কবি বারীন ঘোষাল। কবিতার বই- সুখের কালক্রম ও সমুজ্জ্বল দুঃখ; মায়াবী সীমূম; সৎকার; হাশিস তরণী; গিনিপিগ, একটি তথ্যচিত্র; আয়ন শব্দ; মুখস্ত ডালিম; লু ইত্যাদি। উপন্যাস- মাটাম; এক ভারতীয় শীত; উদোমডাঙ্গা। প্রবন্ধ- অতিচেতনার কথা। গল্প সংগ্রহ- জিন্দাবাদ খালকো।
কবিতা কেন বিষয়হীন, কবিতায় কেন কবির কোনো বক্তব্য থাকে না, কবিতার কেন মানে নেই, চেনা ছন্দ কেন দেখা যায় না— এসব নিয়ে বিবিধ প্রশ্ন শোনা যায় ইদানিং। কিন্তু আজকের এই ধাপে পৌঁছতে অনেকগুলো সিঁড়ি দিয়ে হেঁটে আসতে হয়েছে বাংলা কবিতাকে। চিরাচরিত আবহমানকে ভাঙার, কবিতাকে গতানুগতিক ট্র্যাডিশান থেকে মুক্ত করার সেই রাস্তাটা কোনো দেশেই, কোনো সময়েই সহজ তো নয়। ‘নতুন কবিতা’র পরীক্ষা-নিরীক্ষাগুলো যখন জোরকদমে শুরু হয়েছিল বাংলা কবিতায়, সেটা গত শতাব্দীর আশির দশকের মাঝামাঝি। এবারের ফিরে পড়া কবিতায় সেই সময়েরই একটি কবিতা।
বারীন ঘোষাল। এই মানুষটির নাম শোনেন নি বাংলা সাহিত্যে এরকম মানুষ বিরলের মধ্যে বিরলতম। প্রতিকবিতা থেকে শুরু ক’রে কবিতালিপিতে প্রশ্নময় তাঁর হাঁটা। কিন্তু, আজ যে তরুণ লিখছেন, (হ্যাঁ, দায়িত্ব নিয়েই বলছি) তাঁরা হয় তাঁকে নামে চেনেন নয়তো বিভিন্ন মানুষের মুখে শোনা কথায়। আজকে যে নবীনরা লিখতে এসেছেন বাংলা ভাষায়, (জ্ঞান দিচ্ছি না) এই মানুষটির লেখালিখিকে তাঁদের মগ্ন-পাঠতালিকায় রাখতে বলব।
‘সৎকার’ ওঁর একটি কবিতার বই। সেখানে ‘সৎকার’ একটি কবিতার নামও। এই কবিতাটি লেখা ফেব্রুয়ারি, ১৯৮৯ সালে (৩০শে মাঘ ১৩৯৫)।
প্রথম প্রকাশিত হয় কৌরব-৫৩’য়, পাগলা সংখ্যায়, মে- ১৯৮৯-এ। কৌরব-৫৭’য় পুনরায় ছাপা হয়েছিল, সেপ্টেম্বর ১৯৯০ সালে, ‘পাঠকের অনুরোধে’ এই ক্যাপশান দিয়ে। বই হয়ে বেরিয়েছিল ফেব্রুয়ারি, ১৯৯১, বইমেলায়। ‘নতুন কবিতা’ পত্রিকার ১ম বর্ষ ২য় সংখ্যায় (এপ্রিল – সেপ্টেম্বর ২০০৩) একটি সাক্ষাৎকারে কী বলছেন বারীন ঘোষাল এই কবিতাটি নিয়ে? না, এই জায়গায় একেবারেই তা অপ্রয়োজনীয় নয়। বাংলা ভাষার একটি অবশ্যপাঠ্য এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি কবিতা ‘সৎকার’।
আজকের তরুণ যাঁরা, যাঁরা ‘অতিচেতনার কথা’র সাথে পরিচিত নন, তাঁদের সুবিধে হবে এ কবিতার পেছনের গল্পটুকু জানা থাকলে। অন্তত জানা দরকার। আরেকটি কথা, কবিতাটি দীর্ঘ। বুভুক্ষু পাঠকের ধৈর্যচ্যুতির অবকাশ থাকবে না আশা করি।
‘‘… ’৮৯ই হবে, আমি কমল (চক্রবর্তী) গোর্কি (কমল চক্রবর্তীর ছেলে) সুশ্বেতা গেলাম বেনারস। বেনারস, কী জায়গা একটা ! গেলে বোঝা যায়, ‘পুরো ভারত’-এরই একটা ছবি। ওইসব একেকটা ঘাট, মানুষ, জ্যান্ত, মড়া, নানারকম নড়াচড়া, পুণ্য অপুণ্য, বিরামহীন মন্ত্রোচ্চারণ, মাঝিরা আর তাদের নৌকো আর নদী, ভারতই পুরো ! তো, সুশ্বেতা কী কারণে যেতে পারেনি। নৌকো ভাড়া করে মাঝগঙ্গায় ভেসে আছি আমি কমল আর ছোট্ট গোর্কি। তো, গোর্কি জলে হাত দিয়ে খেলছে টেলছে। আমি চুপ করে পড়ে আছি। দেখছি চারদিক। শেষ বিকেল। মন্ত্রোচ্চারণ চলছে। জল, মানুষ, মণিকর্ণিকার জ্বলন্ত চিতা। কল্পনার (বারীন ঘোষালের স্ত্রী, ১৯৮৭ সালে তিন বছরের শিশু শুক-কে রেখে অকালে চলে যান। ক্যানসার) কথা মনে পড়ছে। শুকের কথাও। তো, দেখলাম জলের উপর একটা শবদেহ, ভাসতে ভাসতে চলেছে, আর তার ওপর ব’সে একটা কুকুর মাংস খেতে খেতে চলেছে, এক একবার চারদিকে তাকাচ্ছে। জানেও না যে, ওই দেহটা শেষ তো কুকুরটা নিজেও শেষ, চারদিকে অথৈ জল, স্রোত। কুকুরটা জানে না, কিন্তু মানুষ এটা বোঝে। বেনারসের এই পুরো অভিজ্ঞতা এবং কবিতা নিয়ে আমার তখনকার ভাবনাচিন্তা মিলে মিশে একটা বিরাট স্পার্ক। ফিরে এসে একটানা লিখে ফেলি ‘সৎকার’ কবিতাটা। না, ভেবে ভেবে চিন্তা ক’রে ক’রে নয়, এক সিটিং-এ লেখা। সমস্ত চিরাচরিতকে আবহমানকে ক্রমাগত ভাঙতে থাকা। লক্ষ করবি, প্রথম লাইন থেকে ওই অবিরাম মন্ত্রোচ্চারণের ধারাটাকে বারে বারে আঘাত করা হয়েছে, ভেঙে ফেলা হয়েছে স্থা, মৃত্যু আগলে বসে থাকার থেকে বারে বারে নতুনে জীবনে। আমাদের মনোরমার মধ্যে নতুন নতুন প্রাণসঞ্চার, বারে বারে, এই আবিষ্কার… […] ‘সৎকার’ শব্দটাকে ভাব, লক্ষ কর। ব্যাখ্যাকারের চোখে নয়, অভিযাত্রীর চোখে, চেতনার সম্প্রসারণের পথে পা রেখে।’’


