কনকনে ভোরবেলা দেখতে জানলার শিক ধরে বাইরে উঁকিঝুঁকি। শিক ধরে নড়বড়ে ফোকাস, কখনো গাছের পাতা, কখনো ভাঙা বাড়ি অথবা ফ্যাকাসে নখের ওপর ছোট ছোট কালো লেন্স, পুরনো অভ্যেস। যদিও কনকনে তাপমাত্রা জানলার শিক এর বদলে গনগনে শিক কাবাব ধরিয়ে দিতেই পারতো হাতে। এক লাফে তারপর মুখে গিয়ে চলত স্কুবা ডাইভিং, অন্তিমক্রিয়া সারত পাকস্থলীতে। ওদের আত্মার শান্তি কামনাও করতো না কেউ। অথচ এই অস্তিত্বহীন শিক কাবাব এখন মাথার মধ্যে ঘোরাঘুরি করে পালিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছে। ছোট ঘড়ি ওদের অসময়ে আগমনকে ইল্লীগাল বলে দাবি করেছে। অতএব পরে কোন এক সময়ে অ্যাপইনমেনট নিয়ে আসতে হবে। আপাতত বিরক্তিকর মুখ নিয়ে সুদূরে যেতে হবে শিক্ষিত হতে। আইন বেআইনের পাঠ ঘোচাতে এখনো বছরখানেক দেরি যে। এ পাঠ সম্পূর্ণ না করলে এইরূপ অলীক বস্তুদিগের অসময়ে আগমনকেই আমি আবার লিগাল বলে বসবো। সুতরাং কাঁধে ব্যাগ আর বুকে টিলা নিয়ে চললাম বাস স্ট্যান্ডে।
আহ! বেশ শীত পড়েছে। ভাস্করবাবুকে ডেকে এনে সকালটা দেখাতে ইচ্ছে করছে। ভাবলাম, এই সামান্য কাজটাও ঐ মেয়েটি পারে নি? এ তো আমিও পারি। তারপর মনে পড়লো এক সহপাঠীর কথা। ঐ একই নাম। তাকে যদি একবার কেউ শীতকালের আগমন সময় জানতে চাইত সেও নিশ্চিত ব্যাঙ্গ করে হাসতো।
শীত এর ভোরটায় আমার কুম্ভকর্ণকে খুব হিংসে হয়। অবশ্য কুম্ভকর্ণ আমার মতো শীতের ভোরে বাসে বসে বসেই বা কি করবে, ভাবতে শুরু করলে খুব ঠাণ্ডা হাওয়া গায়ে লাগতে থাকে। এ সময়ে “শীতের সকাল” রচনা দিলে আমি ২০ তে ১৬ ১৭ পেয়ে যেতে পারতাম। একটানা চার পাঁচ বছর রচনায় এই নাম টা দেখলে “অথবা” গুলো আর দেখতে চাইতাম না। “আমার অন্যতম প্রিয় ঋতু ... “ দিয়ে শুরু করে দিতাম। তবে বেশিদূর আমি আর শীতকাল একসাথে থাকতে পারতাম না, কারণ কড়াইশুঁটি আর কমলালেবু আমাকে দিয়ে জোর করে ওদের কথা লিখিয়ে নিতো। এমনকি টকা কমলালেবু খেলে আমার মুখটা কেমন বেঁকে চূড়ে যেতো সেকথাও লিখি নি কখনো, পাছে নম্বর কম পাই। বলেছিলাম, মা কে। মা বলেছিল “ভালো-মন্দ মিলেই তো থাকা”।
মা এর কথায় সবে মাত্র দর্শন খুঁজতে বসেছি, তক্ষুনি কমলা জামা পরা এক মেয়ে এসে বসলো পাশে। অবাঙ্গালি দেখে বুঝলাম। অবাঙ্গালি মেয়েদের আমি দেখেই যেভাবে বুঝি তা হোল পাতলা ঠোঁট এবং মাথায় অজস্র ক্লিপ আঁটা। এই মেয়েটি আবার কমলা জামার সাথে মানানসই চেরি ক্লিপ এঁটেছে মাথায়। আমার মনে হোল কোথাও যদি কমলালেবু ক্লিপ পেতাম মেয়েটাকে গিফট করতাম একজোড়া। তবে কড়াইশুঁটি ক্লিপ কোথাও পাবো না বলেই আমার বিশ্বাস।
এসব ভাবতে ভাবতে বড় সড় একটা হাই তুলতেই দেখি মেয়েটা আড়চোখে একবার তাকিয়েই চোখ সরিয়ে নিল আমার থেকে। বুঝলাম, অভদ্রের মতো হাই তোলা হয়ে গেছে হয়তো। অথবা আমার লাল-নিল সোয়েটার দেখে অভক্তিভরে চোখ সরিয়ে নিলো। বাড়ি থেকে বেরোনোর আগে এই সোয়েটারে আমাকে দেখে বাবা বলেছিলো“ওরাংওটাং” লাগছে।“ওরাংওটাং-কে সোয়েটার পড়লে কেমন লাগবে আমি জানি না, বাবা জানবে হয়তো। আমার ভয় হোল, এখুনি যদি ওরাংওটাং এসে সোয়েটার টা চায় আমার থেকে! বলে আমাদের জিনিস, ফেরত দাও! আমি তাহলেও দেবো না। বলবো, কমলালেবু খাও। এখন টকাও হবে না।
