কবিতা নির্মাণ না সৃষ্টি?

এই মহাজগতের সবকিছুই কবিতা, বলা যাক উৎস কবিতা! সবকিছু, everything!আমি কবিতা লেখার কে ভাই? কবিতা সৃষ্ট হয়ে আছে আগে থেকেই, কবি এই হয়ে থাকা কবিতাকে টের পায়, সে কবিতাস্পৃষ্ট হয়, কবিতা ভাবনায় ঢুকে যায়, সে ভাবনাকে প্রকাশ করার আঙ্গিক নিয়ে ভাবতে শুরু করে, কেউ কেউ প্রচলিত আঙ্গিকেই প্রকাশ করে তার এই কাব্যিক অনুভূতি, কেউ কেউ অচেনা রাস্তায় পা বাড়ায়!কবিতার নির্মাণ শুরু হয়....


কবির আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক দায়বদ্ধতার কোন প্রয়োজন আছে?

না! দায়বদ্ধতা রাজনৈতিক কারণে একটা বিরাট জনগোষ্ঠীকে খুশি করলেও আমার মনে হয় বদ্ধতার কোন প্রয়োজন নেই! দায় আছে, মানবিক দায়! সব মানুষের যেমন, কবিরও সেরকমই!


কবি কি নিজেকে একজন সাংস্কৃতিক কর্মী ভাববেন?

ভাবলে ভালো হয়, তবে সাহেব ভজনার দেশে কর্মী হওয়া কবিদের পোষাবে কিনা জানিনা, আমি নিজেকে একজন কবিতা-কর্মী হিসেবেই মনে করি!


কবিতা এবং যৌনতা

পরস্পরের পরিপূরক যৌনতা এবং কবিতা, ইনিহিবেশন থাকলে যৌন-কবিতা এবং কবিতার যৌনতা গুলিয়ে যাবে!যৌনতা তো মানব্জীবনের সবচেয়ে সুন্দর, রোমাঞ্চকর অনুভূতির একটি, কবি সৌন্দর্যের পূজারী!নোংরামো করার ইচ্ছে থাকলে দারিদ্র নিয়েও নোংরামো করা যায়!কবি কিন্তু কবিতাই লেখেন, উদাহরণ দিলাম না!


যে কোন স্কুলিং কবিতার জন্য কতখানি পুষ্টিকর?

স্কুলিং তো জীবনের, কবিতা এর বাইরে নয়! সবজান্তা হয়ে কে জন্মায়, কবিও তার টের পাওয়া অনুভূতির স্কুলে প্রথম কবিতা-পাঠ নেয়!পরে তার কবিতাপ্রেম নিয়ে যায় কবিতার প্রকাশিত বইগুলির দিকে, প্রথমে বিখ্যাত তারপরে অখ্যাত কবিদের পড়ে সে অভিজ্ঞ হতে থাকে!কবিতার ইতিহাসে কবিতাগত আন্দোলনগুলির ভূমিকা কমবেশি আমরা সবাই জানি, এরকম অন্যপথসন্ধানি কবিতার আন্দোলন থেকেই মূলত কবিতার বিচিত্র সব ভাবনা উঠে এসেছে, আবার ব্যক্তিবিশেষের অবদানও কিন্তু কম নয়, এলিয়ট বা রবীন্দ্রনাথ তার প্রমাণ!কবিতা কিন্তু সাক্ষরতার আগেই মৌখিকভাবে রচিত হত!বেদ যেমন, তো এর স্কুলিং গড়ে উঠেছিল!আবার সবচেয়ে পুরনো কবিতা বলে কথিত, ” tale of the shipwrecked sailor”, উৎসাহিত করে মার্কেজকে “The Story of a Shipwrecked Sailor”লিখে ফেলতে, প্রথমটি ছিলো ৪৫০০ বছর আগে প্যাপিরাসে লেখা ইজিপ্সিয়ান গাথা যেখানে এক সবহারানো দুর্ঘটনাগ্রস্ত নাবিকের মনোবল ফেরাতে আরেক নাবিক এক অজানা দ্বীপে তার আটকে পড়া এবং সেখনে ঘটে যাওয়া নিজের রোমাঞ্চকর কাহিনিটি শোনায় আর সেই বিচিত্র কাহিনিই এই প্রাচীনতম কবিতার উপপাদ্য হয়ে ওঠে! মার্কেজ “The Story of a Shipwrecked Sailor”লেখেন সত্য ঘটনা অবলম্বনে, একটি দুর্ঘটনাগ্রস্ত জাহাজের একজন নাবিকের বিচ্ছিন্ন অবস্থায় ১০ দিন ভয়ঙ্কর সমুদ্রে ভেসে থাকার মর্মান্তিক রিপোরটিং এর মাধ্যমে এই উপন্যাসের শুরুয়াত হয়েছিল!লুই আলেজান্দ্রো ভেলাস্কো নামের সেই নাবিক মার্কেজকে এই কাহিনি লিখতে সাহায্য করেন!আমি এই উদাহরনটা দিলাম এ কারণে যে কবিতার স্কুলিং বা সে অর্থে সাহিত্যের স্কুলিং কোন বদ্ধ জলাশয় নয়, সেখানে ক্লাসরুমের নিয়মতান্ত্রিকতার কোন স্থান নেই!অতএব কবির প্রয়োজন থাকুক বা না থাকুক এই অভিজ্ঞতার স্কুলিং চলতেই থাকে! শিক্ষা পুষ্টিকর তো বটেই তবে সৃষ্টিকর্তাকে অধীত শিক্ষা অতিক্রম করে যেতে হয়!


