কালভার্টের ওপর দিয়ে কি যেন ছুটে যায়। হানিফ উঠে পড়তে চায় সাত তাড়াতাড়ি। পারে না। এ শরীর যেন তার নয়। অন্য কারো। অন্য কারো শরীরের ভেতর বুঝি ঢুকে পড়েছে সে। সে যেন মানুষ নয়, প্রেত। চারপাশ যেন ভূতগ্রস্ত। মানুষ নেই। প্রেতেদের খলবল শুধু।
উঠতে পারে না। কিন্তু কান খাড়া করে রাখে কিছু পরিচিত শব্দ শুনবে বলে। প্রচন্ড আওয়াজ করে দরজা খুলে নেমে আসবে তারা। ভারি বুটের মসমস আর ধাতব ধ্বনি শোনা যাবে। হানিফেরা আবার ফিরে পাবে হানিফদের।
সময় চলে যায়। বাইরে প্রেতের হা-হা দাপিয়ে বেড়ায়। অন্ধকার ঝলসে ওঠে হঠাৎ। বুকের ভেতর তোলপাড় তোলপাড়। কার কার ঘর আগুন লাগাল ইবিলিশের বাচ্চারা? তার নিজেরই কি?
মনে হতেই যেন হাতির বল শরীরে। দু হাতে চাপ দিয়ে উঠে পড়তে চায়। চাপে জোর ছিল। বোঝার আগেই, কনুই অবদি হাত জোড়া ডুবে গেল পাঁকের ভেতর। টাল সামলাতে পারল না। থুবড়ে পড়ল।
শহরের বড় নর্দমা। এক সময় নাকি খাল ছিল। হেজেমজে এখন নর্দমা। খুব পুরন। শতেক বছরের। শহরের জঞ্জাল এর ভেতর দিয়ে গঙ্গায় পড়ার কথা। পড়ে না। পাঁকেজলে নিজেই জড়দ্গব। লোকে বলে, ভেতরে নাকি তিন মানুষ সমান পাঁক আছে। পোঁতা আছে শতেক বছরের নানা দুর্গন্ধ। ভারি বর্ষার টানে ওপরের ময়লা নড়েচড়ে উঠতেই ভেতরে আটকে থাকা দুর্গন্ধ কিলবিল করে বেরিয়ে আসে। বস্তিতে টেকাও দায় হয়ে ওঠে তখন। নর্দমার কোল ঘেঁষে তাদের বস্তি। বস্তির পাশেই শহরের বড় সড়ক। সেটি এসেছে নর্দমার ওপর দিয়ে। সেখানে একটি কালভার্ট। বেশ বড়সড়। দুটি পাঞ্জাব পাশাপাশি যেতে পারে। যায়ও। কত রকম যানবাহনই না যায়। বাস লরি ট্যাকসি ম্যাটাডোর জিপ রিকসা গরুরগাড়ি ভ্যানরিকসা পুলিশভ্যান পুলিশ পুলিশ………
হানিফ বিড়বিড় করতে থাকে পাঁকেজলে মুখ ডুবিয়ে। জলের একটি তিরতির রেখা মুখের ভেতর যেন খেলা করতে থাকে। সমস্ত মুখ টোকে যায় একসময়। ‘‘এ কি পানি, না——’’ সঙ্গে সঙ্গে পাকস্থলি ফাটিয়ে বেরিয়ে আসে এক ভয়ঙ্কর গর্জন— ওয়াক, ওয়াক— নাকমুখ দিয়ে বেরতে থাকে অজস্র কুঁচো কৃমি।
বুঝতে পারে, কৃমির স্তূপের ওপরে পড়ে আছে। সারা গায়ে বিজবিজ করে ঘুরে বেড়াচ্ছে সেই পিচ্ছিল কীট। হানিফ ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। ডান হাত বাড়িয়ে শুকনো মাটি খোঁজে যার ওপর ভর দিয়ে দাঁড়ানো যায়। মাটি নেই। শুধু পাঁক। শুধু তলিয়ে যাওয়া। তবু শেষ শক্তিটুকু দিয়ে শক্ত কিছু একটা খোঁজে— ইট পাথর যা হোক কিছু একটা, শরীরের চাপে যা বসে যাবে না। বুকে ভর দিয়ে ঘসটে ঘসটে খানিকটা এগোয়। হাত বাড়ায়। এই তো, এই তো। মনে মনেই চেঁচিয়ে ওঠে।
