মাঝেমাঝে ভাবি, আমার জন্মরোগ বোধ হয় স্মৃতি ও শৈশব। মনে হয়, সুইজারল্যান্ডের সেই পাহাড়ি শ্রমিকদের ভিতর আমিও তো একজন ছিলাম, যারা প্রিয় পাহাড়ি আবাস-ভূমি ছেড়ে কাজকর্মের জন্য ফ্রান্স কিংবা ইতালির সমতল ভূমিতে চলে আসতো। ফেলে-আসা নিজেদের বাড়ির জন্য ওরা এতোই স্মৃতিকাতর হতো, গাইতো সেই গান – Kuhreihen, আত্মার হাহাকার। Johannes Hofer (১৬৬৯-১৭৫২) তার নাম দিয়েছিলেন mal du pays বা বাড়ির জন্য কাতরতা, ‘সুইস ইলনেস’। এমনও হতো, গান গাইতে গাইতে একদিন ওরা সুস্থতা হারাতো, প্রাণহীন হতো। সেই করুণ সংগীত, সেই শেকড়ের হাহাকার, সেই আত্মার রোদন কর্ম-প্রভূরা রোগের হেতু ভেবে ওদের জন্য নিষিদ্ধ করে দিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু আজও আমি রক্তে সেই গীত খলবল করতে দেখি, যেন Hofer কথিত মধ্যযুগের ‘সুইস ইলনেস’ নয় ‘নালিহুরী ইলনেস’ আমাকে বড়ো বেছইন করে রাখে। কৈশোরের কোনো এক বৃষ্টিভেজা দিনে সেই যে ছেড়ে এলাম নিজ সাং নালিহুরী, নগর-বন্দর করে করে আর তো ফেরা হলো না! এই যে এতো করে গেয়ে চলছি দিনের পর দিন স্মৃতি ও শৈশব, ফেলে-আসা গ্রাম, ভাষা ও ফেরার আকুতি – তাহলে কি সেই দলে আজও আমি মিশে আছি অজান্তেই? গেয়ে চলছি গান, সুরের জখম? কেউ তো আমার জন্য এই গীত নিষিদ্ধ করেনি, করছে না! গেয়ে গেয়ে আমি শুধু সুস্থতা হারাচ্ছি। আমার কি আর এসবের বাইরে গিয়ে কোনো কিছু রচনা করা সম্ভব? তাই-ই তো ভাবছি এই দূরবাসে, দূরের নগরে। লিখছি সব শৈশব-উন্মোচনের ব্যর্থ কবিতা – বন্ধুরা বড়ো মায়া করে বলে ডায়াস্পোরা-কবিতা।


গরমকাল

শীত যাচ্ছে, আর আমি শীতনিদ্রা থেকে জেগে উঠছি। ড্যাফোডিলের হলুদ প্রশ্বাসে টের পাচ্ছি দেহের গরম। গরমী বাতাসে ফুলে উঠছে ঘোড়ার কেশর, শরীরী আবেশ। এতো এতো ঘাসফুল মাটির আড়ালে ছিলো, বেরিয়েছে রোদ ফুঁড়ে নানা বর্ণ দেহের গড়ন। তাদের এ চলন-বলন, এ ফুটে ওঠার শরীরী ধরন ফুরফুরা করে দিচ্ছে শীত লাগা ঘুমন্ত শরীর। পাতাশূন্য ডালপালা হয়ে উঠছে টসটসে পোশাকী সবুজ। আর আমি ভুলে যাচ্ছি এতো দিন শীত ছিলো, এতো দিন জেগে ছিলাম ঘুমের ভিতর, নিদ্রাহীন বিগত বিছানায়।


জবাকুসুম

গেলো বৈশাখে তোমার উঠানে জবাকুসুমের রঙ বড়ো খুলেছিলো! বৃষ্টি দিতে না দিতেই এতো হলহলা হলো গাছ, এতোই কচুয়া হলো পাতাজ্জতুঁতফল রেখে আমি তোমার পাশেই শুধু দিনমান মজে থাকি, দিনমান চোখে মাখি রূপের ঝলক।

তোমাকেই আমি আজ জবা বলে ডাকি!