A work of art may be understood as a conductor from the artist’s mind to the viewer’s. But it may never reach the viewer, or it may never leave the artist’s mind.
(Sol Lewitt: Sentences on Conceptual Art, May 1969)

কিছু কিছু রাগ আছে যা সাধারণত তারসপ্তকে বেশি বাজে। যেমন সোহিনী। কিন্তু অনির্বাণ চট্টোপাধ্যায় সেই বিরল প্রজাতির কবি যিনি চেঁচিয়ে কথা বলেন না। মারোয়া রাগের মতো ওর কবিতায় মীড়ের কাজ প্রায় নেই বললেই চলে। ওর কবিতা মন্দ্র ও মধ্য সপ্তকে বাজে। কিন্তু যখন কোমল স্বরটা লাগায়, আহা এত যত্নে, যেন ‘রোদ এসে টোকা মেরে বলে, ওঠো/ তোমার যে সন্তান হল…’ [আবার লোডশেডিং ২০, অপরাধ (ঙ) ]।
সংস্কৃত সাহিত্যে ‘সিদ্ধরস’ বলে একটা কথা আছে। এলিয়ট-এর ভাষায় ‘objective correlative’। যার অর্থ বহিরাশ্রয়ী সংশ্লেষণ। যেমন আমরা ‘যমুনা’ বলতেই বুঝি গভীর ও শাশ্বত প্রেমের কথা। যেখানে object-এর কথা বললেই আবেগটি ধরা দিয়ে যায়। আবেগকে এইভাবেই কবি অনির্বাণ চট্টোপাধ্যায় তাঁর প্রথম কবিতার বইতে শিল্পে রূপান্তরিত করেছেন। ‘লোডশেডিং’— এই কবিতার বইটি একাধিকবার পাঠান্তে ‘হাতি’ শব্দটি আমার কাছে এইরকম হয়ে উঠেছে। হ্যাঁ, হাতি। একটি বন্য ও মায়াবী হাতি। তার শ্লথ, দোদুল্যমান, আভিজাত্য ও ঐতিহ্যের সাথে মৃদুমন্দ চলা, বাতাসে ও মাটিতে তার ঘ্রাণ ও শব্দ, একটি মাংসল ও শরীরী উপস্থিতি বর্ণনা করে— যার নাম লোডশেডিং। ঐতিহ্য এই কবিতার বইয়ের অন্যতম প্রাপ্তি। ঐতিহ্য অর্থে আমি ঐতিহাসিক চেতনার উপলব্ধির কথা বলছি। আবার এলিয়টে ফিরে যাব— ‘… the historical sense involves a perception, not only of the pastness of the past, but of its presence; ...This historical sense, which is a sense of the timeless as well as of the temporal and of the timeless and of the temporal together, is what makes a writer traditional.’ (Eliot, Selected Essays, p.14). শব্দকে অনর্থ করে দেননি এই কবি। প্রকৃত কবির ভেতরে সমসময়ের চিহ্ন ও আবেদনের সাথে সাথে আদি হতে অধুনা সব কবিই থাকেন। কবি তাঁর এই নিজস্ব মানস ও এই ঐতিহাসিক চেতনার ঘাত-সংঘাতে যে চেতনালাভ করেন, সেই প্রজ্ঞায় তিনি বর্তমান ও অতীত, অতীন্দ্রিয় অনুভূতি ও প্রত্যক্ষ জগতের মধ্যে ঐক্যসূত্র স্থাপন করেন। imagination— কবি অনির্বাণ চট্টোপাধ্যায়ের অন্যতম শক্তি। বাস্তবজগতকে তিনি কাছছাড়া করেননি, কিন্তু কল্পনা শক্তির দুর্দান্ত প্রয়োগে দৃশ্যমান জগতের রূপ ও অরূপের মধ্যে তিনি বিস্ময়জনক সঙ্কেত ও ইন্দ্রিয়াতীত জগতের সাযুজ্য খুঁজে নিতে পেরেছেন। যার ফলে, এই কবিতার বইতে শুধুমাত্র নতুন দৃশ্য নেই, নতুন দৃষ্টিও আছে। ‘লোডশেডিং’-এর শব্দবিন্যাস সংযত। সংকেতগুলি উজ্জ্বল। চিত্রকল্পের emotional sequence-গুলিও লক্ষ্যণীয়। আবেগ, কল্পনা ও বুদ্ধির এমন সংমিশ্রণ সচরাচর দেখা যায় না। আর আছে নাট্যরস। যা ইদানীংকার কবিতায় প্রকৃত অর্থেই বিরল। নিজের মতো করে symbol ব্যবহার করেও অনির্বাণ প্রতীকের