সৎকার

হেমন তম্ তাং এ সময়
বিশেষণ ওং স্বাহা
ওং গুণ নির্গুণ যা দেখিনি
তার কথা কেন বাঞ্চোৎ
কেন যায় ঘোড়া যা কুশল
কোকেন প্রণালী চরু
ক্যালেণ্ডার থেকে খুলে যায়
সমস্ত পুজোর মধ্যে
কে বোমার মতো
হাবার শালার মতো ফিকে
মনোরমার তৃতীয় বুকে কিল
মেরে দেখি সাড় যেন
ছিলনা কখনো আর
হেমন ত্বং বলে লিঙ্গ বেঁচে যায়
এই কাঁচা বিসর্জন
ছেলেরা নাচছে আর
থু থু করে ফেলছে ঋতুগুণ
বাকি সব লোপাট হচ্ছে হাঁ মুখে
আগুন ছোবলে
ওং স্বাহা ধুর ও বিধুর

বলে উঠি নেই নাকি?
সৎকার করব তোমার, তাই?
অসৎকার করব আগে, অ-কথাটা
মনে রেখো জুড়ে
কেন ভালো লাগলো
আমাদের মনোরমা কেন লাগলো
পাল মশায়ের আস্তাবলে
যুদ্ধ, হলুদ হেমন তোর
একটা নতুন নাম হবে
এরপরে ভালোবাসা অহেতুক হবে
আমাদের মনোরমা হয়ে উঠতে
ভয় পাবে কাবেরী
গোপার ছোট বোন
মনে নেই, কৃষ্ণা কাবেরী !