জিনিসটা কি। বুঝতে পারে না। কিন্তু ধীরে ধীরে চাপ দিয়ে বোঝে, ভর নিতে পারবে। একটু সময় নেয়। গুছিয়ে নেয় ভেতরে ভেতরে। বোঝে, এক চাপেই উঠে পড়তে হবে। চাপটি মোক্ষম হওয়া চাই।
দম নেয়, ছাড়ে। পা জোড়া আস্তে আস্তে ওপরে টেনে তুলে আনার চেষ্টা করে। এক সময় পারেও। তারপর সেই শক্ত জিনিসটি আঁকড়ে ধরে এক ঝটকায় উঠে পড়ে।
কোথাও থেকে বিকট একটা আওয়াজ হয়, আঁক! তা নিয়ে সে মাথা ঘামায় না। ডান দিকে তাকাতেই দেখে, পাঁজা পাঁজা করে ইট পড়ে আছে। নর্দমার এই অংশটি বাঁধানোর চেষ্টা করা হয়েছিল একসময়। কাজতি শেষ অবদি হয়নি। কিন্তু ইটও তুলে নিয়ে যায়নি তারা। বাইরের দপদপ আলোয় ভেতরের অনেকখানিই স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল। কালভার্টের মুখে পৌঁছতে খুব একটা অসুবিধা হলো না।
বাইরে এসে বুক ভরে দম নেয়। ওপরে তাকাতেই বুক শুকিয়ে কাঠ হয়ে যায়। বস্তি জ্বলছে। মনে হয়, সে নিজেও বুঝি।
মুখ ঘুরিয়ে নেয়। কালভার্টের ভেতর চোখ পড়তেই মুখ ঢেকে ফেলে। বিড়বিড় করে বলে, হায় আল্লা!
উপুড় হয়ে পড়ে আছে একটি মেয়ে। পুরো মাথাটাই পাঁকের ভেতর সেঁদিয়ে গেছে। সে কি তবে ওই মাথার ওপর ভর রেখেই— শরীরের সব রক্ত যেন মাথার ভেতর ঝামটে পড়ে। মুহূর্তেই সব কিছু অন্ধকার হয়ে যায়।

ওপরে উঠেই কিন্তু ভয় হয়। চারধারে বড় বেশি আলো। কোথাও কোনো অন্ধকার নেই। খোদাতাল্লা যে দিনরাতের ভাগ করে দিয়েছেন তা কি অমনি-অমনি।! রাত অন্ধকার নিয়ে আসে। বিপদের মুখে তার ভেতর গুঁজে দিয়ে নিশ্চিন্ত হতে পারে মানুষ।
বাবরি মসজিদ ভাঙার খবর আসার সঙ্গে সঙ্গে নানা গুজব ছড়াতে থাকল। হানিফ সে-মসজিদ দেখেনি। অযোধ্যা কোথায়, তাও সঠিক জানে না। কিন্তু ক বছর ধরে শুনে শুনে কখন যে মসজিদটি তার ভেতরে ঢুকে গিয়েছিল, বোঝেনি। বুঝল সেটি ভাঙার পর। মনে হয়েছিল, অযোধ্যা নয়, ভাঙচুরটা হলো যেন তার ভেতরেই। অনেকটা জায়গা খালি হয়ে গিয়েছিল। আসলে, ওটি যে কেউ ভাঙতে পারে তা স্বপ্নেও ভাবেনি কখনও। যখন ভাঙল, ধাক্কাটা সামলাতে পারেনি।
শুধু কি মসজিদই? আরও কিছু ভেঙেছিল তারা। পড়শিতে পড়শিতে সদ্ভাব, সম্পর্ক, বিশ্বাস, নির্ভরতা, এ-সবের শিকড়েও তারা নাড়িয়ে দিয়েছিল। বাকি কাজটা করেছিল গুজব যা বাতাসের আগে ছোটে। তারা ধরেই নিয়েছিল, যারা মসজিদ ভাঙতে পারে তাদের কাছে হানিফদের প্রাণের দাম আর কতখানি!
