সালটা কত ছিল এখন আর মনে নেই। কফিহাউসের টেবিলে আলাপ হয়েছিল সুমৌলি আর মনিশংকর এর সাথে। অল্প কথার মানুষ, মনিশংকর চোখ তুলে জানতে চেয়ে ছিল উত্পল কুমার বসু, আমার পড়া আছে কিনা,এটা ঠিক সেই সময় যখন, মনি আমাকে তখন ও তুই তোকারি করে কথা বলা শুরু করে নি। অচিরেই দেখলাম মনি নিজেকে গান্ধার শিবিরেই বেশি স্বচ্ছন্দ বোধ করলো। ৯০ এর দশকের একদম শুরুতে প্রায় প্রেমের বন্যা বইছিল, আমরা প্রায় প্রতেককেই চিঠি লিখতে শুরু করে দিয়েছিলাম।আত্মজৈবনি ক হয়তো নয়,কিন্তু ব্যক্তিগত গদ্যের আদলে বা ছন্দে লেখা সেই সব চিঠি গুলি ছিল কারমেল কনভেন্ট এর মেয়ের প্রতি,বা উজ্জল শ্যামবর্ণা বান্ধবীর প্রতি,দিদিমনির প্রতি,এমন কি গুজরাটি মেয়ের প্রতিও একটানা লিখে যাওয়া হয়েছিল সেই সব চিঠিগুলি,বলা বাহুল্য মনি কোনো দিন এইসব ভুবন ভোলানো ফাঁদে পা দেয় নি। প্রথম থেকেই সে এই সব সযত্নে এড়িয়ে গেছে। সুতরাং যা হয় আর কি অনির্বানের পাশাপাশি মনিশংকর কেও লোকজন ছোট উত্পল বলা শুরু করে দিয়েছিল। তখন বুঝিনি, কিন্তু আজ বুঝি লেখা লিখির একদম শুরতেই একজন গুরু থাকা দরকার,গুরু অনেক হলে লেখাও অনেক রখম অনেকের মত হতে বাধ্য। "একজন লেখক তখন ই লেখক যখন তার পাঠক লেখক হয়ে যায় " সন্দিপনী এই প্রবাদ আমি বিশ্বাস করি কবিতার ক্ষেত্রে ও সত্য। তখন ও মনি অকল্যান্ড যায় নি, তখন সে ঠাকুর নগরের কাছাকাছি দূর্গা নগর বলে এক যায়গায় থাকে,তারাতলায় পড়াশুনো করে আর আমাদের সাথে আড্ডা দেয় কফিহাউসে। উত্পল কুমার বসুর পুরী সিরিজ আর বিনয় মজুমদার এর ফিরে এস চাকা এই দুইকৃশ গ্রন্থিকা আর দূর্গা নগরের মফস্সল বাংলার প্রকৃতি ধীরে ধীরে গড়ে তোলে মনিশংকর এর কবি মানস। কিন্তু কেন সে শুরু থেকেই হতে চেয়েছিল বিশিষ্ট ? কেন সে দল বেঁধে পপুলারিস্টিক কবিতা লেখার পথে পা বাড়ালো না ? এর উত্তর দিতে গেলে একটা উধাহরণ দেওয়া যেতে পারে। এই কিছুদিন আগে আমি ফোনে আমার কিছু কবিতা নিলাদ্রী কে শোনাছিল্লাম।কবিতাগুল ো আগে থেকে ওর না পড়া থাকলেও, ও লেখা গুলো কে আমার পুরনো লেখা বলে সনাক্ত করতে পারল,এবং ঠিক ঠাক বলেও দিল যে লেখা গুলো ৯০ দশকের মাঝামাঝি সময় এ লেখা। টানা শুনে যাওয়ার ফাঁকে সে শুধু তিন চার টি ক্ষেত্রে বাহ, বা আহএরাম কিছু একটা বলে ছিল। বন্ধুদের এই শীত্কার গুলোকে আমি খুব গুরূত্ব দিয়ে থাকি,অবাক হয়ে লক্ষ্য করেছিলাম ওই তিন চারটি কবিতার ক্ষেত্রেই মাত্র আমার কবিতায় যুগ চিহ্ন লেগে ছিল না ? আচ্ছা বলুন তো জীবনানন্দ দাশ কোন দশকের কবি ? বা বিনয়মজুমদার কোন দশকের ? উত্পল বাবু ? শক্তি চট্টোপাধ্যায় ? শেষের তিন জন কে আপনি পঞ্চাশ বলে সনাক্ত করতে চাইলেও ক্রমশই এই সব সর্বগ্রাসী কবি আর দশকের বেড়া জালে আটকে থাকছেন না। মনিশংকর এটা একদম শুরু থেকে বুঝে ছিল,আর বুঝেছিল বলেই ও ৯০ দশকের মূল কবিতার যে স্রোত,তা থেকে নিজেকে বিচ্ছিন রেখে ছিল, নিজের কবিতা থেকে ঘসে ঘষে তুলে দিয়ে ছিল দশক চিহ্ন, তা সুধু অমরত্ত্ব র লোভে। অতচ ভাষা বিবর্তন এর পথে তাকে যেতে হয় নি,ভাষা বদল সে করেনি কবিতার,উত্পল বাবুর হাত ধরে আসা একটি ভাষা আর বিনয় মজুমদার এর মনন নিয়ে সে সংশ্লেষ ঘটাতে চেয়ে ছিল,সব ক্ষেত্রে সে যে সফল হয়েছে সেটা বলছি না,কিন্তু তবু পাঠক লক্ষ্য করুন ও প্রবেশক কবিতাটিতেই লিখেছে - এখানে তোমার কথা বলে না কেউ। বনের ভিতর গ্রীষ্ম-ছাউনির খুটি সংঘর্সময় বুনোফুল চেপে ধরে আপ্রাণ; অখিল গুপ্ত সমিতির কেউ একজন মনে হয় নিজেকে। পশুর জল খাবার শব্দে কিছুদুর উড়ে একটি চিল আবার স্থির হয়ে বসে,ঝুঁকে পড়া গাছের ডালে; যেন কথাও অন্য এক স্থিরতার কথা ছিল - জলতল ঘিরে থাকা ঢিল ঘিরে জলের বৃত্তের মত। এখন ফিরে দেখা,ধুসর পাহাড়ের গা ঘেঁসে দাড়ানো মেঘের সারি -সূর্যের কোলের কাছে পশু পালকের তামাটে গ্রাম -টলমল পাথরের ছায়ায় একটি দলছুট ভেড়ার আর্তনাদ .. বস্তুত আমাদেরই প্রেম। ওই সংঘর্সময় বুনো ফুলের প্রারম্ভিক ধাক্কা সামলে নিলে পাঠক অবাক হয়ে দেখবেন,একেবারে অক্ষর বৃত্তের আদলে লেখা, এই কবিতার একেবারে শুরুতেই কবি তার জাত চিনিয়ে দিতে চাই পাঠক কে। সে বলে " দীর্ঘ বাতাসের নিচে ছোট ছোট ফুল ফুটে আছে / যেনতোমার মুখের পরে আলো .../ আমি এই সব ঘেঁতে নিতে চাই / অস্থি বিশারদ যেমন একটি হাড়ের থেকে /পূর্ণ কঙ্কালের বিবরণ পেশ করে " এই সব কবিতায় মনিশঙ্কর একান্তই মনিশংকর এর মত, অগ্রজদের সাবধানে এড়িয়ে বড় বেশি স্বকীয় এই উচ্চারণ। কিন্তুযেটা লক্ষ্যনীয়, সেটা হলো মনি নিজেকে কোথায় কানেক্ট করছে, ৯০ দশকে কম কবি তো আর ছড়া লিখে আর গান লিখে বিখ্যাত হলো না,মনি শুরু থেকেই এই বিখ্যাত হওয়ার পথ সযত্নে এড়িয়ে গেছে। এপিটাফ লেখার যত্নের মত করে সে লিখেছে নিজের কথা " নির্জন শেফালী আর একটু দুরের / ইষৎ সবুজ ওই তারাটির -/বস্তুত একই তরঙ্গের অংশ মাত্র।/ প্রতিদিন তাদের কে এই খানে যে ডেকে পাঠায় /সেই গাছটির নাম রাত্রি।/ তুমি ধীরে ধীরে তার প্রতিটিশাখাই ছুয়ে যাচ্ছ / বালকের মত হেলা ভরে / শিশিরে, নৈশব্দে ( কবি ) সত্যি বলছি ওই কবিতার শেষ দুটো শব্দ লিখে কবিতাটিকে অমরতার দিকে ঘুরিয়ে দিতে কব্জি লাগে, আর লাগে নিমগ্নতা, মনিশংকর সেই কাজ করে দেখিয়েছে তার ছাপা না হওয়া বইয়েরপাতায় পাতায়। বইটির পাতায় পাতায় ছড়িয়ে আছে অমরতার লোভে দুষ্ট, এমনই সব আশ্চর্য লাইন। বইটির নাম সে দিতে চায়, "চন্দন পিড়ি", বড় বেশি অআধুনিক এই নাম,জেন জেড এর যুগে,কিন্তু চন্দন কাঠের সৌরভের মধ্যে আমি পাই অমরত্বের সেইলোভ যা সে নিক্ষেপ করতে চেয়েছে কালের গর্ভে। পুনশ্চ :লাগলে চেয়ে নেবেন এই কবিতার ইবুক। কেননা আমি সত্যি জানিনা এই বই আদৌ প্রকাশ পাবে কিনা !!