স্বপন রায় on নতুন কবিতা, নতুন কবিতা on স্বপন রায়

নতুন কবিতার যে ভাবনা তার ষোলো আনাই বারীনদার দেন!আমি রাউরকেলা থেকে খড়গপুরে আসি ১৯৯১ সালে, তখন কবিতা ক্যাম্পাস প্রকাশিত হয়ে গেছে এবং যেহেতু আমি রাউরকেলা থেকে চলে এসেছি আমার বন্ধুরা চাইছিলো আমি ক্যাম্পাসে যোগ দেই, কারণ রাউরকেলায় না থাকায় “দ্রিদিম”আর বের করা যাচ্ছিল না!আমার সমস্যা ছিলো অন্য!আমি তখন ভাবছি কবিতাই আর লিখবো না!আমার স্কুলিং ছিলো জীবনানন্দ এবং শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের, “চে” আমায় সেই প্রভাবের মোহময় আবহাওয়া থেকে মুক্তি দিয়েছিলো কিছুটা!“চে” আমি প্রায় ৫ বছর ধরে লিখেছিলাম, ওইটুকু বই কিন্তু আমার মনে হয়েছিলো ডায়েরির ছোট্ট পরিসরে এমন কিছু লিখতে হবে যা কবিতা হয়ে উঠবে, কেবলমাত্র আমার হোম ওয়ার্কের দলিল হয়ে থাকবে না!কবিতায় পান্ডিত্য আমার বরাবরের না পসন্দ!আমি কতটা জানি এটা প্রমাণের জায়গা কবিতা নয়, কবিতা আমার বিস্ময়ের ধারক হয়ে থেকেছে বরাবর!

তো, “চে” আমায় যেমন ভরিয়ে দিয়েছিলো সে রকমই এক শূন্যতাও নিয়ে এসেছিলো আমার লেখালিখিতে! what next? আমি “চে”অতিক্রম করতে চাইছিলাম, পারছিলাম না! এ সময়েই আমি খড়্গপুর চলে আসি, আমার বন্ধুরা, ধীমান, প্রণব, অলোক, রঞ্জন আমায় ক্যম্পাসে যোগ দেওয়ার অনুরোধ জানাতে থাকে আর আমি ওদের এই বলে ফিরিয়ে দিতে থাকি যে আমি নতুন কিছু লিখতে পারছি না, আমায় ছেড়ে দে!

আমি তখনো বারীন ঘোষালের নাম শুনিনি! কৌরব আর কমল চক্রবর্তী, এতটা জানতাম!