দুনিয়া ও দৃশ্য-দুনিয়ার ভেতর সেতু নির্মাণ করতে সক্ষম হয়েছেন। আশ্চর্যজনক ভাবে তাঁর কবিতায় আসেন বঙ্কিমচন্দ্র, কুমুদরঞ্জন মল্লিক, বিভূতিভূষণ, গুলজার, গালিলিও কিম্বা নীল আর্মস্ট্রং। এত জ্যান্ত অনুভূতি ও তার সাথে ধীশক্তির মিশেল, জায়গায় জায়গায় এত নিখুঁত হস্তাবলেপ ও পরিমিতি বোধ আর ঐ হাতির মতো গম্ভীর আর বিলম্বিত গতি নিয়ে internal passion-এর এই কবিতাগুলো আহা রসে রসে টইটুম্বুর করছে। ‘কাব্যের মুক্তি’তে সেই কবে সুধীন্দ্রনাথ দত্ত বলছেন : ‘কাব্যের মুক্তি পরিগ্রহণে ; এবং কবি যদি মহাকালের প্রসাদ চায়, ... তবে ভুক্তাবশিষ্টের সন্ধানে ভিক্ষাপাত্র হাতে নগরপরিক্রমা ভিন্ন তার গত্যন্তর নেই। কারণ কাব্যের পথে উল্লঙ্ঘন চলে না; সেখানকার প্রত্যেকটি খাত পদব্রজে তরণীয়, প্রত্যেকটি ধূলিকণা শিরোধার্য…।’ অনির্বাণ চট্টোপাধ্যায়ের ‘লোডশেডিং’ পড়লে বোঝা যায় ইতিহাস তাঁকে কিভাবে চেতনা দিয়েছে। ইতিহাসের শিকড় থেকে তিনি কিভাবে স্বীকরণ করেছেন তাঁর কবিতা বোধ।
‘সারি সারি ঢেউ মেখে দাঁড়িয়েছে ছুটি
যেন তুমি কাশ্মীর। গাড়ির ভিতর থেকে
কার্ফু দেখা যায়, ছাদ নয় ঘোমটার
নিচে যে বাড়ি, বসার জায়গা
যেন অপরাধ বসে আছে, ঠেস, সামনে চায়ের কাপ।’
[আবার লোডশেডিং ২০, অপরাধ (ছ) ]

সময়ের দাগ এইভাবে ওর লেখায় অজস্র, যুগের আঁচিল ওর গালে। আর, ‘যেন অপরাধ বসে আছে, ঠেস, সামনে চায়ের কাপ।’ – এই সৃষ্টি কিন্তু খামখেয়ালি নয়। এ যথেষ্ট সাধনার ফল। ছন্দ ওর লেখায় মাত্রা-অক্ষর-পর্বের ওপরে দাঁড়িয়ে নেই। প্রচণ্ড ভাবে কানের স্বীকার করে নেওয়ার ওপর দাঁড়িয়ে অনির্বাণ শব্দগুলোকে রাখেন। আর সেগুলো যেন কান-চোখ-নাক-শরীর-মন সবকিছুর কাছে আবেদন হয়ে ওঠে। তাই, নিঃসন্দেহে কবিতাগুলি দৃশ্য, শ্রাব্য, পাঠ্য এবং চিন্তনীয়। অর্থাৎ একাধিক ইন্দ্রিয় সম্পন্ন। লোডশেডিং-এর কবিতাগুলোয় যে আলো রয়েছে তা’ অনির্বাণের নিজের অভিজ্ঞতায় রঙিন। ওর কবিতা পড়ার পরে একটা গুনগুন গুঞ্জন চলতে থাকে মনের ভেতরে। আর সেটাই ওর ছবিগুলোকে জুড়ে দেয়। এইভাবে সবটুকুকে নিয়ে ওর লেখা একটা total effect তৈরি করে। এই সামগ্রিক আবেদন সৃষ্টি করাই ওর কবিতার লক্ষ্য। আর বিভিন্ন ইন্দ্রিয়ানুভূতির মিশ্রণে যে মিঠেকড়া মণ্ডটি ও প্রস্তুত করে, সেই অনুভূতিগুলি একে অপরে স্থান বদল ক’রে এক অন্য ও অনন্য গভীর ইন্দ্রিয়স্বাদ এনে দেয় ওর কবিতায়। ওর কবিতার পটভূমি ওর লৌকিক যাপন। আর ওর এই নিবিড় ইন্দ্রিয়ঘনতার ফলে ওর সেই ইন্দ্রিয় ও মানস-জগৎকে সবরকম dimension-এ আরো শরীরীভাবে উপলব্ধি করা যায়।
‘একটি গন্ধের নাম মেজো মা
একটি মেজো মার নাম কমলা
পায়রা ওড়ার শব্দের মতো হঠাৎ
বোথাম সিক্সার হাঁকিয়ে দিল আর
পুরনো শেভিং ক্রীমের মতো পরতে পরতে
মেজো মা পরছে থান অথবা
ময়েশ্চারাইজার। কটকি কালো ইঞ্চিপাড়।’
[আবার লোডশেডিং ২১]

