শংকর লাহিড়ী, নবেন্দু বিকাশ রায়, রাজর্ষি চট্টোপাধ্যায়

নয়াদশকের আড্ডা আড্ডি-তে এবার শংকর লাহিড়ী ও নবেন্দু বিকাশ রায়। এক আধবার আমি। শংকরদার এই প্রথম ও পূর্ণাঙ্গ সাক্ষাৎকারটি, কয়েকটি পর্বে বিভক্ত হয়ে এখানে একত্রে প্রকাশিত হল। - রাজর্ষি চট্টোপাধ্যায়।

প্রথম পর্ব

১ / নবেন্দুঃ
শঙ্করদা, প্রথমেই একটা কথা জেনে নিতে চাইবো। বারবার দেখা গেছে তুমি সামহাউ মুখার্জীকুসুমকে অস্বীকার করার চেষ্টা করেছ। ঘরোয়া আড্ডায় তো বটেই এমনকি লেখার মধ্যেও তোমার এই প্রবণতা বারবার চোখে পড়ে। তুমি বেশী পছন্দ করো ‘শরীরী কবিতা’ বা ‘উত্তরমালা, বেরিয়ে এসো প্লীজ’ নিয়ে কথা বলতে। অথচ মুখার্জীকুসুম তরুণ প্রজন্মকে এখনো আলোড়িত করে তোলে। মুখার্জীকুসুমের জনপ্রিয়তাই কি তাহলে তোমার বিরাগের কারণ?

শঙ্কর লাহিড়ীঃ
প্রথমেই বলে রাখি, ‘মুখার্জী কুসুম’কে কখনোই আমি অস্বীকার করিনি। ওর স্পেসটাই অন্য, এবং নানা কারণে আমার কাছেও খুব প্রিয়। ‘কুসুম’ ছিলো শরীরী কবিতার প্রায় সমসাময়িক, ওরই ফাঁকে ফাঁকে লেখা, আশির দশক জুড়ে। পরীক্ষা নিয়ে একটা নতুন খেলাধুলোর জায়গা, -ঐ বইয়ের শুরুতেই সাক্ষাৎকারে যেমন জানিয়েছি। ...আমার প্রথম বই ‘শরীরী কবিতা’ লেখা হয়েছে প্রধানতঃ আমাদের ক্যাম্পের দিনগুলোয়। সমসাময়িক থেকে একেবারে আলাদা রকম একটা কাজ করতে চেয়েছিলাম, একটা অন্য ল্যান্ডস্কেপ ও ডিকশান। সেসময়ে আন্তর্জাল ছিল না, ব্যক্তিগত কোনও যোগাযোগ ছিল না, তবু ‘শরীরী কবিতা’ প্রকাশিত হওয়ার পরে অনেকে সরাসরি পোস্টকার্ডে, ইনল্যান্ড্‌ লেটারে প্রশংসা জানিয়েছিলেন। কবি, ভাষাবিদ, পেন্টার। আনন্দবাজার লিখেছিল, ‘...অবয়বহীন বোধের বিন্যাস ছড়িয়ে আছে সমস্ত গ্রন্থটিতে, ...এক আশ্চর্য আবহ-মূর্ছনা ভারী করে রাখে মন, ...পাঠক স্থিরভাবে অনুভব করতে পারবে চেতনার শুদ্ধ গ্রন্থিগুলো এখনও হারিয়ে যায়নি’। এই রকম আরও কিছু। তো সেই বই আজকের প্রজন্মের অনেকেই আজও পড়েনি। এটার একটা কারণ, বইটা আর পাওয়া যায় না। ঐ বইয়ের ভূমিকায় দেখবে, সেসময়ে আমার একান্ত কবিতাভাবনার কিছু সূত্র উদ্ধৃত আছে। ক্যাম্প থেকে ফিরে যেভাবে ভেবেছি। সমকালীন লেখায় সম্ভবতঃ সেই ছিলো প্রথম, ওসব কথা আগে কেউ লেখেনি, -এটা তোমরা মিলিয়ে নিয়ে আমাকে জানাতে পারো । ... মুখার্জী কুসুমের জনপ্রিয়তার কথা আমি জানতে পারি অনেক পরে, কারণ আমি কোনও রকম সভাসমিতি প্রচারের আলোয় কখনো এসে দাঁড়াইনি। যেটুকু কেউ স্বতঃস্ফূর্ত হয়ে চিঠিতে জানাতেন। একগাদা লেখা এবং সর্বত্র লেখাকে আমি দুর্বলতা মনে করেছি। বইমেলায় কুসুমের দারুণ চাহিদা দেখে, ওর শেষ কপিটা নীলাম হয়েছিলো শুনেছি, পরে দ্বিতীয় এডিশান বেরোয়। ...এর শুরুটা মনে আছে। ১৯৮৪ সালে ডিসেম্বরের এক শীতসন্ধ্যায়, জামশেদপুরে আমার বাড়িতে কুসুমের প্রথম ১৩টা কবিতা আমি পড়ে শোনাই। সেদিন কৌরবের পাঁচজনের ফুলবেঞ্চ হাজির ছিলো, -কমল বারীন স্বদেশ দেবজ্যোতি ও আমি। সঙ্গে কলকাতা থেকে কবি রণজিৎ দাশ। সে এক তুলকালাম পানীয়সন্ধ্যা। সবাই দারুণ প্রশংসা করেছিলো, রণজিৎ বলেছিলেন ‘ভেরি কমেন্ডেব্‌ল্‌’। সেই রাতে বন্ধুদের পানীয়-হুল্লোড়ের শেষাংশ উপচে বাইরের রাস্তা অবধি গড়িয়ে পড়ায়, বন্ধুরা চলে গেলে পরদিন সকালে বাড়িওয়ালা আমাকে নোটিশ দিলো ! তখন আমি ভাড়াবাড়িতে, -সুবর্ণরেখা ফ্ল্যাটে শিফট্‌ করেছি আরও পরে। -‘কুসুম’ নিয়ে শুরুতেই এই অ্যান্টিক্লাইম্যাক্স , ভাবতে পারো ? চার বছর পরে থলকোবাদে বেড়াতে গিয়ে বারীনদার উৎসাহে কুসুমের সব কবিতা আবার পড়েছিলাম। বারীনদা বলেছিল, ‘কবিতার প্রচলিত ধারা থেকে মুক্তি পাওয়ার পুরো চেতনাটা এখানেই এসেছে, এটা নিয়ে আমি প্রবন্ধ লিখবো’। কিন্তু আমার মনে হয়েছে, ধারামুক্তির কাজটা আমি আগে ‘শরীরী কবিতা’তেই করেছিলাম। ‘কুসুম’ প্রকাশিত হওয়ার পরে ‘শরীরী কবিতা’ কিছুটা ব্যাকসীটে চলে গেল, সকলেই ‘কুসুম’ পড়তে চায়। তাই মনে হয়, ‘শরীরী কবিতা’ এবং পরের বইগুলোকে ‘কুসুম’ কিছুটা আড়াল করে রেখেছে।

২ / রাজর্ষিঃ
মুখার্জী কুসুম দিয়ে তোমাকে আটকান হল; শরীরী কবিতা --সে ভাবে তখনো পড়া হয় নি। আমি পরে পড়ে দেখেছি ওটা অধিক গুরুত্বপূর্ণ।

শঙ্কর লাহিড়ীঃ
কুসুমের বেশী জনপ্রিয়তার কারণ, আজকের তরুণ কবি ও পাঠকদের কাছে কবিতার ঐ ফর্ম্যাটটা খুব ফ্রেশ ও নতুন মনে হয়েছে। এবং ঐ কবিতাগুলোর স্পীকারের সাথে নিজেদের খুব সহজেই আইডেন্টিফাই করতে পেরেছে তারা। আজ এই ২০১২ সালেও, কয়েকমাস আগে, অনুপম রায় (তরুণ গায়ক, লেখক, ও সুরকার) ফেসবুকে আমায় জানিয়েছে, ‘কুসুম’ পাঠের প্রথম রোমাঞ্চকর স্মৃতির কথা, যা ওর ‘চোখে জল আনে’। লিখেছে, ‘মুখার্জী কুসুম’ ওর কাছে একটা ‘লাইফ টাইম এক্সপিরিয়েন্স’। -এটা অনেক তরুণেরই অনুভবের কথা। আবার অন্যদিকে আমাকে আশ্চর্য করে যখন জানতে পারি, শরীরী কবিতা নিয়ে আর্যনীলকে কিছুদিন আগে লেখা এক অন্তরঙ্গ চিঠিতে একজন তরুণ (শান্তনু বন্দ্যোপাধ্যায়) জানিয়েছে তার উচ্ছ্বাস। সে লিখেছে, ‘আজ যারা নতুন কবিতা লিখে ফেলেছি ভাবছে, তাদের জানা উচিত পঁচিশ বছর আগেই ঐ বইতে কি কি লেখা হয়ে গেছে’। ... এসব কথাই এখন আমি ক্রমে জানতে পাচ্ছি। তবে কৌরবের ভেতরে স্বদেশদা ও অন্যান্যদের বেশী পছন্দ ছিলো ‘উত্তরমালা’ এবং ‘বন্ধু রুমাল’-এর কবিতাগুলো। মাত্র কিছুদিন আগে বারীনদা আমায় ফেসবুকে লিখে জানিয়েছে যে ‘শরীরী কবিতা’ তার কাছে একটা ‘বিস্ময়’ ! এটা আমাকে ও লিখেছে ২০১১তে, অর্থাৎ ঐ কবিতাগুলো কৌরবে বেরনোর প্রায় পঁচিশ বছর পরে। -মনে হয় অনেকেই হয়তো ফিরে পড়ছে ঐ লেখাগুলো। এসবই আমি মেনে নিয়ে নিজের কাজে মন দিয়েছি, তাই ‘কুসুম’-সংক্রান্ত বেশি আলোড়ন ও জনপ্রিয়তা নিয়ে কোনও বিরাগ নেই।

৩ / নবেন্দুঃ
বাঙালি কবি-লেখকেরা সাধারণত কবিতা-গল্প-উপন্যাস-সিন েমা-থিয়েটার এসবের বাইরে বেরন না। তাদের নন্দনতত্ত্বের একটা মোটামুটি চৌহদ্দি লক্ষ্য করাই যায়। অথচ তুমি বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, অঙ্ক, মহাকাশচর্চা, ফটোগ্রাফি এসব নিয়ে বহুদিন ধরে ব্যক্তিগত চর্চা করে চলেছ। নাসা মঙ্গলগ্রহে কিউরিওসিটি পাঠালে তুমি সবার আগে ফেসবুকে তা নিয়ে আপডেট দিয়েছ। তোমার ব্লগে পড়া যায় “রবীন্দ্রনাথ তাঁর কবিতায় গানে লিখেছিলেন গ্রহ তারা রবি আর সুদূর নীহারিকার কথা। ভ্যান গখ এঁকেছেন স্টারি নাইটস-এর ছবি। এডভেঞ্চার-প্রিয় বাঙালী আজও শুধু শাল জঙ্গল আর ঝাউ বনে। মহাকাশে তার আজও কোনও উৎসাহ নেই”। এটাকে তুমি কিভাবে দ্যাখো সেটা জানতে ইচ্ছে করছে।

শঙ্কর লাহিড়ীঃ
ভালো প্রশ্ন, সার্চিং কোয়েশ্চেন ! দেখ, আমার কর্মজীবনে কাজের জায়গাগুলো আমিই বেছে বেছে নির্বাচন করেছি, নতুন জিনিষ শেখা আর নতুনের স্বাদ পাওয়ার আগ্রহে। কিছুটা লার্জ ক্যানভাসে জীবনকে দেখতে চাওয়া। তার কিমাকার ডায়নামোগুলোকে, নির্বাক বেদনা আর গভীর আহ্লাদকে। লেখালিখি আমার খুবই কম, যেটুকু না লিখলেই নয়। কারণ বাংলা সাহিত্য ও ব্যাকরণ নিয়ে প্রথাগত পড়াশোনা আমার যাচ্ছেতাই রকমের কম, এটা বিনয় নয়। সাহিত্যচর্চায় আমার ব্যক্তিগত মডেল : দেখো-৪০, ভাবো-৩০, পড়ো-২০, লেখো-৬, প্রকাশ করো-৪ । প্রফেশানাল জীবন আমাকে অনেক কিছু দেখার স্বাদ এনে দিয়েছে, যার প্রভাব পড়েছে লেখায়। ...বাঙালী লেখকের যে সীমিত নন্দন-চৌহদ্দির কথা তুমি বললে, সেই সব লিমিটেশানের ইঙ্গিত দিয়ে কিছুটা লিখেছি ‘অপ্রস্তুত বিহার’ নামক গদ্যে, ‘বন্ধু রুমাল’ বইয়ের শুরুতে যেটা আছে। ক্যাম্পের দিনগুলোতে এইসব নিয়ে ভেবেছি। শুধু তো কবিতার জন্যে নয়, জীবনকে নানাভাবে নিজের অনুভবে আনবো বলেই মাল্টিমিডিয়া ও ইন্টার-ডিসিপ্লিনারী জানালাগুলো ক্রমে খুলে দিয়েছিলাম নিজের কাছে। সবটাকে ওপর থেকে দেখা, মানে একটা লার্জার পার্স্পেক্টিভে, এবং নানা মাধ্যম দিয়ে আলো ফেলে কাছ থেকে দেখা, দুটোই জরুরি মনে হয়েছে। আমাকে টেনেছে ফটোগ্রাফি, চিত্রকলা, সিনেমা, সঙ্গীত, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, অঙ্ক, মহাকাশচর্চা, লোকসংস্কৃতি, -এই সবই। সকলকেই কম বেশী টানে হয়তো। অন্ততঃ নতুন কাজ করতে চাইলে আজ হয়তো এরিনায় এগুলো আনা জরুরী। এর অনেক কিছু আমার প্রফেশানেও কাজে লেগেছে, কারণ আমার কাজের একটা বড় অংশ ছিলো নতুন উদ্ভাবন। বিশ্ববিখ্যাত অনেক বিশেষজ্ঞ সংস্থার সাথে কাজ করতে হয়েছে। আমেরিকার ‘এম-আই-টি মিডিয়া ল্যাব’-এর সাথেও যোগাযোগ হয়েছিলো। এগুলো আমাকে একটা গ্লোবাল এক্সপোজার দিয়েছে। তবে জানিয়ে রাখি, এর কোনটাতেই আমার পাণ্ডিত্য নেই। দীর্ঘ সময়ের শিক্ষানবিশী। এগুলো লেখায় সাহায্য করেছে। কতকগুলো বিষয়ে এক এক সময়ে খুব প্যাশানেটলি ঢুকে পড়তে চেয়েছি। তার রূপ আর রহস্যের টানে। শুনলে হয়তো অবাক হবে, ১৯৭২ সালে আমার একমাত্র বোনের বিয়ের সন্ধ্যায় তার সম্পূর্ণ ব্রাইডাল মেকআপ আমিই করেছিলাম। একা হাতে করেছি। স্টেপ বাই স্টেপ। আমার ওপর খুব ভরসা ছিলো ওর। তখন থেকে পোর্ট্রেট আমার প্রিয় বিষয়। কৌরবের অনেকের পোর্ট্রেট ছবি তুলেছি বিভিন্ন সময়ে। রেমব্র্যাঁর ছবিতে লাইট-সোর্সগুলো লক্ষ্য করেছো ? উইন্ডো লাইট, স্কাই লাইট, ক্যান্ডেল লাইট, রিফ্লেক্টেড লাইট...। অনেক বছর আগে, এই শহরেই দেখেছিলাম মল্লিকদের মার্বেল প্যালেসে রাজা রবি ভার্মার আঁকা ছবি, বেঙ্গল ক্লাবে বিবর্ণ অরিজিনাল ‘রেনল্ড’। এই দেখাটাই তখন আমার শিহরিত প্রয়োজন ছিলো। হ্যাঁ, শিহরিত প্রয়োজনই বলবো। ওই সময়ে আমার লেখা ‘একটি রঙিন ছবির আর্তনাদ’ বা, ‘এক অমানুষিক আয়োজন’ কবিতাগুলো ‘শরীরী কবিতা’ বইয়ে আছে। একবার আমস্টার্ডামে অফিসের কাজে গিয়ে আমি সময় বের করে ‘ভ্যান গখ্‌ মিউজিয়াম’ দেখেছিলাম। সে এক রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা। চোখের সামনে ক্যানভাসে অরিজিনাল ‘পটাটো ইটার্স’! ভাবতে পারো ? ওগুলো তখন প্রিয় ছবি। যেমন রেমব্র্যাঁ-র তেলরঙে আঁকা ছবি ‘নাইটওয়াচ্‌ম্যান’। ক্যাম্পের ঐ পিরিয়ডে খুব ভালো লাগতো অ্যানসেল অ্যাডাম্‌সের প্লেট ফটোগ্রাফি। তাঁর ‘জোন থিওরি’ বোঝার চেষ্টা ক’রে তখন হাল ছেড়েছিলাম। কিন্তু বিষয়টা টেনেছিলো। ...জামশেদপুরে ভূদেব ভকতের সাথে তার ডার্ক রুমের লাল আলোয় বসে বালকের মতো বুঝতে চেয়েছি কিভাবে আঙুল দিয়ে আলো বিলিয়ে ছবিকে ফুটিয়ে তুলতে হয়। ইন্টারন্যাশানাল স্যালোঁর নির্বাচিত ছবির ক্যাটালগগুলো ভূদেব এনে দেখাতেন। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ কাজগুলো দেখা যেত সেখানে। সেই থেকে আমার ফটোগ্রাফির অন্দরমহলে আগ্রহ। ভূদেবের স্টুডিওতে সেকালে অনেক আড্ডা মেরেছি। ওর কালার স্লাইডের ক্যাপশানগুলো কখনো আমিই লিখে দিতাম। কোলকাতায় আসতাম অফিসের কাজে, সে সময়ের বড়ো হোটেলগুলোর সবগুলোতে থেকেছি। প্রায় পনেরো-কুড়ি বছর ধরে, কোলকাতায় এলে আমার ঠিকানা হোত ঐসব হোটেল। আড্ডা দেওয়ার কেউ ছিলো না। শুধুই কাজ। ঐ হোটেল থেকেই একটা গদ্য লেখা তৈরী হয়েছিলো যার নাম, ‘মেরিন ড্রাইভের গাধা’। সিনেম্যাটিক ঐ লেখাটা অনেকের কাছেই খুব প্রিয়। গল্পের ন্যারেটিভ্‌কে ভাঙ্গা। ওটা নিজের কাছেই একটা চ্যালেঞ্জ ছিলো। আহা, ফ্রাঁসোয়া ত্রুফো কিম্বা গোদার যদি ওটা নিয়ে ছবি করতে পারতেন ! ...কলেজ স্ট্রীট কফি হাউসে একবার গেছিলাম কমলদার সাথে, জাস্ট আধঘন্টা। তবে ওর মধ্যেই সুর্য সেন স্ট্রীটে কৃষ্ণগোপালদার বাড়ি বহুবার গিয়েছি কৌরবের কাজে, কপির বান্ডিল নিয়ে, নিজের আঁকা প্রচ্ছদ নিয়ে । ...পেইন্টিংসে আগেকার মাস্টারদের অনেকের ছবি খুব প্রিয় ছিলো । ফুটপাথ থেকে তাদের ছবির বই কিনে আনতাম। সেইসব রিপ্রিন্ট নিয়ে একটা বিরাট কালেকশান করে আর্ট গ্যালারী বানিয়েছিলাম। টাটা স্টীলে, অফিসের তিনতলায়, দীর্ঘ চতুর্ভূজ করিডোরের দেওয়াল জুড়ে। প্রায় দেড়শো ফ্রেম। ল্যান্ডস্কেপ, ন্যূড, কিউবিস্ট, ইম্প্রেশানিস্ট, পোস্টার, স্টিল লাইফ, যা যা। সেসব এক একটা ফেজ গেছে, ঐ আশির দশক থেকে নব্বইয়ের মাঝামাঝি অব্দি পনেরো ষোলো বছর, -তারপর কর্মক্ষেত্রে আরও বেশী দায়িত্ব এসে পড়ে। ‘ব্যশ’(Bosch)-এর আঁকা নরকের একটা স্কেচ দেখে আমি লিখেছিলাম ‘বরাহ’ কবিতাটা, যেটা ‘বন্ধু রুমাল’ বইয়ে আছে। ঐ রহস্যময় ছবিটা না দেখলে ঐ লেখাটা হোত না। সেই ‘আসন্নপ্রসবা বুদ্বুদ’, ‘প্রদীপ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছে শিখা’, বা ‘শিশুরা দড়ির মতো কেঁদে উঠলো’ লাইনগুলো যেভাবে তৈরী হয়েছে। ...অঙ্কেরও কিছু কিছু রহস্যময় দিক, যেমন প্রাইম নাম্বার্স, আমাকে ভীষণ মজিয়েছিলো। এগুলো নানা ভাবে আমার লেখায় এসেছে। খেয়াল করলেই দেখতে পাবে তাদের। ‘জুলিয়া’ নামের একটা কবিতা আছে, যার আড়ালে আছে ‘কেওস থিওরী’-র কিছু কিছু ইশারা। এগুলো কিন্তু কবিতার সাধারণ পাঠকের জানা জরুরী নয়। জানা জরুরী হলে কবিতাটা তখনও কবিতা হয়ে ওঠেনি, মনে করতাম। তবে, যে জানে সে আরেকটু ভেতরে ঢুকতে পারবে, এবং পেয়ে যাবে কিছু নতুন জানালা। এগুলো আমাকে জানতে হয়েছিলো আমার প্রফেশানের জন্যে। ...ঐসব সংখ্যারাশি, সমীকরণ, যা দিয়ে তৈরী হয়েছে ‘জুলিয়া সেট’, যা মীনা-করা ‘কানপাশা’র মতো, কল্কার মতো সুন্দর দেখতে সেই গ্রাফিক্স আমাকে মুগ্ধ করেছিলো । ...স্বদেশ সেন যখন তাঁর কবিতায় ‘গরম রাশির ঐ দিকে’ লিখে, পরে সেটা কেটে ‘গরম রোদের ঐ দিকে’ লেখেন, তখন আমার মন খারাপ হয়। ১৯৭০-এর দশকের শেষদিকে আমি ISI-এর ডক্টর ডেভিস-এর একটা প্রেজেন্টেশান দেখি, এবং সেই প্রথম জানতে পারি ‘ফিবোনাচ্চি সিরিজ’-এর কথা। বিশ্বপ্রকৃতিতে, উদ্ভিদ ও প্রাণীজগতে, তার বিপুল উপস্থিতির কথা। অনেক কালার স্লাইড্‌স্‌ ছিলো সেই বক্তৃতায়। আমার চিন্তায় একটা বিরাট নতুন দিক খুলে গিয়েছিলো সেদিন। সেই প্রথম আমি প্রকৃতিকে অন্যভাবে দেখতে শুরু করলাম। ক্রমে আমাজন রেনফরেস্ট, গ্যালাপাগোস আইল্যান্ড, -এসব আমার প্রিয় হয়ে ওঠে, যেগুলো লেখায় এসেছে। ...আর আদিম আফ্রিকা আমাকে খুব টানে, সেই গন্ডোয়ানাল্যান্ড। মুগ্ধ হয়েছি আফ্রিকার ‘আকা পিগমি’দের গানেও, আমার খুব প্রিয়, শিহরিত অনুভব। ওদের গান নিয়ে আমার একটা দারুণ অ্যালবাম আছে, যার নাম ‘ডিপ ফরেস্ট’। ভীষণ সুন্দর। কয়েক বছর আগে মোজাম্বিকে একটা বড় কয়লাখনি ও নদীবন্দর প্রজেক্টের পরিকল্পনাস্তরে কিছুদিন পরামর্শদাতা হিসেবে জড়িয়ে ছিলাম, এদেশে বসেই । তখন জাম্বেজী নদীর নাব্যতা নিয়ে পড়াশোনা করতে হয়েছে। দারুণ রোমাঞ্চকর, কিন্তু আফ্রিকা যাওয়া আজও হয়ে ওঠেনি। ...কবিতায় সিনেমাভাষার প্রয়োগ নিয়েও কিছু কাজ করেছি, -কম্পোজিশান ও মন্তাজ। যে কাজটা শুরু হয়েছিলো ১৯৮৩ সালে কৌরব-৩৮এ আমার লেখা ‘জলের শব্দ ও ধাবমান টাট্টু’ নামের দীর্ঘ কবিতায়। সেই প্রথম, পরে আরও কিছু কবিতায় তার প্রভাব এসেছে। শেখানোর কেউ ছিলো না, নিজেকেই খুঁজে বার করতে হয়েছে নতুন জানালাগুলো। ...এইসব নানারকম পরীক্ষার মধ্য দিয়ে কাজ করে এসেছি, এতে কবিতা কতটা নতুন ও স্বতন্ত্র হয়েছে সেটা পাঠকের বিচার্য। এই সব নিয়েই আমার জীবনযাপন আর স্বনির্বাচিত খেলাধূলো । নিজের জামায়, টি-শার্টে ফেব্রিক পেন্ট দিয়ে মোটরহোমের ছবি এঁকেও তো ঘুরেছি, -এতটাই প্যাশান ছিলো কৌরব নিয়ে।
...তুমি তো মহাকাশ চর্চার প্রসঙ্গও তুলেছো । আমার বহুদিনের প্যাশান এটা। একটা সময় খুব কেটেছে টেলিস্কোপ নিয়ে, এখনও বিষয়টা খুবই টানে। নিজের টেলিস্কোপে প্রথম রাতে যেদিন স্যাটার্নের রিংগুলো দেখি, বিহ্বল হয়ে গেছিলাম, অমন একটা জিনিষ আকাশে !? সেটা বোধ হয় ১৯৯৬ সাল, আমি তখন জামশেদপুরে সুবর্ণরেখা ফ্ল্যাটে থাকি। মনে পড়ছে, ঐ সময় ‘হেল বপ’ নামের ধূমকেতুটাও সৌর মন্ডলের কাছে এসে পড়েছিল। আমি সবে তার গতিবিধির খবর পেতে শুরু করেছি। সে সময় তো ইন্টারনেট ছিলো না। মনে আছে, দিল্লীতে গিয়ে সেবার ‘তাজ প্যালেস’ হোটেলে উঠেছি। সেখানে সন্ধ্যেবেলা ছোট লাউঞ্জ বার-এ আমাদের জন্যে রোজ একটা করে কমপ্লিমেন্টারি ড্রিঙ্ক বরাদ্দ থাকতো। যে কোনও ককটেল, জাস্ট একটা, তাই নিয়েই অনেকটা সময় কাটাতাম। পাঁচতারা হোটেলে পয়সা দিয়ে মদ কেনার ক্ষমতা ছিলো না। তো সেখানে টাইম ম্যাগাজিনের একটা কপি পড়ে ছিলো। বসে বসে পাতা উল্টে হঠাৎ সেই ধূমকেতুর ফ্লাইট-পাথের পুরো ডিটেল্‌স পেয়ে কি উত্তেজনা। জামশেদপুরে ফিরে কয়েক মাস পরে, একদিন সন্ধেবেলা পশ্চিম আকাশে চোখ পড়তেই দেখি তাকে, -সেই দীর্ঘ উজ্জ্বল লেজওয়ালা ‘হেল বপ’ ! আমি তখন নির্বাক। অনেককে ডেকে চিনিয়েছি। এখন তো আমার ল্যাপটপেই পুরো একটা প্ল্যানেটোরিয়াম রয়েছে। ... জামশেদপুরে, একবার মাঝরাতে গাড়ি বের করে স্ত্রীকে নিয়ে পার্কে গিয়ে দেখেছিলাম আকাশ থেকে ছুটে আসা ‘লিওনিড্‌ মিটিওর শাওয়ার’। পরে কুমায়ুনে ‘ওরিয়নিড্‌ শাওয়ার’ও দেখেছি। দারুণ রোমাঞ্চকর। ...সেরকমই মনে আছে, ২০০৩ সালে যখন কল্পনা চাওলা গিয়েছেন ইন্টারন্যাশানাল স্পেস স্টেশানে, তখন আমি তার ফ্লাইট পাথের ডাটা যোগাড় করেছি। এবং খুব ভোরে উঠে জুবিলী পার্কের মাথার ওপর দিয়ে তার চলে যাওয়া দেখেও ফেলেছি একদিন। শেষ দিনে ওদের স্পেস শাট্‌ল্‌ ‘কলম্বিয়া’ যখন ফিরে আসছে পৃথিবীতে, যখন ওরা বায়ুমন্ডলে ঢোকার পরেই প্রবল উত্তাপে বিস্ফোরণে টুকরো হয়ে মাঝআকাশে জ্বলে পুড়ে শেষ হয়ে গেল, জামশেদপুরে তখন রাত। আমার বিহ্বল চোখের সামনেই, টিভিতে লাইভ দেখেছিলাম সেই দৃশ্য। -আজও ভুলিনি। ...আমার খুব প্রিয় নীহারিকার নাম ‘আন্ড্রোমিডা’। আকাশগঙ্গা / ছায়াপথও খুব প্রিয়, -দা মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সি, কিন্তু তাদের কোলকাতার আকাশে দেখা যায়না। প্রথম দেখেছিলাম, অন্ধকার রাতে জাজপুর-রোড স্টেশানে, ট্রেন থেকে নেমে। তার পরে আরও কয়েকবার। একবার কুমাউন হিমালয়ায়। অ্যাস্ট্রোনমি ক্লাবের বন্ধুরা একে অন্যকে চিঠির শেষে লেখে, ‘আরও আঁধার নেমে আসুক পৃথিবীতে’। সেলিব্রেশান অফ ডার্কনেস। সেই ক্লাবে আমরা সবাই চাই, -আকাশ আরও স্বচ্ছ হোক, ভিলেন চাঁদ অস্ত যাক, নগর ভরে থাক মিশমিশে কালচে নীল অন্ধকারে, দুনিয়া জুড়ে প্রকৃত আঁধার নামুক, হে ইশ্বর। ...মহাকাশে আগ্রহ না থাকলে আমার লেখা হোত না ‘দা অরিজিন অফ দা মিল্কিওয়ে’ গদ্যটা। ইটালিয়ান চিত্রকর ‘টিন্টোরেট্টো’-র আঁকা সেই বিখ্যাত পৌরাণিক ছবিটার কথা আছে যেখানে। লেখাটা ছিলো মূলতঃ কবিতা নিয়ে, কিন্তু প্রথাগত থেকে অনেকটা সরে এসে, একটা নতুন ফর্ম্যাটে। -আমরা তো কবিতাকে জলোচ্ছ্বাসের মতো, বাজুকার মতো, অন্তর্বাসের মতো কর্তৃত্বময় দেখতে চেয়েছিলাম। ঐ রকম আরেকটা লেখার জন্যে আমার কাছে অনেক অনুরোধ এসেছিলো সেই সময়ে। মহাকাশের দিকে তাকিয়েছেন অনেক কবি। রবীন্দ্রনাথ তো বটেই, পরবর্তীকালেও অনেকের কবিতায় মহাকাশ-সূর্য-গ্রহ-চাঁদ -এর উল্লেখ আছে, তবে সেটা দৃশ্যজগতের মধ্যেই সীমিত থেকেছে, কবিতায় কোনও নতুন অ্যাবস্ট্রাকশান তৈরী হয়নি। জীবনানন্দে এসে মহাকাশের কিছুটা অন্য ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। তবে ওঁর কবিতায় যখন ‘নক্ষত্রের দোষ’ লেখেন, তখন সেটা ‘অ্যাস্ট্রোলজি’ বলেই মনে হয়েছে।
...বিজ্ঞানে ফিজিক্স আমার প্রিয় বিষয়। কিন্তু আইনস্টাইনের রিলেটিভিটি থিওরীগুলো ভালো করে বোঝার মতো উচ্চশিক্ষা আমার নেই। তবে ঐ স্পেস-টাইম ওয়ার্প, -মাধ্যাকর্ষণের প্রভাবে যে কোনও বস্তুর চারপাশের স্পেস-টাইমের বেঁকে যাওয়া, যেভাবে পাতলা রাবারের টান ক’রে ধরা চাদরের ওপরে কোনও ভারী জিনিষ গড়িয়ে দিলে দেখা যায়, -সেটা আমায় গ্রাফিক্যালি একটা নতুন ঝংকার দিয়েছিলো। এটা না হলে, ‘সময়-চাদর’ নামের প্রিয় কবিতাটা, যেটা ‘বন্ধু রুমাল’ বইয়ে আছে, -ওভাবে লিখতে পারতাম না। কবিতাটার শুরুতেই আছে, ‘সময়-চাদরের এক প্রান্ত থেকে গড়িয়ে যায় বল / যে বল আস্তে ধীরে বাঁক নেয় বক্র রেখায় / অর্জুন গাছের দিকে- / অর্জুন গাছের নীচে মহাকাশ অন্ধ-গহ্বর।’