মনে নেই সঙ্গম সারাদিন
পাহাড়ে চড়বো বলে
সারাবছরের ব্যায়াম শিক্ষা
হাতির মধ্যে আছি আবার
হাতির বাচ্চার মধ্যেও এই কথা
মনোরমা ফুলজঙ্ঘা মনোরমা
নাভিতে শালবাজুর
সমস্ত পৌষ্টিক আর কস্টিক
খ্যাপলা হাতে ক’টা ক্লান্ত ছবি
আধা পুরণমাসি আধা স্তনে
শিহরতলা প্রেরণা ও লাথি
এসব সবুজ আতর উড়ু
গাঁজা ভাঙ থেকে
গঙ্গাজলের নেশাও বুঝতে হল
তখনই বুঝেছিলাম দিনশেষ
এবার সৎকার হবে পুড়ে যাবে
সময় নিবেদিত প্রথম প্রচারপত্র
যা কখনই নিবেদন হয়ে ওঠেনি
বলে উঠি ওঠেনি নাকি গুরু?
এই মেকী। এই মেকী এই মেকী

নাম কি— কি নাম তোর
আয় সোনা নড়বড় জড়সড়
ঘটাং ঘট ঘটাং ঘট
পাশে জন্মের কথা ভাবা
যেতে পারে যখন যেখানে আছো
ভাবোনা জোনাকি-সরাই জমক
অমলিন হচ্ছে নিম্নচাপ
থাকব, আর পা খুঁজে পাচ্ছি না
আলোরেখা গুণাগার হয়ে উঠল
নিঃশব্দ বলে কিছু নেই
ভাবোনা জলপ্রপাতের শব্দে
বেরিয়ে আসছে নতুন বাচ্চা
মনোরমা কোমর কাপড়ে
জট খুলতে পার—
ছেনা কিছুতেই চেনাচ্ছে
থেকেও নেই বিশ্রী দুটো হাত
থেকে থেকেই ডাকবে বাচ্চাকে
আর মা বাপ হয়ে উঠবে
সূর্য চন্দ্র আগ মার্কা মিথ্যুক
আমাদের মনোরমা মারাতে আসবে
অরাজক বায়ুশমের পশ্চিম পাখিরা

ছন্দে কেন মরতে গেল ঘোড়াটা
আর তার পাখা গজালো সুস্থ
পরিষ্কার দেখলাম পক্ষীরাজকে
উড়ে উড়ে কর্ষণ দাগের ওপর
কেরোসিন লাইনের ওপর
চালাক ও বিরক্ত হওয়ার বদলে
যুদ্ধশেষে মরণোত্তর পদক
ছিনিয়ে নিয়ে গেলো
কোথায় যুদ্ধরে হারামি
যুদ্ধ কাকে বলে ক্ষমাখোর
ক্ষমতার নেশা ছাড়িয়েছে
চণ্ডু চরস চরু প্রিয় চরু
হুক্কা হুয়া হুক্কা হুয়া এই
ক্যানেস্ত্রা আড়ালে সেই হেঁসো
সেই ধান শস্য মুঠো ক’রে
কাটো আর লরিতে তোলো
পাতার তলায় আগুন ধরেও
জ্বলে যাচ্ছে না কিছু
আগুন খেয়ে ফেলেছি
শীতময় সেঁকো শীত খেয়ে ফেলেছি
নীলকন্ঠ অস্ত্রের নিকুচি করেছি
তুমি জানো, মাঠে হিসি ক’রে
দৌড়লে ট্রেন ধরতে যুদ্ধবাজ
ধোঁয়া সব খেয়ে ফেলেছি
গাপ করো বিদূষণ চোখ মোছো
জল থেকে পাহাড়ের বর্ত্ম থেকে
উঠে আসছে নেশাখোররা
পরিষ্কার বাতাসে সাঁতার
কাটছে পক্ষীরাজ আর
বাচ্চাটাকে হাসাচ্ছে

