষার ও কুয়াশামুক্ত সূর্যের সুদূরবিস্তারী কিরণ দেখতে মনোহর— তার স্পর্শ এক আনন্দানুভূতির সঞ্চার করে। আর চারিদিকের দৃশ্য? ঘন নীল আকাশের নীচে পৃথিবী রয়েছে কর্পূরের মতো সাদা তুষারে ঢাকা। চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে আর তুষারপাত না হওয়ার জন্য পূর্বের দানা-দানা তুষারকণাগুলি কঠিন জমাট হয়ে গেছে। এই হিমবসনা ধরিত্রী দিগন্তপ্রসারী নয়, বরং উত্তর থেকে দক্ষিণে কয়েক মাইল পর্যন্ত চলে গিয়েছে আঁকাবাঁকা রূপালী রেখার মতো, যার দু’ধারে পাহাড়ের ওপর নিবিড় অরণ্যরেখা। আসুন, এই বনরাজিকে আরও কাছে গিয়ে দেখি। এই তরুশ্রেণীর মধ্যে মূলত দুই ধরনের বৃক্ষাদি আছে। একটির নাম ভূর্জ— শ্বেত বল্কলধারী এবং বর্তমানে নিষ্পত্র ; অপরটি পাইন—উত্তুঙ্গ ও ঋজু। শাখাগুলি সমকোণে ছড়িয়ে গেছে চারিদিকে। সুচ্যগ্র পাতাগুলি হরিৎ বর্ণ— কোনোটা ঘন গাঢ় সবুজ আর কোনোটা ফিকে। তুষারের অজস্র দান থেকে গাছগুলি নিষ্কৃতি পায়নি, গাছের কোণে তুষারের স্তূপ সাদা কালোয় রূপ-রেখা সৃষ্টি করে কার যেন দৃষ্টি আকর্ষণ করছে। এ ছাড়া চারিদিকে ভয়ঙ্কর নীরবতার অখণ্ড রাজত্ব বিদ্যমান। কোনোদিক থেকেই শোনা যায় না ঝিঁঝিঁর ঝঙ্কার, পাখীর কাকলী বা পশুর কোলাহল।
আসুন, পাহাড়ের সর্বোচ্চ শিখরস্থিত পাইন গাছের ওপর উঠে চারিদিকটা দেখি। হয়ত ওখানে গেলে বরফ, জমি ও পাইন ছাড়া আর কিছু দেখতে পাওয়া যেতে পারে। বড় বড় বৃক্ষরাজির দিকে তাকিয়ে মনে হতে পারে যে এখানে কি কেবল এই রকম গাছই জন্মায়? এই জমিতে কি ছোট ছোট চারা গাছ বা ঘাস জন্মায় না? কিন্তু সে সম্বন্ধে আমরা কোনো মতামত দিতে পারি না। শীত প্রায় শেষ হয়ে এল। এই বড় বড় গাছের গুঁড়িগুলি কতখানি বরফের স্তূপে ঢাকা পড়েছে তা বলা শক্ত, আমাদের কাছে মাপবার কিছু নেই। এই বরফের স্তূপ আট হাত অথবা তার চেয়েও বেশী হতে পারে। বরফ এ বছর বেশী পড়েছে— এ অভিযোগ সকলেরই।
পাইনের ওপরে এসে কি দেখা যাচ্ছে? দেখছি সেই বরফ, সেই বনরাজি আর সেই উঁচু-নীচু পার্বত্য-ভূমি। হ্যাঁ, পাহাড়ের অপর পারে এক জায়গায় ধোঁয়া দেখা যাচ্ছে। জনপ্রাণী-শব্দশূন্য বনভূমির মধ্যে ধোঁয়ার কুণ্ডলী কৌতূহল জাগিয়ে তোলে।
(সংক্ষেপিত)

[page]
পুরুধান
দেশ : উপরিস্বাত ।। কাল : ২০০০ খৃষ্টপূর্ব

মঙ্গলপুরের পুরুরা তাদের সুন্দর ঘরগুলি পাইন শাখায় ও রঙ বেরঙের পতাকায় সাজিয়েছিল। পুরুধান তার ঘর সাজাচ্ছিল এক বিশেষ ধরনের রক্ত পতাকা দিয়ে। তা দেখে প্রতিবেশী সুমেধ বলল। ‘‘মিত্র পুরু। তোমার পতাকাগুলো বেশ হালকা ও চিকন দেখছি। আমাদের এখানে তো এ রকম কাপড় বোনা হয় না, এতে বোধহয় অন্য কোনো ধরনের ভেড়ার লোম ব্যবহার করা হয়েছে?’’