[page]
৪ / রাজর্ষিঃ
'নতুন কবিতা' - এই কয়েনেজটাও প্রথম তোমার ব্যবহৃত বলে মনে হয়...। এই প্রি-টেক্সটেই তুমি রক লজিক, ফাজি লজিক নিয়ে কথা বলছ...।

শঙ্কর লাহিড়ীঃ
হ্যাঁ, এখনকার অনেকেই জানে না, ‘নতুন কবিতা’-এই কয়েনেজটা প্রথম এসেছিলো আমার ১৯৮৪ সালে লেখা ‘মুখার্জী কুসুম’-এর কবিতায়, ক্রমে যে কবিতাটা প্রভূত জনপ্রিয়তা পেয়েছিলো, পরে বইয়ের প্রচ্ছদেও ছিলো ঐ লাইনটা। এবং না, ফাজি লজিক একেবারেই নয়। বাংলায় রক-লজিক/ওয়াটার-লজিক নিয়েও প্রথম উল্লেখ ছিলো আমারই লেখায়, যার নাম ‘কবিতার খেলাধূলো : থিয়োরী ও প্র্যাকটিস’। ওটা বেরিয়েছিলো ‘কবিতা ক্যাম্পাস’ কাগজে, ১৯৯৪ সালে। ‘রাইট অ্যান্ড রং’-এর ‘ডুয়ালিজম’-কে ভাঙ্গার কথাও ছিলো ঐ লেখায়। কারণ সেসময় আমার কর্মক্ষেত্রে অ্যাপ্লায়েড ইম্যাজিনেশান, থট্‌ প্রসেস, ড্রীম, এবং আইডিয়েশান নিয়ে পড়াশোনা করতে হয়েছে। জামশেদপুরে ডিমনা-তে, টাটাস্টীলের ম্যানেজমেন্ট ট্রেনিং সেন্টারে আমি তখন ‘ক্রিয়েটিভিটি’ বিষয়ে ক্লাসও নিতাম। ইঞ্জিনীয়ারদের সাথে অনেক ডাক্তারও আসতেন আমার ক্লাসে। ...বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় বিশ্বপ্রকৃতিকে যে নতুন ভাবে বুঝতে চাওয়া হচ্ছে, তার স্বরূপ হচ্ছে ‘সেলফ্‌ অর্গানাইজিং অ্যান্ড প্যাটার্নিং সিস্টেম্‌স’ (SOPS)। নানা উদ্ভাবনী ক্ষেত্রে খুবই জরুরী এইসব ‘সিস্টেম্‌স ভিউ’কে কিছুটা বোঝা, বড় ক্যানভাসে তার ‘হোলিস্টিক্স’কে জানা। ওখান থেকেই গড়ে উঠছে নতুন ওয়ার্ল্ড ভিউ। ...বাংলা সাহিত্যে কবিতার আলোচনায় এই বিষয়গুলো আমি এনেছিলাম, কারণ চিন্তাধারার মূলে এই নতুন দৃষ্টিকোণগুলোকে জানা তখন প্রয়োজনীয় মনে হয়েছে। দৃষ্টিকোণ বদলে গেলে, তার প্রভাবে কবিতাভাষাও নতুনভাবে সেজে উঠবে। ...আমার বক্তব্য ছিলো, আমরা যখনই কিছু চিন্তা করি, অনুভব করি, বা প্রতিক্রিয়া করি, তখন কেন ঠিক সেইভাবে চিন্তা, অনুভব, বা প্রতিক্রিয়া করি, -এগুলোর অনুসন্ধান ভীষণ জরুরী। এখান থেকেই আমি পৌঁছেছিলাম এডোয়ার্ড ডি’ বোনোর কাছে। এইসব বিষয় নিয়ে, আমাদের চিন্তাপদ্ধতি, চিন্তাভাষা এবং ‘মেকানিজম অফ মাইন্ড’ নিয়ে ডঃ ডি’বোনো পায়োনীয়ারিং কাজ করেছেন। সারা পৃথিবী তাঁকে মান্যতা দিয়েছে। অনেক পরে, ২০০০ সালে আমি যখন টাটাস্টীলে ‘মডার্নাইজেশান অফ মাইন্ড’-এর প্রয়োজনীয়তা নিয়ে কর্পোরেট স্তরে আলোচনা করছি, পরে যেটা স্ট্র্যাটেজি হিসেবে গৃহীত হয়, সেই সময়ে আমি যোগাযোগ করে ওঁকে এদেশেও এনেছিলাম। তার আগে উনি ভারতে আসেন নি। ‘থট প্রসেস’ নিয়ে ওঁর প্রায় ৬০/৬৫-টা বই আছে। আমার দুর্ভাগ্য, উনি যখন জামশেদপুরে এসেছিলেন আমি তখন আমেরিকায় একটা ইন্টারন্যাশানাল সেমিনারে ‘সিমুলেশান মডেলিং’ বিষয়ে পেপার প্রেজেন্ট করতে গিয়েছি। ঐ রক লজিক, ওয়াটার লজিক, ল্যাটারাল থিঙ্কিং, - এইসব শব্দগুলো ওঁনারই কয়েনেজ, যেগুলো আমরা সকলে অজান্তেই কমবেশি ব্যবহার করে থাকি সৃষ্টিশীল কাজে, এবং কবিতা রচনায়ও। কৌরবের সেই স্বর্ণযুগে, এর সজ্ঞান ব্যবহার করেছি নিজের রচনা ছাড়াও, পত্রিকার ডিজাইন এবং বিজ্ঞাপনে। তবে ফাজি লজিক সম্পূর্ণ অন্য জিনিষ, সেটা প্রবাবিলিস্টিক, -কন্ট্রোল সিস্টেমে ব্যবহৃত হয়। কবিতার পাঠকের এতসব জানার কোন প্রয়োজন নেই। ‘কবিতার এরিনা’ প্রবন্ধে ঐ প্রসঙ্গগুলো আসছে, কারণ সেখানে আমি শুধু কবিতা নয়, শিল্পের সমগ্র শাখায় উদ্ভাবনী শক্তির চরিত্র নিয়ে আলোচনা করতে চেয়েছি। কাজটা এখনও সম্পূর্ণ হয়নি। কবিতা লেখার জন্য কোনও ‘টুল বক্স’ নয় এগুলো। তবে অনেক জরুরী ঐ ‘SOPS’-এর স্বরূপকে জানা, তার হোলিস্টিক্সকে চেনা, এবং ভাষার ম্যালাডি-কে বোঝা। ভাষার ওই ম্যালাডি-র প্রসঙ্গ আমি প্রথম এনেছিলাম প্রায় তিরিশ বছর আগে লেখা (কৌ-৩১, ১৯৮১) ‘আহ্‌ দোজ ট্রাইসাইক্‌ল্‌স্‌!’ গদ্যে । ওটাই একমাত্র গদ্য, যা কৌরবে মোট তিন বার প্রকাশিত হয়েছিলো।


৫ / নবেন্দুঃ
একটু অন্যধরনের কথা বলি। জার্নি ৯০স এ তুমি যে আত্মজীবনীমূলক গদ্যটা লিখছ, ধারাবাহিকভাবে সেটা পড়তে গিয়ে আমার ভীষণ ইচ্ছে করছিল ওই ৭০ এর সময়টায় চলে যেতে। সে সময়ে তোমরা কবিতার ক্যাম্প করছ, তুমুল প্রচ্ছদ করছ কৌরবের, দীর্ঘ কবিতা লিখছ আবার একই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ চাকরি সামলাচ্ছ। সব মিলিয়ে একটা গোটা জ্যান্ত সময়। আজ প্রায় ৩০ বছর পর কেমন লাগে ওই সময়খন্ডটাকে দেখতে? যদি প্লীজ শেয়ার করো... কেমন ছিল কৌরবের সেই দিনগুলো?

শঙ্কর লাহিড়ীঃ
সে তো অনেক কথা, সংক্ষেপে বলি। আমার ঐ ধারাবাহিক লেখাটা কিছুটা আত্মজীবনীমূলক, তবে ওতে ন্যারেটিভ অংশ সামান্যই, বেশীটাই এক্সপ্লোরেশান অ্যান্ড অ্যানালিসিস। নিজের জীবনের কিছু নির্বাচিত স্লাইস ওখানে রয়েছে, যেভাবে বার্গারের মধ্যে চিজের স্লাইস থাকে। তাই কিছুটা বার্গারধর্মীও বলতে পারো। ওতে আমি জীবনের সেইসব স্মৃতিচিত্রগুলো খুঁজে দেখেছি যার সাথে কোনও ভাবে যোগ আছে আমার ভাবনাচিন্তার গ’ড়ে ওঠার এবং বিবর্তনের ; কীভাবে তৈরী হয়েছে ব্যক্তিগত দৃষ্টিকোণ আর আইকনগুলো, যা ছড়িয়ে আছে আমার সমগ্র লেখালিখিতে। সত্তরের দশক, যাকে বলা হত ‘মুক্তির দশক’, সেই সময়টায় আমি তো ইঞ্জিনীয়ারিং কলেজে। খুব কঠিন দিন ছিলো আমাদের, আমরা যারা রাজনীতি থেকে দূরে থেকেছি। বিজ্ঞান আর প্রযুক্তি যে ভালো লাগতো, তা তো চাকরীর জন্যে নয়। ভালো লাগে, তাই ভালো লাগতো। পেশাগত সাহিত্যের লোকদের বরং ভীরু মনে হত। ‘তোমার হাতে নেই ভুবনের ভার, ওরে ভীরু’ –সেই রকম। কৌরবে যোগ দিয়েছিলাম ইঞ্জিনীয়ারিং পাশ ক’রে টাটাস্টীলে চাকরী পাওয়ার চার বছর পরে, ১৯৭৭ সালের শেষে। তখন সমসাময়িক গদ্য-পদ্য, যা বেরোত পত্রপত্রিকায়, বেশীটাই ভালো লাগতো না। মনে হোত বাসি, টিপিক্যাল, প্যানপেনে। কৃত্তিবাস কাগজটা তখন সবে দেখেছি। ওতে কিছু মজার বিজ্ঞাপন থাকতো। ব্যাস, ঐ। কৌরবে এসে আমি একটা কাঙ্ক্ষিত মুক্তাঙ্গন পেয়েছিলাম। সেদিনের কমল চক্রবর্তী ছিলো আমার দেখা প্রথম কমপ্লিট্‌ সম্পাদক। ওর ধারে কাছে কেউ নেই। অনর্গল কথা, দারুণ মজলিসি। ধাক্কাপাড় ধুতি অথবা কাউবয় জিনস্‌। কল্পনা আর আবেগের ডাবল্‌ হেলিক্যাল ওর জিন-এ। কৌরবের পুরোনো সংখ্যায় বারীন ঘোষালের কয়েকটা গল্প আর কমল চক্রবর্তীর সম্পাদকীয় লেখাগুলো তখন আমার নজর টানে। ক্রমে কমলদার দুটো কবিতার বই ‘চার নম্বর ফার্নেস চার্জড’ আর ‘জল’ পড়ে আমি গা ঘেঁষে দাঁড়ালাম। টাটাস্টীলে সেই সময়টা আমি ‘ওপেন-হার্থ’ ফার্নেসের সামনে দাঁড়িয়ে কাজ করেছি, তার তীব্র উত্তাপের ঝলক দেখা ছিল। তার অনেক আগেই কমলদার ‘ফার্নেস’ লেখা হয়ে গেছে। কিন্তু কমলদারা ছিলো টাটা মোটর্সে, ট্রাক তৈরির কারখানায়। এবং আফসোসের কথা, কখনো কোনও স্টীল প্ল্যান্টের ভেতরে ঢুকে দেখেনি। তবে গলিত স্ল্যাগের আলোয় জামশেদপুরের আকাশ লাল হয়ে উঠছে দেখলে ওরা রোমাঞ্চিত হোত। আমি স্টীল প্ল্যান্টে থাকলেও কাজের প্রয়োজনেই গাড়ি তৈরির অনেক কারখানায় যেতে হয়েছে; টাটা, টয়োটা, মারুতি, হিউন্ডেই, মাহিন্দ্রা। তখন কৌরব গ্রুপের বয়স প্রায় দশ, ওরা ক্লান্ত, পত্রিকা বন্ধ করে দেবে ভাবছে, -সেই সময় আমাকে পেয়ে কমলদার মনে হয়েছিলো কৌরব নিয়ে আরও অনেক খেলাধুলো বাকি রয়ে গেছে। কৌরব-২০ তখন প্রেসে। সেই থেকে আমরা দুজনে একসাথে অনেক ঘুরেছি। অনেক মদ, মাইলস্টোন, ক্যামেরা, ক্যাম্প, ক্রিয়েটিভিটি। আশির দশক জুড়ে। -আসলে, সব মিলিয়ে একটা বড় ধরনের ঝাঁকানি দিতে চেয়েছিলাম। আঁতলামি নয়, অনুকরণ নয়, দলবাজি বা কুৎসা নয়, -একদম নতুন রকমের ভাবনা চিন্তা। কাজের আনন্দে কাজ। কাজের গভীরে যে কাজ। এবং সমসাময়িক চর্চা থেকে অনেকগুলো ল্যাপ এগিয়ে একটা পত্রিকা। আমার সাথে ওর ভাবনার অনেকগুলো ওয়েভলেংথ মিলে গিয়েছিলো। এটা না হলে সম্ভব হোত না। ...সমসাময়িক একঘেয়েমি থেকে মুখ ফিরিয়ে, জীবনের অনাবিষ্কৃত রূপময়তার কথাই লিখতে চেয়েছিলাম। সেই ভিন্ন অনুভবগুলো। নতুন দৃষ্টিকোণ, পরিবেশনা, প্রকৃতি, সম্পর্ক, যৌনতা, আনন্দ, ভয়, আবিষ্কার, অধিকার। কৌরবে যোগ দিয়ে প্রথমেই কমলদার সাথে গ্রামের হাটে পাহাড়ে জঙ্গলে ঝর্ণায় আদিবাসী মেলায় ঘুরতে শুরু করি। হেঁটে, স্কুটারে, ট্রেনে, গরুর গাড়িতে, জীপে, নৌকোয়। তখন পত্রিকা নিয়ে প্রতি সন্ধায় আড্ডা দিতাম দুজনে। সারা শহর ঘুরে প্রচুর পরিকল্পনা হত। ক্রমে নিজের তাগিদেই আমাকে ডুব দিতে হয় বাংলা সাহিত্যের অবশ্যপাঠ্য বইগুলোতে। পদাবলী, হুতুমপেঁচা, ভবানীচরণ থেকে শুরু করে সে এক লম্বা লিস্ট, আমাকে বেছে বেছে কিনে কিনে পড়তে হয়েছিলো, যেগুলো আগে কখনো পড়িনি। ‘সমবেত প্রতিদ্বন্দ্বী’, ‘শেষ নৌকা’, -এগুলো আমি বিয়েতে উপহার পেয়েছিলাম। তো, ঘুরতে ঘুরতে আমি আর কমলদা একদিন চাঁদিপুরে পৌঁছলাম, সেটা অক্টোবর ১৯৭৯। তখনই কবিতার ক্যাম্পের পরিকল্পনা মাথায় আসে। তারপর ১৯৮০র গোড়ায় প্রস্তুত হয়ে কবি স্বদেশ সেনকে সঙ্গে নিয়ে আবার যাই। আমরা তিনজনে ক্যাম্প পাতি, চাঁদিপুর সমুদ্রতীরে, টিলার ওপরে একটা গোলঘরে। আমার সঙ্গে ক্যামেরা, ডায়েরী, টেপরেকর্ডার। তো সেই শুরু হয় কৌরবের প্রথম ‘কবিতার ক্যাম্প’। সেই লেখা বেরলো কৌরব-২৭এ, সেই একটা ঘরানার শুরু। তারপর চাঁদিপুরের পরে মুকুটমণিপুর, সিমলিপাল, বেথলা, চান্ডিল, ইত্যাদি। আমাদের ‘মোটরহোম’ তখন দিকে দিকে ছুটছে। এবং সঙ্গে কবি স্বদেশ সেন। তাঁকে না নিয়ে আমি কোনও ক্যাম্প করবো না, ঠিক করেছিলাম। ক্রমে পরবর্তী পাঁচ-সাত বছরে কৌরব-ই হয়ে গেল সেই পত্রিকা, যেখানে আমাদের নানা রকম কাজ দেখে বাংলা সাহিত্যের প্রায় সমস্ত ‘দিকপাল’ লেখকরা এবং তরুণ প্রজন্ম একযোগে লিখতে উৎসাহিত হল। সে এক তাজ্জব অবস্থা। এর মধ্যেই বিয়ে করেছি। ঘরে নতুন বৌ, খেয়াল নেই। ফলে কৌরব তার কাছে হয়ে দাঁড়ালো প্রায় সতীনের মতো। দারুণ দিন কেটেছে। ...মনে আছে, কমলদা তার প্রথম উপন্যাস ‘আমার পাপ’ লেখার সময় দাঙ্গা-বিধ্বস্ত জামশেদপুরে কার্ফুর ফাঁকে ফাঁকে পান্ডুলিপি নিয়ে আমার কাছে এসে পড়ে শোনাতো। সেসময়ের দিকপালরা সবাই তাদের শ্রেষ্ঠ লেখাগুলোই কৌরবে দিয়েছেন। তখনকার অনেক সিনিয়র সাহিত্যিকের মতে, উই ওয়্যার দা চেঞ্জ মেকার্স। নানাভাবে। আজ প্রায় তিরিশ বছর পরে এখন ভাবলে রোমাঞ্চ হয়। এ নিয়ে অনেক গবেষণার প্রয়োজন আছে।
সেই ছিলো কৌরবের স্বর্ণযুগ। সেই সব দিনের লেখা কবিতা, গদ্য, আজকের প্রজন্মের অনেকেই পড়েনি, জানে না। ...না জেনে, হতাশায় আছে। অথবা ভুল তথ্য জেনেও আনন্দে আছে। তাই অনেকেই আবারও বৃত্ত আবিষ্কার, জুতো আবিষ্কার, -এসব করছে। এগুলোর জন্যে আর্কাইভ দরকার। সিরিয়াস সাহিত্যপ্রেমী গবেষকরা হয়তো একদিন খুঁজে খুঁজে ক্রোনোলজিক্যালি দেখে নেবে কীসে কী হয়েছে, -কোনটা আগে কোনটা পরে, -কীভাবে বিবর্তন এসেছে সাহিত্য-ভাবনায়, লেখায়, পরিবেশনে, -কার প্রভাব গিয়ে পড়েছে কোথায়। ‘কবিতার এরিনা’ নামে লেখা প্রবন্ধগুলোয় এবং কবিতাভাবনা নিয়ে কৌরবে যা কিছু লিখেছিলাম গত কুড়ি-পঁচিশ বছরে, পরবর্তী কালে অনেকের লেখায় আলোচনায় তার স্পষ্ট ইম্প্রেশান দেখেছি। কোথাও আবার আলটপকা নকল করাও হয়েছে, বিষয় না বুঝে । এখন যে ধারাবাহিক লেখাটায় কবিতায় শৈশবের স্মৃতিচিত্র ও মনোজগতে তার প্রভাবের কথা নিয়ে আলোচনা করছি, তার কিছু প্রভাব ইতিমধ্যেই লক্ষ্য করছি কয়েক জায়গায়, আলোচনায়। এটা ভালো লাগছে। প্রকৃত নতুনের জন্যে একটা ভিন্নতর ও সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি হয়তো ধীরে ধীরে তৈরি হয়ে উঠছে অবধারিতভাবে, যেটা প্রয়োজন ছিলো। ‘কবিতার ক্যাম্প’ নিয়ে কবি উৎপলকুমার বসু একটা মূল্যবান চিঠি দিয়েছিলেন, -আমার ব্লগে ‘কৌরবের স্বর্ণযুগ’ লেখাটায় দেখতে পাবে।

