রঞ্জন মৈত্র, পরিচয়ের অপেক্ষা রাখে না। এবার তার-ই সাথে কথোপকথন।


কবিতা নির্মাণ না সৃষ্টি ?

' না ' শব্দটি ধন্দে ফেললো। কারণ কোনও সৃষ্টিই নির্মাণ ছাড়া নয়। একটি সজাগ নির্মাণে " আপন মনের মাধুরী " ঠিকঠাক মিশে গেলে তবে সৃষ্টি। একে অপরের পরিপূরক। কবিতার ক্ষেত্রেও তাই। ঠাকুরমশাই খুব নরম পন্থায় মাধুরী শব্দটি ব্যাবহার করলেই মোটেই হাল্কা কথা বলেননি। কল্পনাশক্তি, ঝুঁকি নেয়ার তীব্র ইচ্ছে, অভিযাত্রীর অদম্য আনন্দও, সন্যাসীর উদাসীনতা, শিশুর বিস্ময় এবং চোখ ভর্তি ভালবাসা এই সব মিলিয়েই ওই মাধুরী। বিনির্মাণ-ও নতুন নির্মাণের কাড়নেই, নইলে তা বেকার। শুধুই নির্মাণ সৃষ্টিতে পৌছয় না এবং সৃষ্টিও কোন অলৌকিক দৈবী বস্তু নয়।


কবির আকাঙ্ক্ষা না কবিতার আকাঙ্ক্ষা ?

প্রশ্নটি কি ঠিকমতো বুঝতে পারছি ! আরও অন্য অন্য কবি চাই নাকি আরও আরও অন্যতর কবিতা----- এইরকম যদি হয় তাহলে আমার উত্তর হাঃ হাঃ হাঃ । কিন্তু প্রশ্নটি সরাসরি নিলে------- কবির আকাঙ্ক্ষা চোদ্দ রকমের হতে পারে । কোনটি- ই অস্বাভাবিক বা অমানবিক নয় বলেই মনে কড়ি টবে কোন মন্তব্য কড়ি না । কিন্তু কবিতার আকাঙ্ক্ষা !! শরীরে শিহরন হয় । কবিতারও তবে একটা আকাঙ্ক্ষা থাকে ! কবিতা কি সেই পথেই পূর্ণ চালিত করে কবয়ীকে, জানতে বা অজান্তে, এবং নিয়ে যায় শেষ পঙক্তি অবদি ! নাকি কবি তার নিজের চাওয়া দিয়ে কবিতার আকাঙ্ক্ষাটিকে প্রকৃতই দমিত কোরে চলতে থাকেন নিজের পথে। কিন্তু নিজের পথ ! সেও তো অজানা। প্রতিটি পদক্ষেপে নিজেকেই প্রশ্ন করার, উত্তর খোঁজার এবং আবিষ্কারের।


কবিতার স্কুলিং ?

চারপাশের চলমান জীবন, প্রকৃতি, প্রতিদিনের বাঁচা- মরা, অসংখ্য ছোট বড় আনন্দের ও কষ্টের উৎস, অগ্রপথিক কবিদের অসম্ভব সব উচ্চারণ ও দিগদর্শন, বন্ধু কবিদের নিজের নিজের অনুভব-কলা এই সবই কবিতার স্কুলিং- এর উৎস। এমনকি ওই " কাগজ কে কস্তি, বারিশ কে পানি"- ও।


সমসাময়িক কবিদের সম্পর্কে, বারীন ঘোষাল এবং কৌরব সম্পর্কে রঞ্জন মৈত্র ?

সমসাময়িক কবিদের জন্য যতটা ভালবাসা ততটাই শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা। তাঁরা প্রত্যেকেই নিজস্ব আলাদা কণ্ঠস্বর এবং লিখনশৈলী জ্যান্ত রেখে, কোন ম্যানিফেস্ট ছাড়াই এবং নির্লোভ কলমে কবিতার এক নতুন পৃথিবী গড়ার কাজে যে যোগদান দিয়েছেন, তাঁদের পাশাপাশি চলার প্রশ্রয় না পেলে যে দু- দশখান কবিতা লিখেছি আমি তা সম্ভব-ই হত না কোনদিন।

বারীন ঘোষালকে নিয়ে খুব কিছু বলার যোগ্যতা আমার নেই। চরাচর বাংলায় আজ কবিতার যতরকমের নতুন কাজ হচ্ছে আনন্দে ভালবাসায়, তিনি সেই সবের অগ্রপথিক। তিনি আমাদের দিগ- দর্শক, কিন্তু নিয়ামক বা নিয়ন্ত্রক হতে চাননি কোনদিন। একদিন হয়ত এমনকি বিভিন্ন কবিকে লেখা তাঁর চিঠিগুলোকে নিয়েও সংকলন হবে, যা খুব জরুরি এবং যার জন্য বাংলা বাজারের কোন দাক্ষিণ্যের প্রয়োজন হবে না।