‘‘না, এ-তো কোনো ভেড়ার লোমে বোনা হয়নি সুমেধ!’’
‘‘তা’হলে?’’
‘‘এ এক রকমের পশম— গাছে জন্মায়। আমরা ভেড়ার গা থেকে পশম নিয়ে কাপড় বুনি, আর এই পশম জন্মায় জঙ্গলের গাছে।’’
‘‘এ রকম শোনা যায় বটে কিন্তু নিজের চোখে এ ধরনের গাছ কখনও দেখিনি।’’
উরুর ওপর তকলী ঘষে সেটা ঘুরিয়ে দিয়ে ভেড়ার লোমের ফেটি লাগাতে লাগাতে সুমেধ বলল, ‘‘কী ভাগ্যবান তারা, যাদের গাছে এই পশম জন্মায়। আচ্ছা, আমাদের এখানে ওই গাছ লাগানো যায় না?’’
‘‘তা বলতে পারি না। কতটা শীত-তাপ সে গাছ সহ্য করতে পারে তাও জানি না। কিন্তু সুমেধ। মাংস তো আর গাছে জন্মাতে পারে না।’’
‘‘কোনো দেশে যদি গাছে পশম জন্মাতে পারে— কে জানে হয়ত এমন দেশও আছে যেখানে গাছেই খাবার মাংস পাওয়া যায়। যাক্, এ কাপড়ের দাম কত?’’
‘‘পশমী কাপড়ের চেয়ে অনেক কম, তবে টেকে না বেশীদিন।’’
‘‘কোথায় খরিদ করলে?’’
‘‘অসুরদের কাছ থেকে। এখান থেকে প্রায় পঞ্চাশ ক্রোশ দূরে তাদের দেশ, সেখানকার লোকেরা গাছের পশমের কাপড় পরে।’’
‘‘এত সস্তা যখন, তখন আমরাই বা পরি না কেন?’’
‘‘ওই কাপড়ে শীত কাটে না।’’
‘‘তবে অসুররা পরে কি করে?’’
‘‘ওদের দেশে ঠাণ্ডা কম, বরফ পড়েই না।’’
‘‘আচ্ছা পুরু, তুমি কেবল দক্ষিণ দিকেই ব্যবসা করতে যাও কেন?’’
‘‘লাভ বেশী হয়— সেই জন্যেই! আর বিভিন্ন ধরনের জিনিসপত্রও পাওয়া যায়। তবে খুব কষ্টও হয়। ওদিকে গরম প্রচণ্ড, একটু ঠাণ্ডা জলের জন্য প্রাণ ছটফট করে।’’
‘‘ওখানকার লোকেরা সব কেমন পুরুধান?’’
‘‘লোকগুলো বেঁটে বেঁটে, রঙ তামাটে। বড়ই কুৎসিত। আর নাক আছে কি নেই সেটা বোঝা যায় না— খুব চেপ্টা ও ভোঁতা। আর সবচেয়ে খারাপ হল যে, সেখানে মানুষ কেনা-বেচা চলে।’’
‘‘কি বললে? মানুষ কেনা-বেচা!’’