৬ / নবেন্দুঃ
তোমার কবিতায় তৎসম, অর্ধতৎসম শব্দের ব্যবহার খুব ইন্টারেস্টিং মনে হয় আমার। এই যেমন লিখেছ, “পরাজয়, অথবা অসহায় শিংওয়ালা একটা হরিণ; / দেওয়াল, অথবা ধ্বসে পড়ার এক চেতনা;/ বিবাহপ্রস্তাব, অথবা ক্রাচে ভর দিয়ে এক পা এক পা / চলে যাওয়া; ঐ বরফের দেওয়াল ও কাঁটায় আকীর্ণ বিছানা”। এটা বোধহয় শরীরী কবিতার। মানে ৮০র দশকে লেখা। আবার দুয়েন্দেতে খুব সাম্প্রতিক কালে লিখেছ, “ ওইসব কালো কেটলি / দিনের আলোয় দেখা রৌপ্য মুদ্রা সিকি ও আধুলি / রাতের বাস্পজল আলোড়ন”। কাজেই দেখা যাচ্ছে এই টেন্ডেন্সিটা বেশ গভীর ও শক্তিশালী। আমার তো মনে হয় সচেতন সিদ্ধান্ত। তুমি কিভাবে দ্যাখো এই বিষয়টাকে?

শঙ্কর লাহিড়ীঃ
হ্যাঁ, এটা ঠিকই খেয়াল করেছো। ঐ দুতিনরকম শব্দের মিলিত ব্যবহারেই গড়ে উঠেছে আমার কবিতার ভাষা। এক ধরণের ফিউশান। এখনকার নতুন বিল্ডিং আর্কিটেক্‌চারে দেখেছো, মার্বেল ও কংক্রিটের সাথে অনেকটাই গ্লাস ও হলো-টিউবের ব্যবহার হচ্ছে। তৈরী হচ্ছে নতুন অ্যাব্‌স্ট্রাকশান। মিউজিকেও দেখেছো। সেই রকম বলতে পারো। আমার সময়ের উপযোগী নতুন একটা গদ্যভাষাও তৈরী করতে চেয়েছিলাম আমি। যখন লিখতে শুরু করি, ১৯৭৯-৮০ সালে, সেই সময় জীবনানন্দ-পরবর্তী কবিদের মধ্যে আমার প্রিয় ছিল উৎপলকুমার বসু আর বিনয় মজুমদার। পড়া ছিলো কিছুটা সুনীল, শক্তি, কিছুটা ভাস্কর, রণজিৎ, বুদ্ধদেব, কিছুটা অমিতাভ, তুষার রায়। এই রকম। এঁদের কবিতাকে আমি সমীহ করতাম, কিন্তু ঐসব ঘরানা একেবারেই আর কর্মক্ষম ছিলো না, অন্ততঃ আমার কাছে। হাংরিদের কবিতাও নয়। কোলকাতার যীশু তো নয়ই। কবিতার ঐ সহজকে ছেড়ে দিতে হবে। ঐ সব পেছনে ফেলে চলে আসতে হবে, নতুন কলমে, নতুন প্যানোরামায়, নতুন অ্যাব্‌সট্রাকশানে। কবিতার ক্যাম্পে আমরা তিনজনেই মুক্ত মনে এসব ভেবেছি। সেই সময়ে ক্যাম্পগুলোয় স্বদেশদা ও কমলদার সঙ্গ আমার কাছে খুব মুল্যবান ছিলো।
...দেখ, বিদুষী ও পন্ডিতদের লেখাগুলোকে আমি খুবই ভয় পাই, সমীহ করি, এবং দূরে থাকি, কারণ তাঁদের ডিস্কোর্সের বেশীটাই আমার কাছে নিরেট গ্রানাইটের মতো, ফুকো-দেরিদা-স্পিভাক, দুর্বোধ্যতাই হয়তো ইউএসপি। এই দূর্বোধ্যতা তৈরী হয় ভাষা ব্যবহারে, কথ্যভাষাকে চিন্তা পদ্ধতিতে ব্যবহার করতে চাওয়ার চেষ্টায় ; -যে কারণে অজস্র ‘জার্গন’ তৈরী হয় লিখিত ভাষায়। এভাবে ভাষাবিদরা হয়তো নিজেরাই নিজেদের ফাঁদে জড়িয়ে পড়েন, আর তৈরী হয় অজস্র জট পাকানো রাশি রাশি উলের বল। সেই বল দুহাতে লোপালুপি ক’রেও জীবন কেটে যেতে পারে অনেক কবিযশোপ্রার্থীর। এগুলো কবিদের কাজে তো লাগেই না, বিজ্ঞানীরও নয়, এরকমটাই আমার মনে হয়েছিলো । দেরিদার ‘ডিকন্সট্রাকশান থিওরী’র ওপর কিছু আলোচনা পড়ে মনে হয়েছিল, ওর মোদ্দা কথাগুলো বোধ হয় এক পাতাতেই সরল করে লিখে দেওয়া যেত। কিন্তু তাহলে তো আর পাঁচশো লোকের পিএইচডি হয় না। অথচ ভেবে দেখো, এত এত ভাষাবিদ, এত দর্শন, এত পিএইচডি, এত বিশ্ববিদ্যালয়, কিন্তু পৃথিবীর কোনও কাজেই লাগে নি! মানবসভ্যতায় আজও শেষ হয়নি হিংসে অত্যাচার দমন লোভ আগ্রাসনের ভুবনজোড়া কাহিনী, তাদের চরিত্রের কিছুটা বদল হয়েছে মাত্র। মানুষে-মানুষে, মানুষে-প্রকৃতিতে, রাষ্ট্রে-মানুষে, রাষ্ট্রে-রাষ্ট্রে ভীষণ রকমের ভুল বোঝাবুঝি থেকেই তো হয়ে চলেছে এইসব। অর্থাৎ গোড়াতেই কোথাও বড় রকমের ভুল থেকে গেছে ব্যবহারে। কবিতাও পারে নি। -সেই জন্যেই একটা অন্য খোঁজ জরুরী। -‘অর্থাৎ কেবল তুমি লিপ্ত হলে সমাধান হয়’।
তবে আমাকে নাড়া দিয়েছিলো গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাকের একটি বিখ্যাত প্রবন্ধের মূল প্রশ্নটি, -‘ক্যান দা সাব্‌অল্টার্ন স্পীক ?’ ঔপনিবেশিক সংস্কৃতিতে অধস্তন প্রজাদের সম্পর্কেই এই প্রশ্ন। আমি ভাবলাম, এর মানে কি ‘-স্পীক ইট্‌স নিউ ল্যাঙ্গুয়েজ ?’ যা আমরা আবিষ্কার করতে চেয়েছি ? আমার কাছে অবশ্য এই ল্যাঙ্গুয়েজ মানে কথ্যভাষা নয়, এটা ‘চিন্তা করার ভাষা’। এই জরুরী তফাৎটা বোঝার সময় হয়েছে তাদের যারা কোনও উদ্ভাবনী প্রক্রিয়ার সাথে যুক্ত আছে।
...পাঠক হিসেবে এসব না বুঝেও ক্যাম্পের দিনগুলোয় আমার পড়তে ভালো লেগেছিলো, মালার্মে, এলিয়ট, হালুভ, ব্রডস্কি, গ্রাস, বোদলেয়ারের কিছু কিছু কবিতা। দেশী বিদেশী অজস্র কবিতা, অনুবাদ, তখন ছুঁয়ে ছুঁয়ে গেছি, তার সামান্যই আজ মনে আছে। কিন্তু বিংশ শতাব্দীর শেষ কুড়ি বছরে এসে সেসবও আমাদের পরিত্যাজ্য মনে হয়েছিলো। জামশেদপুরে কর্মক্ষেত্রে আমাকে পাঠ নিতে হয়েছে ইম্যাজিনেশান, ড্রিম, থট প্রসেস, অ্যাওয়ারনেস, আর ইনটুইশানের, যার আবছা ফুট প্রিন্ট ‘মিল্কিওয়ে’ গদ্যটায় আছে। লন্ডন থেকে উড়ে আসতেন আমাদের শিক্ষিকা, নাম জুডিথ ক্র্যামার। আমি তাঁর প্রিয় ছাত্র ছিলাম। এদেশের অনেক এক্সপার্টও পড়াতে আসতেন। মূল্যবান শিক্ষা ছিলো সেই সব। আর আমার খুব দামী মনে হয়েছিলো প্যারিস রিভিয়ু-র সাক্ষাৎকারগুলো, -কার্লোস উইলিয়ামস, জাঁ ককতো, ব্লেজ সেন্ড্রার্স, টি এস এলিওট, গীন্‌সবার্গ, হেনরি মিলার, -দারুণ তাঁদের অন্তর্ভেদী আলোচনা। অথচ তাঁদের রচনা আমি সামান্যই পড়েছি। এবং বিপ্লব নিয়ে, বাদাবন নিয়ে, দাঙ্গা ও দুর্ভিক্ষ নিয়ে, রমা ও রমেশের প্রেম নিয়ে, নষ্ট শসা ও পেঁচা নিয়ে, বৈদ্যুতিক যোনি লিঙ্গ নিয়ে, এমসি স্কোয়ার নিয়ে, চাঁদ ও চকোর নিয়ে, ঘুমপরিদের নিয়ে, চিলেকোঠা ও রেজিস্ট্রী বিবাহ নিয়ে আর কিছুই লেখার নেই, মনে হয়েছে।
ক্রমে আমি বিষয়হীনতার দিকে সরে যেতে যেতে চমকে থেমেছি। নিজের মতো লেখার সেই শুরু। ক্রমে নিজের মনোজগতের রূপময় অনুভবগুলোই হয়ে উঠলো আমার কবিতার একমাত্র, এবং বহুমাত্রিক বিষয়। ...কবিতা আমার কাছে উদ্ভট শব্দমাংসের কিমা নয়। ওটা ‘লেভেল জিরো’ গেম; অনেকের কাছে ওটাই প্রিয় খেলা, ওটাকে মান্যতা দিলে সুখী হয়। ...আমি তো সজ্ঞানে কবিতা থেকে যাবতীয় শালা-বাঞ্চোৎ-তুইতোকার� ��-ঢ্যামনা-ঢলানি বাদ দিয়েছিলাম। ক্রমে নিজের জায়গাটা স্পষ্টতা নিয়ে জেগে উঠছিলো নিজের কাছে। ক্যাম্পগুলোতে এই ব্যাপারে আমাদের তিনজনের ভাবনায় মিল ছিলো অনেক। আমরা চেয়েছিলাম কবিতার মধ্যে কবিতাকে ফিরিয়ে আনতে। তার রহস্যময়ী সহোদরাকে। ...সেই একান্ত অনুভবের জগৎটাকে প্রকাশ করার জন্যে, মনোজগতের সুদূর ও নির্বাক বিস্ময়গুলোর সাথে বাস্তবের আমি-র যোগাযোগের জন্য, ধীরে ধীরে আমাকে খুঁজে পেতে হয়েছিলো নিজস্ব ভাষার টিম্বার। যাকে আমি চারটে বইয়ে নানাভাবে ব্যবহার করেছি। এর কিছুটা এসেছিলো অবধারিতভাবে, কিছুটা সচেতন পরীক্ষায়। এভাবেই কবিতায় এসে যায় নিজস্ব লিটারারী স্টাইল, ও সিগনেচার। যেটা পেন্টারদের বেলাতেও হয়। তাদের ছবির কম্পোজিশান, লাইন, স্পেস, কালার, টেক্সচার, স্ট্রোক। অচিরেই বুঝেছিলাম যে কবিতায় এটা ভীষণ কোনও শক্ত ব্যাপার নয়। এটা অনেকটা আপনিই গড়ে ওঠে, ক্রমে ক্রমে। নিজস্ব সাবান, মাজন, পাজামা, পরিজ, নোঙর, মাস্তুল, দূরবীন অবলম্বন ক’রে। দৃষ্টি যখন ক্রমে ঘুরিয়ে আলো ফেলে ভেতরে, মনোজগতের ভান্ডারের এপার থেকে ওপারে, তখন কান পাতলে ধীরে শোনা যায় এই ভাষার উচ্চারণ। তার মেলাংকলি ও উল্লাস। গড়ে ওঠে নিজস্ব ভাষার টিম্বার। কিছুটা অবধারিত, আর কিছুটা অবশ্যই সচেতন।

[page]
৭ / নবেন্দুঃ
কবিতা লিখে ওঠার প্রসেসটা তোমার কাছে কিরকম? মানে, ধরো, কেউ লেখে একটা বা একাধিক বিশেষ ঘটনা থেকে স্পার্ক নিয়ে। কেউ আবার শব্দ ব্যবহার করে ঐ অনুভূতিটার কাছে পৌঁছতে চায়। তোমার ক্ষেত্রে কবিতা কিভাবে আসে? ঘরে বসে লিখতে পছন্দ করো নাকি বাইরে? এখনো পেনে লেখো নাকি কম্পিউটারে? এগুলো কি জানতে চাওয়া যায় কবি শঙ্কর লাহিড়ীর কাছে?