তবু ভরসা একটা কোথাও ছিল যেন। হাতের কাছে রয়েছে একটি হিন্দু বস্তি। বাসে এক স্টপেজের মামলা। সবাই যে সবাইকে চেনে তা নয়। কিন্তু অনেকে অনেককে চেনে। কেউ কেউ একই কারখানায় কাজ করে। লক-আউট হলে একই সঙ্গে কৌটো নাচায়। এ-বস্তি ও-বস্তি ঘুরে ঘুরে সস্তা শৌখিন জিনিস ফিরি করে কেউ কেউ। এ-অঞ্চলের একমাত্র সিনেমা হলে ব্ল্যাক করে দু বস্তির বেকার ছেলেরাই। এরাই পরে মস্তান হয়। বাজারে তোলা তোলে। ভোটের সময় ভোটবাবুদের নজরে পড়লে কারো কারো নসিব খুলে যায়। বস্তির কাছেপিঠে বেওয়ারিশ জমিতে পাকা বারি তুলে ভদ্দরলোক বনে যায়। থানা পুলিশ ওঠবোস করে তাদের হুকুমে। তারা ওঠবোস করে ভোটবাবুদের হুকুমে। হানিফেরা এদের এড়িয়ে চলে। ভরসাও রাখে। বড় ঝড়ঝাপটা রুখে দিতে পারে এরাই।
দ্বিতীয় দিনই বোঝা গিয়েছিল, অবস্থা জটিল হচ্ছে। মহল্লায় অনেক নতুন মুখ দেখা গেল। খুবই বেপরোয়া তাদের চালচলন। গোলমালের আভাস পেতেই এই সব লোক কোথা থেকে যেন চলে আসে। আগেও দেখেছে। কারা এদের ডাকে, কারাই বা পাঠায়, কে জানে।
হানিফেরা অনুমান করতে পেরেছিল, ও-বস্তিতেও বাইরের লোক এসে গিয়েছে। খবর এসেছিল—তা কারা পাঠায়, জানতে চায় না কেউ। টিন টিন পেট্রল যোগাড় করেছে ওরা, হাতে হাতে পেটো বিলনো হচ্ছে, রাইফেল এসে গেছে। পাল্লা দিয়ে তাদের এখানেও পেট্রল যোগাড় করা হলো, ব্যাগভর্তি পেটো পৌঁছল অনেক ঘরে, রাইফেল ঝুলিয়ে আমিরি চালে ঘুরে বেড়াতে লাগল সেই সব নতুন মুখ। সন্ধ্যের মুখে বড় সড়কে একটা পেট ফাটল। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই ও-বস্তি থেকেও পেটোর আওয়াজ ভহেসে এল। দুটি শব্দের ওপর দিয়েই সন্ধ্যেটা কাটল। বুকের ভেতর জমে রইল চাপ চাপ আতঙ্ক।
সবে খেতে বসেছে। রাত খুব একটা বেশি নয়। ঝড়ের বেগে ঢুকল জোহরা। দরজায় খিল তুলে দিয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, ‘রাতটা থাকতে দেবা?’
হানিফ চেয়ে থাকে তার দিকে। আন্দাজ করতে চায়, ব্যাপারখানা কি। জোহরা চালের ব্ল্যাকার। সুনাম নেই মহল্লায়। হুটহাট করে বেরিয়ে যায়। যখন খুশি ফেরে। সঙ্গে করে লোকও নিয়ে আসে কখনও কখনও। বলে বটে, মহাজন। কেউই বিশ্বাস করে না। আসলে, গলদটা রয়েছে তার ভেতরেই। এ-বয়সেই— কতই বা আর বয়স? পঁচিশ? না হয় দু০এক বছর বেশিই হলো। চার চার বার তালাক খেয়েছে। বড় মুখরা আর বার টান। হয়তো এ-সব কারণেই শিকড় পেলো না। চার চারজন মরদের ঘর করে এসেছে, কিন্তু শরীরে কোন ছাপ পড়েনি। ছিপছিপে, আঁটোসাঁটো বাঁধুনি। শাদামাটা মুখে একটি শ্রী এনে দিয়েছে ঢলঢলে দুটি চোখ। সাজসজ্জার দিকে খুব নজর। কিন্তু বড়ই চিকন তার সজ্জা। এ-সবই মাটি করেছে তার গলা। রেগে গেলে তো কথাই নেই, এমনিতেও তা বেশ তেজালো। উঁচু পর্দায় বাঁধা, টং-টং করে বাজে। এই গলার জন্য তাকে এড়িয়ে চলে লোকজন।
জোহরাকে নিয়ে হানিফ আলাদা করে কিছু ভাবে নি কখনও। মেয়েদের সম্পর্কে তার ধারণা ভাল নয়। সে বিশ্বাস করে, সুযোগ পেলেই তারা ঠকাবে। তাদের ছলাকলায় ভুলেছ, কি ডুবেছ। না হলে, নছি বিবির মত অমন সরল পানা……..