শ্রীলা, ঋজু তখনো রাউরকেলায়!আমি একা থাকি, খাওয়া দাওয়া ব্যাঙ্কের মেসে!এই সময়ে সেই অত্যাশ্চর্য ঘটনাটি ঘটে যায়!আমি আবার “গীতাঞ্জলি”পড়তে শুরু করি।বারবার পড়তে থাকি!আর এক চেতনাগত অভ্যুত্থান ঘটতে থাকে আমার ভেতরে!বেশ কিছুদিন পরে আবার কবিতায় ভরে উঠতে থাকে আমার কবিতার ডায়েরি আর আমি বুঝতে পারি আমার কবিতা পাল্টে গেছে, আমি যা লিখছি তা আমি আগে লিখিনি, অন্য কেউও লেখেনি!আমি আবার ভরে গেলাম কবিতা লেখার আনন্দে! আমার লেখা কেউ পড়বে কিনা এ রকম ভাবনা আমার কখনোই ছিলো না, আমি নিজের জন্যই লিখি, লিখে আনন্দ পাই, সাহিত্যমূল্য ঠিক করার দায় তো মহাকালের!

এ ভাবেই লেখা হলো “ধূপশহর”; দীর্ঘ এই কবিতাটি প্রকাশিত হলো কবিতা ক্যাম্পাসের “দীর্ঘকবিতা” সংখ্যায়। আমিও যোগ দিলাম কবিতা ক্যাম্পাসে, ১৯৯২ এর শেষে! “ধূপশহর”নিয়ে বারীনদার প্রথম এবং বিশাল চিঠি আমার কাছে এলো, বারীনদা সেই লম্বা চিঠির শেষে লিখেছিলো, এই কবিতা, অতিচেতনার কবিতা!

কবিতা ক্যাম্পাসের ওয়ার্কশপগুলো এরপর খড়গপুরে আমার বাড়িতে আর জামশেদপুরে বারীনদার টেলকো’র পি/১৪/৩ এর ফ্ল্যাটে হতে লাগলো! প্রথম দিকে আমার এবং আমাদের সঙ্গে বারীনদার interactionsগুলো ছিলো বিরোধাভাসে ভরা! খুব তর্ক হতো।আমি, অলোক, ধীমান, রঞ্জন, প্রণব একদিকে, অন্যদিকে বারীনদা একা! অপরিসীম ধৈর্যে বারীন দা শুধু অতিচেতনা শুধু নয়, কবিতার সামগ্রিক অবস্থা নিয়ে আলোচনা করতে থাকতো! আমাদের আবার মারক্সীয় দর্শন নিয়ে fixation ছিলো! সে এক ধুন্ধুমার কান্ড!আমার তখন এক কামরার ছোট ভাড়া বাড়ি, সঙ্গে এক চিলতে ঢাকা বারান্দা! শ্রীলা ছোট্ট ঋজুকে নিয়ে আমাদের খাওয়া দাওয়া কি ভাবে সামলাতো কে জানে, কিন্তু সাম্লে দিতো! ওই পর্যায়ে বাংলা কবিতাসহ সারা পৃথিবীর কবিতা নিয়ে যে আলোচনা হতো, যে ভাবে হতো সেটা আর কোথাও হওয়া সম্ভব ছিলোনা!এমন মিথষ্ক্রিয়াই আমায় নতুন কবিতার নানা দিকগুলো সম্পর্কে সচেতন করে তোলে, “ধূপশহর”লিখেছিলাম এ সব না জেনেই আর জানার পরেও যে কবিতা লিখেছি তাতে নতুন কবিতার সব চিহ্ন ছিলোনা, আমি স্বভাবতই আকর্ষিত হয়েছিলাম কেন্দ্র ছেড়ে বেরোন চেতনপ্রবাহের এডভেঞ্চারের দিকে, এই তো আমার রাস্তা, বারীন দার কাছে আমি ঋণী রয়ে গেলাম সারাজীবনের জন্য!