শঙ্কর লাহিড়ীঃ
দেখ, ঠিক সময়ে আজকাল ঠিক কথাটা মনে আসে না। একজন বিখ্যাত কবি, নামটা এখন মনে নেই, বলেছিলেন, কবিতা লেখার সময় খোলা জানালায় দৃশ্যের সামনে বসে কখনো লিখো না। বোধ হয় ‘প্যারিস রিভিউ’-তে পড়েছি। এটাকে আমি খুব ক্রেডেন্স দিইনি। তবে অশান্তির মধ্যে আমি একদম লিখতে পারিনা। অ্যাড্রেনালিন একটা লেভেলে না নামলে লেখা সম্ভব হয়না আমার। টেবিলে, বিছানায়, কলমে, পেন্সিলে, ডায়েরীতে, ল্যাপটপে, আপৎকালীন টিস্যুপেপারে, সাদা প্যাডে অথবা রূলটানায়, -নানাভাবে লিখেছি। ভোরের সূর্য্যকরোজ্জ্বল শতাব্দি এক্সপ্রেসে, বম্বে দিল্লীর নির্মেঘ ফ্লাইটেও কখনো। টেনশানহীন স্থির আলোয়। স্টীলপ্ল্যান্টের ভেতরে, ব্লাস্ট ফার্নেসের হাই-লাইনে আকরিক লোহাপাথর নিয়ে যাওয়ার চলন্ত মালগাড়ীতেও রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে টুকরো কাগজে কিছু লাইন লিখেছি, শুরুর দিকে। মাঝ রাতে বিছানায় ঘুম ভেঙ্গে অন্ধকারে হাত বাড়িয়ে কাগজের টুকরোয় কখনো লিখে রেখেছি একটা দুটো ছড়ানো, ভাঙ্গা, আধফোটা। তবে কবি নামের ওপরে আমার আদৌ কোনও মোহ নেই। কবি হওয়ার দায় নেই কোনও। এই বিশাল বিশ্ব ব্রহ্মান্ডের সৃষ্টিরহস্যের সামনে অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে, কখনও মনেও হয় নি যে আমার জন্ম হয়েছে ‘কবি’ হবো বলে। ওটা আমার এজেন্ডায় নেই। লিখি, কারণ লিখতে ভালো লাগে।
...কিভাবে কবিতা আসে, এটা নিয়ে সম্প্রতি স্বদেশ সেনের ওপর একটা লেখায় কবিতার ‘মেঘায়ন’-এর কথা বলেছি। এই প্রসেসটা সারা দিনরাত মনের ভেতরে কাজ করে যায়। আদিকাল থেকেই এভাবে। কবিতার অনুভবের সম্পূর্ণ রম্যভূমিটাই তো মনোজগতের অধিকারে। সেখানেই সে স্তরে স্তরে গড়ে, ভাঙ্গে, বিভাজিত, ঝংকৃত হয়। এর সাথে বস্তুর গুন, শক্তিপুঞ্জ, অণুপরমাণু-বিভাজন-ফিশা� ��-এমসিস্কোয়ার ইত্যাদির কোনও যোগাযোগ নেই। আমাকে বন্ধুস্থানীয় একজন সাহিত্যপ্রেমী কিছুদিন আগে লিখেছিলেন, ‘আমি এখন বেশ বুঝতে পারি, আমাদের ক্রিয়েটিভিটির মূলে আছে বস্তুর অণু-পরমাণুর সঙ্ঘর্ষ, বিভাজন ইত্যাদি ব্যাপারগুলো’। আমি এর উত্তর দিয়ে তাকে বিব্রত করিনি, কিন্তু আমার মনে পড়ে গেছিলো, ছোটবেলায় পড়া রবীন্দ্রনাথের ‘হিং টিং ছট’ কবিতাটা। যার শেষে ছিলো সেইসব অব্যর্থ লাইন : ‘ত্রম্বকের ত্রিনয়ন ত্রিকাল ত্রিগুণ / শক্তিভেদে ব্যক্তিভেদ দ্বিগুণ বিগুণ’, -রাজসভায় সেই ব্যাখ্যা শুনে সভাস্থ ‘সবে বলে, পরিষ্কার, অতি পরিষ্কার’। -এরকম ব্যাপার এখনও হয়তো ঘটে চলেছে, স্বাভাবিক নিয়মেই । কারণ এইসব বিষয়গুলোর ওপর গবেষণাভিত্তিক বইপত্র লেখালিখি বাংলায় এখনও দেখিনি। আমার ‘কবিতার এরিনা’ প্রবন্ধগুলোয় এই নিয়ে অনেকটা আলোচনা দেখতে পাবে। কবিতা লেখার প্রসেস নিয়ে এখন তুমি যে প্রশ্নটা করেছো, সেটার উত্তরে আমি বেশী জটিলতার মধ্যে না গিয়ে, কিছু বলি। অনেক রকম মডেলের মতো এটাও একটা রূপক। ইন্দ্রিয়লব্ধ হাজার রকমের ইনপুট্‌স এবং স্মৃতিচিত্র থেকে, - যার মধ্যে তোমার প্রশ্নের ঐ ‘বিশেষ ঘটনা থেকে স্পার্ক’ও রয়েছে, - চেতনায় স্তরে স্তরে অবিরল যেন নানা বর্ণের ও আকারের মেঘের জন্ম হতে থাকে, মেটাফরিক্যালি। ক্রমে অবচেতনের গভীরে আশ্রয় পায় তারা, আর ক্রমশঃ গড়ে ওঠে তাদের জটিল বিন্যাস। এও এক ধরনের ‘ক্লাউড কম্পিউটিং’। বিশেষ অবস্থায় সেইসব মেঘে মেঘে ইন্টার‍্যাকশানে এক ধরণের সংবাদ ঘনিয়ে ওঠে। হঠাৎই বাইরে থেকে পাওয়া কোনও এক্সাইটেশনের প্রভাবে, অবচেতনের গভীর থেকে সেই সংবাদ বিদ্যুতের মতোই লাফিয়ে নামে চেতনায়। ধীরে একটা আভাস আসে জাগরুক মনে, যেন একটা অদৃশ্য ওয়্যারফ্রেম বা তারজালিতে আবদ্ধ কোনও স্পেস বা আকার বা প্যাটার্ন, যাকে অস্পষ্ট বোঝা যায়, যা টলে উঠছে, বিন্যস্ত হচ্ছে, আর ক্রমে তৈরী করছে কিছু দৃশ্য ছবি শব্দ সুর। ক্রমে সেই বোধের সঙ্কেতগুলো ধরে ধরে সচেতনভাবে লাইনগুলো তৈরী করতে শুরু করি। অক্ষর, শব্দ, বাক্য। কাগজে নেমে আসার প্রাকমুহূর্তে তারা চঞ্চল হয়, শব্দগুলো সহসা বদলে যেতে চায় পারিপার্শ্বিকের প্রভাবে। সেইটা খুব সতর্কভাবে আগলে রাখতে হয়। আগলাতে হয় কবিতার মূল শাঁসকে, বাইরের ঐ কীটের আক্রমণ থেকে। সেইটা করা না গেলে সবটাই নষ্ট হয়ে যায়, অথবা রচিত হয় হিসেব-বুদ্ধি দিয়ে লেখা একটা সেকেন্ডারী কবিতা। এইসব নানাভাবে দেখা। স্বদেশ সেনও এক জায়গায়, হয়তো কিছুটা কাছাকাছি, -লিখেছেন, ‘এই ভাতের গরম, রোমকূপ আর ডাকের মেঘই কবির সাহিত্য’। এই মেঘায়ন শব্দটা আমার মাথায় এসেছিলো ম্যানেজমেন্ট-গুরু ‘এলিয়াহু গোল্ড্‌র‍্যাট’-এর ওয়ার্কশপ থেকে। তবে ডি’বোনো তাঁর চিন্তাসুত্রের ব্যাখ্যায় ব্যবহার করেছেন ‘রঙিন অক্টোপাস আর সার্চ লাইট’-এর মডেল।
অনেকে উল্টোভাবেও লেখে, যে প্রশ্নটা করলে তুমি, -‘শব্দ ব্যবহার করে অনুভূতির দিকে যেতে চাওয়া’। -কোনও ডিক্‌শনারি, ট্রেনের টিকিট, খবরের কাগজ, টিনের কৌটো, অথবা ফিল্মিগান থেকে শব্দ তুলে এনে, সেই অনুভবে কবিতা বানাতে চাওয়া, -তাতে কৃত্রিমতা থাকবেই। কন্ডোম ব্যবহার করে প্রকৃত অনুভূতিটার কাছে পৌঁছোতে চাওয়ার মতোই। যেকোনও সক্ষম মানুষই জানে এই প্রভেদটা। কিম্বা যেভাবে ‘আর্টিফিশিয়াল ইনসেমিনেশান’, কিম্বা যেমন এলএসডি-র প্রভাবে হিপ্নোটিক ট্রিপ। -এই বাইরে থেকে জোর করে ধরে আনা শব্দ বা স্টিমুলাস, যা তোমার জীবনের গভীর অনুভবের সাথে যুক্ত হয়নি, তাদের সঙ্গের এক্সেস ব্যাগেজ নিয়েই তো যত গোলমাল। এগুলোর বরং অনেক সফল ব্যবহার আছে বিজ্ঞাপনে, প্রোডাক্ট ডিজাইনে, মার্কেটিং-এ। ...কিন্তু ধরো তুমি প্রচুর লেখো, সর্বত্র লেখো, এবং তিনটে কবিতা আজ দুপুরেই তোমায় লিখতে হবে। তুমি একটা শব্দ বেছে নিলে, যেমন আলতা। এটাই তোমার স্টিমুলাস। এটাকে ভেঙ্গে দিয়ে পেলে, - আল, আলো এবং লোআ, তারপর লতা এবং উল্টে দিয়ে তাল। এবার চারপাশে নজর ঘুরিয়ে দেখতে পেলে কিছু চলমান ঘটমান দৃশ্য। ব্যস, লেখা শুরু হয়ে গেল, -‘আল আলো আলাদিন / জ্বালিয়ে দিতেই হেসে উঠলো লতা / লোয়ার কেসে, ঠুমকায়, তালে’... এই রকম আর কি। এবং লিখতে শুরু করলে দেখবে, শব্দের অ্যাসোসিয়েশানে স্রোতের মতো আরও শব্দ চলে আসছে, যেগুলো তুমি ভাঙ্গা বাক্যে বেঁধে ফেলতে পারছো। তুমি ভাবলে, এই তো কবিতার প্রবাহ। এইভাবে আট দশ বারো চোদ্দো লাইন। ঐ গোড়ার স্টিমুলাসকে ভাঙ্গিয়ে। এবং পাঠকও পেয়ে যাবে অনেক, কারণ এতদিনে তারাও মজাটা বুঝতে পেরে লেখা শুরু করেছে। কিন্তু এগুলো ‘লেভেল-জিরো’ গেম, অবসরের খেলা। কাজের ফাঁকে ফাঁকে এগুলো দিয়েও জীবন কাটিয়ে দেওয়া যায়, যতক্ষণ না এর চাতুরী ও খোক্‌লা দিকটা নজরে পড়ে। এই পথেই সবকিছু-বাদ-দেওয়া কবিতার প্রবণতা এসেছে। একে মান্যতা দিতে গেলে তোমায় প্রথমেই কবিতাকে রিডিফাইন করতে হবে। কবিতার গঠন, অনুভব, বোধ, উপমা, অলঙ্কার, এবং যা কিছু সাধ্যের বাইরে তাদের বাদ দিয়ে, সহজ করে নতুন সংজ্ঞা তৈরী করে বলতে হবে, এটাই কবিতা, এই কবিতাই লিখতে চেয়েছি। -এবং এভাবে সত্যিই প্রতিদিন অজস্র লেখা হয়, যেগুলো সেকেন্ডারি কবিতা। প্রচুর লিখতে চাইলে, এই খেলায় নামতে হয়। এর সামান্য অংশই পাঠযোগ্য। কিন্তু ব্যাপারটা সফল হয়ে ওঠে যখন বাস্তবে দেখা কোনও মাল্টি-ফ্যাসেটেড স্টিমুলাস থাকে, যেমন সিনেমা, পেন্টিং, স্কাল্পচার, সঙ্গীত, কান্না, হত্যা, ঝড়। এসব নিয়ে আমরা ক্যাম্পের দিনগুলোতেও ভেবেছি।
-এর চেয়ে নিজের আকাশের গভীরে নিরন্তর ঘনিয়ে ওঠা মেঘের ওপরেই আস্থা রাখা ভালো। সেই মেঘায়নের চরিত্রে বড় রকমের বদলের সাথে সাথে কবিতাভাষার শরীরেও তারতম্য ঘটে। আমার চারটে কবিতার বই খুঁটিয়ে দেখলে ভাষার সেই পরিবর্তনগুলো চোখে পড়বে নিশ্চয়ই। দৃষ্টিকোণ নতুন হলে, অধ্যয়নটা নতুন হলে, আমাদের চিন্তাপদ্ধতির দোষত্রুটি ও পক্ষপাতকে বুঝতে পারলে, এই পৃথিবী, প্রকৃতি, পরিবেশ ও আমাদের সম্পর্কগুলোকে SOPS-এর আলোয় দেখতে পারলে, -তার প্রভাবে কবিতা নতুনভাবে সেজে উঠবেই। সেই চেষ্টাই করেছি। উল্টো পথে শব্দভাঙ্গার খেলা করে নয়। কবিতা থেকে কোনও কিছুই বাদ দিতে হবে বলিনি। কবিতার মূল বোধের উপস্থাপনার জন্যে উপমা, অলঙ্কার, ছন্দ, কল্পনা, রূপক, শ্লেষ, গুরুচন্ডালী, বিদেশী ভাষা, সমস্তই থাকবে, কিন্তু তাদের চরিত্র হয়ে উঠবে নতুন ধরণের। এবং আমার নিজের প্রয়োজন মতো আমি তাদের ব্যবহার করবো, যুক্ত করবো শিল্পকলার বিভিন্ন বিভাগের সাথেও। অ্যামিবা থেকে অ্যান্ড্রোমিডা, সবটা নিয়েই আমার কবিতা-বিজ্ঞান।

৮ / নবেন্দুঃ
এই প্রসঙ্গে আরেকটা ব্যাপার মনে পড়ে গ্যাল। বাংলা প্রকাশনা নিয়ে তোমার কি মূল্যায়ন? দ্যাখো, তরুণ প্রজন্ম এখনো দারিদ্র, বেকারি এসব দায় কাঁধে নিয়েও অক্লান্ত কবিতা লিখে যাচ্ছে। যাকে লিটিল ম্যাগাজিন বলে তার সংখ্যা বোধকরি অগুনতি ছাড়িয়েছে। সত্যিই এমন কিছু সাহিত্যসৃষ্টি আমরা পেয়েছি যা আন্তর্জাতিক মানের। অন্যদিকে দেখছি বাংলা ভাষাটির অবস্থা ক্রমশ শোচনীয়। একটা ভালো টেক্সট বই বাংলায় পাওয়া যায় না, গুটিকয়েক যা আছে অধিকাংশ পাঠক তার কথা জানেন না। লেখক পৌঁছতে পারছেন না প্রকাশকের কাছে। প্রকাশক পাঠক তৈরি করতে পারছেন না। একদা আন্তর্জাতিক এই ভাষাটি এখন রিজিওনাল ল্যাঙ্গুয়েজে পরিণত হয়েছে। ভাষাকে ফ্লারিশ করতে হলে শুধু সাহিত্য দিয়ে চলবে না এটা আমরা কেবলই ভুলে যাই। দারিদ্র ভাঙিয়ে খাওয়াটা একটা জাতির পক্ষে খুবই দুঃখজনক। এ বিষয়ে তোমার কি বক্তব্য?

শঙ্কর লাহিড়ীঃ
ভালো প্রশ্ন। মনে হয়, বাংলা সাহিত্যের গড্ডলিকাতে বাংলা প্রকাশনাও গা ভাসিয়েছে। যে সময়ে বড় মাপের সাহিত্য রচিত হত, সে সময়ে বেশ কিছু বড় মাপের রুচিশীল প্রকাশক ছিলেন, যাঁরা সাহিত্য পড়তেন, বুঝতেন, যত্ন করতেন। আজকে সারা পৃথিবী জুড়ে বড় মাপের সাহিত্যিকের আকাল পড়েছে, মনে হয়। প্রযুক্তির প্রভূত উন্নতি হওয়ায়, কিছুটা সাধ্যের মধ্যে এসে যাওয়ায়, বইমেলায় দেখতে পাবে অনেক নিখুঁত ঝকঝকে হার্ডবাউন্ড জ্যাকেট, যার ভেতরে রয়েছে পাঁউরুটি আর ঝোলাগুড়। লোকে লাইন দিয়ে কিনছে। লিটিল ম্যাগেও এক কথা। যেহেতু এখন সহজেই করে ফেলা যায় অনেক কিছু, তাই সহজ লেখা, সহজ টার্গেট, সহজ পুরস্কার, সহজ চাতুরী। মনে পড়ছে, স্বদেশ সেনও আক্ষেপ করে বলেছিলেন, ‘রবীন্দ্রনাথ ও জীবনানন্দের পর ওরা কবিতার সহজে ফিরে গেল!’ ...আন্তর্জাতিক মানও তো এখন খুব উঁচু বলে জানিনা। যেটুকু এদিক ওদিক দেখতে শুনতে পাই। সেখানেও অনেক কায়দা, গিমিক আর দেখনদারী আছে। কিন্তু এখন অনেক নতুন নতুন বিষয়ের ওপরও বই পাওয়া যায়, নন-ফিকশান, যা আগে তেমন ছিলো না। এর সাথে যুক্ত হয়েছে ইন্টারনেট, অকল্পনীয় তার ভান্ডার। ... বাংলা সাহিত্যে আমাদের যে বিপুল উত্তরাধিকার আছে, তার রসাস্বাদনের ইচ্ছে এই প্রজন্মের কিছু কম আছে বলে মনে হয়। আমাদের সময়ে, অন্ততঃ কৌরবের মধ্যেও, যেরকম খুঁজে খুঁজে বই এনে পড়ার প্রথা ছিলো, তেমন কি এখন আর খুব বেশি আছে ? এখন রাতারাতি কবিখ্যাতি চাই। যেটা পাওয়াও যায় অনায়াসে। আগে দু তিনশো টাকা দিয়ে বন্ধুদের নিয়ে এক ফর্মার কাগজ করলেই কবি বা সম্পাদক হিসেবে নিজের নাম দেখানো যেত। আর এখন তো একদম ফ্রি-তে পাওয়া ওয়েবজীন। কোনও দৌড়ধূপ নেই। ...কেউ অক্লান্ত কাজ করছে, বা পড়ছে শুনলে আমার খুব ভালো লাগে। কিন্তু অক্লান্ত কবিতা লিখছে শুনলেই বিপদের গন্ধ পাই। মনে আছে, সেই ক্যাম্পের দিনগুলোয় একবার আমি আর কমলদা দুজনে ঝাড়গ্রামের এক প্রত্যন্ত গ্রামে চলেছি। কিছুটা ট্রেন, তারপর বাস, শেষে গরুর গাড়ি। মাঝ পথে, ঐ ভীড়ের বাসে কমলদার পরিচিত দুজন তরুণের সাথে দেখা। জানা গেল, তারা অক্লান্ত কবিতা লেখে। অন্য কোনও বিষয়ে পড়াশোনা বা আগ্রহ নেই। এমনকি বেচারাদের প্রেম ট্রেম করাও হয়নি, কারণ সময়ই পায়নি। এতো কবিতার চাপ !

৯ / নবেন্দুঃ
শরীরী কবিতার প্রচ্ছদ দুর্দান্ত ছিল। মোটরহোমও অসাধারণ। তুমি তো কৌরবের বেশ কয়েকটা সংখ্যার প্রচ্ছদ করেছিলে। তারপর এখন তোমায় প্রচ্ছদে পাই না কেন? সম্প্রতি ৯’য়া দশক থেকে প্রকাশিত ‘কালো কেটলি’ বইটার প্রচ্ছদের ছবিটা তোমারই তো তোলা? কোথায় তুলেছিলে ছবিটা? কোন বিশেষ গল্প আছে?

শঙ্কর লাহিড়ীঃ
অথচ দেখ, ছবি আঁকায় আমার কোনও স্কুলিং নেই। কোনও বসে-আঁকো নেই, হামটি ডামটি নেই। আমি পারলে তুমিও পারবে। আউটঅফ্‌দাবক্স ভাবতে পারাটাই আসল। -শরীরী কবিতার প্রচ্ছদ সেই সময়েও আলোচিত হয়েছিলো। বাংলায়, কবিতা বইয়ের মলাটে, একটা নান্দনিক রাবীন্দ্রিক শুদ্ধতা, লেটারিং নিয়ে কিছু কাজ, কিছু বিমূর্ত কাটাকুটি, -প্রায়শঃ এই রকমই তো চলে আসছিলো। সেদিক দিয়ে কবিতার বইয়ের প্রচ্ছদে ঐ জীপার-খোলা জিনস, -তার তারুণ্য আর প্যাশান, সব মিলেমিশে ফলক-চিহ্নের মতো জেগে উঠেছিলো। মোটরহোমের কভারও বহু আলোচিত। ওটা আসলে লেখাটার পরিপূরক, ওটা না থাকলে মোটরহোমের রোম্যান্টিক ডিজাইনটাই বোঝা যেত না। শুরুতে আমি ইতস্ততঃ করেছিলাম। কমলদা আমায় ভরসা দিয়ে বলেছিলো, যেমন ভেবেছো সেটাকেই আঁকাবাঁকা অপটু হাতে এঁকে ফেলো, আর কিছু ডিটেলস দিও। ব্যস, পরের দিনই এঁকে ফেললাম ঐ কিউবিস্ট স্কেচটা। ভেতরের ডিটেলস দেখে সবাই হেসে ফেললো। ওইটাই ছিলো ইউএসপি। ঐ দেখে কবি উৎপলকুমার বসু চিঠিতে তাঁর উচ্ছ্বাস জানিয়েছিলেন। ওটারই একটা সরল সংস্করণ দিয়ে কৌরব প্রকাশনীর লোগো তৈরী করেছিলাম। সে সময়ের বইগুলোতে সেটা দেখতে পাবে। পরে মোটরহোমকে সরিয়ে কমলদার আঁকা ‘গাধা’ এসে লোগো হয়ে যায়। সেটাই এখনও চলছে। -কালো কেটলির ছবিটা তুলেছিলাম ২০১১-র নভেম্বরে, ডুয়ার্সে। জলদাপাড়া থেকে বাক্সা ফরেস্ট যাওয়ার পথে বিকেলে, একটি ধাবায়। সেটা মহিলাদের দ্বারা পরিচালিত দোকান । গাড়ি থেকে নেমে চা-এর কথা বলতেই দেখলাম ঐ কেটলিটা রয়েছে পাশের উনুনে। দেখেই আমি হাঁ হাঁ করে উঠে, ক্যামেরা বের করেছি। ওটার এমন অবস্থা, মাজতে গেলেই হয়তো ফুটো হয়ে যাবে। নিকন ক্যামেরায় আমাকে ঐরকম একটা আংরা জিনিষের ছবি তুলতে দেখে মহিলারা হেসে অস্থির। ক্যামেরায় এনে যখন ক্লোজ-আপ দেখালাম, ওঁরা সবাই অবাক হয়ে দেখলেন, তারপরে নিজেরাই বললেন, ‘খুব সুন্দর’। -আমার মনে হয়েছিলো, সাধারণ গ্রাম্য মানুষের মধ্যে সুন্দরের যে স্বাভাবিক একটা বোধ কাজ করে, তার সবটা সে নিজেই হয়তো বুঝে উঠতে পারে না। একবার সেটা ধরতে পারলে তার সুন্দরের সীমানাও ক্রমে বিস্তৃত হয়। আমার মনে হল, সেদিনের পর থেকে ওঁদের দেখার চোখটাই হয়তো একটু পালটে যাবে।

১০ / রাজর্ষিঃ
“দিনের ফলকগুলো নেমে গেছে মাটির গহ্বরে
তাকে সিঞ্চিত করে বীজজ্ঞানে বয়স্ক কুকুর”।
বিশেষত “নতুন কবিতা, আমি পাই না তোমাকে কেন?” -থেকে ‘সিম্ফনি কবিতা’-র দিকে তোমার যাওয়ার ভঙ্গিমাটি ১৯৯০-২০০৩, যদি একটা জার্নি হয়!

শঙ্কর লাহিড়ীঃ
হ্যাঁ, জার্নিই তো। আগেই বলেছি, কথ্যভাষাকে আমাদের চিন্তাভাষা হিসেবে ব্যবহার করার বিপদের কথা আমি জেনেছিলাম ডি’বোনোর কাছে। সুতরাং এই ভাষা দিয়ে কেন তবে আর কবিতা লেখা হবে ? -‘মিল্কিওয়ে’ রচনাটায় (১৯৯০) ভবিষ্যতের জন্য এমন একটা প্রস্তাবনাই আমি রেখেছিলাম। এবং নতুনতর মাধ্যম ও কমিউনিকেশন নিয়ে ভাবতে ভাবতে তার এক বছর আগেই (মার্চ ১৯৮৯) আমি ‘সিম্ফনি কবিতা’র কম্পোজিশানগুলো রচনা করে ফেলি। খুবই পরীক্ষামূলক, এবং সেই প্রথম। বাংলায় আগে কেউ করেছেন শুনিনি। এমনভাবে লেখা, যাতে পাঠযোগ্যতাও থাকে। কেউ কেউ পরে আগ্রহ দেখিয়েছেন, এর অডিও-ভার্শান বানানোর জন্যে। হয়তো আগামী দিনে কখনো হবে। উন্নত প্রযুক্তি নিয়ে খুব সম্ভাবনাময় হতেও পারে তার ফর্ম্যাট। আইডিয়াটা এসেছিলো ঐ মহাকাশ চর্চা থেকে। আজ থেকে ৩৫ বছর আগে নাসা একটা মহাকাশযান পাঠিয়েছিলো পৃথিবী থেকে সৌরমণ্ডলের সীমানার দিকে। সেই মানববিহীন ‘ভয়েজার-টু’র কাজ কর্ম শেষ হয়ে গেছিলো ১৯৮৯ সালেই, যখন সে প্লুটোর সাম্রাজ্য পেরিয়ে আরও গভীর মহাকাশের দিকে ছুটতে শুরু করে। তখনি তার কথা জেনেছিলাম। এই ২০১২ সালেও সে ছুটে চলছে । এবং আগামী কয়েক লক্ষ বছর ধরে চলতে চলতে যদি কখনও কোনও উন্নত প্রাণীজগতে সে পৌঁছে যায়, যদি যায়, সেই ভেবে ঐ মহাকাশযানে একটা গ্রামোফোন ডিস্ক রেখে দেওয়া হয়েছে এই পৃথিবীর মানবজাতির পক্ষ থেকে। আমাদের কথ্যভাষা না বুঝলেও যেন আমাদের গ্রহের প্রাকৃতিক শব্দ শুনে তারা কিছুটা পরিচয় পায় এই সভ্যতার। আমি নিজে সেই সময় অনেক ভেবেছি, কি কি থাকতে পারে ঐ রেকর্ডে। পরে জেনেছিলাম, বিজ্ঞানী কার্ল সাগানের পরিচালনায় ঐ ডিস্কে আছে উদ্দাম সমুদ্রঢেউ, বৃষ্টি আর ঝড়ের শব্দ, সমুদ্রের গভীরে তিমি মাছের ডাক, মানবশিশুর কান্না, আফ্রিকান ফোকড্রাম, বিঠোফেন, আর একটু ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীত। -এখান থেকেই এসেছিলো আমার ‘সিম্ফনি কবিতা’-র কনসেপ্ট।

১১ / রাজর্ষিঃ
লিখেছ, সেই সব উচ্চারণই আমার প্রিয়, যা “মৃত্যু-চীৎকার থেকে বড়ো ও সমানে ছড়িয়ে যায়” । ...তোমার কবিতা ও স্বদেশ সেন । তোমার পাখীটিও তো না থেমে সমস্তটা উড়ছে। ---কিছু বলবে?