‘লোডশেডিং’-এ অনির্বাণের capacity for inventive thought দেখে অবাক হতে হয়। এরকম উইটেরও বহুদিন দেখা নেই বাংলা কবিতায়। অনির্বাণের কবিতা ছোটে না, নাচে না, লাফায় না। ওর কবিতা হাঁটে। বসে। থামে। এবং দাঁড়ায়। চলে। আর কি অদ্ভুত সহজে চলে। ওর কবিতায় স্ফূর্তি নেই। বিত্ত আছে। ঝংকার নেই। সুর আছে। ওর ভাবনার ধনুকে শব্দের জ্যা টানটান বদ্ধ। এত লিরিকের চোরা স্রোত, অভিনব উপমা অলংকার, এত রকমের রূপক, এক একটা শব্দের এমন কি দাঁড়ির এরকম সচেতন প্রয়োগ, আর শব্দের বানানে-উচ্চারণে-প্রয়� ��গে খাঁজে খাঁজে নিজের আঞ্চলিক ঐতিহ্য গুঁজে দেওয়া আর তার এত অর্থ-পাপড়ি, যে, কবিতাগুলো পড়ার সময় জিভে-চোয়ালে-টাগড়ায় একটা কুলুকুলু আওয়াজ পাওয়া যায়। একেবারে গদ্যের শব্দকেও অনির্বাণ কী অনায়াসে এবং সাবলীল ভাবে কবিতায় রাখেন। যেমন এই লাইনটা দেখুন—
‘সাদা কালো সিনেমার ন্যায় ওয়াইপ বুলিয়ে দিই’
একটা still centre-এ আগাগোড়া বাঁধা লোডশেডিং। অথচ একই সাথে কী নিরাসক্ত, সন্ন্যাসী আর একই সাথে সাংসারিক, ঘরোয়া। এবং আটপৌরে। আর স্মৃতি। স্মৃতি এই কবিতার বইয়ের একটা বিরাট এবং আশ্চর্য অংশ। রিলকে বলতেন, স্মৃতির মধ্যে জারিত হলে phenomena বা ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বস্তু, জড়জগৎ একটি নতুন সত্তা লাভ করে। অনির্বাণ যেন ওর দেখাকে ডুবিয়ে রাখেন দীর্ঘদিন, তার পর সেখান থেকে তুলে আনেন সেই স্মৃতি, যখন তার থেকে ক্রিয়া-বিক্রিয়ায় মাদকরস তৈরি হয়েছে। আর তখনই তো ‘যে কোন দুপুরে জেঠিমাদের বালা বলে ডেকে ফেলা যায়’ (লোডশেডিং-৭), তখনই তো ‘স্তনে চুমুক দেবার পর সমস্ত পান পাত্র-ই ফ্যালনা/ মনে হয়।’ (লোডশেডিং-৭) । সমসাময়িক এক কবি এই কবিতায় ‘বালা’ বলতে হাতের বালা বুঝেছেন! বালা কিন্তু বালিকার (১৬ বছর পর্যন্ত বয়সের মেয়ে) আরেক প্রতিশব্দ।
লোডশেডিং-এর প্রথম ১০-১২টি কবিতা সম্পর্কে বলা যায় focused more on the initial concept rather than the final product of the poem. ছ’বছর ধরে লেখা ওর এই কবিতাগুলো পড়লে বোঝা যায়, প্রতিটি লেখার পেছনে ওর একটি (একটিমাত্র নয় কিন্তু) ভাবনা (idea) কাজ করে। যা ওর concept-কে সাধারণত implement ক’রে থাকে। এত সূক্ষ্ম অথচ তীব্র ভাবে জ্যান্ত কিন্তু নিবিড় কবিতা ছড়িয়ে আছে এ’বইয়ের পাতায় পাতায়, লাইনে লাইনে। শব্দে শব্দে কিম্বা দাঁড়িতে দাঁড়িতে বললেও মোটেই বেশি বলা হয় না। আর ওর উপমায় এত concreteness, এত অবয়বতা, যা ওর কবিতাকে রক্ত-মাংসের লেখা করে তুলেছে। passion আর logic-এর ব্যালান্স, সংহত রূপায়ণ আর লিরিক ধর্মীতা কবিতাকে যে কোথায় নিয়ে যেতে পারে তার প্রায় অবিশ্বাস্য মুন্সিয়ানা দেখা যায় এ’বইতে। ওমে-গন্ধে-ভাপে পাওয়া যায় মানুষ অনির্বাণকে। এত টাটকা এই জীবন যেখানে লোডশেডিং হলেই জানা যায় ‘অপরাধ আর কিছু নয় মানুষের লেখা অন্য মানুষ মাত্র’ [আবার লোডশেডিং ২০, অপরাধ (ঝ) ]।

আগ্রহী পাঠকের জন্যে নিচের এই তথ্যগুলি দেওয়া হল—
লোডশেডিং- অনির্বাণ চট্টোপাধ্যায়, প্রকাশ- কলকাতা বইমেলা ২০১৩, একটি বৈখরী ভাষ্য নিবেদন, ৫০ টাকা
বইটি সংগ্রহ করতে চাইলে যোগাযোগ করতে পারেন এই দুটি নম্বরে : +919433544817, +919903566136