কবি অরুণ বসু। ষাট দশকের শুরু থেকে অদ্যাবধি নিজস্ব একটা ধ্রুবকে, মনোধর্মকে স্থির রেখে কবিতা লিখে গেছেন। তাঁর কবিতায় তিনটি চিহ্ন স্পষ্ট: ১) বিষয়গত আত্মবীক্ষণ ধর্মীতা, ২) কবিতার ভাস্কর্য রূপ, ৩) ছন্দ-শব্দের মিশ্রণে গড়া নিজস্ব ধরনের ভাষা। অরুণ বসু জৈব-ধর্মের কবি। কাম, মোহ ও বৈরাগ্যেরও কবি।
তাঁর ষড়ৈশ্বর্য পর্যায়ের কবিতাগুলি বাংলা কবিতার ক্ষেত্রে একটি অবদান। ছন্দের পরিমিতির সঙ্গে শব্দের আভিজাত্য ও ঔরস, ধ্যান ও মনন এক অননুকরণীয় ভঙ্গিমায় মিশে এক একটি স্থাপত্য নির্মাণ করেছে তাঁর কবিতায়।

 

বাঁশি

বাঁশি, তুমি সৌরবীজ—ক্ষার—অবয়বী
তোমার বিবাহ ছিল, ছিল প্রেম;
                                              — ছিল না পদবী?

১.
বাঁশি বেজে ওঠে— বাঁশি

এবং ধর্মাবতার এই-যে জিজ্ঞাসা অনবরত বাজিয়ে দেয় পণ্ডিতের
টিকি ও কুন্দফুল আমি তাকে বলেছিসনহযত হও যেহেতু তোমার
নিশান খুব একচ্ছত্র নয় যেহেতু তোমার সঙ্গীত ঠিক গীতিকবিতা
নয় যেহেতু তোমার ধর্মও ততখানি অপরাজেয় নয়—যতটা
অপরাজেয় হ’লে বাঁশি বেজে ওঠে, এবং…

২.
কিশোর, তোমার ভোর এখন ভৈরবী
এখন পলাশ আর পাঁচটি ইন্দ্রিয় সহ টীকা
ভুজঙ্গপ্রয়াতে শেষ সামুদ্রিক ছন্দোময় কবি
নিকষনিগ্রহে আনে চড়নদার এবং শিবিকা

৩.
এবং শিবিকা ওই আগুনের ঝরনার ভিতরে আজ
শাদাহাসি খেলা করে দেখো
তোমার ব্রহ্মশাপ হ’লো, আমি নিমিত্ত পোয়াচ্ছি—
কোথাও বেদান্তে তিন বৈবাহিক-সত্য নেই, প্রিয় কোনো ছবি…

৪.
প্রকীর্ণ হে পৌর্ণমাসী, জীর্ণ-বাঁশি, জীবাশ্ম, জাহ্নবী—
তোমার বিবাহ ছিল, ছিল প্রেম;
                                              — ছিল না পদবী!

[page]
মন্ত্রে জন্মমৃত্যু : ১

উকুর-চুকুর চিচিংফাঁক
                ওয়াং-চোয়াং ফুঃ,
কিংখাবে জড়ানো জন্ম
                কিংখাবে মৃত্যু।


কুকুর প্রদর্শনী

ম্যাণ্ডেভিলা গার্ডেন পেলেন প্রথম পুরষ্কার
দ্বিতীয় রীচি রোড
তৃতীয় সল্ট লেক্

প্রথম কুকুরকে দেওয়া হ’ল সোনার মেডেল
তার প্রভু মিসেস্ মিত্র
হাত জোর ক’রে সামনে এসে দাঁড়ালেন
বাঁ-পাশে তাঁর কুকুর
জিভ বের ক’রে অদ্ভুত-চোখে তাকিয়ে আছে
                                              দর্শক গ্যালারির দিকে