‘‘হ্যাঁ, ওরা এই ব্যবসাকে বলে দাস-ব্যবসা।’’
‘‘দাস ও তাদের প্রভুদের মধ্যে কি চেহারার কোনো পার্থক্য আছে?’’
‘‘না। তবে দাসরা খুব গরিব ও পরাধীন— দেহ-মন সবই প্রভুদের অধীনে।’’
‘‘ইন্দ্র রক্ষা করুন, এমন লোকের মুখ যেন দেখতে না হয়।’’
‘‘মিত্র সুমেধ! তোমার তকলী তো ঘুরছেই— যজ্ঞে যাবে না?’’
‘‘যাব না কেন! ইন্দ্রের দয়াতেই তো আমরা নধর পশু আর মধুর সোমরস পাচ্ছি। এমন কোন হতভাগা আছে যে এই ইন্দ্রপূজায় মিলিত হবে না?’’
‘‘তোমার বউটির খবর কি? তাকে তো আজকাল দেখা-ই যায় না!’’
‘‘কেন, তুমি তার প্রেমে মজেছ না-কি, পুরুধান?’’
‘‘মজবার কথা হচ্ছে না। তুমি তো জেনেশুনেই বুড়ো বয়সে তরুণীর সঙ্গে প্রণয়ের জিদ ধরেছিলে!’’
‘‘পঞ্চাশে লোক বুড়ো হয় না।’’
‘‘কিন্তু পঞ্চাশ আর বিশ বছর বয়সের পার্থক্য কত, জান?’’
‘‘বেশ তো, সে তা’হলে তখনই আমাকে প্রত্যাখ্যান করলেই পারত!’’
‘‘তুমি তখন গোঁফ-দাড়ি মুড়িয়ে চেহারা করেছিলে যেন আঠারো বছরের ছোকরা! আর ঊষার মা-বাপের নজর ছিল তোমার পালিত পশুদের ওপর।’’
‘‘এ সব কথা বন্ধ কর পুরু। তোমরা ছেলেছোকরা তো খালি…।’’
‘‘বেশ, এ সব কথা না হয় বলব না। ওদিকে কিন্তু বাজনা আরম্ভ হয়ে গেছে— উৎসব এ বার শুরু হবে।’’
‘‘দিলে তো এখানে দেরি করিয়ে— বেচারা সুমেধ এখন গাল খাক আর কি।’’
‘‘বেশ তো চল, ঊষাকেও সঙ্গে নেওয়া যাক্।’’
‘‘সে কি এখনো বাড়ি বসে আছে না-কি।’’
‘‘যাক্, এই পশম আর তকলীটা রেখে চল এখন।’’
‘‘আরে, এগুলো সঙ্গে থাকলে যজ্ঞের কিছু অঙ্গহানি হবে না।’’
‘‘এই জন্যেই তো ঊষা তোমায় পছন্দ করে না।’’
‘‘পছন্দ ঠিকই করে— অবশ্য তোমরা মঙ্গলপুরের তরুণরা যদি তাকে পছন্দ করতে না দাও— তা’হলে আমার আর দোষ কি?’’
কথা বলতে বলতে দুই সঙ্গী শহরের সীমা ছাড়িয়ে এগুতে লাগল যজ্ঞ-বেদির দিকে। পথে যে কোনো যুবক বা যুবতীর সঙ্গে পুরুধানের চোখাচোখি হয়— সেই মুচকি হেসে চলে যায় ; পুরুধানও চোখ ঠেরে মাথা ঘুরিয়ে নেয়। এই অবস্থায় একজন তরুণকে সুমেধ পাকড়াও করে বকে উঠল, ‘‘এই তরুণরাই হচ্ছে মঙ্গলপুরের কলঙ্ক।’’
‘‘কি ব্যাপার, মিত্র !’’
‘‘মিত্র-টিত্র নয়, ওরা আমাকে দেখে হাসছে।’’
‘‘আরে, বন্ধু, ও তো বদমাস— তুমিও সেটা জান। ওর কথা ভাবছ কেন?’’