শঙ্কর লাহিড়ীঃ
স্বদেশ সেন আমার প্রিয় কবি, বড় মাপের কবি। ওঁর সাথে একসাথে বহু সময় কাটিয়েছি, যখন কৌরবে ওঁর শ্রেষ্ঠ লেখাগুলো লিখেছেন। সদ্যলেখা কবিতাগুলো পড়া হোত। অনেক আড্ডা, আলোচনা, ভ্রমণ, মদ্যপান, হাসি মজা। ওঁকে না নিয়ে কোনও ক্যাম্পে যাবো না, তাই সব ক্যাম্পেই উনি ছিলেন। সেইসব দিনের প্রচুর স্মৃতি, আর কিছু অডিও রেকর্ড আমার কাছে আছে। কৌরবের দারুণ সব দিন ছিলো সেই সময়ে। অনেক শিখেছি ওঁর কাছে। ওঁর সাথে পারিবারিক সখ্যতা আছে, আমার বাড়িতেও এসেছেন। জামশেদপুরে একসময়ে উনি সপরিবারে যে ভাড়াবাড়িতে থাকতেন, সেই একই বাড়িতে পরে আমিও এক বছর সপরিবারে থেকেছি। আজকের কবিতাচর্চা নিয়ে সম্প্রতি অনেক অন্তরঙ্গ কথা বলেছেন আমায়। ওঁর হতাশা আর ক্ষোভের জায়গাগুলো। ওঁর কবিতা পাঠের অডিও সিডি আমিই রেকর্ড করে প্রকাশ করেছি। ...তবে স্বদেশদার কবিতা আর আমার কবিতার ল্যান্ডস্কেপ সম্পূর্ণ আলাদা, ভাষাও আলাদা, স্টাইলও আলাদা, অ্যাবস্ট্রাকশানও আলাদা। ওঁর কবিতার উপযোগী এক আশ্চর্য নতুন ভাষা উনি তৈরী করে নিয়েছিলেন, আমরা মুগ্ধ হয়ে পড়েছি সেইসব কবিতা। হাই পোয়েট্রি। তবে আমাকে নিজের প্রয়োজনে অন্যভাবে কাজ করতে হয়েছে, কারণ আমার অ্যাওয়ারনেস ও ইমোশানাল স্পেসটা অন্য। আমার অনেক কবিতা এবং গদ্যভাষা ওঁর খুব প্রিয়, আমাকে বলেছিলেন। ডায়েরীতে সেই সব কবিতা আমি চিহ্নিত করে রেখেছি।


১২ / নবেন্দুঃ

তরুণ প্রজন্মের লেখালেখি তোমাকে কতোটা টানে? তুমি দীর্ঘদিন ধরে লিখছ, অনেকটা পট-পরিবর্তন চোখের সামনে ঘটতে দেখেছ। কিরকম দেখছ এই সময়ের গদ্য-পদ্যের ধরণ? কিছু বলতে চাও নবীনতম লেখকদের?

শঙ্কর লাহিড়ীঃ
দেখ, গুরুগিরি জিনিষটা আমার নয়। শেষদিন অব্দি আমি ছাত্রই থাকবো। কৌরবে আমি কখনো জনসংযোগ করিনি, প্রচারের আলোয় আসিনি, তাই আমার কথা তরুণেরা শুনবে কেন ? কথায় বলে, ‘রিডার্স গেট রাইটার্স দে ডিজার্ভ’। অর্থাৎ পাঠক যে ধরণের লেখা পড়তে চায়, তাদের ভাগ্যে সেই মাপের লেখকই তো জোটে। অনেক তরুণ লেখকও ভাবে, -এইতো আমার পাঠক, এইতো দেখছি ফেসবুকে ‘লাইক’ দিয়েছে, এই লেখাই তাহলে লিখে যেতে হবে। -আসলে তার একটা আইডেনটিটি ক্রাইসিস আছে, তাই তাকে যে করে হোক কবির শিরোপা পেতেই হবে, ‘কবি’ গেল তো সব গেল। সময় নেই, ঝুটা হি সহি। এইটা আগেই কাটিয়ে উঠতে পারলে ভালো। এই ফেসবুক আর ওয়েবজীনের যুগে, ওপেন ফোরামে, চটজলদি-চতুর-গোষ্ঠীবদ্� �� মতামতগুলো তরুণ লেখককে বিভ্রান্ত করে ভুল পথে ঠেলে দিতে পারে। এর থেকে নিজেকে বাঁচানোর জন্য মার্শাল আর্ট শেখা দরকার। সেটা কুংফু বা তাইকোন্ডো নয়। সেটা হোল, নিজের পড়াশোনা, -ঠিক ঠিক বইগুলো বেছে বেছে পড়া। ঠিক ছবি, ঠিক সিনেমা, ঠিক কাজগুলো দেখা। নিজের ভেতরে যে ‘একা’ লোকটা রয়েছে, তাকে শ্রদ্ধা করতে হবে। মনে রাখতে হবে, এটা ইনফর্মেশান-এক্সপ্লোশ� �নের যুগ। তাই অজস্র ভুল বই পড়েও একটা জীবন কেটে যেতে পারে, নিজের ভান্ডার শূন্যই থেকে যেতে পারে, এটা বুঝতে হবে। দেখ, ইন্টারনেটের যুগে কবিতায় নতুনকে আনতে হলে একালের শব্দ ব্যবহার করে নয়, কবিতায় ‘সিমকার্ড’, ‘আপলোড’, ‘রিংটোন’, ‘এসেমেস’, ‘হাইপারলিঙ্ক’, এসব দিয়ে নয়, ‘হিং টিং ছট’ দিয়ে নয়, তোমাকে যেতে হবে নতুন ল্যান্ডস্কেপগুলোতে, পরিবর্তন চাই তোমার ভাবনায়, দৃষ্টিকোণে, উপস্থাপনায়। এর জন্যে চাই ভালো ও বিচিত্র সঙ্গ। উন্নত মেধার গায়ক, নাট্যকার, লেখক, পরিচালক, সুরকার, শেফ, প্লাস্টিক সার্জেন, পারকাশানিস্ট, প্রযুক্তিবিদ, পাইলট, পেন্টার, কমেন্টেটার, নর্তকী, কিউরেটার, ডীপ-স্কাইওয়াচার, অক্‌শানীয়ার, ডিমোলিশান ব্রিগেড, ক্রেন ড্রাইভার, ডিস্কো জকি, টি টেস্টার, এই রকম আর কি। -কতো রকমের জীবিকা আছে, জানো ? একবার আমি আর কমলদা দুজনে চান্ডিলে হাইওয়ের পাশে একটা ধাবায় । থালায় রুটি তড়কা ডিমভাজা। একটি আদিবাসী ছেলে, পাশের খাটিয়ায় বসে চা আর ছোলাভাজা খাচ্ছে, হাতে একটা রঙচটা খাতা। আলাপ হোল। সরকারী চাকরি করে। তার কাজ হোল সারাদিন ঘন্টায় ঘন্টায় নদীর স্রোত মাপা, কাছেই সুবর্ণরেখা নদী। পাড়ে একটা শাল গাছ আর একটা বড় পাথর, মাঝে প্রায় একশো ফুট দুরত্ব। প্রতি ঘন্টায় একবার ঐ পাথরের ওপর দাঁড়িয়ে, একটা শুকনো ডাল বা পাতা জলে ফেলে, স্টপওয়াচে সময় মেপে সে দেখে নেয় কতক্ষণে ওটা স্রোতে ভেসে সেই শাল গাছটা পেরিয়ে চলে গেল। সেইটা ধাবায় এসে খাতায় লিখে রাখতে হয়। বাকিটা খাটিয়ায়। এই তার দিনভর কাজ।
নবীনদের আমি আর কি বলবো ? আমি যখন নবীন ছিলাম নিজেকে বলেছিলাম, পৃথিবীর কর্মকান্ডের সাথে, দৈনন্দিন আবিষ্কারের সাথে জড়িয়ে থাকতে হবে, আগ্রহী হতে হবে শিল্পকলার অনেক বিভাগে। আমার নিজের মডেলের কথা আগেও জানিয়েছি; দেখো-৪০, ভাবো-৩০, পড়ো-২০, লেখো-৬, ছাপো-৪। জীবনে কবি হওয়ার কোনও লক্ষ আমার কস্মিনকালেও ছিলো না। নিজের আনন্দে কাজ করেছি, লিখেছি। প্রচারহীন থেকে গেছি। তাতেই যা হওয়ার হয়েছে। আজ বুকার, পুলিতজার, জ্ঞানপীঠ, নোবেল, সবেতেই প্রচুর লবি লাগে। রবীন্দ্রনাথ যদি সময় বুঝে গীতাঞ্জলির ট্রান্সলেশানটা না করতেন, ইয়েটস্‌কে না পাঠাতেন, তবে আজও হয়তো সাহিত্যে নোবেল হতো না, আর শতসহস্র তরুণও ‘কবি’ হতেই হবে বলে সর্বস্ব পণ করে বসতো না। আমার নিজের কাছে আজ কবি নামের কোনও বিশেষ ব্যঞ্জনাই নেই। কিন্তু মনে হয়, আগামী দিনের শ্রেষ্ঠ কবিতাগুলো হয়তো লিটিল ম্যাগাজিন থেকেই উঠে আসবে, যদি আজকের নবীন লেখকরা নিজেদের সেভাবে প্রস্তুত করে, -‘সৃষ্টির পূর্বাহ্নে দেখ নিজেকেই সৃষ্টি করা প্রয়োজন হয়’ (বিনয় মজুমদার)।
আশার কথা, আজ অনেক শিক্ষিত সিরিয়াস তরুণ, গড্ডলিকায় গা না ভাসিয়ে, মুক্ত মনে, বুঝতে চাইছে কবিতার নতুনকে। তাদের লেখায় ক্রমে দেখা যাচ্ছে সেই চিহ্নগুলো।

[page]
দ্বিতীয় পর্ব

১ / নবেন্দুঃ
বন্ধু রুমালের পর প্রায় দশ বছর নীরবতা। তারপর এই বছর বইমেলাতে দুটো বই। একটা নির্বাচিত কবিতা আর অন্যটা গদ্যের। এই দীর্ঘ সময়ে, তোমার মনে হয় না, তুমি তোমার পাঠকদের বঞ্চিত করে রেখেছিলে? নিজেই বা কেমনভাবে ছিলে এই না-কবিতার সময়ে ?

শঙ্কর লাহিড়ীঃ

ভাবিয়ে তুললে আমাকে। এবং এই প্রশ্নে মনে পড়লো বহু পুরনো একটা পূর্ববঙ্গীয় লোকগীতি, যাতে আছে ‘ছাওয়াল-কাঁদানো, জামাই-ভোলানো, রাঁধুনি-পাগল-করা’ ইলিশ মাছের কথা। যাকে পাওয়ার অপেক্ষায় আপামর বাঙালি চিরকাল চার্জড্‌ হয়ে থাকে। ঠিক যেভাবে হ্যারি পটারের চার্জড্‌ পাঠকরা রাত জেগে অপেক্ষায় থাকে পরবর্তী প্রকাশের জন্য। যেভাবে বাংলা ভাষাতেও শারদীয় উপন্যাসের জন্য বাৎসরিক হাপিত্যেশ দেখতে পাও। সেগুলো প্রকৃতই সেলিব্রিটি স্ট্যাটাস। আমার মতো দুচারটে বইওয়ালা প্রান্তিক ও পরীক্ষামূলক গদ্যপদ্য লিখিয়ের জন্যে আজকের পাঠক অপেক্ষায় থাকে কি ? ...হ্যাঁ, ‘প্রান্তিক’-ই বলতে পারো, যদি এভাবে ডিফাইন করা যায়, যেন জলবেষ্টিত প্রান্তিক এক ভূখন্ড, যেখানে কাজ করার জন্যে শিক্ষিত তরুণরা তাদের সমস্ত সৃষ্টিশক্তি, অন্বেষণ, ও ভাবনাকে জড়ো করে এনে ক্যাম্প পেতেছে। যেখানে আমিও একটা চেয়ার টেবিল পেতেছি । সেইসব রচনা, যা মেনস্ট্রীমের প্রথাগত বাপুজী-বাজারের চতুর সাবান-সাহিত্য নয়, এবং রেজিমেন্টেড বাজারের সংঘবদ্ধ প্রচারও নয়। এই নির্জন তৃতীয় স্পেসটাকেই আমরা পরীক্ষা-সাহিত্য বলেছিলাম, যার একটা সামগ্রিকতা আছে, এবং যার কোনও পাগলপ্যান ম্যানিফেস্টো বা টেমপ্লেটের প্রয়োজন নেই। যা ক্রমে যুক্ত হয়ে উঠছে শিল্পের বিভিন্ন বিভাগের সঙ্গে, নতুন প্রযুক্তি, বিজ্ঞান এবং ওয়ার্ল্ড ভিউয়ের সঙ্গে। তবে আমাকেও একসময়ে পাঠক / সম্পাদক অনুরোধ করেছে, আরেকটা ‘কুসুম’, আরেকটা ‘মিল্কিওয়ে’, আরেকটা ‘মোটরহোম’, বা ‘মেরিন ড্রাইভ’ লেখার জন্যে। কিন্তু আমি নিজেকে রিপিট না করে আরও নতুন কিছুর অন্বেষণেই থাকতে চেয়েছিলাম। আজ তাই মনে হয়, ওই ছ’সাত বছর তাদের বঞ্চিত করে বাঁচিয়ে দিয়েছি আমি, আর নিজেকেও যেন বাঁচিয়েছি। সেই রবীন্দ্রগানটা মনে করো, ‘আমি বহু বাসনায় প্রাণপণে চাই, বঞ্চিত করে বাঁচালে মোরে’। সেইরকম।
...দেখ, বন্ধু রুমাল বেরিয়ে ছিল ২০০৪-এর জানুয়ারিতে। পরবর্তী ছ’সাত বছর, অর্থাৎ ২০১০ সালে টাটা স্টীলের চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার দিন পর্যন্ত সময়টা আমি ভয়ংকর ব্যস্ত ছিলাম। এর মধ্যেই আমার মেয়ের বিয়ের আয়োজন করতে হয়েছে। এই পিরিয়ডেই টাটা স্টীল বিদেশের অনেকগুলো স্টীল প্ল্যান্ট কিনে নেয়, -থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, ইউ কে, ইউরোপ। আমাকেও সেই গ্লোবালাইজেশানের সুত্রে কিছুটা দেশ বিদেশ ছুটতে হয়। লন্ডন, শিকাগো, আমস্টার্ডাম, ডুসেলডর্ফ, ব্যাঙ্কক। ক্রমে এদেশেও টাটাদের অনেকগুলো নতুন মেগা স্টীলপ্ল্যান্ট খোলার প্রকল্প তৈরী হয় ঝাড়খন্ডে, উড়িষ্যায়, কর্ণাটকে। সেইসব স্বপ্নিল ও বিশাল কলকারখানার জন্য প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো ও লজিস্টিক্স পরিকল্পনায় বিশেষ ভূমিকা ছিল আমার। ফলে নাওয়া-খাওয়ার সময় থাকতো না। প্রচুর ঘুরতে হয়েছে। অনেক সড়ক, রেল, সমুদ্র-বন্দর, অনেক হেলিকপ্টার-সর্টি, খনি অঞ্চলের দুর্গম পাহাড়-জঙ্গলের ওপর দিয়ে বিপজ্জনক উড়ান, ল্যাপটপে অনেক সিমুলেশান মডেল আর পাওয়ারপয়েন্ট-প্রেজ� �ন্টেশান নিয়ে বিভিন্ন রাজ্যে এবং দিল্লীতে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে জরুরী দরবার। এরই মধ্যে কাজের সুবিধের জন্যে ২০০৮ সালে আমাকে নিজের অফিস সরিয়ে আনতে হয় কলকাতায়, টাটা সেন্টারে। জামশেদপুর থেকে এত বছরের সংসার গুটিয়ে সপরিবারে এই সহরে চলে এসে লজিস্টিকালি গুছিয়ে বসার মধ্যেও একটা বিরাট শারীরিক ও মানসিক ধকল ছিলো। জীবনে এই প্রথম ‘নিজের’ বাড়িতে এসে বসলাম, যখন আর ভাড়াটে নয়, টাটা কোম্পানির বাসস্থানে নয়। নরেন্দ্রপুরের ‘শেরউড’-এ আমাদের এই ছোট্ট কমপ্যাক্ট ফ্ল্যাটের পরিকল্পনা নিয়েও উত্তেজনায় অনেক রাত জেগেছি। এর প্রত্যেক ঘরের লেয়াউট, ফার্নিচার, ফ্লোর, দেওয়াল, আলো, রঙ, আর ফাংশানালিটি নিয়ে ল্যাপটপে অনেকরকম গ্রাফিক্স আর পরিকল্পনাই তো করতে হয়েছে। যদিও আমার স্ত্রীর মন এখনও পড়ে আছে জামশেদপুরে নর্দার্ন টাউনের সেই ২১ নম্বর বাংলো বাড়িটায়, যেটা আমরা ছেড়ে এসেছি। তার কার্পেট-ঘাসের লন, কিচেন গার্ডেন, আম-জাম-কাঁঠাল-লিচু-কলা-� ��ারকেল আর দেবদারু গাছগুলো। সারা শীতকাল অজস্র ফুলের গাছ হত টবে। অনেক পাখি এসে বসতো। রঙিন মাছ ছিলো, কাঠবেড়ালি ছিলো, দোলনা ছিলো, আর আউট-হাউসে ছিলো ফুটফুটে কয়েকটা শিশু যারা এখনো আমাদের ফোন করে ফিরে আসতে বলে। সেইসব নস্টালজিয়া। এর মধ্যেই আমার মা ক্রমে আলঝেইমার্স, পরে প্যারালিসিস, এবং শেষে মৃত্যু। ...জামশেদপুর ছেড়ে চলে আসার সময় হাজার ব্যস্ততায় খেয়ালই হয়নি যে চলে যাচ্ছি। পরে কলকাতায় এসে সেটা বোঝা গেল। - জীবনে অনেক কিছুই ছেড়ে চলে গেছে। ভীষণ উথাল-পাতাল একটা সময় গেছে আমার। জীবনে কয়েকবার এরকম ছ’সাত বছরের এক একটা পালা হয়তো সকলেরই আসে, যখন বোঝা যায় তোমার চারপাশে হুহু করে জলস্তর বাড়ছে। যখন জলের ওপর গলা বাড়িয়ে প্রয়োজনীয় শ্বাসটুকু নিয়ে যেতে হয়, যতক্ষণ না জল নামে। সেই পিরিয়ড থেকেও অনেকটা দেখাশোনা তুমি পেয়ে যেতে পারো, যদি তুমি ‘স্নর্কেলিং’ জানো। সমুদ্রের অগভীর প্রবাল-ল্যান্ডস্কেপে শ্বাস নেওয়ার জন্যে একটা টিউবকে মুখে ধরে জলতলের নীচে মাথা নামিয়ে যেভাবে ট্যুরিস্টদের দেখানো হয় রঙবেরঙের বিস্তৃত কোরালসম্ভার, ঝিনুক, সি-ফিশ, -অনেকটা সেইরকম। এর জন্য প্রয়োজন কিছুটা হুঁশজ্ঞান ।

...২০১০সালে টাটার চাকরি থেকে অবসর নিয়ে কিছুটা ভ্রমণ, আর কিছুটা মন দিয়েছি নিজের মতো লেখাপড়ায়। কিছু গদ্যপদ্য লেখাও হয়েছে এই দুবছরে। গদ্য যেমন, ‘খোঁজ’ (নতুন কবিতা, ২০১১) বা, ‘অনন্ত নার্সিশাস ও ভুভুজেলা’ (কুরুক্ষেত্র, ২০১২)। স্বদেশ সেনের কবিতা নিয়ে একটা দীর্ঘ আলোচনাও করেছি সাম্প্রতিক কৌরবে। আর ‘বন্ধু রুমাল’-এর পরে কিছু কবিতা লিখেছি, যে সিরিজটার নাম ‘নীল কাগজ’, -কৌরবে এবং অন্যত্র প্রকাশিত হয়েছে সেই লেখাগুলো। আপাততঃ ব্যস্ত আছি কবিতায় সিনেমাভাষার কাজ নিয়ে ; একটা নতুন রকমের অ্যাবস্ট্রাক্‌শান, -আগামী দিনে এই স্পেসটা রেলিভ্যান্ট হয়ে উঠতে পারে। এটা অনেক পাঠকের কাছেই অপরিচিত। এখানে কম্পোজিশানগুলোর ফ্লুয়িডিটি অনেক কম, -যেমন ওই ‘ভোর / দুপুর / বিকেল বেলায় যা যা দেখলাম’-নামক কবিতাগুলো। -ওর গঠনটা যেন একটা আলোকিত ক্রিস্টাল স্ট্রাকচার, অথবা অ্যাসেম্বলি অফ সেল্ফ-অর্গানাইজিং শেপ্‌স। দশবারোটা আলাদা আলাদা পিস্‌ দিয়ে যেভাবে তৈরী হয়ে উঠেছে সমগ্রটা, এবং চেতনায় অনুভব করাচ্ছে সমসাময়িক স্পেস-টাইমের ওয়ার্পকে, সময়-চাদরের বক্রতাকে। এগুলো আমার সাম্প্রতিক কাজ, তবে ওর প্রথম কবিতাটা (‘আজ ভোরবেলায় যা যা দেখলাম’) কিন্তু লিখেছিলাম অনেক আগে, আশির দশকের শুরুতে, শরীরী কবিতায়। সিনেমায় মন্তাজের কাজ প্রথম শুরু করেছিলেন আইজেনস্টাইন, তাঁর ‘ব্যাটল্‌শিপ পটেমকিন’ সিনেমায়, যেখানে সেই বিখ্যাত ‘ওডেসা স্টেপ সিকোয়েন্স’ আছে, -তোমরা হয়তো ছবিটা দেখেছো। কবিতায় কোলাজ ও মন্তাজের ব্যবহার আমি আশির দশকেই করেছি; ‘শরীরী কবিতা’-য় খেয়াল করলে চোখে পড়বে।
অনেক সিনেমাও, যেগুলো দেখা অত্যন্ত জরুরী মনে হয়েছে, এখন সেগুলো দেখছি প্রায় নিয়ম করে, -ইন এ ডিসিপ্লিন্ড্‌ ওয়ে। কিছু কিছু নোটস রাখছি এবং একটা ডেটাবেস তৈরী করছি। ভীষণ পাওয়ারফুল একটা মিডিয়াম। ত্রুফো, বুনুএল, ব্রেসওঁ, কুরোসাওয়া, বার্গম্যান, পোলানস্কি, হারযোগ, ফাসবিন্দার, ডি সিকা, পাসোলিনি, তারকোভস্কি, গদার, রোমার, ফেলিনি, বার্তোলুচ্চি, জিরি মেঞ্জিল, মিজোগুচি, ওজু, ইমামুরা, মখমলবাফ, কুব্রিক, এঞ্জেলোপুলোস, -কতো কতো অসাধারণ সব কাজ। গত দেড় বছরে বেছে বেছে এরকম প্রায় দেড়শো সিনেমা দেখা হল। তার একটা ক্রমবর্ধমান লিস্ট আছে আমার ব্লগে। খুবই অ্যাব্‌জর্বিং। নিজের জন্যে এই ব্লগটা বানাতেও বেশ মজা পেয়েছি, এটা সম্পূর্ণ একা হাতে বানানো। আর এখন ব্যস্ত রয়েছি ওই ধারাবাহিক লেখাটা নিয়ে, যার নাম ‘আমার কবিতার অন্তরালে শব্দ, বর্ণ, স্রোত’। গত দুবছর ধরে এইসব পড়াশোনা, কাজকর্ম। এর মধ্যে টাটাস্টীল আবার আমায় ডাকছে, দুয়েকটা প্রকল্পে পরামর্শদাতা হিসেবে। - মন চাইছে না।


২ / রাজর্ষিঃ
তোমার ও কৌরবের প্রথম সান্নিধ্য ও তার বিস্তার সম্পর্কে কিছু বল…এই সম্পর্কে অপ্রত্যাশিত চ্ছেদও পড়ে অর্থাৎ দীর্ঘ সংযুক্তি থেকে হঠাৎ বিযুক্তির কারণ কী ছিল?

