খালি পায়ে বাগানে এসে অভিক প্রথমেই যা টের পেল তা হল আর্দ্রতা,- শিশিরের। শীত আসছে। আন্দাজে লাঠিটা অভিককে এগিয়ে নিয়ে এলো পাঁচিল ঘেঁষা কোণার বেঞ্চে। না আসার মতো যেটুকু আলো অভিকের চোখে পৌঁছোতে পারে সেটুকু তাকে জানান দেয়,- রূপা সেখানে আগে থেকেই বসে আছে। অভিক রূপার গন্ধ পায়।
“তুই বদলাস নি।”
অভিক বোঝে রূপার হাসি ছড়িয়ে পড়ছে হাওয়ায়। অভিকের অতি ক্ষীণ দৃষ্টির ওপারে সেই হাসিতে খান খান ভেঙে যাচ্ছে হাওয়া,- অভিকের চুল নড়ে ওঠে। “হাসছিস?”
“হুম... শুধু গন্ধ না বদলালেই মানুষ এক থাকে নাকি?”
“থাকেনা? ...হবে হয়তো।”
“তোর ভয় করছে?”
“না। আমি সুঁচ- অ্যানাস্থেশিয়া ভয় পাইনা।”
“আমি অপারেশানের কথা বলছি না।”
“তাহলে?” দৃষ্টিহীণ অভিক আন্দাজে ভ্রূ কুঁচকে ফেলে।
“দশ বছর অভিক। কত বদলে গেছে সব কিছু।”
“তুই তো বদলাস নি!” অভিক আন্দাজে হাসে। নিশ্চিত হতে পারে না তার মুখভঙ্গী সম্পর্কে, সে হাওয়ায় সোঁদা এক বিষন্নতা টের পায়।
“রূপা,”
“কি?”
“যেদিন আমি ফিরবো, সেদিন আসবি তো বিকেলে?”
রূপা মাথা নীচু করে যেন ভার করে ফেলল পরিবেশটা।
“কি রে... বল আসবি না?”
“না।”
“কেন!?”
“তোর সহ্য হবে না আমায়।”
“কেন? কেন সহ্য হবেনা!”
“তুই জানিস অভিক।”
“তুই আসবি। তোর জন্যই এতো ঝুঁকি সহ্য করতে আমি রাজী হয়েছি। ...আর তোকে সহ্য হবে না!”
আরও ভার হয়ে ওঠে চারপাশ- রূপার নিস্তব্ধতায়। “আসবো।”
অভিকের মুখের সদ্যজাত বলিরেখারা টানটান হয়। হাওয়ায় গন্ধটা মিলিয়ে দিয়ে রূপা চলে গেছে,- অভিক টের পায়। কিছুক্ষণ বসে নিশ্চুপ থাকার পর সে আন্দাজে লাঠির হাত ধরে বাগান ছেড়ে বেরিয়ে আসে।

“ভয় পাস না অভি, সব ঠিক হবে।”
“আমি ভয় পাইনি মা, তুমি বোসো বাইরে গিয়ে।”
হসপিটালের ওষুধে গন্ধে ভয় জাঁকিয়ে বসছে অভিকের লোমগুলোতে, রূপাকে বললেও অপারেশান থিয়েটারের ত্রাস তাকে অধৈর্য করে তুলছে।
“মা,”
“কি?”
“রূপার সাথে দেখা হয় তোমার?”
মা চমকে উঠলেও হাওয়ার হেরফের না হওয়ায় অভিক কিছুই টের পায় না।
“না, অভি। তুই এখন ওসব ভাবিস না।”
ওষুধ গন্ধের তীব্রতা বাড়িয়ে অভিকের সার্জেন ডাঃ পাল ঘরে ঢোকেন।
“সব ঠিকঠাক তো?”
অভিক মাথা নেড়ে চুপ করে যায়। হাওয়া থেকে রূপার গন্ধ খুঁজে নেওয়ার চেষ্টা করে। কোথাও রূপা নেই।