বরফের রাজ্যে এসে আর
গা গরম থাকছে না পায়ে ঘা
নুঙকুতে সাড় নেই চোখে
কালো চশমার ভেতর থেকে
স্বপ্ন গলে পড়ছে সাথে
এতদিনকার নুন পৃথিবী
পাহাড়ে চড়ার জলে ডুবে যাবার
শিক্ষা আমাকে পেয়ে বসেছে
এখন শিখবো আগুন সাঁতার
পাঁচভাগে শুদ্ধ হয়ে উঠবো
এবং তোমাকেও করে তুলবো
বনমহোৎসব দারু জয়
এইসব কবিতার লাইনে লাইনে
তোমাকে খুঁজতে হচ্ছে কি আফশোষ
পলাশ জ্বেলে নিতে হচ্ছে
দিনের বেলাতেও কি আফশোষ
সকাল থেকে সন্ধে পর্যন্ত
পথে পথে এক হাজার মেয়ে
মানুষের মুখ দেখতে হয়
কি আফশোষ মেপে দেখতে হয়
বৃন্ত থেকে বৃন্তের এক বিত্তা
আর কি দেবো আমি সমস্যা
কি দেবো আমরা ফটাস জিন
সাদা অক্ষর সাদা মাটি
সাদা ফল ফুল নৈবেদ্য
বয়স হল ফেরতা দেবার
ফিরে যাও মনোরমা
কথা না কও চুঃ চুঃ
কোকেনীয় বিধিলিপি দেশবিদেশ
কুষ্টিয়া যশোর মেরে আঁকা
উড়ে যাও যত্ন থেকে দূরে

একথা বলি সূর্য পৃথিবী
আর আমাকে এখন
তোমার চাই সৎকার মনোরমা
তার আগে মোটামুটি
শ্রদ্ধেয় মরণ মণিকর্ণিকায়
ধোঁয়ায় পিছলে যায় প্রতিবার
শাটার আর মাঝগঙ্গায়
তোর গলা দেহে তুই ব’সে
মাংস খেতে খেতে তোকেই
তাড়াস তুই শাটার তাড়াস
আমি কি দেখিনি ভেবেছিস
এ শুধুই কোকেন সৎকার?
হাতে ঝাঝরি জল দেবো
চিড়িয়াখানার মধ্যে হাসবে কি
দাঁড়িয়ে দেখবে ফেউ কুবোপাখী
আমাদের মনোহারীওলা
সৎকার সমিতির কাঠগোলায়
হুড়কো পড়েছে আঃ হায়
সমিতি এখন শিশু
ভেবে বসল নৌকোটাকে
গঙ্গার ওপর ওই
হাওয়ায় মোম টোম নিভে গিয়ে
পাচার, গলা মুচড়ে ওঠে

ফেলে দিই ক্যামেরার এসব
পরীক্ষা ম্যাজিক পাতাবাহার ও
অভিমান না-স্বপ্নের
অঞ্চলে এসেও আমাকে
সাহস দিলে না কারানতো
কারানতো বলে পাছায় হাত
রেখে দাঁড়াই অর্দ্ধনগ্নদের মাঝে
কিছু না কিছু ফেলি জলে
নিজেকে ফেলি পুণ্য
পড়ছেই জলে অনবরত
জলে পুণ্য জলে ছাইফুল
কাঠকয়লা অস্থি আলোসার
পেছনে তাকাতে নেই হাঁড়ি
ভেঙ্গেই এগিয়ে যাই জলে
পড়ি মনোরমা এসো তোমার
সৎকার করি

