‘সোনালি কাবিন’ পড়তে গিয়ে বার বার কবি সমুদ্র গুপ্তকে মনে পড়ে যাচ্ছিল। ২০০৭ সালের ঘটনা। খোলা পূর্ণিমায় ছেউড়িয়ার আখড়াবাড়িতে আয়োজিত কথামঞ্চে কবি সমুদ্র গুপ্ত বিশেষ অতিথির বক্তব্য দিচ্ছিলেন। কয়েক মিনিট সাধারণভাবে ভালই বললেন। কিন্তু শেষ ভাগে গিয়ে হঠাৎই মুখে হাহাকার তুলে আবেগ মথিত হয়ে পড়লেন - "লালন মরে নাই। কে বলেছে লালন মরে গেছে? এই যে দেখুন, আমি-ই লালন।" সমুদ্র থামলেন না, কান্না চোখে সামনে বসে থাকা হাজার হাজার ভক্তকুলের মুখ পানে চেয়ে অনাথের মত আর্জি করতে লাগলেন, "আপনারাই তো লালন, লালন মরে নাই...।" আমার মত উপস্থিত দর্শকদের চোখগুলোও তখন তাঁর মুখের ওপর মুহূর্তেই থেমে গিয়েছিল। মনে হল, তিনি যেন সাক্ষাত লালনকে পেয়ে এক অলৌকিক দৃশ্যের ভেতর চলে গেছেন। অজস্র হাততালির মধ্যে দিয়ে বক্তব্য শেষ করে তিনি চোখ মুছতে মুছতে নিচে নেমে এলেন। তারপর কিছুটা সুস্থিত হলে নিকটে গিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, "আপনি আজ যা বললেন তা তো কবিতারও অধিক।" মন্তব্য শুনে তিনি হালকা হেসে ফেললেন, "দ্যাখেন সব-ই আসলে কানেকশানের ব্যাপার। কানেকশান হয়ে গেলে আর কিছু লাগে না। তখন আপনিতেই হড়বড় করে কবিতা চলে আসে। এখানে আমার কিছু করার নাই।"
আল মাহমুদের কবিতাগুলো একনাগাড়ে পড়তে গিয়ে আমার মনে হল, দোলপুর্ণিমার সে রাতে সমুদ্র গুপ্ত যথার্থই বলেছিলেন। কানেকশান ছাড়া ওভাবে অতো গভীরকথা শুধুমাত্র শব্দের কারসাজিতে টেনে তোলা সম্ভব নয়। ভাবালুতায় বুদ না হলে, সহজানন্দে অসাড় না হলে, কেবল সচেতন থেকে অন্তরভেদী অবলোকন করা দুরহ-ই বটে। সোনালি কাবিনের সদর দরজা খুললেই বিস্মিত হতে হয়... আমি ঘোর লাগা বষর্ণের মাঝে আজও উবু হয়ে আছি। কবিতা বেয়ে নিচে নামলেও একই রকম ঘোর, মানে কানেকশান।
বুঝিবা স্বপ্নের ঘোরে আঁইল বাঁধা জমিনের ছক
বুষ্টির কুয়াশা লেগে অবিশ্বাস্য যাদুমন্ত্রবলে
অকস্মাৎ পাল্টে গেলো।
চেতন অবচেতনের মাঝখান দিয়ে চলতে চলতে কবি প্রকৃতির রূপ-রসের অনুবাদ করে চলেছেন। পিছুটানের সব জানালাগুলো বন্ধ করে দিয়ে কেবল নিবিষ্ট পায়ে হেঁটে হেঁটে প্রকৃতিকেই আরাধ্য জ্ঞানে জপ করতে হয় নাকি? কবিতাকে শুদ্ধ করবার এই বুঝি সমাচার! তা না হলে ভেজাল থেকেই যায়।...আর আমি ইন্দ্রিয়ের সর্বানুভুতির চিহ্ন ক্ষয় করে ফেলে, দয়াপরবশ হয়ে রেখেছি আমার কালো দৃষ্টিকে সজাগ। এর মানে কী? আল মাহমুদ যেমন দেখলেন,
‘যে নারী উদাম করে তার সর্ব উর্বর আধার
অথবা ...‘ত্রিকোণ আকারে ফাঁক হয়ে রয়েছে মৃম্ময়ী’।
কবিতায় না পেলে এভাবে কেউ নারীকে একাকার করে দিতে পারে প্রকৃতির অমোঘ ঐকতানের সাথে। যখন কে নারী, কে মৃম্ময়ী, কে বা প্রকৃতি-বিবিধ ভেদ মার্গের বাইরে চলে যায় পাঠক। তখন হয়ত কবির চোখের মতো আমাদের চোখেও তর্জমাগত সমস্যা দেখা দেয়।
...যেন আমি জন্ম থেকেই অতিরিক্ত অবলোকন শক্তিকে
ধারণ করে আছি,
...আমি বুঝতে পারিনা তোমরা কী করে
কোনো রঙিন জিনিসের নাম নির্ধারণ কিম্বা
শস্যক্ষেত্র দেখে আপ্লুত হয়ে বলে ওঠো-সবুজ, সবুজ!