দশ বছর।
অভিক তাকিয়ে আছে। মায়ের মুখে দশ বছর আস্তানা গেড়ে আছে। তাও সে বলে, “তুমি আগের মতোই আছো।”
“ধুর, কি যে বলিস। অনেক রোগা হয়েছি, সবাই বলে। ... তুই কি কাউকে দেখতে চাস? বল আমায়, কাল তাকে তাহলে বাড়িতে ডাকবো...”
অভিক মাথা নাড়ে।
“আমি আসি তাহলে? ভিজিটিং আওয়ার শেষ। কাল সকালে আসছি, ঠিক মতো খাওয়া দাওয়া করিস। ওষুধ লাগাস আর হ্যাঁ, ঠান্ডা লাগাস না। ডাঃ পাল অনেক করে বলে দিয়েছেন। বুঝলি?”
অভিক হাসিমুখে মাথা নাড়ে। মা চলে যান। সে চোখ বন্ধ করে দেয়। বাইরের গাড়ির আওয়াজ আর কিছু অহেতুক শব্দ তার কানে এসে পৌঁছোয়। হসপিটালের গন্ধ তার বন্ধু হয়ে উঠেছে এতোটা যে আলাদা করে আর তাকে খুঁজে পাচ্ছেনা অভিক। সয়ে গেছে। অভিক আন্দাজে উঠে দাঁড়ায়, বেডের ঠান্ডা হাতল আঁকড়ে। আলোয় এসে অভিক টের পায় যেন অন্ধত্ব আর শৈত্য পরষ্পর পরিপূরক হয়ে এই দশ বছর তার সঙ্গ দিচ্ছিল, না বলে কয়ে চলে আসা দৃশ্যতা তাই অভিকের কাছে এখনো পর হয়ে আছে। সে চোখ বুজেই বাথরুমে ঢুকে আসে। হাওয়াই চটিটা ছেড়ে নেমে আসতেই ভিজে চেনা জলীয় বোধটা অভিককে স্বস্তি দেয়। সব ঠিকই আছে। অভিক চোখ খুলেই ছিটকে পিছিয়ে আসে।

আয়না!

বাথরুমের আয়নার মৃদু বাষ্পে দশ বছর জমে আছে অভিকের প্রতিবিম্বের গায়ে। অভিক নিজেকে চিনে নিতে হাত দিয়ে আয়নাটা ঘষে দেয়, নিজেকে চিনে নিতে থাকে।


বাড়িতে অপ্রস্তুত লাগছে নিজেকে, অর্ধচেনা ও অচেনা মানুষগুলো চোখের সামনে অভিকের আলোকপ্রাপ্তিকে প্রায় উৎসবে পরিণত করে ফেলেছে। হঠাৎ এতো বিক্ষিপ্ত দৃশ্যে সে উপচে পড়ছে। ঘরের কোণায় বসে অভিক চোখ বোজে। পারিবারিক আবহাওয়ায় গুমোট হয়ে যায় অভিকের অন্ধকার। অভিক চোখ খোলে। মা সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। “অসুবিধা হচ্ছে? ঘরে যাবি?”
অভিক মাথা নাড়ে।
“আমি কিছুই বদল করিনি, তোর যদি কিছু খুঁজে পেতে অসুবিধা হয়...” মা চলে যান।

অভিক উঠে আসে। বাগানে। চোখ বুজে। আন্দাজে টলতে টলতে ঘাসে পা পড়ে তার। চেনা আরামের সাথে সাথে সে হাওয়ার রূপা-গন্ধ টের পায়। ‘ও এসেছে!’ চোখ বুজেই অভিক জেনে যায় চক্ষুষ্মান হয়ে ওঠার অনুতাপ হালকা হয়ে ঝরে পড়ে গেছে তার গা থেকে।
“আমি জানতাম...”
“তোর চোখ ঠিক আছে তো?”
“আমি জানতাম তুই আসবিই।”
“শুনলাম ডাক্তার ঠান্ডা লাগাতে বারণ করেছে? তুই এসময় বাগানে এলি...”
“কিচ্ছু হবে না আমার! তুই চুপ করে বোস তো...”
“বসলাম।”
“এইবারে আমি চোখ খুলবো, রূপা!”
“না, অভিক আজকে নয়।”
অভিক চোখ বুজে থাকে, তার কপালে আবার বলিরেখা জেগে ওঠে, “কেন? আজ নয় কেন!”
অসহিষ্ণু হাওয়া চলাচল করে বাগানে, ঠান্ডায় অভিক মৃদু কেঁপে ওঠে।
“পরে একদিন না হয় চোখ খুলিস... আজ না।”
“কেন? কেন!? আজ নয় কেন রূপা!”
“তুই ঘরে যা, ঠান্ডা লাগবে তোর।”
“কথা ঘোরাস না, আমি চোখ খুলছি... তোর কোনো বারণ শুনবো না আমি!”
“না...” রেশটুকু মিলিয়ে যায় হাওয়ায়,- অভিকের চোখের সামনে। পাঁচিল ঘেঁষা বেঞ্চে বসে অভিক দেখে কেউ নেই তার পাশে। তার আবছা ঘোর কাটতেই সে দেখতে পায়,- রূপা নয়, পাঁচিলের গায়ে দশ বছর ধরে হুবহু মানুষাকৃতি কিছু শ্যাওলা জড়ো হয়ে আছে,- যাদের সে এতদিন রূপা সাজিয়ে রেখে এসেছে!