শঙ্কর লাহিড়ীঃ

আমি যখন কৌরবে যোগ দিই, ১৯৭৭ সালের শেষ দিকে, তখন আমার বয়েস সাতাশ, আর কমলদার একত্রিশ। তখন কৌরব-১৯ বেরিয়েছে। তখন ওরা ক্লান্ত, এবং ২০-টাই ওদের শেষ সংখ্যা, কৌরব আর বেরোবে না, -এইরকম শোনা গিয়েছিল। প্রথম দিকে কৌরবের সম্পাদক ছিল সুভাষ ভট্টাচার্য। সাকচিতে সুভাষদার ফুলের দোকান ‘মালিনী’তে ওর সাথে আমার প্রথম আলাপ। দারুণ লোক। কারো সাথে প্রথম আলাপে ওদের দোকানে একটা গোলাপ ফুল দিত; ওখানে আমায় নিয়ে গিয়ে বাবলা (অরিন্দম গুপ্ত) আলাপ করিয়ে দিয়েছিলো। আমার মতো সুভাষদাও চাকরী করতো টাটা স্টীলে। ওর খুব ভালো লেগে গিয়েছিলো আমাকে, আমার কাজকে। কাগজের শুরুতে সম্ভবতঃ সে-ই ছিলো সবচেয়ে বেশি চার্জড, স্বপ্নিল, উত্তেজিত। একদম প্রথমে, কৌরব-শুরুর সেই দিনগুলোতে সুভাষদার ভূমিকা, এবং তার স্বপ্ন, অভিমান, উচ্ছ্বাস, ও মনঃকষ্টের কিছুটা আন্দাজ পেতে পারো সুভাষদার নিজের লেখা ‘আমার স্বপ্নের ঘোড়া’ গদ্যে। দেখবে, তাকে বাদ দিয়েও কৌরবের প্রতিষ্ঠাপর্বের কোনও আলোচনাই যথেষ্ট নয়। ১৯৭৯তে কর্মব্যস্ততায় সুভাষদা সরে গেলে, তখন থেকে সম্পাদক হিসেবে দেবজ্যোতি দত্তের নাম ছাপা হোত। প্রকৃত প্রস্তাবে কৌরবের প্রতিষ্ঠাতা, সম্পাদক এবং প্রাণপুরুষ ছিল কমল চক্রবর্তী। চিরদিনই। নামকরণও সে-ই করেছিল। তবে কৌরব-প্রতিষ্ঠার শ্রেয় ওদের সেসময়ের চারপাঁচজন বন্ধুর মিলিতভাবেই প্রাপ্য হতে পারে।
কৌরব নিয়ে কিছুদিন ধরেই অনেক তথ্য-বিকৃতি হয়ে চলেছে দেখেছি। আসলে আজকের বাংলা বাজারে কৌরবকে চতুরভাবে ব্যবহার করে যাচ্ছে অনেকে, -এই নিয়ে কমলদার সাথে কয়েকদিন আগেই কথা হয়েছিল। এমনও হয়েছে যে কৌরব প্রকাশনী থেকে কারোর বই বেরিয়েছে, কিন্তু আমরা অনেকে সেটা জানতেই পারিনি। একবার একটা বই বেরোনোর পরে কমলদা আমাকে ফোনে, এবং আর্যনীল ‘মেল’-এ বিস্ময় প্রকাশও করেছে । ওখানে একটা ডিসিপ্লিন নিয়ে আসা খুবই জরুরী। যেমন, কৌরব প্রকাশনীর নাম ব্যবহার করতে গেলে ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠতায় কোনও একজনকে ধরাধরি করে নয়, একটা পদ্ধতির মধ্যে দিয়ে, আমাদের গরিষ্ঠের সহমত নিয়ে আসতে হবে। কেউ এর মধ্য দিয়ে না এসে কৌরব প্রকাশনীর নাম ব্যবহার করলে সেই বইকে আর মান্যতা দেওয়া যাবে না। আমি নিজেও কৌরব থেকে বই প্রকাশের সময়ে এই ডিসিপ্লিন মেনে চলি ; কমল-বারীন-আর্যনীল ত্রয়ীকে আগেই জানিয়ে রাখি।
আমি যখন যোগ দিই, তখন কৌরবে একটা এলোমেলো, হাঘরে অবস্থা ছিলো। তাকে যত্ন করে ধীরে ধীরে কিছুটা নিয়মনিষ্ঠ করে তুলেছিলাম। বারীনদার লেখাতেও (কৌরব-৫১) তার উল্লেখ পাবে। সেসময়ে ‘কৌরব প্রকাশনা’কে পাইয়ে দেওয়ার রাজনীতি থেকে, ভাগ্নে-ভাইপো-ভাইচারা থেকে, এবং মহান্তবাদ থেকে দূরত্ব বাঁচিয়ে, ভবিষ্যতে নতুন ভাবে সাজিয়ে তোলার পরিকল্পনা নিয়ে একটা দীর্ঘ প্যাশানেট গদ্য লিখেছিলাম, যেটা কৌরবে ‘সম্পাদকীয়’ হিসেবে ছাপা হয়েছিলো। ভীষণ পপুলার সেই লেখাটা পরে ‘কৌরব-দ্বীপপুঞ্জ’ নামে আমার ‘মোটরহোম’ বইতে অন্তর্ভুক্ত হয়। -কৌরব প্রকাশনায় সেদিনের গরিমা আবার ফিরিয়ে আনতে হবে। দেখবে, ভালো কিছু গড়তে অনেক সময় লাগে, অনেক শ্রম, আবেগ, মেধা, আর সততা লাগে। কিন্তু সেটাকে নষ্ট করে দিতে আর কতক্ষণ !
কৌরব গ্রুপের নামকরণ হয়েছিলো ১৯৬৮সালে। সেই সময় থেকে ১৯৭৭সালে কৌরবে আমার যোগ দেওয়া অবধি দশ বছরের লিখিত বিবরণ আছে বারীনদার ‘রথের চাকা মাটিতে বসেনি’ নামক গদ্যে, যেটা কৌরব-৫১ (জুলাই ১৯৮৮)-তে পাবে। খুব সুন্দর লেখা, ৩৫ পাতা, দারুণ রিডেব্‌ল্‌ । আমার ব্লগে কখনো তার কিছু ক্লিপ্‌স পোস্ট করার ইচ্ছে আছে। সেটাতে রয়েছে একেবারে গোড়ার দিকের কথা। গোড়ায় দলের কোনও নিজস্ব নাম ছিলো না। প্রতি সপ্তাহে একসাথে বসে ওরা কয়েকজন নিজেদের লেখাটেখা পড়তো। তখন কমলদার সাথে সুভাষদার সবে আলাপ হয়েছে। ১৯৬৮-র অক্টোবরে কমলদার লেখা প্রথম নাটক ‘সূর্যের বুকে ফসিলের নীড়’ জামশেদপুরে মঞ্চস্থ করার সময়ে কমলদা-ই দলের নাম দিয়েছিলো ‘কৌরব’। সেই ছিলো ‘কৌরব’-গোষ্ঠীর জন্মলগ্ন। কমলদার কাছেও এটা শুনেছি।
১৯৭০সালে কৌরব গোষ্ঠীর দুটো কবিতা সঙ্কলন প্রকাশিত হয়, প্রথমটা সাইক্লোস্টাইল্ড্‌, পরেরটা সবুজ মলাটে বাঁধাই। সেই শুরু, যদিও কৌরব নাম দিয়ে তখনও পত্রিকা বেরোয়নি। ১৯৭১ সালে সুভাষদার সম্পাদনায় যখন কাগজ বেরোনো শুরু হল তখনও তার নাম কৌরব নয়। প্রতি সংখ্যায় ছিলো তার নতুন নতুন নাম, সুভাষদারই দেওয়া। প্রথম সংখ্যার নাম ছিল ‘মহিষ’। সুভাষদাকে লেখা কমলা ঘোষ নামের এক মহিলা কবির চিঠিতে বানানবিভ্রাটে ‘কমলা মোষ’ লেখা ছিলো। সেখান থেকেই নাকি সুভাষদার মাথায় এসেছিলো একটা শিং-বাগানো মহিষের ইমেজ। এভাবেই শুরু হ’য়ে, পরপর বেরিয়েছিল ‘মহিষ’ (সেপ্টেম্বর ১৯৭১), ‘যীশু ফিরে আসছেন রাত ১২টা’ (ডিসেম্বর ১৯৭১), ‘প্রতিবিম্বের কাছে কৈফিয়ত’ (মার্চ ১৯৭২), আর ‘গুডবাই মিলি’ (অক্টোবর ১৯৭২)। এইভাবে প্রথম তিন বছরে কৌরব গোষ্ঠীর মোট ছয়টি প্রকাশ। তার পর থেকে কাগজেরও নাম দেওয়া হয় কৌরব। কৌরব-৭,৮,৯ ইত্যাদি।

এইভাবে কৌরব-১৯, ২০, যখন আমি যোগ দিই । কমলদা আমায় প্রথম আলাপের পরেই বলেছিলো, আমরা আর পারছিনা, আপনি পারলে কাগজটা করুন, আমি সঙ্গে আছি। আমাকে তখন ‘আপনি’ বলত। -ক্রমে কাগজ বন্ধ করার ভাবনা ছেড়ে কমলদা আমাকে পেয়ে নতুন উদ্যমে কাজ শুরু করে। খুবই আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব ছিল ওর। কোলকাতার সমস্ত দিকপাল সাহিত্যিকদের সাথে কৌরবের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ গড়ে ওঠে কমলদার মাধ্যমেই। কৌরবে শুধু তাকেই ব্যক্তিগতভাবে চিনতো বাংলা সাহিত্যের সব প্রবীণ মহারথীরা ; এক টেবিলে মদ্যপানের সম্পর্ক ছিলো। সেই ছিলো কৌরবের স্বর্ণযুগের শুরু। সেইসব দিনে কৌরবের অনেক নতুন পরিকল্পনাই ছিলো প্রধানত: কমলদার ও আমার। কোনটা কার মাথায় প্রথমে এসেছিলো, বলা মুশকিল। কারণ প্রতিটি সন্ধ্যায় আমরা দুজনে একসাথে, আর ছুটির দিনগুলোয় গ্রামে গঞ্জে নদীতীরে পাহাড়ে জঙ্গলে। এইভাবে ১৯৭৮ থেকে ১৯৮৫, টানা আটবছর কেটেছে। এই সময়ের কিছুটা আমার ব্লগে ‘স্বর্ণযুগ’ লেখাতে পাবে। ওদের বাড়ির সাথে আমাদের অনেকটা পারিবারিক সখ্যতা গড়ে উঠেছিল এই ক’বছরে। এর মধ্যেই কমলদার কোর্টশিপ এবং বিয়ের পর্ব মিটেছে, যে বিয়েতে বিদেশী রাষ্ট্রনায়কদের আমন্ত্রণপত্র পাঠানোর পরিকল্পনা আমার মাথাতেই এসেছিল। কমলদার সাথে বিয়ের আগে থেকেই কৌরবের নিয়মিত পাঠক ছিলো সুশ্বেতা। দারুণ রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইতো। আমার লেখার খুব ভক্ত ছিলো। বেশ কয়েকটা মুগ্ধ চিঠি লিখেছিল আমায়, কখনো সেগুলো প্রকাশ করবো। ওর বিয়ের পরে আমরা দুই পরিবার একসাথে দেওঘরে বেড়াতেও গিয়েছি। কখনো ওদের কোলের ছেলেকে আমাদের বাড়িতে ঘুম পাড়িয়ে রেখে ওরা দুজনে বাজারঘাট করতে যেত। -কৌরব তখন প্রকৃতই ছিলো একটা সম্মিলিত পারিবারিক জীবনযাপন। ঘটনাবহুল সেই ইতিহাস।

এর আগে, কমলদার নিজের বোনের বিয়েতে আমাকেই পাত্রপক্ষের ভার নিতে হয়; মেয়েটির সারা গায়ে শ্বেতী, তাই ছেলেটির পরিবারের বিয়েতে সম্মতি ছিলো না। অনেক চর্চার পরে আমরা দুই পরিবার মিলে কোলকাতায় আলিপুর কোর্টে গিয়ে রেজিস্ট্রেশান করি, এবং পরে আমার বাড়ি থেকেই তার বরযাত্রী রওয়ানা হয়। কৌরবে অন্য কেউ সেদিন কোনও অজ্ঞাত কারণে এই দায়িত্ব নিতে চায়নি, যেটা আমায় অবাক করেছিল। এরকমই, পরে যখন কোলকাতার ‘অধুনা’র কৃষ্ণগোপালদা জামশেদপুরে প্রথমবার বেড়াতে আসার পরিকল্পনা নিয়ে কৌরবকে জানান এবং কয়েকদিনের জন্য সপরিবারে থাকার একটা ব্যবস্থা চান, তখনও কৌরবে তাঁর এতদিনের বন্ধুদের কেউ কোনও ব্যবস্থা না করায় শেষে আমিই তাঁকে আমন্ত্রণ জানাই। আমার বাড়িতে কৃষ্ণদা সপরিবারে তাঁর স্ত্রী, ছেলে, বোন এবং ভাগ্নেকে নিয়ে কয়েকদিন কাটিয়ে গিয়েছিলেন। সেই ওঁদের প্রথম দেখা হোল দলমা পাহাড়, সুবর্ণরেখা নদী, জুবিলী পার্ক, ডিম্‌না লেক। -কৌরবের অন্তরঙ্গতার ভেতরে এই রকম অনেক আনপ্রেডিক্টেব্‌ল্‌ ব্যবহার মেনে নিয়েও আমরা একসাথে কতো কাজ করেছি। অ্যাট দা এন্ড অফ দা ডে, একটা পজিটিভিটির রেশ রাখার চেষ্টা করেছে সবাই।

তবে এর চেয়েও বেশি আশ্চর্য ও আহত হয়েছিলাম কমলদা নিজে যখন তার বন্দুক উঁচিয়েছিলো, হায়, আমারই দিকে। সেটা ১৯৮৬-৮৭ সাল, যখন কমলদা নিজস্ব কিছু পারিবারিক অন্তর্কলহ ও ভুল বোঝাবুঝির ফাঁদে পড়ে একটা অশোভন ও সাক্ষ্যহীন মিথ্যা অভিযোগ এনে আমাকে মর্মাহত করে, ও সম্পর্ক ছিন্ন করে। -এর একটা তির্যক উল্লেখ বারীনদা নিজেই ‘রথের চাকা’ লেখাতে করেছে। বারীনদা লিখেছে, “এখানে (কৌরবে) শুধু শংকরই ছিল এক বিশাল সংযোজন। শংকর যদি কবিতা লেখা বন্ধ না করত, তার গদ্যেও দখল ছিল অসাধারণ ও বুদ্ধিমান, তবে আশির দশকে ওকেই বাংলার শ্রেষ্ঠ কবি বলা যেতে পারত, এরকম আমাদের মনে হত। হঠাৎই ব্যক্তিগত ভুল বোঝাবুঝির কারণে ও লেখার জগত থেকে ছিটকে সরে যায় আর থেমেও যায়। এটা ঘটে ১৯৮৬-তে। আমরা আবার হই হৃতসর্বস্ব।”

ওই পিরিয়ডটা সস্ত্রীক খুব আহত ও বিস্মিত হয়ে বেদনায় কাটিয়েছি। দেখবে, কৌরব-৪৬, ৪৭, ৪৮ এবং ৪৯ সংখ্যায় আমার কোনও লেখা নেই। কৌরব-৪৫এ আছে, ৫০এ আছে। এবং তখনও পর্যন্ত আমার কিন্তু একটাও কবিতার বই বেরয়নি। তখনও আমি শরীরী কবিতা লিখে চলেছি। এই সময়ে প্রথমেই যে পরিবর্তনটা কৌরবে নজরে আসে সেটা হল, আমাকে নির্বাসন দিয়ে পত্রিকায় এত বছর ধরে ব্যবহৃত আমার আঁকা ‘মোটরহোম’-এর লোগো-কে সরিয়ে কমলদা নিজের আঁকা ‘গাধা’-র লোগো নিয়ে আসে (কৌরব-৪৬)। সেটাই এখনো চলছে। অবশ্য এই নতুন লোগোটা আমারও খুবই পছন্দ হয়েছিল। ১৯৮৮ সালের গোড়ার দিকে ভুল হয়েছে বুঝতে পেরে বাবলার মধ্যস্থতায় কমলদা আবার আমাকে আমন্ত্রণ করে ফিরিয়ে আনে। আবার শুরু হয় নতুন করে লেখালিখি, নতুন অনেক প্রকল্প, নতুন প্রচ্ছদ। সেই ১৯৮৮ সালের এপ্রিলেই কমল-সুশ্বেতা-বারীন-আমি -দীপক একত্রে সারান্ডা ফরেস্টের গভীরে থলকোবাদে বেড়াতে গিয়েছি। ফিরে এসে লিখেছি আমার থলকোবাদ-সিরিজের কবিতা।


৩ / রাজর্ষিঃ
তোমাদের এই পর্বে থলকোবাদ কেমন হয়েছিল ?

শঙ্কর লাহিড়ীঃ
হ্যাঁ, তিনদিনের থলকোবাদ বেড়ানোটা খুব সুন্দর হয়েছিলো। সুশ্বেতা আর আমরা বাকি চারজন। সারান্ডার গভীরে সেইসব স্বর্গীয় আরণ্যক রম্যভূমি ছিলো একদিন। দূরে দূরে লোহাপাথরের ওপেন-কাস্ট খনি। গুয়া, কিরিবুরু, মেঘাতোবুরু। টাটা-বরবিল রেললাইনে বড়জামদা স্টেশনে নেমে আমরা খাবারদাবার কিনে জীপ ভাড়া করে রওয়ানা দিয়েছিলাম। ‘কারো’ নদীর সাঁকো পেরিয়ে বরাইবুরুকে বাঁদিকে ছেড়ে আমরা অনেকটা পথ এগিয়ে একটা চেকনাকা-তে থেমেছি। সেখান থেকে ডান দিকের ভয়ংকর সুন্দর পাহাড়-জঙ্গল-খাদের রাস্তাটাই ‘শিকারী রোড’। শুক্লপক্ষের সেই আগুনরঙা বসন্ত। পত্রমোচী বনে চারিদিকে রাশি রাশি ঝরাপাতা, আর অজস্র পলাশ শিমুল। আমরা ‘করম্‌পদা’ ফরেস্ট হাউসে একরাত ছিলাম, পরদিন থলকোবাদে। বিকেলে পাহাড় থেকে হাতির বৃংহণ শুনে দৌড়ে জীপ নিয়ে জঙ্গলে ঢুকেছি, ওদিকেই ‘লিগিরদা’ ওয়াচ টাওয়ার। সেবার জঙ্গলে একটা আদিবাসী ছেলের সাথে আলাপ হয়েছিল, হাতে তীর-ধনুক, গরু চরায়। তার নাম বলেছিল, ‘গুম্‌হিদেও হোন্‌হাগা’। খুব সুন্দর নাম, এখনও মনে আছে। আমি তখন একটু আধটু ‘হো’-ভাষা বোঝার চেষ্টা করছি। ওকে জিগ্যেস করেছিলাম, এত সুন্দর পাহাড়-জঙ্গল, এটা হো-ভাষায় কি ভাবে বলবে ? ও বলেছিল, ‘ইশুভুকিন বুরু’। ইশুভুকিন মানে, খুব সুন্দর। সেদিন জ্যোৎস্না রাতে আমরা সবাই জীপ নিয়ে গভীর জঙ্গলে রাশি রাশি ঝরা পাতার ওপরে অনেক ক্ষণ সম্মোহিতের মতো দাঁড়িয়ে ছিলাম। এঞ্জিন বন্ধ করে, আলো নিভিয়ে, নগ্ন জ্যোৎস্নায়। এই সেই ‘ক্লান্ত হিম পাতাপোড়া রাতের হিল্লোল’ (মুখার্জী কুসুম)। - সেইসব দিনের নীরব ঝংকার আজও মনের ভেতরে রয়েছে। পরে, জামশেদপুরে ফিরে লেখা কয়েকটা কবিতায় সেইসব শব্দ গন্ধ রং লেগে ছিল।
“অরণ্যের স্পর্শ আজ আমাদের শিহরিত করেছে।
জ্যোৎস্নায় দ্বিতীয় গীয়ারে
ওঠে চাঁদ, চাঁদ ভেঙ্গে পড়ে ;
কে যেন ডেকেছে আজ আমাদের,
শিকারী রোডের গেট আহ্বানে খুলেছে সহসা,
যেন কে ডেকেছে আজ আমাদের ;
দৈব দাবানল নিয়ে এইমাত্র খেলা শুরু হল।
এসো তুমি মধ্যখানে, জ্যোৎস্নায় সম্পূর্ণ জোয়ারে
চালক-আসন ছেড়ে জীপের পেছনে এসে বসো
বসন্ত রাতের মদ ঢেলে নাও পাত্র থেকে, ক্রমে
সন্ধ্যা নেমে আসে থলকোবাদে।
এবার সম্পূর্ণ ডাকো, সুরে ডাকো, সুস্পষ্ট বৃংহণে,
যেন স্রোত নেমে আসে, দৃপ্ত রূপ জঙ্গল-যুবতীর
যেন গর্ভকেশরের মধ্যে সেই স্রোত এসে লাগে ;
যেন তৃপ্ত হয় আমাদের প্রধান-অঙ্গ আর
পরিশ্রুত হয় যেন সকল কণিকা”।

থলকোবাদ থেকে ফিরে লেখা কবিতাদুটো কৌরবে বেরোলে সেগুলো বেশ পপুলার হয়। এর পর কৌরবে প্রকাশিত হয় আমার ‘সিম্ফনি কবিতা’ ও ‘মিল্কিওয়ে’ লেখাগুলো। ক্রমে ১৯৯০-তে বের হয় ‘শরীরী কবিতা’, যেটা আমার প্রথম কবিতার বই। অর্থাৎ, লেখালিখি যে ’৮৬-তে থেমে যায়নি সেটাই বলতে চাইছি। এইভাবে চলে পরবর্তী আরো আট বছর, ১৯৯৫ অবধি, যখন ক্রমে প্রকাশিত হয় মুখার্জীকুসুম’ ও ‘উত্তরমালা’ বইদুটো। তারপরের বছরগুলোতেও লেখা হয়েছে, বই বেরিয়েছে, তবে আমার কর্মক্ষেত্রে ভীষণ ব্যস্ততার জন্য আমাদের প্রাত্যহিক যোগাযোগ কমে আসে, শুধু বিশেষ সীটিংগুলোতে একসাথে বসা হত। -এখন দেখতে পাই কৌরব নিয়ে কমলদারও বহু বিষয়ে অনেক সময়োচিত স্মৃতিবিভ্রম ঘটেছে, তথ্য- নির্ভরতারও বেজায় অভাব।

[page]
৪ / রাজর্ষিঃ
কৌরবের ক্যাম্পগুলোর ধারাবাহিকতা এবং তার একটা তথ্যানুভিত্তিক ডক্যুমেন্ট কি সম্ভব? তোমার কাছে অনেক অডিও ফুটেজ তো রয়েছে...