আমি যখন সবুজের দিকে তাকাই
সে আর সবুজ থাকেনা।
আমি গলিত মথিত সবুজের সাথে নিজেকেও সবুজাভ দেখি।
‘চোখ’ কবিতাটি পড়তে গিয়ে আনমনেই ফের সমুদ্রগুপ্ত-কে মনে পড়ে যায়। সত্যি তো কানেকশান না হলে, এভাবে রঙের সাথে কেউ নিজকে গলিত-মথিত করতে পারেন! সংযোগটা পেয়ে গেলেই হল আর কিছু লাগবে না। বাজিকররা যেমন হাত সাফাই করে, শূন্য থেকে বস্তু তুলে তেলেসমাতি দেখায়, কবিও তেমন মায়াজাল ছড়িয়ে শব্দের বাজি দেখাতে থাকেন। কবির মাথার ভিতরে আকাশ ঢুকে যায়, তারার বাগানে ফুটতে থাকে বর্নালী ফুল আর প্রজাপ্রতির মতো আপনিতেই উড়ে উড়ে নাজেল(নাজিল) হতে থাকে মধুমাখা কামিনি শব্দেরা। স্বপ্নের সানুদেশে লাইন বাই লাইন লেখা হয়ে যায় অবগাহনের গান। চারদিকে নিশ্চয়ই সবুজ সিগনাল পড়ে যায়! তবুও স্তব্ধতার মধ্যে নড়ে ওঠে বিনীত কবির ঠোট। নিসর্গ মৈথুন করতে করতে আল মাহমুদ আরও সামনে যান, ভাঙেন পাথুরে কোন হৃষ্টপুষ্ট শব্দ। তারপর তামা গলানো শ্রমিকের হাতে গলিয়ে মোলায়েম করেন নেন শব্দকে। রঙিলা বাউলের মত এবার ছেনেছুনে ইচ্ছে মতোন গাঁথতে থাকেন। পাঠকের তাই আলাদা করে সংজ্ঞা খুঁজতে হয় না। শব্দরা নিজ গরজেই বর্ণিল পাখা মেলতে থাকে পাঠকের চোখের পাতায়। আমার মত নস্টালজিক পাঠকেরা যেমন মুহ’র্তেই নিপতিত হন ছেলেবেলার শরবতে। মানে-মাটি, পশু, মাছ, পাখি, জলডোরা, মানুষের ঝাঁক চিনে নেয় পরস্পরকে। যখন কিশোরের শরীরে শিহরণ তুলে উঠে আসে ভিনগাঁয়ের কোন এক জ্যান্ত কিশোরি যাকে হয়ত আমি কোনদিন দেখিনি-‘মক্তবের মেয়ে চুলখোলা আয়েশা আক্তার’।
আল মাহমুদকে পাঠ করতে করতে মধ্যপথে চলে আসি।‘আমার চতুর্দিকে তখন খনার মন্ত্রের মত টিপ টিপ শব্দে সারাদিন জলধারা ঝরে’!

[page]
ধাতস্থ হয়ে লক্ষ করি, প্রকৃতির সব রূপ-লাবন্য-রস ভরে আছে ২৩ লাইন ‘প্রকৃতি’র ভেতর। সোনালি কাবিনের শুরুতেই মোহাচ্ছন্ন হয়েছি। তারপর যতই এগুতে থাকি ততই যেন অন্তরভেদী অবলোকন, বাতাসের ফেনার মতো ওম ওম উষ্ণতায় আপনিতেই জড়িয়ে আসে কবিতার আদর। আরও পিছনে চলে যাই। তারপর ফ্লাশব্যাকে দেখতে থাকি ফেলে আসা ছায়াছবি। ছাব্বিশ বছর আগের কোন এক জংলি ফুলের ঘ্রান এসে নাকে লাগে। নাগরিক উৎপাত গায়ে নিয়েও গলায় গলা লাগিয়ে দেখতে থাকি..‘নদীর নাচের ভঙ্গি’। আহ্ কী সরলতার সমীকরণ! পড়তে পড়তে নাকি কল্পনার মেদুর গাঁয়ে হাঁটতে হাঁটতে আশায় বুক জাগে- আমি নিশ্চয়ই এই গরমধরা শহর থেকে একদিন ছাড়া পাব! কংক্রীটে, ..