ডোরাকাটার-ভেলকি চোখ
ক্ষিপ্র ও মড়াবসার স্বাদে মুহ্য
মাথায় রেখেছে ঝুঁটি
হাঁটি হাঁটি পা নামটি জানে না
নাম কি বাবা নাম বল নাম বল
আমাকে লক্ষ্য করো স্নেহে
আর্তে কাঙালপনায় বাজুকায়
তাকাও আমার দিকে
যে আকাশ তুলে ধরো আর
মিটিয়ে দাও ময়লা মাটি
সার আলোসার দাও নবীনকে
এসব গস্ত করার মুখব্যাদান
আবার উগরে দেবার ভয়
যখন আমার ভয় করবে
জিটি রোডে চাকুচুম্মা নিয়ে
ধেয়ে আসার হাবামজায়
আধুনিকতার নামে নাকানি চোবানি
মনোরমা এই শেষ সি ইউ
বুঝেছিনু সব্বে রিগিং
ওঙ্ হ্রিং গিরিশিখরাৎ
বেজায় লাফিয়ে পাচ্ছি টিনঢেউ
বরফকলের ছাদে প্রভাতে
ও মণিকর্ণিকায়

কোয়ার্ক সমুদ্র থেকে উঠে এসে
কুকুর বা হাঁসের মতো
গা ঝাড়ি সযত্নে পা-টি মুছি
ও হো-হো এও বুঝলে না
উপমার বেওয়ারিশপনা
দ্বিতীয় প্রচারপত্রে আয়নায়
সেঁটে ব’সে গাছ বেড়ে ওঠে
শিবপাহাড় বরফ ও বাচ্চারা
বেড়ে ওঠে ধর্মে ও শীতে
সোয়েটার মোজা জুতো পরি
বনঅংশে জামাপ্যান্ট
বাংলাদেশের মাথায় ভাসফুলের
মুকুট মাত্র এ’কটা অক্ষর
নানারকমের জোড় ভাঙাগড়া
বারবার প্রমাণ করল
উপমারই বেওয়ারিশপনা
যেমন কোয়ার্কে আছে
আর আছে অপমানিতের

আয়নায় মুখটা একবার দেখে
ঝুপ করে লাফিয়ে পড়ি ট্রেঞ্চে
ক্রমশঃ লাফিয়ে পড়ি আবার আবার
রিপিট লাফিয়ে পড়ি
ভাবতে চেষ্টা করি নিজেই
করছি এসব বিশ্বাস করতে চাই
যে আমি চেয়েছিলাম আমার
দেশের জন্য রাইফেল তুলে ধরতে
লাফিয়ে প’ড়ে ট্রেঞ্চে ওৎ পাতি
কেবল নিজের মুখ মনে পড়ে
নিজের মুখ যে মনে পড়ে
তাই তো জানতাম না
আর বেড়ে ওঠে শব্দনিশ
রাইফেল নলের মুখে দাঁড়িয়ে
মনে হয় বেইমান ট্রিগারে
প্রতিফলনের পথে সরাসরি
ঢুকে পড়ছে ঝরাপাতা
কামানের শব্দে ফোলা হাওয়া
লাগে পাতায় দূরের টেবিলে
গ্লাসে, বেড়ে ওঠে
সোনালি জলের কলকলে

নিজের মুখ যে মনে পড়ে
ওঃ তুলে ধরি রাইফেল
ওঁরাও বাশিরা মাদল কাড়া
সূর্য কাঁটা শীর্ণ হয়ে যাচ্ছে
আকাশে চার বছরের ছেলের
হাতে ক্রেয়ন মাথায় গুলির দাগ
এই ছবি পরপর ঘুলিয়ে ওঠে
একের পর একের পর
ক্রমশঃ মুখটা চিহ্নহীন হয়
সূর্যকাঁটা বেঢপ অসমান
ও শীর্ণ অম্বুর সিপিয়া
পারঙ্গম বোতাম টেপো
শয্যা-আলোর অথবা সেই
বেইমান পরমাণুটির খোলো
জানালা যে তার স্বজাতির বুকে
ছোবল দেবার জন্য বসে আছে
গোলাপ বাগানের নিচে
বিস্ফোরণ আর অগ্নিফলকে
ছবি আর লীলা আর নীলাকাশ
নীলাকাশ বলতে পেরে
কি ভালো লাগছে
যেন ভাত ফুটে উঠলো
এলিয়ে সদ্য ভাতের মতো
ফুটফুটে নতুন থালায় স্মৃতি
লেখা আর বারোটা কাঁটা
ঘিরে ধরেছে সময়কে দ্বিতীয়
প্রহরে ক্রেয়ন কাগজ ময়লা
কুড়োন-শিশুটি নিয়ে গেলো
নাম কি নাম কি বল
বাবা, অস্ফুট বরফ ঝরে পড়ে

