এককথায় বলা যায় সে’সময় হল ‘নতুন কবিতা’র। “অতিচেতনার কথা”, “কবিতার ভবিষ্যৎ”, ‘ছাব্বিশ দফা প্রতারণা’ তখনও পড়া হয়নি। “কবিতার ভবিষ্যৎ” তখনও প্রকাশিত হয়নি। ২০০০ - ২০০১ সাল। কিছুদিন আগে পর্যন্তও পাড়ার রবীন্দ্র-নজরুল সন্ধ্যায় কবিতা আবৃত্তি করতাম .. তবলায় ত্রিতাল বাজছে, সাথে “সে ছিল একদিন আমাদের যৌবনে কোলকাতা / বেঁচে ছিলাম বলে সবার কিনেছিলাম মাথা” [‘বাবুমশাই’, শঙ্খ ঘোষ]।
মন্দ লাগে না পারফরমেন্সের পর হাততালি। আর দু-এক বছর আগে, আলি কাকু একটা বই পড়তে দিল- “উন্মাদের পাঠক্রম”।
ম্যাথম্যাটিকস অনার্স পড়তে পড়তে অঙ্কের ভাল ছাত্র আলি হোসেন নকশাল আন্দোলনে যোগ দিয়েছিল। একসময় রাজনীতি ছেড়ে সে বাড়ি ফিরে আসে। অঙ্ক শেখাত আমাকে। সেই আলি কাকু আমাকে “উন্মাদের পাঠক্রম” পড়িয়েছিল। যদিও তার কাছে অন্য কবিতার বই কোনদিন দেখিনি।

কবিতা জনপ্রিয় হবে, “আধখানা চাঁদ আটকে আছে টেলিগ্রাফের তারে” বা “অবনী বাড়ি আছ ?”- হয়ে সে জনতার মুখে মুখে ফিরবে। একটা কবিতার এই ইচ্ছে হতেই পারে। বা কোন কবি সেই জনতার মুখ দেখে পুলকিত হতেই পারেন। প্রশংসা, জনপ্রিয়তা সততই সুস্বাদু। কিন্তু কবিতা লেখার অন্তরালে কোন কবির কি এই ইচ্ছে থাকে ? থাকে নিশ্চয়। তার মদ খাওয়া, পর্যাপ্ত নেশা না হওয়া, অফিসের ইকির-মিকির, অবেলার সমুদ্র বা পাহাড়, নারীকে স্পর্শ করার শিহরণ, অনুভূতি- এ’সবই নিয়েই কবি কবিতায় আসে। তার নিজের মত সেইসব অনুভূতি প্রকাশ করতে চায় কবিতায়। ফলে অনুভূতি তার নিজের .. স্বকীয়। আমার চাঁদের বুড়ি আমারই, আমার বাপ-ঠাকুরদার নয়। কিন্তু জনপ্রিয়তা আর স্বকীয়তার মাঝে এক জটিলতা তৈরি হয়। কারণ শিল্পে অনুভূতি বা তার প্রকাশই একমাত্র গুরুত্বপূর্ণ নয়। ভীষণ জরুরী তার প্রকাশভঙ্গীও। যেকোনো কবিই চান তাঁর সৃষ্টি যেন ইউনিক হয়। অন্তত তাত্ত্বিক আলোচনাতে এই কথাই গ্রাহ্য। কিন্তু তাত্ত্বিক আলোচনাতে যা গ্রাহ্য, সেটাই কি বাস্তবে সর্বদা দেখা যায় ? তাই যদি হয়, তাহলে কেন প্রথা কবিতার ক্ষেত্রে চর্বিতচর্বণ ঘটছিল বাংলা কবিতায় ?