হঠাৎই যেন দেখতে পায়, নছিবন নয়, জোহরা তার সামনে দাঁড়িয়ে। কি যেন বলেছিল? মনে পড়ে, রাতে থাকতে চায়। কেন, এখানে কেন? জোহরা ত জানে, সে একা থাকে। তবে? মতলবখানা কি?
কিন্তু এত সব বলা যায় না। শুধু জিজ্ঞেস করে, ‘কি হয়েছে?’
জোহরা তখনও হাঁপাচ্ছে। দমধরা গলায় ফিসফিস করে ওঠে— যেন অন্য জোহরা, গলায় সেই তেজ নেই— বলে, ‘সেই যে লোকগুলো, বাইরে থেকে এসেছে, বদমাশের যাশু এক একটা। কি করে জানতে পেরেছে, আমি একলা থাকি।’ বলতে বলতেই চোখ মাটিতে নেমে আসে। চুপ করে যায়।
বাকিটুকু হানিফ বুঝে নেয়। সানকি হাত তুলে নিয়ে বলে, ‘বোস।’
জোহরা বসে।
‘খেয়েছিস?’
জোহরা উত্তর দেয় না। সানকিটা তার দিকে ঠেলে দেয় হানিফ।
‘—জুঠা না। খা।’
‘তুমি?’
‘রুটি আছে।’
মেঝেতে দুটো চাদর বিছিয়ে শোয়া হলো। নিজের জায়গায় পা মুড়ে বসে দিনের শেষ বিড়িটা খাচ্ছে তখন হানিফ। পাশ ফিরে জোহরা হঠাৎ বলে, ‘পুরুষ মানুষের মেয়েমানুষ না হলে চলে না। মেয়েমানুষও পুরুষ ছাড়া অচল। বল?’

[page]
বিড়ি খেতে খেতেই তাকায়। সেই ফ্যাকাশে ভাবটা কেটে গেছে। রক্ত ফিরে এসেছে মুখে। জোহরাও আর কথা বলে না। চেয়ে থাকে। শুধু তার বুকখানা ফুলে ফুলে ওঠে। নাকেমুখে তুফান
শুয়ে ছিল, উঠে বসে। চোখমুখে আভা ছড়ায়। নিবু নিবু গলায় বলে, ‘‘লোকটা একটা জানোয়ার। দেখ।’’—বলে, বুকের কাপড় ফেলে দেয়।
আর এক নারীর কথা মনে পড়ে। বড় ভরাট ছিল সে। ভরা গাঙের মতই। জোহরার বুকের দিকে চেয়ে থাকতে থাকতে কেন যেন মনে হয়, ভেতরে ভেতরে হয়তো দুঃখীই মেয়েটা। ফোটাতে পারল না নিজেকে, কুঁড়িই হয়ে রইল।
জোহরা এগিয়ে আসে। চকচক করে জ্বলছে তার মুখ। ফিসফিস করে বলে, ‘‘কত কাল উপোসী থাকবে, মিয়া?’’