আমার এক বন্ধু একটি মেয়ের সাথে কমলালেবুর কোয়া খেতে খেতে অ্যকোয়াটিকা যেতে চেয়েছিল। এখন নিশ্চয় অ্যকোয়াটিকা যেতে চাইবে না এই শীতে। ও হয়তো বলবে, “ভাদ্রমাস কবে আসবে কমলা”।
শিক কাবাব থেকে কমলালেবুর অধঃপতন ঘটলেও বাসটি কিন্তু পুরদমে পার করছে একের পর এক সিগন্যাল। 9A বাসের ড্রাইভারদের বছরে একবার অন্তত এর জন্যে পুরস্কার টুরস্কার দেওয়া যেতেই পারে। ভেতর থেকে বাইরে দুপাশে গাছ দেখার চেষ্টা না করে মোটামুটি সবাই ঐ ড্রাইভারকেই দেখছে। উনি-ই একমাত্র স্থিতিশীল সেসময়ে। বেশ কিছু দাঁড়িয়ে বসে মূর্তি দেখলাম বিভিন্ন রাস্তায়, যাদের অচেনা মনে হোল। দুধার রাস্তায় রনবির কাপুর উঁচু মগডালে বসে কখনো হাসছে, কখনো কাঁধ নাচিয়ে কিছু বলার চেষ্টা করছে হাতে মোবাইল নিয়ে । রনবির কাপুরেরা যেমন ছুটে ছুটে যাচ্ছে তেমনি সিগন্যাল এ থমকে যেতে হচ্ছে সুন্দরীদের গা ভর্তি গয়না পরে দাঁড়িয়ে থাকা দেখে। বড় অদ্ভুত কয়েকটা পোস্টার হোল সেইগুলো যেখানে বড় একটা সাদা হোর্ডিং জুড়ে শুধুমাত্র ২টো ফোন নম্বর লেখা থাকে। ওগুলোতে যোগাযোগ করলে কি হতে পারে, আমার আন্দাজ নেই।
কিছু কচি কাঁচা উঠেছে বাসে। মোটা একটা বাচ্চা আমাকে দেখে খুব লজ্জা পেলে ওর গালগুলো আপেল হয়ে গেলো। অথচ ঘটনাটা কেন ঘটলো ঠিক বুঝে উঠতে পারলাম না। দুটো বাচ্চা হাঁ করে ঘুমচ্ছে, সেই দেখে আরও দুটো বাচ্চা তাদের মায়ের দিকে চট করে তাকিয়েই মুখ নামিয়ে নিলো অভাগার মতো। আমিও ঘুমন্ত বাচ্চা দুটোকে হিংসে করে নিলাম একটু।
ধর্মতলা পেড়িয়ে গেলো। দূর থেকে দেখা যাচ্ছে বড় ঘড়ি আর কে.সি.দাস। পার্কস্ট্রীট ব্রিজের তলায় আলো-আঁধারে সুগন্ধির বোতল হাতে প্রেম করছে পোস্টারের নায়ক নায়িকারা। এদিকে উত্তরের মতো রাস্তার থামে বেঁকে চূড়ে সেঁটে থাকে না বাংলা সিনেমার পোস্টার। ঐ সুগন্ধির বোতল গুলো একটু এগিয়ে যদুবাবুর বাজারের দিকটায় দিলে ভালো হয়, ওদিকটায় বড্ড মাছের গন্ধ। তবে সেখানে রাস্তায় সমান সংখ্যায় দেখেছি ট্যাক্সি আর ডাব সাজানো থাকতে দেখেছি। কাঁচের বাইরে দুজন চুড়িদার ও স্নিকারস পরা কাকিমা আমার দিকে তাকিয়ে কিছু জিজ্ঞেস করছিলেন। হয়তো বাস এর নম্বর জানছিলেন। আমি তখন জুতোজোড়া দেখছিলাম। কাকিমারা আর বাস এ উঠলেন না। এলিয়ট পার্ক এর সামনে কয়েক কিলোমিটার শুধু ছোট ছোট গাড়ি দাঁড়িয়ে থাকে। বড় গাড়ি কমই দেখি। ভেতরে মালিক বা মালকিন যতক্ষণ শরীরচর্চা করেন ততক্ষণ এরা মুখোমুখি দাঁড়িয়ে গল্প করে নেয় ।
অবশেষে রাসবিহারী মোড় এলো। একটা মৃত লোকের আস্ত নাম ধরে চেঁচামিচি করছে কনডাকটার। নেমে আর একটা বাসে উঠে বসেছি। সিগন্যাল ছাড়বে কয়েক সেকেন্ডেই। স্পষ্ট, ভাঁজহীন গলায় শ্যামাসংগীত কানে এল। আশেপাশে তাকিয়ে গায়ক আবিস্কার করতে পারলাম না। বলে রাখা ভালো, আমায় রবীন্দ্রসঙ্গীত এর চেয়ে শ্যামাসংগীত বেশি-ই আকৃষ্ট করে। এতো মধুর গলা অথচ ভোরবেলা ফাঁকা রাস্তায় সাহসীর মতো গান গায় কে! বাস ছেড়ে দিলো। হতাশ হয়ে গান টাই উপভোগ করতে লাগলাম। কিছুটা এগোতেই বাঁ পাশের জানলা দিয়ে এতক্ষনের থামে আটকে থাকা দৃশ্যটা এগোতে লাগলো। খয়েরি টি-শার্ট, কালো প্যান্ট পরা লোকটা কাপ দিয়ে দুধ তুলে ঘন করছ। গ্যাসএর ওপর দুধ উথলচ্ছে না একটুও, উত্তেজনা উপচে পড়ছে আমার। পাশে চিনির কৌটোয় তলানি ছিলো পড়ে, অথচ চা ওয়ালার গলায় চিনি ছিল অনেক।