শঙ্কর লাহিড়ীঃ
হ্যাঁ, অনেকটাই সম্ভব। এবং কিছুটা প্রয়োজনও। কোলকাতায় এসে দেখতে পেয়েছি কৌরবের কর্মকান্ড নিয়ে তরুণদের মধ্যে অনেক ভুল তথ্য প্রচারিত হয়ে এসেছে ; নতুন প্রজন্মের লেখক ও গবেষকদের জন্যে এগুলো স্পষ্ট করে দেওয়া উচিত। কৌরবের ‘কবিতার ক্যাম্প’ নিয়ে আমার ব্লগে ‘কৌরবের স্বর্ণযুগ’ লেখাটায় কিছুটা তথ্য পেতে পারো। সেটা পড়ে অনেকেই ‘আগে জানতাম না তো’ বলে লিখেছে আমায়।

আশির দশকের একদম শুরুতেই যে চারটে জিনিষের মধ্যে দিয়ে কৌরবের মেধা ও তারুণ্যের ব্যতিক্রমী ছবিটা ফুটে উঠেছিলো, প্রধানত: যার জন্যে কৌরবের ওপর নজর পড়েছিলো সেকালে সাহিত্যের ‘বড় মহলের’ সকলের, -তা ছিল কৌরবের সম্পাদকীয়, পত্রিকার প্রচ্ছদ, মোটরহোমের উন্মাদনা আর কবিতার ক্যাম্প। অজস্র চিঠি আছে এই নিয়ে, যার কিছু অংশ ছাপা হয়। এই চারের আকর্ষণে সম্ভব হয়েছিল সাহিত্যের অনেক মহারথীদের কৌরবের জন্য লিখতে উৎসাহিত করা। ইতিহাস বলে, পরের দশ বছরে কৌরব বাংলা সাহিত্যের মেজর লেখকদের কাছে স্বপ্নের কাগজ হয়ে উঠেছিলো। এবং বাংলায় সেই প্রথম কোনও লিটিল ম্যাগাজিনকে শ্রেষ্ঠত্বের পুরস্কার দেওয়া হয়। সিগনেট প্রেসের স্বনামধন্য ডি কে গুপ্তের নামে সেই পুরস্কার।

ওই সময়েই কমলদা ও আমি কবিতার ক্যাম্প শুরু করেছিলাম, যার কথা আগেই বলেছি। ভবিষ্যতের অনেক কিছুর বীজ নিহিত ছিলো এই একটা পরিকল্পনায়। ১৯৭৯-র অক্টোবরে আমরা দুজনে যেদিন ঘুরতে ঘুরতে চাঁদিপুর পৌঁছেছিলাম, সেদিন আকাশ ভরা মেঘ ছিলো আর ঝুপ ঝুপ করে বৃষ্টি পড়ছিল, আমরা ভিজে গিয়েছিলাম। -ওই হুহু হাওয়া আর বৃষ্টিফোঁটায় নির্জনে আমরা দুদিন কাটাই, আর আসার সময়ে সেই নিসর্গে কৌরবের জন্যে একটা খুঁটি পুঁতে আসি। সেবার চাঁদিপুরে আমরা সাহিত্য নিয়ে অনেক আলোচনা করেছিলাম, কিন্তু সঙ্গে কোনও টেপ-রেকর্ডার ছিলো না। প্রকৃত প্রস্তাবে সেটাই ছিলো আমাদের প্রথম কবিতার ক্যাম্প, কিন্তু ‘কবিতার ক্যাম্প’ কয়েনেজটা তখনও তৈরী হয়নি। সেবার ফেরার পথে মনে হয়েছিলো, আমাদের ভাবনাগুলো লিখে ফেলা বোধ হয় জরুরী। কথা হয়েছিলো যে, এবারে আমরা আর অ্যাকাডেমিক প্রবন্ধ না লিখে মাল্টিমিডিয়া (ছবি, অডিও, স্কেচ) ব্যবহার ক’রে শহর থেকে দূরে জঙ্গলে সমুদ্রতীরে গিয়ে আমাদের বলার কথাগুলো বলবো সবাইকে, আর লিখবো নতুন কবিতা, যা অবশ্যই পরিচিত ও প্রথাগত লিরিক ও বিষয়ভিত্তিক নয়। যাকে আমরা পরে বলেছি ‘পরীক্ষা সাহিত্য’।

সেসময়ের ভার্জিন চাঁদিপুর আমাদের প্রকৃতই আচ্ছন্ন করেছিল। এর কয়েক মাস পরে ১৯৮০-র ফেব্রুয়ারীতে আমরা দুজনে কবি স্বদেশ সেনকে নিয়ে আবার আসি চাঁদিপুরে। ক্যামেরা, টেপ রেকর্ডার, কবিতার খাতা আর ডায়েরী নিয়ে হাত পা ছড়িয়ে ঝাউবনের মাঝে সেই একটা ছোট্ট টিলার ওপরে, সেই একটা অপার্থিব গোলঘরে, তিনটে দিন একত্রে কাটাই আর উন্মুক্ত করে দিই আমাদের ভাবনার আর কথার ভান্ডার। সেই ছিলো আমাদের পাতা ‘প্রথম রেকর্ডেড’ কবিতার ক্যাম্প। যখন দুপুরবেলা চারদিক আঁধার করে সূর্যগ্রহণ হল, আমরা সমুদ্রতীরে ঝাউবনে বসেছিলাম। সেদিন গোলঘরে পড়া হয়েছিলো অনেক কবিতা, যার মধ্যে আগের বার চাঁদিপুর থেকে ফিরে লেখা আমার একগুচ্ছ কবিতাও ছিলো। এই ক্যাম্পেই স্বদেশদা ও আমি কমলদার ‘চেতন কল্প’ কয়েনেজটা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করি। সাহিত্যের লঘু গুরু নিয়ে, গদ্য ও কবিতার গঠন নিয়ে সারাদিন অনেক কথা হয়, যার মাত্র কিছু অংশ রেকর্ড করা গিয়েছিলো। সেবার চাঁদিপুরে ‘কবিতার ক্যাম্প’ কয়েনেজটা আমাদের অবেচেতনে এসেছিলো একটা পি ডব্লিউ ডি ক্যাম্প দেখে, আমি যার ছবি তুলে রেখেছিলাম। কমলদার সেকথা মনে নেই, তবে এই ছবিটা আমার ব্লগে দেখতে পাবে। চাঁদিপুর ক্যাম্পের লেখা ও ছবি কৌরবে বের হওয়ার সাথে সাথেই কোলকাতায় ‘বড় মহলে’ হৈচৈ পড়ে গিয়েছিলো। শ’খানেক লেখক ও পাঠক চিঠিতে উচ্ছ্বাস জানিয়েছিলেন। পরে কলকাতা থেকে সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় চিঠিতে জানিয়েছিলেন, ‘আমরা ঠিক করেছি কৌরবের জন্য এবার সর্বাত্মক সমর্থন দেওয়া ছাড়া আর উপায় নেই’।

কবিতার ক্যাম্পের ক্রমপঞ্জি :
১ চাঁদিপুরে প্রথম খুঁটি পোঁতা : (অক্টোবর ১৯৭৯)
২ কবিতার ক্যাম্প : চাঁদিপুর (ফেব্রুয়ারি ১৯৮০)
৩ কবিতার ক্যাম্প : মুকুটমণিপুর (জুলাই ১৯৮০)
৪ কবিতার ক্যাম্প : যোশীপুর, সিমলিপাল (অগাস্ট ১৯৮১)
৫ কবিতার ক্যাম্প : বেথলা (অক্টোবর ১৯৮১)
ক্যাম্পের ছবির নেগেটিভ এখনও আমার কাছে রয়েছে । সবই আমার তোলা, ফলতঃ আমি ক্যামেরার পেছনে। এইসব ক্যাম্পের সবগুলোতেই স্বদেশদা ছিলেন। কারণ আমি স্বদেশদাকে না নিয়ে ক্যাম্প করবো না, ঠিক করেছিলাম। কিন্তু অনেকেই জানে না যে এইসব ক্যাম্পগুলোর কোনটাতেই বারীনদা ছিল না। এমনকি ছিলো না কৌরব-সম্পাদক দেবজ্যোতি দত্ত। তবে বেথলা-ক্যাম্পের লিখিত বিবরণে বারীনদার নাম ঢোকানো হয়েছিল, যদিও বারীনদা সেই ক্যাম্পেও যায়নি! মনে আছে, মুকুটমণিপুর ক্যাম্পে আমাদের সাথে যোগ দিয়েছিলেন কবি ঈশ্বর ত্রিপাঠী ও সিদ্ধার্থ বসু। আর সিমলিপালে সঙ্গী ছিলো নাট্যকার বন্ধু অরিন্দম গুপ্ত।

কবিতার ক্যাম্প যখন পরে বই হয়ে বেরোয় (কৌরব-৬১, জানুয়ারী ১৯৯২), তখন তাতে অজস্র ভুল তথ্য ছিল। এবং কয়েক ঘন্টার আড্ডাকেও সেখানে ক্যাম্প হিসেবে দেখানো হয়েছে, -যদিও তাতে মহাভারত অশুদ্ধ হয়নি। সেই দারুণ আড্ডাগুলোর আমি অডিও রেকর্ড করে রেখেছিলাম, ফলত: তাদের হুবহু সংলাপ পাওয়া গিয়েছিলো। ১৯৮১-৮২তে এমনই দুটো দারুণ আড্ডার লিখিত বিবরণ ক্যাম্পের লেখায় ব্যবহৃত হয়েছে; একদিন হাইওয়ে-৩৩ ধাবায়, যেখানে কমল-স্বদেশ-শংকর-দেবজ্য োতি। আর কৌরবের দপ্তরে এক সকালে সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়ের সাথে মুগ্ধ আড্ডায়, সেখানেও কমল-শংকর-দেবজ্যোতি। একদিন সমরেশ বসুর সাথেও আমরা দারুণ আড্ডায় বসেছিলাম, কিন্তু সেটা আমি রেকর্ড করতে পারিনি।

বারীনদা ক্যাম্পে এসেছিলো অনেক পরের দিকে চান্ডিল ও বরাইবুরুতে (১৯৮৩-৮৪), যখন কৌরবের কবিতার ক্যাম্প বহুচর্চিত, এবং ইতিমধ্যেই একটা ‘মিথ’ হয়ে গেছে। সেই দুটো ক্যাম্পের কয়েকটা ছবি আছে, ডিটেলস নেই, -পরিবর্তে যোগ হয়েছে অনেক কল্পিত সংলাপ যা পরে জামশেদপুরে বসেই লেখা হয়েছিলো ; এতে অনেকটা জল মিশে যায় মদে, আর ক্যাম্পের রিডেবিলিটি ও ফ্লেভার নষ্ট হয়।


আশির দশক শেষ হলে, নব্বই দশকের মাঝামঝি কৌরবে কমলদা, স্বদেশদা ও আমার কবিতাভাবনার থেকে বারীনদার কবিতার থিয়োরী ও প্র্যাক্টিস ক্রমশঃ ভিন্ন রূপ নিয়েছিলো। সেই চঞ্চল সময়ে অনেক উজ্জ্বল তরুণকে দেখেছি, ভাষাবদলের কবিতা লিখতে। পপুলার গেম-শোয়ের মতো এই খেলাটা বেশ ছড়িয়েও পড়েছিলো। প্রায় সেই সময় থেকেই বারীনদার নেতৃত্বে একটা স্বতন্ত্র গোষ্ঠী তৈরী হয়। ক্রমে আমাদের সাহিত্য-ভাবনার সাথে নিজের স্পষ্ট বিভাজনগুলো ঘোষিতভাবে প্রকাশ্যে নিয়ে আসে বারীনদা, এবং কৌরবের বাইরে তার নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘নতুন কবিতা’ গ্রুপ। তবে অনেকেই ভুল করে ভেবেছিলো যে এটা বুঝি কৌরব-ক্যাম্পেরই নির্দেশিত পথ। সে জন্য আমি ১৯৯৪ সালেই কবিতা ক্যাম্পাসে একটা গদ্য লিখেছিলাম, এবং পরে বারীনদার ফ্ল্যাটের আড্ডায় একটা সময়োপযোগী প্রস্তাবও রেখেছিলাম যার থিম ছিলো, ‘কবিতাপথের চোরাবালি ও আগামী দশ বছর’। সেকথা কমলদার আজও মনে আছে, বলছে। অনেক প্রতিশ্রুতিবান ও শক্তিমান তরুণ তখন ব্যক্তিগত সখ্যতার টানে বারীনদার নেতৃত্বের ছায়ায় এসেছিল, আবার অনেকে কিছুদিন পরেই কবিতায় সিরিয়াস কাজ ও গবেষণার প্রয়োজন আছে বুঝে অন্যপথে সরেও গিয়েছে। সব মিলিয়ে খুব জমজমাট কেটেছে কবিতা চর্চার এই দীর্ঘ বছরগুলো।

কবিতার বাজার-চলতি হরেক থিয়োরি নিয়ে পরবর্তীকালে আমি আর মাথা ঘামাইনি, নিজের জগতে নিজের মতো কাজ করে গেছি। ১৯৭৭ থেকে ২০১২, কৌরবে যোগ দেওয়ার সময় থেকে ৩৫টা বছর অনেক ভালোবাসায় আবিষ্কারে প্রেমে অপ্রেমে উত্থানে পতনে কেটে গেছে আমাদের। খুবই মুল্যবান সেই অভিজ্ঞতা। সেসব এখন ইতিহাস, যার ওপরে সময়ের অনেকটা ধূলো জমে গেছে। আমার মনে হয়, স্বদেশদা ইদানিং যাকে ‘রেজিমেন্টেড দখলদারি’ বলেছেন, তার থেকে বেরিয়ে এসে অনেক শিক্ষিত তরুণই হয়তো এখন আবার নতুন করে মুক্ত মনে কাজ করার উৎসাহ পাবে। শূন্য দশকের অন্ততঃ কয়েকজনের মধ্যে সেই প্রেরণা ও কনভিকশান আমি ইতিমধ্যেই লক্ষ করেছি।


৫ / নবেন্দুঃ

তোমার গদ্যে সিনেম্যাটিক এলিমেন্ট সবসময়ই একটা বড় জায়গা রেখেছে। তবে নিছক দৃশ্য বা কল্পদৃশ্যের বাইরে এসে তুমি চেতনার তারে আঙুল ছোঁয়াও। ‘কোরাল আলোর স্যিলুয়েট’এর একটা জায়গায় একটা লাল টেলিফোন পিষ্ট হবার বর্ণনা আছে। পড়তে পড়তে আমার মনে হচ্ছিল এই স্পেসটা বোধহয় সবথেকে ভালো তৈরি করা যেতে পারে অডিও-ভিসুয়ালের মধ্য দিয়ে। বা মোটরহোমের কথাই ধরো না কেন। তুমি তো একবার কবিতা ও কবিতার ট্রেকিং-কে কেন্দ্র করে টিভি সিরিয়ালের স্ক্রিপ্ট লেখার কথাও বলেছিলে...

শঙ্কর লাহিড়ীঃ

হ্যাঁ। সিনেমা মাধ্যমটা খুব পাওয়ারফুল। কবিতার থেকেও বড়ো কাজ করা যায় ওখানে। কারণ, তার সমীকরণে আছে অনেকগুলো ভেরিয়েবল্‌স্‌। মিলিয়ন্স অফ পসিবিলিটিজ। বিশাল তার স্প্যান, জটিলতা, ও গ্র্যাঞ্জার। তার অ্যাব্‌সট্রাকশানেরও একটা নির্মাণপদ্ধতি আছে। যেভাবে সে এক্সপ্রেস করে। সেই সিনেমা ভাষাটাকেই আমি আমার লেখায় নানাভাবে দেখেছি। এটা কিন্তু চেষ্টা করে করা নয়। এটা একটা অন্যরকম মোড অফ এক্সপ্রেশান, এ থিম্যাটিক ভিউপয়েন্ট, যেটা ক্রমে এসে গেছে, নিজস্ব দেখার ও ভালো লাগার সাথে যুক্ত হয়ে। মনে হয়, সিনেমাভাষাকে আশ্রয় করে কবিতা কখনও সিনেমার চেয়েও বেশী কার্যকর, ও দীর্ঘস্থায়ী হতেও পারে।

উৎপলকুমার বসুর পুরী সিরিজের কবিতার সেই লাইনটা মনে করো, -‘একা ময়ূর ঘুরছে খালি দোতলায়, ওই ঘরে সজল থাকতো...’। ওই একটা লাইনের অ্যাবস্ট্রাকশানকে সিনেমায় আনতে গেলে আমাকে খুব কম করেও হাজার-বারোশো ফ্রেম, চল্লিশ সেকেন্ডের ফুটেজ লাগতো। ক্রমে তারা ওভারল্যাপ করতো অন্য দৃশ্যগুলোর সাথে। ওয়ের্নার হারযোগ বানালে কম করেও তিন মিনিট সময় নিতেন শুধু ওই লাইনটায়। ওই বাড়িটা মাটির, অথবা নোনা-ধরা পুরনো ইঁটের কোনও খান্ডাহার ; চারিদিকে জঙ্গল, আগাছা, শুকনো পাতা উড়ছে নাকি ভেজা দেওয়ালে ফাঙ্গাস ; দোতলার গরাদহীন জানালা দিয়ে ক্যামেরা প্যান করে দেখছে ইতস্ততঃ ওই সুদৃশ্য পেখমের সবুজ-ইন্ডিগো উদ্ভাসকে ; কিভাবে সে একা ঘুরছে ওই বারান্দায়, ধূসর সিঁড়িতে, কিভাবে ঠোঁট দিয়ে ঠুকরে দেখছে জানালার কাঠ। ভাঙ্গা ফটোফ্রেম। তার বেশীটাই মিড্‌ শটে, কখনো লং। -অথবা একটা ছেঁড়া পাতায় প্যাস্টেলে আঁকা একটা রঙ্গীন ময়ূর, বসন্ত-বাতাসে সেই পাতাটাই উড়ে বেড়াচ্ছে এঘরে ওঘরে। সেখানে তখন ভোরের কুয়াশামাখানো আলো, নাকি বিকেলের পড়ন্ত রোদ্দুর ? ব্যাকগ্রাউন্ডে ঝোড়ো হাওয়ার শব্দ, নাকি সন্তুরে রাগ তিলক কামোদ ? নাকি দূরে কোনও ধান-কলের আওয়াজ ? নাকি ঘুঘু পাখির বিষণ্ণ ডাক ? অনেক, অনেক ভাবেই তুমি ভেবে দেখতে পারো ওই চল্লিশ-পঞ্চাশ সেকেন্ড। বিচিত্র সব অভিঘাত তৈরী হয়ে সেজে উঠেতে পারে, ছুঁতে পারে চেতনাকে। আর এর উলটো দিকে দেখ, কবিতায় রয়েছে শুধু ওই ছোট্ট একটা লাইন -‘একা ময়ূর ঘুরছে খালি দোতলায়’। তারও কিন্তু অনেকটাই অভিঘাত, যা তোমাকে কিছুক্ষণ বসিয়ে রাখবে। এগুলো গভীরের কাজ।

কবিতায় কল্পিত উদ্ভট চিন্তা নয়, -হাতুড়িটা লম্বা হাত বাড়িয়ে বেডপ্যানে জল ঢেলে দিলো, বা দরজাটা টেলিফোন হয়ে শাড়িকে আঁচড়ে দিলো, -এরকম নয়। কিন্তু এগুলোও লোকে লিখতে চায়। তুমি ঠিকই বলেছো যে নিছক দৃশ্য বা কল্পদৃশ্য নয়। আসল ব্যাপার ওই চেতনার তারে আঙুল ছুঁতে পারাটা; -তার জন্যে জীবনের একটা অন্যরকম অধ্যয়ন আগে প্রয়োজন। শুধু ‘গেঁয়োদের মাঠের রগড়’ দিয়ে নয়, একজন পরিশীলিত মানুষের চেতনার সুপ্ত তারটাকে ছোঁয়া। সেটা যদি পারা যায় তবেই তো তুমি বলবে যে কাজটা করা গেছে।

‘মোটরহোম’ নিয়েও অনেক অডিয়োভিশুয়াল কাজ করা যায়। সিনেমা অথবা টিভি সিরিয়ালও হতে পারে। একদল তরুণ-তরুণী যারা গান করে, ছবি আঁকে, কবিতা লেখে, পোশাক বানায়, অ্যাডভেঞ্চার পছন্দ করে। যাদের হাসি সুন্দর, কথা সুন্দর, যৌনতা সুন্দর, ভাবনা সুন্দর। যারা চাঁদা তুলে নিজেদের ডিজাইন মতো তৈরী করে ফেলে একটা মোটরহোম। তাদের নিয়ে বেরিয়ে পড়া যায় হাইওয়ে ধরে দূরের পাহাড়ি বা বালিয়াড়ি বা মহাকাশ ক্যাম্পগুলোতে। যেতে যেতে তারা অনেক রকম ইম্যাজিনেটিভ খেলা খেলবে, কবিতা লিখবে, ছবি আঁকবে, উপার্জন করবে, গান গাইবে, প্রেম করবে, ক্যাম্প-ফায়ার করবে। প্রত্যেক কাজেই অভিনবত্ব থাকতে হবে, যেগুলো পরবর্তীকালে কপি করবে এখনকার রিয়েলিটি শোয়ের প্রোডাকশান হাউসগুলো। -১৯৮০সালের শেষে যখন ওই প্রকল্পের কথা লিখেছিলাম, তখন চেয়েছিলাম ‘মোটরহোম’ লেখাটার মধ্য দিয়ে কৌরবের পাঠকদের একটা ক্রিয়েটিভ স্বপ্ন দেখানো, -সোনাগাছি আর খালাসীটোলার একাধিপত্য থেকে দূরে যাওয়ার পাসওয়ার্ড। ভেবে দেখো, তখনও কিন্তু এদেশে টিভি আর রিয়েলিটি শোয়ের জন্ম হয়নি। আমার ছাত্র-বয়সের পেন্‌ ফ্রেন্ড্‌ পেগি শ্যুমাখারের স্বপ্ন ছিলো একটা ভ্যানে করে দেশ দেখতে বেরিয়ে পড়া। সেই স্বপ্নটা নিজের মনে লালন করে আমি ওই ‘মোটরহোম’ এঁকেছিলাম। তখন মনে হয়েছিলো, ওটাই হতে পারে সেই উচ্চারণ যা ‘মৃত্যু-চীৎকার থেকে বড়’।


৬ / নবেন্দুঃ
জুন ২০০২ তে তোমার নিজের ওয়েবসাইট বেরোয়। তখন ইন্টারনেটের এত রমরমা ছিল না। সেই ওয়েবসাইটে তুমি তোমার পছন্দের একটা তালিকা প্রকাশ করেছিলে। দুর্দান্ত লেগেছিল সেই লিস্টটা। মজাও পেয়েছিলাম। পাঠকদের সুবিধার জন্য সেই লিস্টটার কিছুটা অংশ আবার এখানে তুলে দিচ্ছি। যারা সবটুকু পড়তে চাইবেন তাদের জন্য বলছি,পুরো তালিকাটা শঙ্কর লাহিড়ীর ব্লগে এই ঠিকানায় পাওয়া যাবে। http://shankarlahiri.blogspot.in/p/oxygen.html

• Often in my dream I see ... water falling from great height into a blue lagoon; she is sailing away in a small paper boat!

• A memory so sad ... I was fourteen when my father died.

• Most pleasant memory ... many years ago, when my school in Calcutta closed in summer we travelled to Jamshedpur; -waking up in the train in the wee hours at Dhalbhumgarh rail station, - greeted by morning breeze made fragrant by rain trees and mango trees, -so much serene, assuring and esoteric; the fragrant memories still linger on.

• I love doing most ... writings in literature, photography, sky watch, read, observe and think and think and...

• I hate doing ... wasting time

• Biggest fear ... misunderstandings

• My favourite dress ... that breathes and communicates

• My favourite dish ... anywhere, -steamed hilsa fish with rice, grilled prawn, and ice cream fruit salad. And anything else, served in candle light, with music, at a hill station. Oh!

• Favourite pastime ... dream weaving

• Places I'd love to visit ... my primary school in Dumdum, dream island Galapagos, Sherpa villages, English country side, Ngorongoro forest, Maldives, Bandhabgarh Tiger Reserve, Louvre Museum, NASA space centers, Moulin Rouge, Jaiselmir, the Valley of flowers, Santiniketan, Holocaust memorials, and...

• My strength ... my skills, my thoughts, and my family.

• My weakness ... my muse

• I'd love to be a ... mesmerizer!

• What makes me upset / scares ... Sycophancy / Closed mind

• Turning points in my life ... Father's death (1965) / Joining a poetry group called Kaurab (1977) / Joining Tata Steel (1973) / Meeting Judith Kramer in her class on Intuition & Awareness (1988-'89).”


এখন এই লিস্টটা আবার রিরাইট করতে হলে কি কি চেঞ্জ করবে তুমি? আদৌ কি কিছু চেঞ্জ করবে?