অভিক শিউড়ে ওঠে,- ঠান্ডায়। আলোকপ্রাপ্ত অভিক টের পায় এবার তার চাহনি আর শৈত্য পরষ্পর পরিপূরক হয়ে উঠছে। উঠে টলতে টলতে ছুটে আসে সে নিজের ঘরে, চেয়ারে বসে পড়ে। শীতের সাথে সাথে কান্না আসে, গলায় আওয়াজগুলো দফনাতে চেয়েও অভিক ভেঙে পড়ে, সঙ্গে সঙ্গে বাইরের উৎসব তার সমস্ত গোঙানি গিলে নেয়। কাঁপতে কাঁপতে অভিক মাটিতে বসে, হঠাৎ কি মনে হতে টেবিলের ড্রয়ার খুলে হাতড়াতে থাকে।

হিস্টেরেটিক ব্লাইন্ডের ঘরে দশ বছর ব্যাপী অনাবশ্যক প্রতিনিধিত্ব করে আসছিল যে ছোটো আয়নাটা, সেটা বের করে এনে নিজের মুখের সামনে ধরে সে। বহু দিন বাদে নিজের টুকরো টুকরো হয়ে ভেঙে যাওয়া মুখটা সে দেখে, পিতার মত স্নেহে আয়নার প্রতিবিম্বের চোখ থেকে জল মুছিয়ে দিতে থাকে। দশ বছর ভুলিয়ে রাখা কষ্টগুলো অভিকের চোখ থেকে নেমে আসছে হুড়মুড়িয়ে। অসম্ভব শক্ত হয়ে ওঠে তার গা হাত পা, সে ছটফট করতে থাকে। কাঁদতে কাঁদতে নিজের পৌরুষের দিকে করুণাভরে তাকায়। একহাতে চেপে ধরে নিজের যন্ত্রটা, যন্ত্রণার সাথে চালনা শুরু করে, বেগ যতো বাড়ে ততো ভিজে যেতে থাকে অভিক আর অভিকের পুনর্জাত চোখ। একসময় গোঙানির সাথে সাথে তার হাত অবশ হয়ে এসে থেমে যায়।

ঠান্ডায় মাথা ভার হয়ে এসেছে অভিকের, আত্মরতির পর কান্না উবে গিয়ে সে যেন শূন্য হয়ে গিয়েছে। অভিক আবার ড্রয়ারে হাত ঢোকায়, এবার আপাত শক্ত এক খাম বেরিয়ে এল। অভিকের হাত সাথেসাথে রূপার গন্ধে ভরে যায়। লাল,- যেমন হয় এজাতীয় খাম, কোণায় হলুদ- সিঁদূরের ছাপ দেওয়া,অভিক নাকের কাছে এনে বুক ভরে শ্বাস নেয়, হাওয়া সওয়ার হয়ে আবার যেন চাপা কষ্টটা বুকে জাঁকিয়ে বসে, খামের ওপরের ‘প্রজাপতয়ে নমঃ’ লেখাটার প্রেক্ষাপটে অভিকের দৃষ্টি আবছা হয়ে আসে। আবছা হতে হতে একসময় অভিক বোঝেনা চোখে কি জমছে,- অত্যধিক আলো না অন্ধকার। এলোমেলো হাতে সে দুচোখ হাতড়াতে থাকে।