দ্বিতীয় শ্রীবিদেশ সরদেশাই
বাঁ-হাত তুলে অভিবাদন নিলেন
ওঁর কুকুর ডান-পা সামনের দিকে তুলে, একটু ঝুঁকে
                                              দেখে নিলো চারপাশ

তৃতীয় অবশ্যই সল্ট লেক্
মুখ নিচু ক’রে মিস্ সিন্ধিয়া, ঝাপসা চোখ,
                                              শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন দূরে
ওঁর পেল্লাই অ্যালসেশিয়ান ডগ্, বিস্ফারিত চোখ,
                                              চোখে অশ্রুর হেমন্তবহ্নি, এবং হঠাৎই
মিস্ সিন্ধিয়াও, কেন জানি, কুকুরের মতো ডুকরে ডুকরে
                                              কেঁদে উঠলেন
ঘেউ…ঘেউ…ঘেউ…
সমস্ত দর্শকবৃন্দ হতচকিত এবং মুহূর্তেই গোটা হল-ঘর জুড়ে
প্রত্যেকেই কুকুরের মতো কেঁদে উঠলো— বিশ্ববিদীর্ণ ক’রে—
কেবল শিশু এবং বৃদ্ধরা বাদে—
                                              হায়, এমনকি কবিরাও

[page]
সহজ পাঠ

গাছে গাছে পাখি ডাকে। পাখি ডাকে। পাখি ডাকে।
জলে তিমি গান গায়। গান গায়।
ডিম পাড়ে শাদা হাঁস। নীল হাঁস ডিম পাড়ে। ডিম পাড়ে।
নদী জল ছলছল। ছলছল নদী জল।
মাছ জলে খেলা করে। খেলা করে। খেলা করে।
নীল ফুল লাল ফুল। ওই খোঁপা ওড়ে চুল।
নদি বয় কুলকুল। কুলকুল।
মৌমাছি। পিপীলিকা।
পিপীলিকা। পিপীলিকা। দলবল ছাড়ি একা। ছাড়ি একা।
কোথা যাও, ব’লে যাও, ভাই।

গাছে গাছে পাখি ডাকে। পাখি ডাকে গাছে গাছে।
কারা যেন ছুটে গেল। ছুটে গেল।
ছুটে গেল রেলগাড়ি। ঘুঘুমারি। হাওয়াগাড়ি।
এক দুই তিন চার...
নাচে নট, নাচে নটী। নাচে নটী। নাচে নটী।
নাচে ঐ কুমারীর
নাচে বাঘশুমারির
ভয়-ভয় করোটি।
পাঁচ ছয় সাত আট...
লেনাদেনা বেচাকেনা। ঐ চেনা বসে হাট। বসে হাট।
বসে হাট নয় দশ। নয় দশ...
কারা যেন তাড়ি খায়। গান গায়।
গান গায়। তাড়ি খায়। খায় রস।

[page]
এপিটাফ/১

সরল পত্রবাহক, তোমার সংগ্রহ থেকে উঠে আসে লবণ গুলঞ্চফুল মাটির উঠোন
আর দিব্যরাগিণীতে বেজে ওঠে পিয়ানোর রক্তমাংস এবং হাড়ের,
কাঠের ও অতিকথনের কালো গর্ত, ছেঁড়া-ফাটা মেঘ ও ময়ূরী
আমি স্বপ্ননীলিমার নিচে খুব নরম রোদ্দুরে
দাঁড়িয়ে দেখছি দূরে তিনভাগ জলের ছবি, সমুদ্রশাসন