তো এ সময়েই আমার জীবনে আসে হিমালয়, তার আগে জঙ্গলে ঘুরে বেড়াতাম!সিমলিপাল গিয়ে ম্যালিগনান্ট ম্যালেরিয়া হয়ে গেলো, মরতে মরতে বেঁচেছিলাম, হিমালয় এই শুন্যস্থানটা নিয়ে নিলো!পৃথিবী জুড়ে কবিতার যে বিগঠন চলছিলো in the name of post modernity, আমায় সেভাবে আকর্ষিত করেনি!কবির কাজ নিজের নতুন কবিতাটি লেখা, কবিতাকে ধ্বংস করা নয়!তাই বিগঠন নয় কিন্তু বিনির্মিত প্রতিকবিতায় আমি কবিতার অগ্রগমন দেখেছিলাম!তবে আমার লেখায় কবিতার শরীরের চেয়ে তার অনুভাবিত বিন্যাসের পটপরিবর্তনই আমি করতে চেয়েছি!নিষ্ক্রান্ত চেতনার অজানা অচেনা রোমাঞ্চটি হিমালয়ের ব্যাপ্তিতে প্রশ্রয় পেয়ে গেলো, আমিও দেখলাম যে, আমার অতিচেতনাসঞ্জাত অনুভবগুলিকে অনেক সময়েই প্রচলিত শব্দ এবং বিন্যাস দিয়ে ধরা যাচ্ছে না, আমি নতুন শব্দ এবং বিন্যাসের দিকে ঝুঁকে গেলাম!”লেনিন নগরী”, ”কুয়াশা কেবিন” বা “ডুরে কমনরুম” জুড়ে এই অনুভাবিত নতুন তরঙ্গময় শব্দের প্রয়োগ রয়েছে, এর সঙ্গে আমার বন্ধু কবি প্রণব পালের কয়েক বছর পরে করা “ভাষা বদলের কবিতা”র কিন্তু কোন আত্মিক বা প্রায়োগিক সম্পর্ক নেই!

টুলরোদ, চিঠিরূপ চিঠিকাল, ভোরাজ, পাখীদের একতিল রচনাবলী, মেঘলৌকিক, চেরি-ভরম, শিশির-চমকা, আলোমিতিক, টায়ারনীচু, ভোরণ, ধুম আর তাক করা, রু-হাঁস, হৈচুর, ঈশ বোনা কোন, জ্বরোতি, বাস্না, মাধবীমূলক দ্বন্দবাদ, নার্সতোয়া, জলোরা, জলোরিঝিম, নেভিরাতোড়-ব্যান্ড, আলোমিশ, কোল্ট মর্মর, পেয়ালাজনিত ঈশ, সোরোঁ, রবুঁজ, চাঁদ-ও-বলী, ধ্রুতিম, ঘোরা-তন্ময়-জীনা, চলোভা, রূপল, স্তনন...এ রকম অজস্র ধ্বনিসঞ্জাত কল্পশব্দকে ব্যবহার করে চিত্রকল্প থেকে বেরিয়ে গিয়েছিলাম, কারণ সুর-রিয়াল চিত্রকল্প আমায় ক্লান্ত করে তুলেছিলো!চেতনার বাইরে বেরোন অনুভবের সঙ্গে খাপ খেয়ে যাচ্ছিল ধ্বনিময় কল্পশব্দগুলি! ১৯৯২ থেকে ১৯৯৭ পর্যন্ত এই খেলার চিহ্ণগুলি রয়েছে, ”লেনিন নগরী”“কুয়াশা কেবিন” আর “ডুরে কমনরুম” এই তিনটি বইতে!এই নীরিক্ষাগুলি সফল না ব্যর্থ এনিয়ে আমার মাথা ব্যাথা নেই, আমি এই প্রক্রিয়ায় থেকে যে আনন্দ পেয়েছি সেটাই আমার জ্বালানী হিসেবে কাজ দিয়েছে এবং আমি “মেঘান্তারা”র জন্য ভাবতে শুরু করি এরপরেই!