ইন্দ্রনীল (ঘোষ) বলেছিল যে সাম্যদার (সাম্যব্রত জোয়ারদার) লেখা ও প্রথম পড়েছিল ‘দেশ’ পত্রিকায়। তারপর সাম্যদার বই খুঁজতে কলেজ স্ট্রীট। ‘দেশ’ একটা সময় এই ভূমিকা পালন করেছিল। আমাদের বন্ধুদের অনেকেরই প্রায় এ’রকম অভিজ্ঞতা রয়েছে। আমার বাড়িতে নিয়মিত দেশ নেওয়া হত না। পড়তাম শারদীয়া ‘দেশ’।
ক্রমশ আজ আর সেটাও পড়া হয় না। শূন্য দশকের শুরুতেই ‘দেশ’ তার গুরুত্ব হারায়। তার একটা অন্যতম কারণ সাগরময় ঘোষের প্রয়াণ। তবু ‘দেশ’ একটা বাণিজ্যিক পত্রিকা হিসেবে তার উদ্দিষ্ট লক্ষ্যেই এগিয়েছিল – জনপ্রিয়তা। সেখানে কেউ বাঁশিওয়ালা, কেউ তবলচী। তবে গুরুত্বহীনতার আর একটা স্পষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়া যেতে পারে নব্বই-এর দশকের বাংলা গানের দিকে তাকালে। বাংলা ব্যান্ড, সুমন, অঞ্জন, নচিকেতা, শিলাজিৎ নিয়ে তথাকথিত “জীবনমুখী” গানের শুরুয়াদ হয় সে’সময়। “জীবনমুখী” শব্দটা যতই দমবন্ধ করা হোক হাঁফ ছেড়ে বাঁচে বাংলা গান। মান্না-সন্ধ্যা-হেমন্ত� ��র রিমেক, তস্য রিমেক করেও শ্রোতা পাওয়া যাচ্ছিল না। সঙ্কুচিত হয়ে আসছিল বাজার। আর কেবলমাত্র বাজারের তত্বেই নয়, এই নতুন গান বাংলা গানের ভাষাকে পরিবর্তন করে। ছুঁড়ে ফেলে দেয় তার লিরিক্যাল আলস্য। হয়ে ওঠে নতুন সময়ের গান। ব্যান্ডের গান অনেকসময়ই বড় চিৎকৃত, সেখানে জবরদস্তী চলে। কিন্তু দিবস-রজনী পেরিয়ে সফলভাবে সে সময়ের চিহ্ন হয়ে ওঠে।

নব্বই-এর একেবারে শেষের দিকে বা শূন্যের শুরুতে যে কবিতা লেখা হচ্ছিল তার দিকে তাকালেও এই গ্রাফ টের পাওয়া যায়। শূন্যের শুরু থেকে বেরোচ্ছে ‘বৈখরী ভাষ্য” পত্রিকা। তার দ্বিতীয় সংখ্যায় প্রকাশিত অনির্বাণ চট্টোপাধ্যায়ের কবিতার দিকে তাকানো যাক –

                               ক্ষণে
এক কাপ চায়ের বদলে
যদি সোডা একগ্লাস,
শরীর পেত
আমিও অনায়াসে তোমার
খোঁপা এলোমেলো করে
ঘূর্ণন, ঘূর্ণন।
                               দেখাতাম
পালকির ছাদে চাঁদ
                               বইছে চার বেহারা।

(‘কবিতা-১’/ “সিরিজ-১”/ অনির্বাণ চট্টোপাধ্যায় / “বৈখরী ভাষ্য”,২০০১)

কাগজের সরু গলি
পথে স্মৃতি কাহিনী
বৃষ্টি ওদের ধুতে
পারে না; সূর্যও
অক্ষম, নাশকতা
এনে দিল, ব্যর্থ
কবির ছপ্‌ ছপ্‌
                               আলতা ছাপ পা ...
আর কিছু নয় – রাস্তায়
                                                             এনিয়ার গান, অহং
                                                             লেখার মত এক রিম্‌ কাগজ
                                                             যদি হয় ...
(‘কবিতা-৪’/ “সিরিজ-১”/ অনির্বাণ চট্টোপাধ্যায় / “বৈখরী ভাষ্য”,২০০১)

কবিতাদুটি পড়ে যে বিষয়গুলি নজরে আসে -
১. কল্পনাশক্তি (পালকির ছাদে ... চার বেহারা)
২. বর্ণনার ক্ষেত্রে দৃশ্যকল্প-র সীমারেখা অতিক্রম করা।
৩. কবিতার বিস্তারের ক্ষেত্রে লজিক নয়, লজিক্যাল ফ্যালাসিকে প্রশয় দেওয়া।
৪. শব্দ এবং কল্পসূত্র বা কবিতাসূত্রের ক্ষেত্রে কোন নির্দিষ্ট প্যারাডাইম বা ব্যকরণ না মানা।
৫. সেলফ রিফ্লেক্সিভিটি ও ইন্টারটেক্সটুয়ালিটি -র ব্যবহার (ব্যর্থ / কবির ছপ্‌ ছপ্‌ ... রাস্তায় / এনিয়ার গান )
সব ছাপিয়ে আসে “অহং / লেখার মত এক রিম্‌ কাগজ / যদি হয় ...”
এই অহং – যা কোথাও গিয়ে স্বকীয়তাকে ট্রিগার করে তা অনির্বাণকে প্রথাকবিতার আঙিনার বাইরে নিয়ে আসে। পরবর্তীকালে এই ট্রেন্ডই বিস্তার পাবে “লোডশেডিং”-এ। কিন্তু আপাতত এই ট্রেন্ডকে কি anti-poetry বলা হবে ?