‘ভালো কি আছো? হায়রে ভালো থাকা!
নগরবাসি কে রাখে কার খোঁজ!
ফিরতে চাই, পাবো কি সেই পথ’?
ভাবতে গিয়ে তবু পুলক জাগে’।

মাথার ভিতর অজস্র গেঁয়ো জ্যোৎস্নাধারা নিয়ে হয়ত ফের সোনালি কাবিনেই মুখ রাখি। কবিতারা তখন আর মলাটবন্দি হয়ে থাকতে পারে না। দৃশ্য থেকে প্রাণ নিয়ে আমার অতীত ইন্দ্রীয়কে ঘিরে দল বেঁধে গোলাকারে বসে পড়ে। আলো-আধারি হাতড়ে আমি টের পাই, ...‘পিঠার পেটের ভাগে ফুলে ওঠা তিলের সৌরভ’।

কবি আলাদা কেউ নন। গৃহে থেকেই তিনি বিবাগী, কখনও সন্যাসী। তাই বলে কবিকে কী একঘরে করে দেয়া যায়! না, বরং জীবনের সব রঙ-রস-সুধা তিনি আকণ্ঠ পান করেন। পার্থক্য কেবল, মন আর মুখ নিয়ে ভনিতা করতে জানেন না তিনি। সত্যের মতোই সহজাত প্রবৃত্তিগুলোকেও তিনি সহজে প্রশ্রয় দেন নিজের কাছে। অন্তর্জালে সংঘটিত সত্যকে সপ্রাণ প্রকাশে তাই কুন্ঠা করেন না তিনি। ‘অন্তরভেদী অবলোকন’-এ কত সহজেই তিনি বললেন,
..আমার স্ত্রী চোখ তুলে তাকালেন,
...ব্লাউজের বোতাম খুলে গিয়ে ‘ম’-এর আকারের মতো
কণ্ঠা উদোম হয়ে আছে।
....
এমন কি মেয়েরা যখন কলতলায় শাড়ি পাল্টায়,
আমার চোখ নির্লজ্জের মতো দেখে নেয়।
কোন অনুভুতিকেই ছোট চোখে দেখতে চান নি তিনি। সামান্য স্পর্শকেই অবিচার করবেন না বলেই হয়ত সব নারীরাই কোন না কোনভাবে উপস্থিত হয়েছেন আল মাহমুদের কবিতায়। সৎ অনুবাদকের বয়ানে ফাঁক ফোকর থাকবে কেন! যেমন,
এক বেকার নিরপরাধ কামুক বেশ্যার বুকে
মাথা রেখে কাঁদছে। যে মেয়েটি বুকে হাত রাখলে
খদ্দেরদের ভীষণ ধমকাতো’
কাম-ক্রোধ-হিংসা-লোভ-ভা� �নার মদ, কোন কিছুই তো জীবন থেকে খসে ফেলানোর মতো নয়। কবি তাই রচনা করেন-‘সাহসের সমাচার’।
তিনি বক্তার জিভের ওপর তার আত্মাকে দেখতে পান। খোলসের ভিতরে কী আছে তাও দেখতে পান। যখন বললেন,
...‘কেউ সিজদায় নত হলে
আমি দেখি একটি কলস ভরা লোভ উবুড় হয়েছে’।
মিথ্যের সঙ্গে সত্যের অনবরত সংঘর্ষ দেখে দেখে কবিও কি একসময় ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন! নাকি
অদ্ভুত আধার এসে গিলে নিচ্ছে আমাদের বোধের উৎসমুখ?