কল্পশব্দ যেন যান্ত্রিক কিছু না হয়, এ নিয়ে আমি সচেতন ছিলাম!চমক সৃষ্টি করা আমার উদ্দেশ্য ছিলোনা!জোড়শব্দের ব্যবহারেও আমি মূর্ত বিমূর্ত মিলিয়ে দিতে চেয়েছি, কারণ জোড় শব্দের ব্যবহার নমস্য কবিরা আগে বহুবার করেছেন!নতুন শব্দ সৃষ্টির কাজ সবচেয়ে বেশি করেছেন রবীন্দ্রনাথ, আমার মনে হয় তিনিও অনুভবের প্রকৃত প্রকাশের জন্যই এমনটা করেছিলেন!কবিতা কিন্তু শুধু শব্দ নয়, বৃষ্টি যেমন শুধুমাত্র জল নয়!শব্দের মানে নেই বলেই আমি এর “রেফারেবিলিটি”নিয়ে খেলতে শুরু করি আর তার জন্য প্রয়োজন ছিলো এমন একটি ভাষার বিন্যাস যা আগে কখনো ছিলো না এবং যা আমার কবিতাকে ক্যারি করার ক্ষেত্রে সহায়ক হয়ে উঠবে!শব্দ কেন ধারণ করবে না ধ্বনির, সঙ্গীতের ব্যাপ্তিগুলো?আমি আজ পর্যন্ত এ কাজটিই করে এসেছি, চেষ্টা করেছি আমার একটি বইয়ের সঙ্গে আরেকটি বইয়ের প্রকাশ ভঙ্গিমায় যেন পার্থক্য থাকে, আমি “রিপিটেশন”কোন ক্ষেত্রেই পছন্দ করিনা!এর ফলে আমার বই বেরোতে সময় লাগে, আমি সময় নিই, এ আমার অসাহয়তাও বলা যায়!ফলত “ ডুরে কমনরুম” এর পরে বেরোন কবিতার বইগুলিতে আমার খোঁজ শুরু হয় “নেসেণ্ট” কবিতার, অতিচেতনার অভিঘাতে আমার স্পর্শক হয়ে ওঠে কবিতার“নেসেণ্ট” রূপটি, উৎস কবিতাটি!”মেঘান্তারা”, ”হ থেকে রিণ” এবং “দেশরাগ” এই খোঁজের দলিল এবং এখনো আমার খোঁজ চলছে.....”সিনেমা সিনেমা” সিরিজটি এই খোঁজেরই ফল, দেখা যাক!

[page]
“নতুন কবিতা” আমায় সম্ভবত এ ভাবে দেখবেঃ

১.কবিতাকে খুঁজতে বেরোন একটা লোক

২.নতুন কবিতাকে তত্ত্বের শিকল না পরাবার জন্য কবিতাকে লেখার চেষ্টা করা একজন মানুষ

৩.যে কবিতাকে জুয়ার টেবিলে ওঠায়নি, যার কোন স্টেক ছিলোনা কবিতা নিয়ে, কারন সে মূলতঃ একজন কবিতা খুঁজিয়ে!

৪.কবিতা নিয়ে অবসেশন একটু বাড়াবাড়ি পর্যায়ের আর যার কোন ইনহিবিশন নেই!

৫.যে কবিতাকে অভিভাত্রাই ভেবেছে, অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে যেমন শব্দের অর্থ নেই এই সিদ্ধান্তে এসেছে, কবিতার বিষয়কে হীন করার কথা একই শিক্ষা থেকে ভেবেছে সে রকমই অতিচেতনার অচেনা অন্ধকারে পা রেখেছে এই আশা নিয়ে যে এ যাবত অন্ধকারে থাকা কবিতাকণাগুলি আলোকিত হয়ে উঠবে....এবং বারীন ঘোষালের এই ভাবনাকে প্রায়োগিক দিক থেকে যে মৌলিক বলে মনে করেছে!