এভাবে বিপন্ন অস্তিত্বকে
দেশভাগকে আসলে অবহেলাকেই
বলছি স্বাধীনতা দুঃখকষ্টের
চাপ আনন্দের চাপ এমনকি
মুক্তির জন্যও যে চাপ তৈরি
হয়ে আছে সাফল্য ও কাদায়
যে চাপ ধানমুঠিতে
হেঁসোর হাতলে বা
মানুষের পেটে কুঁচকে যায়
ছটফট করে আর পিছলে
বেরিয়ে যায় হে শিবা
ঐ প্রতিপক্ষে একবার ক’রে
ফসলের রক্ত ধুয়ে যাচ্ছে
আমি এর বিন্দুবিসর্গ জানতাম না
জন্মিলে মরিতে হবে
হে এই যুদ্ধ পরিখার
শ্রমিকগুলির আড়তদার
আমি জানতাম না শূন্য হাতে
ফিরে যাবার সিঁড়িগুলো
ক্ষমা করো চাতুরিগুলো
জানতাম না


উত্তাপ বিফলে যায়
আলোকিত অন্ধকারে
আদর জড়ো করি
চেষ্টা করি এ বিশ্বে
একটা ফুলদানি রাখার সাহস
যে সম্ভাবনার কথা
এতক্ষণ বলছিলাম
পাঁচ আঙুল মেলা একটা
হাত গুঁজে নিয়ে ধাঁ করে
ফুলদানিটা ছিটকে গেল
পেছন পেছন ঐ পক্ষীরাজ
প্রতি বছরের ছেলেরা ফুল হাতে
ভোরফেরী আর পেছন পেছন
ক্ষতপ্রাণ হাসপাতাল
মনোবিদ্যামার্কা শিশুরা
পলাশ মহুয়া ভূমিবসন্ত
তৃতীয় প্রহরের ব্যক্তিগত জাহাজ
ঠেলতে ঠেলতে ঠেলো ঠ্যাল ঠেলো ঠ্যাল
গলিগলিতের মতো জড়ো
দুর্গন্ধ ছড়িয়ে যেতেই থাকে
আমাদের তৃতীয় প্রচারপত্র
ছড়িয়ে যেতেই থাকে
ঘুরে দেখবো সময় পড়ে আছে

জাহাজ হারিয়ে যাচ্ছে
জল রয়েছে স্থির
নিজের মধ্যে নিজেরাই
অণুর পাশে অণু
পরমাণুর অতি পরিচিত
আর একটা পরমাণু
কি করে যে ঠোঁটের কাছে ঠোঁট
বাম স্তনের ওপর পাঁচটা লাল দাগ
জলপ্রপাতের চিহ্ন থেকে গেল
লিঙ্গমুখে কি করে যে
এই ভুল বয়ে হারিয়ে যাচ্ছি
জলে হাঁটার অভিজ্ঞতায়
মাটি পাথর ও বিষয়গুলো
কোয়ার্ক নিয়ে যাচ্ছে কোন অন্ধকারে
আর ছেলেরা আর মেয়েরা
আলো আঘাত করছে যারা
গোলাপি শঙ্খচূড়ো খুঁটে
শরীর শিউরে ওঠে বিষয়কাড়া
অন্ধকার খেলা তরাইকূল
ভালোবিষিবিষি বা পাষাণ বা শানে
ধাক্কা মারো আলো অনালো নিক্তি
সেই গতিতে লাফিয়ে পড়ো তৃতীয়বার
বিশ্ব থেকে ব্রহ্মাণ্ড থেকে
শনি মকরধ্বজ সত্যনারায়ণ
নরনারায়ণ থেকে শস্য থেকে
ক্ষুধা ক্ষমতার পরিত্রাণ
যেন স্বপ্ন থেকে তৃতীয়বার
কোয়ার্ক হাসপাতাল থেকে
লাফিয়ে পড়ো মনোরমা
মোটর সাইকেল থেকে
রোচনা প্ররোচনা তোমার
কিছু একটা হয়ে যাক
ধান মুঠো করে সহ্য হচ্ছে না
হেঁসো চালিয়ে দিই চোখ বুঁজে
মেশিনগান সাবড়ে ফেলি মাঠে

এসো সৎকার করি