মূলাধার রহস্য

সেই সিংহমূর্তিযুক্ত আসনের নিচেই ছিল গণেশের বাহন। সে তৃণমূল থেকে
মুখে ক’রে তুলে নিয়ে এসেছে আগুন। ওই আগুন, রাজপুরুষদের গোপনতা
ডিঙিয়ে, সুন্দরী রমণীদের অর্ঘ্যমুকুলে জ্বেলে দিয়েছে সে। তারপর মানুষের
পায়ু ও লিঙ্গের মধ্যবর্তী স্থানে, গণিতের মতো গন্ডগ্রাম লুকিয়ে রেখে ঘুমিয়ে
পড়েছে, অরণ্যে, বর্ণপরিচয়ে।
আর, আর্দ্রজলবায়ু থেকে ঋগবেদ পর্যন্ত কালখন্ডকে যে ধ’রে রয়েছে, সে
আসলে তপঃক্লান্ত মেঢ্র-বিড়াল। তার কোনো নির্দিষ্ট উপাস্য বা দেবতা নেই।
তার কোনো সত্য-উপাসনা বা প্রকৃত বন্ধন বা বন্দ্যঘটি নেই। তার লোমশ,
বেমক্কা লেজে মাৎসান্যায়। ঝুলে রয়েছে অমীমাংসিত ঊষাকাল।
ওই মুষিক গ্রন্থকীট; বিড়াল মাংসাশী। আর, এই দুই বিপরীতমুখি টানা-
পোড়েনের মধ্যে দিন ক্রমশ ছোটো হ’য়ে আসে; ছায়া দীর্ঘ হয়, ছায়া দীর্ঘতর
হ’য়ে ছড়িয়ে পড়ে ছায়ার ভিতরে।

[page]
অস্তিত্ব ও অন্ধতা বিষয়ক মুগ্ধতা

সরলবর্গীয় বৃক্ষ, ধন্যবাদ তোমাদের।

মেথিফুল আর ঐ জায়ফল, আমলকী, বনছায়ে বেড়ে-ওঠা হলুদ-পাতাটি,
তোমাদেরও ধন্যবাদ। ওষধির পাশে যে ইঁদুর-সংসার, তাদেরও জানাই আমি
ধন্যবাদ।

সরোরূহ এ-পৃথিবী শুধুমাত্র মানুষের, শুধুমাত্র মানুষের নয়।

বাতাসে যে রমণীর আঁচলের পাতিহাঁস ওড়ে, আমি জানি, পরিশুদ্ধ ঐ আঁচল
আসমুদ্র, ব্যাপ্ত চরাচর। কে আর সে-ভাবে অমলতাস চেনে! জানা হ’লো,
বাঁদর-লাঠির ফুল ফুটে উঠলে, প্রজাপতি পাখনা মেলে ধরে।

ভূ-বিদ্যার পাশে ব’সে তবু কিন্তু নিসর্গকে চেনা হয় না। নিসর্গের নিজস্ব
যে-গন্ধ, তাকে বোধের ভিতর থেকে বোঝার জন্য চাই রাখালের বাঁশি।
বুনোফুলে সেজে থাকে যে-যুবতী, তার দুই ভুরুর মাঝখানে আছে টিপপোকার
রঙিন ঐশ্বর্য; নিসর্গ বোঝার জন্য তাকেও তো পেতে হবে কাছে; এবং
জানাতে হবে ধন্যবাদ।

‘অন্ধতা’ অদ্ভুত শব্দ; আমি তাকে নিসর্গের কাছে ডাকি; মুগ্ধ, ডেকে বলি :
এ-পৃথিবী কেমন লাগছে, তোর?

আমার অন্ধতা আমি একদিন পৃথিবীর কাছে রেখে চ’লে যাবো, ভয় হয়;
তা-ই অন্ধতাকে প্রণাম জানিয়ে বলি : মনে রেখো—

সরলবর্গীয় বৃক্ষ, মনে রেখো, ইঁদুর-সংসার আর ওষধি-মূলের পাশে একদিন
লীলালোধ্র আমিও ছিলাম। আমিও ছিলাম।