৬.যে বিশ্বাস করে নতুন কবিতা লিখবে তরুণ কবিরা...নতুনতর কবিতাও তারাই লিখবে


স্বপন রায় ও কৌরব connection:

কৌরব আমার মামাবাড়ির(টাটার) কাগজ!অথচ খড়গপুরে আসার আগে কৌরব আমার অচেনা ছিলো!বারীন দা মারফৎ আমি কৌরবের ঘনিষ্ঠ হই, আজো আছি!কৌরবের নীরিক্ষা সাহিত্য আমার কবিতাগত বোধের পরিধিকে বাড়িয়ে দিয়েছিলো অনেকটাই!বিশেষত স্বদেশ সেন!স্বদেশ দার কবিতা আমায় মুক্ত করেছিলো শক্তি, সুনীল, শঙ্খ ঘোষের আবহ থেকে!কৌরব প্রকাশিত কমলদার “মিথ্যে কথা”, বারীন দার”মায়াবী সিমূম”ডিসম্যান্টল করেছিলো আমায় আমার একাডেমিক কবিতাবোধ থেকে!কবিতা হয়ে উঠেছিলো এক অনন্দের কেন্দ্র, এর জন্যই বারে বারে জামশেদপুরে ছুটে যাওয়া!কমল দা, বারীন দা, শঙ্কর লাহিড়ি, যাদব দত্ত, দেবজ্যোতিদা, দোলন(মানস ঘোষাল) সহ আরো অনেকের সঙ্গে সেইসব অবিচ্ছিন্ন আড্ডা, আহা!শঙ্কর লাহিড়ির আশ্চর্য বইটি(মুখারজী কুসুম) কৌরব সূত্রেই তো পাওয়া!কৌরব আমার আনন্দের তীর্থ!যতদিন বাঁচবো মনে রাখবো!


কবিতা, না গদ্য, না কবিতা বিষয়ক গদ্য?

অবশ্যই কবিতা!


কবিতায় ডিপার্চার?

বিশ্বাস করি, নিজের কবিতার ক্ষেত্রে প্রয়োগ করার চেষ্টা করি, যখন অন্য কারো কবিতায় ডিপার্চার দেখি তার সঙ্গে যোগাযোগ করি, উৎসাহ দিই, ”নতুন কবিতা” পত্রিকার জন্মও তো এ কারণেই হয়েছিলো!নতুনকে নতুনতর করার তাগিদে!রঞ্জন আর আমার এই কমন তিতিক্ষা ছাড়া “নতুন-কবিতা” পত্রিকা হতো না!পরে ইন্দ্রনীল, অরূপ, সৌমিত্র, অভিজিৎ, ধীমান নিজের মত করে সাহায্য করেছে, ভালোবেসেছে পত্রিকাটিকে!


Do you consider yourself the last (neo) Romantic among the ‘other’ eighties? I do, Sir…

কে জানে! তবে আমি মনে করি যে রোমান্টিক নয় সে কবিতা লেখে কিন্তু কবিতাকে টের পায়না!আর এটাও বোধহয় ঠিক যে I do have an extra dose of romanticism within me… নইলে কবিতা নিয়ে ওই গদ্য লিখবো কেনো!পায়ে পায়ে যাবোই বা কেনো সেখানে, যেখানে রাস্তা শেষ আর কবিতা শুরু....কেনো দেখতে পাবো এক রেসিপিরেনাঁশার জন্য দায়ী তরুণীর নৃত্যময় আঙুলে আঁচের রেশ?


আবার প্রথম থেকে লিখতে শুরু করলে কী লিখবে, কী লিখবে না...

কবিতা কবিতা কবিতাই লিখবো...কি লিখবো না? প্যামফ্লেট মে বি...