অনেক ছোট বয়স থেকে কৌরব- কে চিনি। ফলে কথাবার্তায় একটু পক্ষপাত থাকবেই। প্রায় চার দশক ধরে এই একটি পত্রিকা বরাবর অন্য সমস্ত কিছুর পাশাপাশি কবিতার নতুনের জন্য, পরীক্ষা নিরীক্ষার জন্য এবং আলাদা উচ্চারণের জন্য একটি প্রশস্ত জায়গা দিয়ে এসেছে কোনও প্রতিদানের আকাঙ্ক্ষা না রেখেই। সঙ্গে ঠেকেছে, পাশে থেকেছে কোন নাম বা গ্রুপ নিরপেক্ষ ভাবেই।


রঞ্জন সম্পর্কে রঞ্জন?    

আত্মবিশ্বাসের অভাব এবং লেখার অনীহা এই দুই বেড়ী থেকে বেরোতেই পারলো না জীবনে


কবিতা ও জনতা ?

এখানে 'জনতা' শব্দটির ব্যাবহার যদি ঠিক বুঝতে পেরে থাকি তাহলে বলার এটুকুই যে, কবিতা স্রেফ মনোরঞ্জনের মাধ্যম, গুরুবাণী, নেতাবাণী, পেঁয়াজের মূল্যহ্রাস কিম্বা ডিএ- র ঘোষণা এর কোনটাই নয়, ফলে জনতার কোন কম্মেই লাগে না এবং সেটা অস্বাভাবিক বা মেধাচ্যুত কিছু নয়।


সুবর্ণরেখা থেকে, সেভেন বেলোর বাড়ি থেকে পরবর্তী যা লিখলে, উত্তরণ না অবনমন ?

সেটা তো আপনাদের মতো গুণী পাঠকের মুখ থেকেই শুনতে চাই স্যার । সব কবি-ই তো উত্তরণের কথা ভেবেই লেখেন। কখনও হয় কখনও হয়না। ক্রমাগত উত্তরণ কিম্বা অবনমন দুটোই সমান বিস্ময়কর। কবির অনির্বাণ অতৃপ্তিই তাঁর সৃষ্টির উত্তরণের চালিকাশক্তি। এখন রঞ্জনের সেটা আছে কিনা রঞ্জন ঠিক বুঝতে পারে না। আপনারা সাহায্য করুন তাকে ।


নতুন কবিতার হাল হকিকত ও পরবর্তী সম্ভাবনা ?

নতুন কবিতা একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। এটি কর্পোরেশনের স্ট্যাম্প নয় যা পাঁঠার পাছায় দেয়া হয়ে থাকে। নতুনতর এবং আরও নতুন সম্ভাবনার দিগদিগন্ত ক্রমশ উন্মোচিত হতে থাকবে নওল কবিদের কলমে এই স্বপ্নটি বুকে ধরেই তো নতুন কবিতার যাত্রা শুরু হয়েছিলো মাধ্যমেই । অমর সেই স্বপ্ন । এবং অনেক নতুন ছেলেমেয়ের কলমে সেই স্বপ্নেরই চলমান জীবনযাপন লক্ষ্য করে বুক ভরে ওঠে। অবশ্য কেউ যদি মিনিবাসের কন্ডাক্টরের সেই বিখ্যাত লবজ " পিছন দিকে এগিয়ে যান "কে অগ্রগতি বা নতুন কবিতার ক্লিশের বিরুদ্ধে সৃষ্টিশীল বিদ্রোহ ভাবেন এবং নিজকে তদ্ভব বিদ্রোহী হিসাবে ক্রমাগত প্রজেক্ট করে তৃপ্তি পান তো তাঁকেও নমস্কার। কোন বিদ্বেষ বা বিরূপ মন্তব্য হাস্যকর হয়ে যাবে।


কবির গদ্য ?

অনেক কবি-ই যখন গদ্য লেখেন, মনে মনে একটা কবিতাই লিখতে থাকেন। ফলে গদ্যটি কিঞ্চিত পরাধীন হয়ে যায় । কেউ কেউ কবি অবশ্য প্রনম্য। তাঁদের গদ্য পড়ে পায়ের ধুলো নিতে ইচ্ছে করে। এখন গদ্য তো নানাবিধও। গল্প উপন্যাস প্রবন্ধ সংবাদলিখন। কবি নিজেকে কবিতা-চলন থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে যখন এগুলি লেখেন তখন সার্থক হয়ে ওঠেন। তবে সমান শক্তিতে দুই মাধ্যমেই সফল হওয়া খুবই কঠিন।


যদি আরেক জীবন পাওয়া যায় , তুমি কি লিখবে ?

আরেক জীবনে বিশ্বাস করি না। তবু যদি ওই শব্দদের মান্যতা দিতে হয় তবে এই প্রশ্নের উত্তর আরেক জীবনে দিতে পারব বলেই মনে হচ্ছে।