... ‘এ কেমন শিহরণ,
গ্রীস্মকে শীত আর শীতকে গ্রীস্ম করে দেয়।
অথবা অন্য কবিতায় গিয়ে আল মাহমুদ যেমন বললেন,
বোধের উৎস কই,
কোনদিকে? আমাকে রাখতে দাও হাত।
আমরা যারা পাঠ করতে থাকি তারা পরিতৃপ্তির ঢেকুড় তুলতে পারিনা। তার আগেই শেষভাগে অপেক্ষা করে সোনালি কাবিন নামের চোদ্দ ছত্রের গীতিকবিতা। চঞ্চলা, বেহুলা, শরমিন্দা বিবি, হরিণী কিংবা হংসিনী যথেষ্ট নয় নিশ্চয়, যখন পুরুষের কাছে সে উম্মুক্ত করে তার ধন-ধান্যের সমস্ত দুয়ার। প্রেমিক পুরুষ তাই সাধ্যমত ছত্র খুলে বিশেষণ যোগাড় করতে থাকেন। তন্ন তন্ন করেন খুঁড়ে চলে প্রাচীন আর বর্তমানকে। ঈজিপ্ট, গ্রীস, সেরাসিন শিল্পীর পৌড় আঙুলে, কৌম সমাজে। আরও অন্যখানে! মহুয়ার মাটির বোতলে, কবিদের আত্মার ভিতরে। ...শুধু একবার নত হয়ে বলবে, মালা পরো বালা, প্রাণের শবরী, আর্যের যুবতী। দুনিয়া মন্থন করে কী অস্থীর সকাতর আর্তি-সোনার দিনার নেই, দেন মোহর চেয়ো না হরিণী, যদি নাও, দিতে পারি কাবিন বিহীন হাত দুটি। নারীর প্রতি, কুলবধূর প্রতি পুরুষের আদিম টান, প্রেম ভালোবাসার এমন কাব্যকথা-পরম্পরা আর হয় না। পুরুষসত্য কিংবা কামনার মত সত্যকে ছবি দিতে আল মাহমুদের মত আর কে পেরেছেন! নিজের সাথে মেলাতে গিয়ে দেখি, শুধু কবি একা নন দুনিয়া জুড়েই প্রেমিক পুরুষরা সর্বস্ব উজাড় করে আনত হয়ে আছে মনের মানুষের সামনে। সোনালি কাবিন তাই কবির একান্ত বয়ান হয়ে থাকে নি, হয়েছে প্রেমিক পুরুষের সার্বজনীন পাঠ ।

তাঁর কবিতার সীমা আর সীমাবদ্ধতা নিয়ে কিছু বলার আগে নিজের তহবিলে রাখা সাহসের কথা মনে পড়ে। শব্দগ্রস্থ অথচ মুক হয়ে কাবিনে জেগে ওঠা নিসর্গের দিকে কেবলই চেয়ে থাকতে হয়। যদিও কিছু খটকা লাগে মনে। যেমন কবি যখন আমাদের সামনে আর্তি করেন-
..‘কিন্তু একজন কবিকে কি দেবে তোমরা?
যে ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে থাকে বিষন্ন বদনে?’
কবির এ আহ্লাদকে আমি ঠিক বাহুল্য মনে করি না। কারণ সকলেরই একটা পাওনা থাকে। স্বীকৃতি-সম্মান কে না চায়, সকলেই চায় হাততালি, বাহবা কিংবা যেমন করে আল মাহমুদ বোঝাতে চেয়েছেন, ..‘এমনকি আহত, পঙ্গুদের বুকেও সান্তনার পদক ঝলকায়’। সত্যি তো, মঙ্গলগ্রহে কবিতা প্রকাশিত হলে ক জন কবি কবিতা লিখতেন? প্রচারনা, প্রকাশনা, পদক, পুরস্কার কম-বেশি কাম্য বটে। কবিও তো চিরকাল বৃত্তের বাইরে নন। তাঁকেও মাঝে মাঝে বৃত্তবন্দি হতে হয়-ক্ষুধায়, কামনায়; গলা মেলাতে হয় সামাজিক সহবাসে। কিন্তু যিনি প্রকৃতির বরপুত্র! তার বেলায়? কদাচিৎ তিনি হয়ত নিমগ্নতা থেকে গলা তুলেছেন, তারপর আমাদের কারবার দেখে তিনি আবার নিরাময়ী সবুজে ডুব দিয়েছেন। বিষয়-বাসনা, দয়া-দাক্ষিণ্যের চেয়েও অধিক আনন্দ তাকে হাতছানি দিয়ে ডেকে নিয়েছে নিজের করে। ফলে সামাজিক দায়বোধ কোন কালেই জয়ী হতে পারেনি কবির কব্জির কাছে। ফালতু সমাদর রেখে তাই অন্তর থেকে বলছি-শত বছর বেঁচে থাকুন আল মাহমুদ, বেঁচে থাকুক আপনার কলম।