স্বপন রায় on স্বপন রায়

আমার আমিকে গড়ে তুলেছে প্রাথমিকভাবে রাউরকেলা!সেই সাজানো গোছানো নির্জন পাহাড়ী শহর, যেখানে কোয়েল নামের একটি নদী ছিলো, শহর থেকে একটু বেরোলেই এ রকম সব জায়গাঃভালুলতা, পানপোষ, মৃগখোঁজ, ঝিরিপানি!
আর আমার দীর্ঘ সাইকেল জীবন, ভালোবাসা, সেক্টরে ভাগ হয়ে থাকা ওই সুন্দর শহরের যাবতীয় নির্জন ভাষা আমার সাইকেলের চেনে জড়িয়ে যেতো!আর বিপ্লব!পুলিশের খাতায় নাম ওঠা, আর সেইসব গানগুলো... আমরা, মানে আমি, সুকমল, রাণুদি এবং অরুণ দা মিলে বের করতে শুরু করি “দ্রিদিম”পত্রিকাটি... কি করে ভুলবো দ্রিদিমের জম জমাট আড্ডা... শ্রীলার সঙ্গে প্রেম... আর রাউরকেলা সিনে ক্লাবের সঙ্গে ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে পড়ার ফলে সারা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সিনেমাগুলোর সঙ্গে পরিচিত হওয়া... রাউরকেলাতেই নাটক নিয়ে মেতে থাকার সময়ে দীপক মজুমদার এলেন... এলেন মানে বোহেমিয়ান এই মানুষটির তখন কোথাও যাওয়ার ছিলোনা... দীপক দা আমার কমিটেড দার্শনিকতার ভিত কাঁপিয়ে দিলেন!এক অদ্ভুত মানুষ!আমেরিকা থেকে যুদ্ধবিরোধী আন্দোলন টান্দোলন করে দীপক দা হিচ-হাইক করে ইওরোপ ভ্রমণ করেন, এ সময়ে তাঁর সাথে দেখা হয় পোল্যান্ডের বিপথিক আন্ডারগ্রাউন্ড নাট্যকার গ্রেটাওস্কির সঙ্গে... দীপকদাকে গ্রেটাওস্কি theater of sources সম্পর্কে অবহিত করেন, দীপক দা বেকেটের waitig for the godotর বাংলা অনুবাদ “ভগার জন্য অপেক্ষা”লেখাটি শেষ করেছিলেন সে সময়ে, আমাদের দিয়ে করাবার কথা ভাবতেও শুরু করেছিলেন, যদিও অন্য দুটি নাটক আমরাকরে উঠতে পারলেও” ভগার জন্য অপেক্ষা”করা হয়ে ওঠেনি!তবে আমার অপরিসীম লাভ হয়েছিলো, দীপক দা তুহিনাভর ওখানে থাকলেও আমরা মাঝরাত অব্দি টোটো করতাম, আজো ভুলিনি দীপকদা গলা ছেড়ে গাইছেঃ”আমি কান পেতে রই... ”আমার অনেক স্থিতিস্থপকতা ভেঙে দিয়েছিলেন এই মানুষটি... আমি তো এক অবঙ্গজ, আর আমার বেড়ে ওঠাও যাচ্ছেতাইভাবে অসংস্কৃত...আমার জীবনে খড়্গপুর আছে... হস্টেলের জীবনযাপন... এডভেঞ্চার... রয়েছে ডুয়ারস, জল্পাইগুড়ি আর সিকিম, দারজিলিং বা হিমালয়... এ সবই কোথাও না কোথাও কবিতাকে জুড়ে দিয়েছে আমার সঙ্গে!

আমার লেখা গদ্য পড়ে আমার অনুজপ্রতিম বেশ কিছু কবি হিমালয়ের ভক্ত হয়ে গেছে এটা আমায় শান্তি দেয়, আনন্দ দেয়! আমার কবিতা নিয়ে আগেই বলেছি আমার কোন স্টেক নেই... চেষ্টা করেছি এমনভাবে লিখতে যা আগে কখনো লেখা হয়নি... এই লেখাগুলো কবিতা হয়েছে কিনা সেতো পাঠক বলবে, মহাকাল বলবে... তখন আমি কোথায়?তার চেয়ে লেখার আনন্দটাই জরুরী আমার কাছে... আর আমি কিন্তু এ রকমই প্রায়ঃ

“দেদার ফুটলো মরশুম
রেকাবীতে স্বপ্নকোলনে রাখা টুং টাং ক্রিয়ামধুর ত্রবলীরা
আমি হয়তো বসে আছি সেরা চোখের ঢাবায় হয়তো ভাবনামিশুক মেঘে মেঘে
বয়েস বাড়েনি...”