‘‘আমি তো মঙ্গলপুরের কাউকে ভালো দেখি না।’’
যজ্ঞ-বেদির পাশে বিস্তৃত ময়দান—তাতে এখানে-ওখানে মঞ্চ এবং পাইন পাতায় সজ্জিত তোরণ প্রস্তুত হয়েছিল অতিথিদের স্বাগত জানাবার জন্য। গ্রামের বহুসংখ্যক স্ত্রী-পুরুষ বেদির চতুর্দিকে জমায়েত হয়েছিল কিন্তু আসল বড় সমাবেশটা সন্ধ্যার পরই হওয়ার কথা, তখন সারা পুরু-জনের স্ত্রী পুরুষ এই উৎসবে যোগ দেবে— স্বাত নদীর অপর পারের মাদ্র-জনের স্ত্রী-পুরুষেরাও আসবে।
ঊষা দুই বন্ধুকে আসতে দেখে তাড়াতাড়ি তাদের কাছে গিয়ে সুমেধের হাত দুটো নিজের হাতে নিয়ে তরুণী প্রেমিকার মতো চটুল ভঙ্গীতে বলল, ‘‘প্রিয় সুমেধ। সারা সকাল তোমায় খুঁজে খুঁজে আমি প্রায় শেষ হয়ে গেলাম, তবু তোমার পাত্তাই নেই।’’
‘‘কেন, আমি কি মরে ভূত হয়েছিলাম!’’
‘‘এমন কথা মুখে এনো না। বেঁচে থেকে আমাকে বিধবা বানিয়ো না।’’
‘‘পুরু-জনের বিধবাদের ভাবনা কি, দেবরের অভাব নেই।’’
‘‘কেন, সধবাদের কাছে দেবররা কি বিষতুল্য?’’—পুরুধান প্রশ্ন করল।
সুমেধ বলল, ‘‘ঠিক বলেছ পুরু। ও আমাকে শেখাতে এসেছে। নিজে কোন ভোরে বেরিয়েছে—না জানি এর মধ্যে কত ঘর ঘুরে এসেছে। সন্ধ্যার পর এ বলবে আমার সঙ্গে নাচ, ও বলবে— না আমার সঙ্গে। এই নিয়ে বেধে যাবে ঝগড়া, রক্তারক্তি। আর এই বঊ-এর জন্যে বদনাম হবে বেচারা সুমেধের।’’
ঊষা সুমেধের হাত ছেড়ে দিয়ে চাউনি ও কন্ঠের স্বর বদলে চিৎকার করে বলল, ‘‘তুমি কি আমাকে বাক্সে বন্ধ করে রাখতে চাও না-কি? যাও না— রান্না ভাঁড়ারের ভার নাও গে, আমিও নিজের পথ দেখে নিই।’’ যাবার সময় পুরুধানকে একান্তে মুচকি হাসির ইসারা দিয়ে বেদি সংলগ্ন ভিড়ের মধ্যে ঊষা হারিয়ে গেল।

বছরে একটা বিশেষ দিন বলে এই দিনটা গণ্য হত। বক্ষু তটে (অক্সাসের তীরে) স্বাত উপত্যকায় অতীতের পুরু-জনের প্রথা অনুসারে পশুপালের সেরা ঘোড়াটি বলি দেওয়া হত। সারা স্বাত উপত্যকায় এই সময় ঘোড়া খাওয়ার রেওয়াজ ছিল না—তবু ইন্দ্রপূজার বলি হিসাবে সকলেই ভক্তিভরে প্রসাদ নিত। জনের মহাপিতর—যাকে এখানে জনপতি বলা হয়—আজ আপন জনপরিষদের সঙ্গে সঙ্গে ইন্দ্রপূজার প্রিয় অশ্বমেধ যজ্ঞে যোগ দিত। এই বলিদানের সব