[page]
উপনিষদের গল্প

মেলায় একধরনের স্বপ্ন-মাদকতা থাকে ব’লে, মানুষ
ভালোবাসে খোলা আকাশ, নগ্ন প্রকৃতির পাশে নিঃশব্দ পরীর
সোনালি দুটি স্বপ্নময় ডানার অলীক-বাতাস...
আমাদের কৈশোর-পূর্ব পক্ষীরাজ ঘোড়া
সে ভেসে বেড়ায় ওই আকাশে, সূর্যালোকে, অনন্ত-ব্রহ্মান্ডে
তার আলো-পিচ্ছিল-শরীরে হেমন্তের নীল শিশির, যেন পদ্মপাতায় জল
যেন ছোটো-ছোটো সোনামুগডালের আশ্চর্য দানার মতো
বিন্দু বিন্দু ঘাম...
বৃদ্ধা হরিমতীর সেই যে দুঃখী কলাই-করা থালায়
                                              স্বর্গের প্রতিচ্ছবি—
তাতে মুগ্ধ প্রজাপতির পাখার বাতাসের মতো
                                              ভাতের আশ্চর্য, অলৌকিক গন্ধ
সিন্ধুতরঙ্গে আছড়ে পড়ে
                                              পুত্রশোক, ক্ষুধা ও থিরবিজুরি
স্বপ্নে, সেও নীলঘুড়ি হ’য়ে আকাশে উড়ছে, শূন্যে, নীলিমায়…
মেলায় একধরনের স্বপ্ন-মাদকতা থাকে ব’লে
বৃদ্ধা হরিমতীর উপনিষদের মতো আশ্চর্য সেই যে মিষ্টি, ছোট্ট নাতনি
মুখের বদলে মুখোশ নয়—
                                              একটি রাঙা-লাঠি কিনবে একটি পয়সা নাহি

[page]
চতুর্দশপদী প্রত্নগাথা

রয়েছে আমার হাতে জুঁই, ভাঁটফুল
রয়েছে সুন্দরীবৃক্ষ, শমী ও মাদার
কে তোমাকে ডেকে বলে : খোলো গো মা, দ্বার
দূরে বেজে ওঠে বাঁশি ব্যথায় ব্যাকুল

আর তার মধ্যে প্রত্ন-গগন ঠাকুর
আছে নকশী-কাথা-মাঠ কমলকুমার
কে খোঁজ রেখেছে দিব্য ভূমি ও ভূমার
পাথর-প্রতিমা নয় সে দেশ পাকুড়

পুরুষ-কলিজা তার নিথর পাথর
তাকে কী কমলালেবু দিতে চাও তুমি
প্রজন্ম বাজায় দূরে দূরত্ব, ঝুমঝুমি
বৃত্তের বাইরে বৃত্ত, যেমন-বা তোর

চোখের মণির চেয়ে সুন্দর পৃথিবী
বালিকার বুকে কবে পাখি এঁকে দিবি

[page]
তন্মাত্র-মনীষা

জেনেছি অজ্ঞান এই তন্মাত্র-মনীষা
জানি একে নিয়ে যাবে বালিকার তৃষা

ওষধি-পাথরে খুব স্তব্ধতার কাছে
যেখানে তামস-আত্মা ধ্যানে মিশে আছে

মৃদা ও মুহূর্তে মিশে, মহাশূন্যে, দূরে
একটি সুতোয় গাঁথা জানি সপ্তসুরে

অই আত্মা পৃথিবীর চিরন্তন-রূপ
শিশিরেও ঝরে তার ঐশ্বর্য, খধূপ

আমি তার প্রতি কিন্তু দয়াপরবশ
দেখেছি শিকড়-শুদ্ধু অনন্তের রস

যে পেয়েছে তার দুঃখ ত্রসরেণু, কণা
মানুষ ভুল করে, ভাবে এ-সবই ছলনা


কবিতাগুলি কবির ‘নির্বাচিত কবিতা’ বই থেকে নেওয়া হয়েছে। পুরনো বানান অপরিবর্তিত।