কান ফাটানো গর্জনে তাদের ঘুম ভেঙে গিয়েছিল। মনে হয়েছিল, যেন থরথর করে কাঁপছে ঘরবাড়ি। ভয়ঙ্কর এক আক্রোশে হা-হা করে ছুটে আসছে শতেক দৈত্য। বোমা পড়ছে, বৃষ্টিধারার মত, অঝোরে। মানুষ চিৎকার করছে। নলি ফাটিয়ে শাপশাপান্ত করছে। পোড়া বারুদের গন্ধে বাতাস তোলপাড়।
থুম মেরে বসে থাকে হানিফ। দু হাতে কান চেপে তার কোলে মুখ গুঁজে দেয় জোহরা। বাইরে বাতাস ফালাফালা হতে থাকে। হানিফ বোঝে, যে-আশঙ্কা ছিল ভেতরে, তা বেরিয়ে এসেছে বাইরে। ভয়ের কথাটা জানত। জানত না, কেউ বলেও নি, সে যদি এসেই পড়ে কি করতে হবে। ভসে বসে শুধু অবশ হতে থাকে। এক সময় মনে হলো, পুরো বস্তিটাই যেন বিলাপে ফেটে পড়ল। শোনা গেল অসংখ্য পায়ের ত্রস্ত ছোটাছুটির আওয়াজ। নানা দিকে হাঁক ওঠে, ‘‘পালাও, পালাও’’। বোঝে, জোহরা কাঁপছে। চিৎকার করার শক্তিটুকুও যেন হারিয়েছে, হানিফ উঠে পড়ে। দুহাতের বেড়ে তাকে ধরে রাখতে চায় জোহরা। ধীরে ধীরে তার বাঁধন খুলে বেরিয়ে এল হানিফ। দরজা খুলতেই দেখে, দিশেহারার মত ছুটছে সবাই। যাদের আসার কথা ছিল, তারা এসে গেছে। এ-পাড়ায় কোন মসজিদ নেই। কিন্তু ঘরবাড়ি রয়েছে, দোকানপাট রয়েছে, রয়েছে লোকজন। মসজিদ নেই তো কি! অবস্থাটা বোঝার জন্য ঘরের সামনে এসে দাঁড়ায়। লোক ছুটছে কলকল করে। তার কথা শোনার সময় নেই কারো। হঠাৎ ধুনকর সেলিমকে দেখতে পায়। পেছনের চাপে যেন ভাসতে ভাসতে আসছে। চিৎকার করে হানিফ, ‘সেলিম—হেই—কি হলো?’
দেখতে দেখতে সেলিম কাছে এসে যায়। ধমকে ওঠে, ‘তামাশা দেখতা, আঁ। বেওকুফ!’ এবং, এক হ্যাঁচকায় টেনে নেয় তাকে। হানিফ ভাসতে থাকে। পেছনে পড়ে থাকে সেই নারী যে জানত, হয়ত অন্য রকম করে, মেয়েমানুষ পুরুষ ছাড়া অচল। জোহরার কথা ভেবে অস্থির হয়ে ওঠে হানিফ। কিন্তু সেই সাঁড়াশি চাপ থেকে বেরিয়ে আসার শক্তি ছিল না তার। জনস্রোত তাকে ভাসিয়ে নিয়ে যায়। বুকের ভেতরটা টনটন করে ওঠে। মনে মনেই বলে, ‘নসিব, জুহিবিবি, নসিব। খোদা, মেয়েটাকে দেখো তুমি। ওরা যেন ওকে খুবলে না খায়।’
বড় সড়ক ধরে ছুটছিল তারা। লক্ষ্য ছিল নর্দমার ওপারে আশরাফ মিয়ার তিনতলা বাড়িটি। কালভার্টের ওপরে এসেই রেলিং চেপে ধরে দাঁড়িয়ে পড়েছিল। ভেবেছিল, দাঁড়িয়ে থাকতে পারলে বেরিয়েও আসতে পারবে। এখনও ফিরে যাওয়া যায়। বোঝে নি, মৃত্যু যাদের তাড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে, তাদের কাছে অন্যের বাঁচা-মরার কোন দাম নেই। সে দাঁড়িয়ে পড়তেই পেছনের লোকেরা থমকে গিয়েছিল। দু-এক মুহূর্তের জন্য। তারপর কয়েকটি অস্থির হাত এগিয়ে এসেছিল। সে ছিটকে পড়ল নর্দমায়।