বিধি-বিধান প্রত্যেকেরই জানা। বক্ষু উপত্যকায় অধিবাসীরা যে মন্ত্র পড়ে ঘোড়া ইন্দ্রের নামে উৎসর্গ করত— তা তাদের সবটাই মুখস্থ ছিল। বাদ্য ও মন্ত্রস্তুতির সঙ্গে অশ্বকে স্পর্শ করে এবং প্রক্ষালন থেকে বলি পর্যন্ত সমস্ত ক্রিয়া সম্পন্ন হল। তারপরে ঘোড়াটির চামড়া ছাড়িয়ে তার দেহ খণ্ড খণ্ড করে কাটা হল— পরে কয়েক খণ্ড মাংসে মশলা মাখিয়ে আহুতি হিসাবে আগুনের মধ্যে দেওয়া হল।
যজ্ঞের বলি, প্রসাদ বিতরণ করতে করতে সন্ধ্যা ঘনিয়ে এল। ইতিমধ্যে যজ্ঞভূমি নর-নারীতে ভরে গেছে। এই দিন সকলেই আপন আপন শ্রেষ্ঠ বসন-ভূষণে সজ্জিত হয়ে এসেছে। মেয়েদের দেহে ছিল সূক্ষ্ম রঙিন কম্বল—কোমরের কাছে বাঁধা কারুকার্যখচিত নানা রঙের কোমরবন্ধনী, আর নীচে সুন্দর লোমবস্ত্রের আবরণ। প্রায় প্রত্যেকের কানেই সোনার কুণ্ডল। বসন্ত শেষ হয়ে আসছে—সারা উপত্যকায় ফুল যেন আজকের দিনটিকে লক্ষ্য করে বিকশিত হয়েছে। আজকের রাত নর-নারীর স্বচ্ছন্দ বিহারের রাত—ইচ্ছামতো প্রণয় ও কামনা-ভোগের রাত। রাত্রে যখন উৎসবের সজ্জায় সুসজ্জিতা ঊষা পুরুধানের হাতে হাত মিলিয়ে ঘুরছিল তখন সুমেধের নজরে পড়ল, কিন্তু কি বা করতে পারে সে— হতাশ ভঙ্গীতে মুখ ঘুরিয়ে নিল। ইন্দ্রের উৎসবের দিনে নর-নারীর যথেচ্ছ মিলনে রাগ করার পর্যন্ত অধিকার কারুর নেই।
রাতে মধু ও ভাঙ-এর নদী বয়ে যাচ্ছিল। সারা গাঁয়ের মানুষ জড়ো করেছে, ভোগ দেওয়ার জন্য সুস্বাদু গোমাংস আর সোমরস। সর্বত্রই অভিনব প্রেমের মাদকতাপূর্ণ জড়ানো কন্ঠের সম্ভাষণ আর যুগ্ম তরুণ-তরুণীর পদচারন নজরে পড়ছে। এক টুকরো মাংস মুখে পুরে এক পেয়ালা সোমরসে গলা ভিজিয়ে নিচ্ছে। বাজনা বেজে উঠছে—আর বাজনার তালে তালে নাচছে তারা। শ্রান্ত হলে বিশ্রামের পর অপর গ্রামের আগন্তুকদের গিয়ে অভ্যর্থনা জানাচ্ছে। সারা গোষ্ঠীর লোকদের উদ্যোগে উৎসবের আয়োজনও বিরাট—আর নাচের জন্য আসরও ছিল বিস্তৃত। ইন্দ্র উৎসব ছিল যুবজনের মহোৎসব। এদিন তাদের কোনো কিছু করতেই বাধা-নিষেধ ছিল না।
(সংক্ষেপিত)

গদ্য দুটি লেখকের ‘ভোলগা থেকে গঙ্গা’ বইটি থেকে নেওয়া হয়েছে। অনুবাদক: সুধীর দাস, অসিত সেন। বানান অপরিবর্তিত।