শঙ্কর লাহিড়ীঃ

প্রথম ওয়েবসাইট তৈরী করেছিলাম কৌতূহল আর খেয়ালের বশে। বেশ ক্রিয়েটিভ একটা ব্যাপার হয়েছিলো। ওটা বানাতে সাহায্য করেছিলো পূর্বাশা, আমার মেয়ে, -ও তখন ‘ওয়েব ইঞ্জিনীয়ারিং’ নিয়ে ডিপ্লোমা করছে। সেই সময়ে জামশেদপুরে পরিচিত আর কারো ব্যক্তিগত ওয়েবসাইট ছিলো না। সাহিত্যের কোনও বন্ধুদেরও নয়। আমার সেই ওয়েবসাইট থেকে এই যে লিস্টটা তুমি এখানে তুলে দিয়েছো, এটা লিখতে তখন খুব মজা পেয়েছিলাম। ওর বেশীটাই আমি আজও চেঞ্জ করবো না। তবে ওই যে লিখেছিলাম, ‘I would love to be a mesmerizer!’ –আজ সেটা প’ড়ে হাসি পাচ্ছে। আসলে এই বিপুল বিশ্বব্রহ্মান্ডের সৃষ্টিরহস্যের সামনে আমি নিজেই সম্মোহিতের মতো দাঁড়িয়ে থাকি। সেটারই একটা রিফ্লেকশান ওই ‘মেস্মেরাইজার’। -ইয়েস, আই উড লাভ টু বি, কতো কিই তো হতে ইচ্ছে করে। এখান থেকেই মনে পড়ে যাচ্ছে অনেককাল আগের একটা গান। ইহুদি মেয়ে ‘ডালিয়া লাভি’-র গাওয়া সেই গান তোমরা কেউ শুনেছো কি না জানিনা, তরুণ বয়সে আমার ভীষণ প্রিয় ছিলো ওই লং প্লেয়িং রেকর্ডটা।

সেই দারুণ হাস্কি ও ফুল-থ্রোটেড ভয়েস, আর সেই অবিস্মরণীয় গান আজও মনে আছে । খুব সুন্দর তার সুর আর কথা : ‘আমি বরং শামুক না হয়ে হতে চাইবো এক চড়াই পাখি, -যদি পারতাম তবে হতাম নিশ্চয়ই।

“I'd rather be a sparrow than a snail
Yes I would, if I could, I surely would
I'd rather be a hammer than a nail
Yes I would, if I only could, I surely would

Away, I'd rather sail away
Like a swan that's here and gone
A man gets tied up to the ground
He gives the world its saddest sound
Its saddest sound

I'd rather be a forest than a street
Yes I would, if I could, I surely would
I'd rather feel the earth beneath my feet
Yes I would, if I only could, I surely would”

এটা স্বাধীন জীবনের জন্য গান; স্বপ্ন আকাঙ্ক্ষা আর বিষাদ মাখানো গান। এর মুডের স্পেকট্রামটা অনেকটা ছড়ানো, -গলায় উল্লাস বা কান্না, দুরকমই আসতে পারে। একা ছাদে, মেঠো পথে, মোবাইকে, ট্রেনের জানালায়, দূরের পাইন-বনে, খোলা আকাশের নীচে, নদীর খাঁড়িতে, ভোরবেলা অথবা বিকেলে, নানা ভাবে গাওয়া যায়। খালি গলায়, কিম্বা গীটার বা তানপুরা বাজিয়ে। তুমি চাইলে, সেই গানের সুরটা নিজেই একটু গেয়ে শোনাতে পারি ইউটিউবে।


[page]
তৃতীয় পর্ব

১) নবেন্দুঃ
জার্নি ৯০এর জানুয়ারি-এপ্রিল ২০১২ ইস্যুতে অনুপম মুখোপাধ্যায় তোমার কালো কেটলি বইটি নিয়ে আলোচনার সময় লিখেছেন, “আমার মনে হয়েছে তিনি পাশ্চাত্য-পিপাসু”। একই লেখায় বলা হয়েছে “যে বাঙালি সংস্কৃতি মূলত গ্রামীন, তার প্রতি তাঁকে কোনোভাবে উৎসুক...মনে হয় না”। স্নবারির এই অভিযোগ কেমন ভাবে দ্যাখো তুমি?

শঙ্কর লাহিড়ীঃ
‘কেটলি’ নিয়ে ওই আলোচনাটা অনেকের মতো আমারও বেশ সুপারফিশিয়াল মনে হয়েছে। তবে ওখানে কোনও অভিযোগের প্রশ্ন হয়তো নেই। থাকলে সেটা হোত নেহাৎই বাতুলতা। আসলে বাংলা কবিতা নিয়ে এখনও খুব ভ্রান্ত ও স্টিরিওটাইপ চিন্তাধারা চলে আসছে, যেগুলো আজকের বিশ্বায়নের যুগে তরুণ ও আলোকিত প্রজন্ম দ্রুত কাটিয়ে উঠছে দেখবে। কৌরবে আশির দশকে ক্যাম্পের দিনগুলোতেই এই ব্যাপারগুলো আমরা বুঝে নিয়েছিলাম। সভ্যতার গড়ে ওঠার, নানান দেওয়ানেওয়ার মধ্যে দিয়ে সজ্জিত হয়ে ওঠার একটা প্রসেস আছে। এই প্রসেসের মধ্যে দিয়েই আরো অনেক দেশ-ভাষা-সংস্কৃতি নিয়ে আমরা উৎসুক হই, খুলে দিই ঘরের জানালাগুলো। সেটা না হলে বাংলা কবিতা গল্প উপন্যাস আজও কাস্তে কোদাল ঢেঁকিঘর ইতুপুজো আর বাদাবনের জীবন আঁকড়ে পড়ে থাকতো। ঘরকুনো বাঙালি তার বদনাম কাটিয়ে যতো বাইরে বেরিয়েছে, পরিচিত হয়েছে দেশবিদেশের নানা জাতির শিক্ষা সংস্কৃতি ভাষা ও সৃষ্টির সঙ্গে, ততই তাদের প্রভাব এসে মিশেছে তার কাজে, সমৃদ্ধ করেছে তার ভাবনা ও রচনাকে। গ্রামীণ সংস্কৃতির কয়েকটা শিকড় আমার মধ্যে নিশ্চয়ই রয়েছে, কারণ আমার ছেলেবেলায় কিছুটা সেই পরিবেশ ছিল। যৌবনে যখন লেখালিখি শুরু করি তখন তো আমি শহরের নাগরিক। অবশ্য সেখানেও ঝাড়খন্ডের গ্রামীণ সংস্কৃতির প্রভাব ছিল। তবে আমার লেখায় যে কাস্তে, কোদাল, লাঙল, হেঁটো ধুতি আর গাইগরুর চেয়ে ফৌজি অশ্ব, শিকারী মাছ, আগুন-ফ্রক, বারুদ, বিছানা, হিমবাহ, পেন্ডুলাম, পটাশিয়াম, হার্পুন, চিমনি, জাঁতাকল বা ফলপাত্রের কথা বেশী দেখতে পাও তার কারণ আমি ওভাবেই কবিতায় নতুন অ্যাবস্ট্রাকশান আনতে চেয়েছি। আমার ল্যান্ডস্কেপটা এমনই। কবিতা আগে বহুলাংশে যে রকম ছিল, হয় তা গ্রামীণ, নয়তো চূড়ান্ত নাগরিক। আরও বড় স্পেস তৈরী ক’রে ওটাকে আমরা পেরিয়ে আসতে চেয়েছিলাম।


২) রাজর্ষিঃ
তোমার কবিতায় ‘আধ্যাত্মিকতার স্তর’, ‘নিহিত শুদ্ধতা’—নিয়েও কী বলতে চেয়েছিলে...

শঙ্কর লাহিড়ীঃ
‘শুদ্ধতা’ ব্যাপারটা এক রৈখিক, ওর বর্ণালী বিশ্লেষণ হয়না। আধ্যাত্মিকতার অনেক স্তর আছে, যা মাত্রই পৌত্তলিকতা নয়, যা কিছু আত্মবিষয়ক বা চিত্তসম্বন্ধীয় তার অন্বেষণই (এনকোয়ারী) আধ্যাত্মিকতা। আমার কবিতার ভেতরেও স্বাভাবিকভাবেই তার বোধ ও জিজ্ঞাসা রয়ে গেছে, যেভাবে গানের সাথে জড়িয়ে থাকে গায়কী।


৩) নবেন্দুঃ
তোমার কবিতায় ছন্দ চিরকালই একটা বড় ভূমিকা রেখে এসেছে। তোমার দীর্ঘ পঙক্তি-বিন্যাস ও ধারণাগত বিস্তারের সঙ্গে দীর্ঘ পয়ার বেশ মানানসই, যেমন, এখন এই উদাহরণটা তোলা যাক,
“এই ঘ্রাণ ভালোবাসি, আর শরীরের তীব্র নীল
দৈব বলয়গুলো দু’হাতে ঝংকৃত হ’য়ে ওঠে;-
হে সর্বসাধারণ সুদক্ষ নিপুণ ফোরম্যান,
ভোরবেলা ঘুম ভেঙে আগুনের সামনে দাঁড়িয়ে
বিকেলে হাওয়ায় ঝড়ে ন’ড়ে ওঠে সর্বাঙ্গীন ক্রেন”।
এই লেখাটি সম্ভবত ৯০ এর দশকে লেখা। কিন্তু আজ ২০১২-তে ছন্দের কি আর কোনোরকম প্রাসঙ্গিকতা আছে? তরুণ কবি এখন কেনই বা ছন্দের বাঁধন মেনে চলবেন?

শঙ্কর লাহিড়ীঃ
এটা একটা জটিল ব্যাপার। দেখ, আমার কোনও ছন্দের পড়াশোনা নেই, মাত্রাবৃত্ত স্বরবৃত্ত পয়ার এসব নিয়ে আমার কোনও অ্যাকাডেমিক অ্যাটেন্ডান্স নেই। তবে ছোটবেলায় তবলার বোল, মাদলের বোল, ঢাকের আওয়াজ, সত্যেন দত্ত, সুনির্মল বসু, -এসব মিলেমিশে কানটা অনেকটা তৈরী হয়ে গিয়েছিল। দেখ, ছন্দ তোমার কানে বাজবে আর মনের ভেতরটাকে দোলাবে। এবং এটা শুধু কবিতায় নয়, গদ্যেও ব্যাপারটা ভীষণভাবে লক্ষ্য করা দরকার। আমার কবিতার প্রথম চারটে বইয়ের পরে ‘নীল কাগজ’ সিরিজে যেগুলো লিখেছি তার ফর্ম্যাটটা পূর্ণতঃ গদ্যের, কিন্তু যেভাবে তা কম্পোজ্‌ড্‌ হয়েছে তারও একটা অন্তর্নিহিত ছন্দ রয়েছে। ছন্দকে ভাঙতে গেলেও জানতে হবে ঠিক কোন কোন জায়গাগুলোকে আলগা করে দিতে হয়, কোনখানটা ক্লিপ করতে হয়। এটা খুব ইন্টারেস্টিং ব্যাপার, এবং অবশ্যই প্রাসঙ্গিক। একদম টানা গদ্যকেও কবিতায় ব্যাবহার করেছি আমি। ‘শরীরী কবিতা’ বইয়ে একটা কবিতা ছিল, ‘আজ ভোরবেলায় যা যা দেখলাম’। ওটার একটা সিক্যুয়েল হিসেবে পরে দুপুর, বিকেল এবং রাত নিয়ে আরও তিনটে কবিতা রয়েছে। কতকগুলো বিশেষ ধরণের ইমেজকে সাজিয়ে একটা নতুন রকমের চেতনকল্প বা অ্যাবস্ট্রাকশান তৈরী করা হয়েছে সেখানে। টানা গদ্য, কোনও ছন্দের মোড়ক নেই, কিন্তু ভেতরে একটা ডিসিপ্লিন আছে, পকড় আছে, সেটাই তার ছন্দ। দেখবে প্রত্যেকটা শব্দের অবস্থান প্রায় নির্দিষ্ট হয়ে আছে, একটু এদিক ওদিক সরালেই ব্যাপারটা নড়ে যাবে। আজকের তরুণ লেখককে এগুলো বুঝে নিতে হবে।

[page]
৪) রাজর্ষিঃ
“সহসা হয়েছে সাধ
যেন সে প্রবাল দ্বীপ
যেন সে রঙীন স্বাধীনতা”...

তোমার কবিতায় রঙের ব্যবহার নিয়ে কিছু বল…

শঙ্কর লাহিড়ীঃ
হ্যাঁ, আমার কবিতায় রঙের ভিশ্যুয়াল্‌স নিয়ে কিছু কাজ আছে। গদ্যেও আছে। এটা এসেছে আমার চিত্রকলার প্রতি টান থেকে। -যা কিছু রঙিন, সামুদ্রিক, ভেষজ, প্রবাল, চিত্রার্পিত। অনেক রঙের উল্লেখ আছে, কোরাল, মভ, বার্ন্ট সিয়েনা, টার্কোয়াজ, পার্পল, নীলাভ, পিঙ্গল। রঙের অনেক প্যাটার্নও রয়েছে। আছে ‘কিছুটা খয়েরী, কিছু রক্তবর্ণ, সুনীল ভিতরে’।...আছে ‘সবুজের লোহিতের অপলক বিস্তৃত গালিচা’ । আছে ‘তপ্ত লাল বৃত্তাকার অক্ষরগুলো’ (শরীরী কবিতা)। কবিতায় এই রঙিন স্বাধীনতাকে নানাভাবে ব্যবহার করেছি আমি। জীবনে, চেতনায়, সমগ্রে, ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে এইসব আলো আর রঙের উদ্‌যাপন। তবে এর একটা মনোবৈজ্ঞানিক দিকও হয়তো আছে। দমদমে শৈশব কেটেছে প্রকৃতির বেশ কাছাকাছি। পরে, আমার কিশোর বয়সে বাবার মৃত্যুতে জীবন বিবর্ণ হয়ে গিয়েছিল। মাকে দেখেছি বিবাহিত জীবনে বড় করে সিঁদুরের উজ্জ্বল টিপ পড়তে, - পরে তার বৈধব্য রূপও আমায় দেখতে হয়েছে। এখান থেকেই সম্ভবত রঙের প্রতি একটা তৃষ্ণা জন্মায়। তবে সবই যে উজ্জ্বল রঙ, তা নয়। আমার ভালো লাগে চারকোল, গ্রে, প্যাস্টেল, ওয়াশ ড্রয়িং। তবে এগুলো শুধু ভিশ্যুয়াল্‌স পর্যায়ে নয়, এগুলো দিয়েই তৈরী হয়েছে নানা ধরণের চেতনকল্প, যেমন ‘একটি রঙিন ছবির আর্তনাদ’, বা ‘এক অমানুষিক আয়োজন’ কবিতায়।


৫) রাজর্ষিঃ
সম্প্রতি বারীনডাঙা বেরিয়েছে, তুমি দেখেছ কী? সেখানে একটা সাক্ষাতকারে আমাদের দেওয়া তোমার সাক্ষাতকারের বিরোধিতা করা হয়েছে...কী বলবে?

শঙ্কর লাহিড়ীঃ
দেখ, বারীনডাঙা আমি পড়িনি। কেউ যদি জেনেশুনে অসত্য বলে, অথবা বিভ্রান্তি জিইয়ে রাখে তার দায় তাদেরই নিতে হবে। তবে এই বিভ্রান্তিগুলো আস্তে আস্তে কেটে যাবে ঠিক, শুধু আরও সময়ের অপেক্ষা। কৌরবের কবিতার ক্যাম্প নিয়ে অনেক ডকুমেন্ট একমাত্র আমার কাছেই রয়েছে, যার ভিত্তিতে তোমাদের ঐ সাক্ষাৎকার দিয়েছি ; প্রত্যেক ক্যাম্পে আমিই ছবি তুলতাম, অডিও রেকর্ড করতাম, স্কেচ করতাম, নোট্‌স নিতাম। কমলদাও কিছু নোট্‌স নিত। ক্যাম্পে থাকতো স্বদেশ সেন, কমল চক্রবর্তী এবং আমি। বারীনদা ক্যাম্পে এসেছে একেবারে শেষের দিকে, যখন বাংলা বাজারে কৌরবের ‘কবিতার ক্যাম্প’ একটা মিথ্‌ হয়ে গেছে। আমিতো তার ডিটেলড্‌ সালতামামী আগেই দিয়েছি। বারীনদা নিজেও এক জায়গায় লিখেছে, ‘শংকরের সময়েই কৌরবে কবিতার ক্যাম্প হয়’। -এতে বিভ্রান্তি বা মনোমালিন্যের কোনও জায়গা নেই। আজকের তরুণদের অনেকেই এগুলো জানতো না, বোঝা গিয়েছে।


৬) রাজর্ষিঃ
“স্বপ্ন ঘুম নিয়ত-মাছেরা
আমাকে সামান্য হাতে স্পর্শ করে
                               সহসা বাজায়;
আমি তার দেখেছি বিস্মিত
দুধ ও রক্তস্রোত, আমি সেই সাঁতারে নেমেছি”

যারা ঘোলা জলে মাছ ধরেছে, তুমি কখনো তাদের দলে নও।... তোমার স্বাতন্ত্র্য নিয়ে তুমি কিছু বলবে?

শঙ্কর লাহিড়ীঃ
দেখ, কর্মক্ষেত্রে আমার কাজে যথেষ্ট সুখ্যাতি পেয়েছি, আমায় তাই কখনও আইডেন্টিটি ক্রাইসিসে ভুগতে হয়নি। অনেকটা লার্জ স্প্যানে জীবনকে দেখা সম্ভব হয়েছে আমার। যারা সেটা পায়নি তাদের সাথে সেখানেই আমার স্বাতন্ত্র্য। সাহিত্যের আসরে আমি তাই সমস্ত রকম দলবাজি থেকে মুক্ত থাকতে পেরেছি, কারণ কবি হওয়ার কোনও দায় ছিল না আমার। কৌরবেও আমার সময়ে ভাগ্যক্রমে একটা সুবাতাস চলাচল করেছে, ওখানে খুব সুন্দর একটা সাহিত্যচর্চার পরিমন্ডল পেয়েছিলাম, এবং তাকে লালন করতে হয়েছে, বাঁচিয়ে রাখতে হয়েছে হাজার কিসিমের পেজোমি থেকে। পরিষ্কার স্বচ্ছ জলে আপন মনে সাঁতার কাটার একটা আলাদা আনন্দ আছে, এবং আমি সেটাই চেয়েছি।


৭) রাজর্ষিঃ
এবার আমরা নাছোড়বান্দা, স্বদেশদার সাক্ষাতকার তুমি তুলে নিয়েছিলে, ওটা আমরা আবার ছাপব...

শঙ্কর লাহিড়ীঃ
হ্যাঁ, ওটা ছাপলে যদি তোমাদের কবি ও কবিতার কোনও ঊপকারে লাগে তাহলে ছাপতেও পারো। কবি স্বদেশ সেনকে আমরা শ্রদ্ধা করবো অথচ তিনি আমাদের কবিতাচর্চা নিয়ে স্বাধীনভাবে কিছু বললেই প্রবল আপত্তি জানাবো, সেটা ঠিক নয়। আমি ওটা আমার ব্লগে প্রকাশ করার কয়েকদিন পর অশোভন চাপে পড়ে তুলে নেওয়াই শ্রেয় মনে করেছিলাম। কিছুদিন আগে স্বদেশদা প্রসঙ্গক্রমে জানতে চাইছিলেন, ঐ সাক্ষাৎকারের ফলশ্রুতি কী হল? আমি বলেছি, কবিতা নিয়ে আপনার মতামত এই প্রজন্মের তরূণদের কাছে নিশ্চয়ই নতুন করে ভাবনার প্রেরণা যুগিয়েছে।


৮) রাজর্ষিঃ
“ইনফিনিটি শারীরিক হাসি
সুরেলা ডাকের শিস, শীর্ষবিন্দু, কাঁপা ও বর্তুল”…

তোমার কবিতায় স্পেসের ব্যবহার নিয়ে কিছু বল…

শঙ্কর লাহিড়ীঃ
হ্যাঁ, শব্দের পরবর্তী স্পেসকে নিয়ন্ত্রণ করা কিছুটা জরুরী মনে হয়েছে কবিতায়। দুটো শব্দের অন্তর্বর্তী যে জায়গাটা আমি ছেড়ে রাখি, সেটা কোনও ভিশ্যুয়াল অ্যাপিলের জন্য নয়, সেটা মূলতঃ কবিতার পাঠকালীন যতিগুলোর পরিমাপ চিহ্নিত করার জন্যেই। নীরব পাঠেও, এটা একটা আলাদা ডাইমেনশান, দ্যোতনা যোগ করতে পারে শব্দবন্ধে। চেতনায় প্রত্যেক শব্দের একটা নিজস্ব রণন-কাল বা ‘সোকিং টাইম’ আছে, যা নির্দিষ্ট করতে পারে ঐ যতির পরিমাপ।


৯) রাজর্ষিঃ

প্রযুক্তির শুরু থেকেই তুমি ব্লগ ব্যবহার শুরু করেছিলে, এই ভাবনা কী ভাবে ও কেন এসেছিল?

শঙ্কর লাহিড়ীঃ
দেখ, পেশাগতভাবে আমাকে প্রযুক্তির সাথে সবসময় যুক্ত থাকতে হয়েছে। আশির দশকের ১৯৮৩-৮৪ সালে ভারতবর্ষে পার্সোনাল কম্পিউটার আসার আগে থেকেই টাটাস্টীলে কর্মক্ষেত্রে কয়েকটা ছোট পোর্টেবল্‌ কম্পিউটার (তার নাম ‘অরিক’) বিলেত থেকে ইম্পোর্ট করে এনে রাখা হয়েছিল লাইব্রেরীতে। সেগুলোকে টিভি-স্ক্রীনের সাথে যুক্ত করে কাজ করতে হত। আমি তারই একটা রিকিউজিশান করে বাড়িতে এনে অনেক রাত জেগে প্রোগ্রামিং শেখার জন্যে লেগে থাকতাম। অনেক Animated designs করেছি। কম্পিউটারের সাথে সেই প্রথম বিনিদ্র মধুচাঁদ। এর অনেক বছর পরে ২০০২ সালে আমার প্রথম ওয়েবসাইট লঞ্চ করি। বেশ প্রশংসিত হয়। টাটাস্টীলেও সেই প্রথম। আমার ব্লগ এসেছে আরও অনেক পরে। এই যে নিজে নিজে ডিজাইন করতে পারা, -ছবি মিউজিক টেক্সট সব মিলিয়ে, এবং এটা যে পৃথিবীর যেকোনও প্রান্ত থেকেই কেউ দেখতে পারছে, -এই ভাবনাটাই আমাকে তখন মোটিভেট করেছিলো। প্রথমেই আমেরিকায় M.I.T Media Lab-এ ডিজিটাল ওয়ার্ল্ডের গুরু ডক্টর নিকোলাস নিগ্রোপন্টিকে ভবিষ্যত-পৃথিবীর সমস্যা সম্পর্কে ইমেল করেছিলাম, উনি উত্তর দিয়েছিলেন। এরকমই। Just for the fun of having my own website, and to be involved in a creative work of self-expression. প্রথম দিকে আমার ওয়েব সাইটে লিটারারি কন্‌টেন্টস কিছু ছিল না। অনেক পরে ব্লগে এসে সেটা যুক্ত হয়, -প্রধানতঃ আজকের তরুণ প্রজন্মের সাথে একটা যোগসুত্র তৈরী করার জন্যে। সম্পূর্ণ নিজের হাতে তৈরী করা এর আর্কিটেকচার, কন্টেন্ট্‌স এবং ভিশ্যুয়াল্‌স অনেকেরই ভালো লেগেছে।

https://youtu.be/BTYYt04xPS8