শেষ পর্যন্ত মহানিমের গোড়ায়ই বসে পড়ল হেলান দিয়ে। এখন কি করবে, কি করা উচিত, কিছুই মাথায় আসছিল না। কিছু ভাবতেও ইচ্ছে করছিল না। মাথার ভেতর যেন লোহালক্কড়ে বোঝাই। শরীরে ক্লান্তির ঢল। চোখ বুজে আসে। ঢুলতে থাকে।
হঠাৎ জোহরাকে দেখতে পায়। পায়ে পায়ে তার সামনে এসে দাঁড়ায়। খিলখিল করে হেসে ওঠে, জোহরা নয়, জোহরার করোটি। গাঁইতি শাবলের ঘা শোনা যায়। কারা যান সুর করে বলে যায়, ‘এক ধাক্কা অর দো—’ হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ে খিলান ইট পাথর। জোহরার চোখে পানি, টলটল। বলে, ‘লোকগুলো বদমাশের যাশু। দেখ।’ কাপড় খুলে ফেলে। হানিফ আঁতকে ওঠে। জোহরা নয়, একখানা কঙ্কাল। এখানে-ওখানে আটকে আছে মাংসের ডেলা। লাল টকটকে সেই সব পিণ্ড থেকে ফিনকি দিয়ে বেরচ্ছে রক্ত। চোখ বুজে ফেলে সে চিৎকার করে ওঠে, ‘চলে যা। তোর পায়ে পড়ি। চলে যা।’
চোখ মেলতেই দেখে, তার ওপর পা তুলে দিয়ে তার পা চাটছে দুটি কুকুর। তাদের মুখের ভেতর থেকে একটা আওয়াজ উঠে আসছে, চক-চক-চক-চক………… যেন বা খুবই তৃপ্ত।
মাথার ভেতর আগুন জ্বলে। উঠে দাঁড়িয়ে সপাটে পা চালায়। ছিটকে পড়ে এক পাশে। আবার পা তুলতেই অন্যটি ছুটে চলে যায়। দূরে দাঁড়িয়ে পেছন ফিরে তাকে দেখতে থাকে।
নিজের দিকে চোখ পড়তেই লজ্জায় ঘেন্নায় কুঁকড়ে যায়। ছুটতে থাকে পড়িমরি। কোন বাধাই বাধা হয়ে ওঠে না। সব কিছু দলে মুচড়ে পাগলের মত ছুটতে থাকে। ছুটতে ছুটতেই ঝাঁপিয়ে পড়ে গঙ্গায়। গঙ্গার মাতি দিয়ে নিজেকে ঘষেমেজে যখন ওপরে উঠে এল, খুবই গ্লানিমুক্ত মনে হচ্ছিল। সেই ভার-ভার অনুভূতিটাও আর নেই। বেশ হালকা মনে হচ্ছে। থুমধরা সেই কুয়াশা কেটে যাচ্ছে এখন।
এই সমেয়েই, ঠাণ্ডা হাওয়ায় গা কাঁটা দিয়ে উঠতেই, বড়ই বিব্রত হয়ে পড়ে সে। বোঝে, এই ভয়ঙ্কর সময়ের হাত থেকে তার নিস্তার নেই। অসহায় এক নারীকে সে বাঁচতে দেয়নি। আর এক নারিকে সে খুন করেছে। কৃমিকীটের দোজখে ছুঁড়ে দিয়েছে। আর এখন, এই ভোর-ভোর রাতে, তাকে উলঙ্গ করে রেখে গেল সে। সে কি করে, কি করে সে এখন? চোখ ফেটে জল আসে। পায়ে পায়ে ওপরে উঠে এল। মহানিমের ছায়ায় দাঁড়ায়।
আগুন নিভে আসছে। ফিরে গেলে একটা লুঙ্গিও কি পাওয়া যাবে না? অন্তত একখানা? তা যদি না-ও বা মেলে, উত্তাপটুকু তো মিলবে। হলোই বা তা দাঙ্গার আগুন
সাতপাঁচ এইসব ভাবতে ভাবতে দগ্ধ বস্তির দিকে হাঁটতে থাকে হানিফ।


গল্পটি লেখকের ‘রামাল্লা ও হানিফেরা’ বই থেকে নেওয়া হয়েছে। পুরনো বানান অপরিবর্তিত।