(এই লেখা পরিসংখ্যানবিহীন। ভৌগলিক অবস্থাগত খুঁটিনাটি তথ্যাদি বর্জিত। ইতিহাসচেতনা বিমুখ এবং পূর্ণত ব্যক্তিগত। শুধুমাত্র পঞ্চেন্দ্রিয় খোলা রেখে সমকালীন অস্তিত্বে যেটুকু টের পাচ্ছি সিগারেটের ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে বলে ফেলছি...)


Always look around and never trust any woman from the street

ওপরের কথাটা (সাবধানবাণী) দোহা (কাতার)এয়ারপোর্টে একজন আমায় বলেছিল। যখন আমি ওকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম আর্জেন্টিনা সম্পর্কে। লোকটা ছিল আর্জেন্টাইন। আর ওর মুখটা আমার এখনও মনে আছে। শুধু নামটা ভুলে গেছি। ‘Why?’ আমি জিজ্ঞাসা করেছিলাম। “It’s Buenos Aires, Man”। বলে ও কাঁধ ঝাঁকিয়েছিল। হাত উল্টেছিল। ঠোঁট বেঁকিয়েছিল।
রাত সাড়ে নটায় (এখানকার সময়)আমি বুয়েনস্‌ আইরেস এয়ারপোর্টে নামি। আমার নাম লেখা প্ল্যাকার্ড হাতে যে বুড়ো লোকটা দাঁড়িয়েছিল তাকে আমি একজন এক্সিকিউটিভই ভেবেছিলাম। পরে দেখলাম যে ড্রাইভার। এবং ইংলিশ জানে না। একফোঁটাও। এয়ারপোর্টের বাইরে কোম্পানির গাড়ি দাঁড়িয়েছিল। অত বড় গাড়ি আমার নিজের রোজগারে কোনোদিন হবে- এ আশা আমি রাখি না।
3858 লাস হেরাস্‌। কোম্পানির ইমেল মত আমার মাসখানেকের ডেরা। ড্রাইভারকে আগে থেকেই ইনফর্ম করা ছিল। দেখলাম। ঠিকানায় আমার জন্যে অপেক্ষা করার কথা ছিল ম্যাক্সিমোর। ম্যাক্সিমো ভানোনি। পৌঁছে দেখলাম একজন সত্যিই দাঁড়িয়ে আছে। ভাবলাম ম্যাক্সিমো হয়ত। কিন্তু না। সে ছিল কার্লোস। তরুণ যীশুর মত। লম্বা চুল। কাঁধ অব্ধি। জানলাম ম্যাক্সিমোর সহকারী। এবং ইংলিশ জানে। আমার অ্যাপার্টমেন্টের সবকিছু দেখিয়ে- বুঝিয়ে দিয়ে চাবিটা রেখে ও চলে গেল। ফুল ফার্নিশড অ্যাপার্টমেন্ট। স্টুডিও টাইপ। ওয়াই- ফাই আছে। কফি মেকার সাথে ও একটি স্টিরিও সিস্টেম। শেষ দুটোর প্রয়োজন আমার বড় একটা ছিল না ।
ভুল করেছিলাম এবং যথেষ্ট বড় রকম। আমি এয়ারপোর্টে (বুয়েনস্‌ আইরেস)ডলার ভাঙাইনি (অবশ্য এর পেছনে একটা কারণও ছিল। পরে কখনও ফাঁক পেলে বলছি...)।
অন্তত কিছু ডলার ভাঙানো উচিত ছিল। আমার লাগেজ আসতে দুদিন দেরী হয়েছিল। তাই শুকনো খাবার দাবার কিছুই আমার সাথে ছিল না। রাতে কিছু খাওয়াও হয়নি। সাথে ছিল শুধু কিছু জরুরী ডকুমেন্টস আর তিনশ ডলার (হ্যান্ড লাগেজে)।
পরদিন সকালে (রবিবার ছিল)আমি ছোট ছোট ক্যাফে- দোকান গুলোতে ঘুরে চেষ্টা করলাম কেউ ডলার নেয় কিনা! কেউ নেয় না। অগত্যা দুপুরটাও উপবাস।
বিকালে ভাগ্যিস এক কলিগ এল। ওর কাছে কিছু পয়সা (আর্জেন্টাইন পেসো)ধার করে দিন দুয়েকের মত বাজার করলাম। মদ আর সিগারেটও কিনে রাখলাম।

সোমবার, পরের পরের দিন আমার সাথে ম্যাক্সিমোর দেখা হল। খোসা ছাড়ানো আলুসেদ্ধর মত মুখ। তিনবছরের শিশুর মত সারল্যের হাসি। কিন্তু দালাল সর্বত্রই এবং সর্বদাই দালাল।

‘Always look around.’ ফলতঃ চোখকান আমি খোলাই রেখেছিলাম।প্রথম যেদিন আমি এখানকার বাসে উঠে অফিসের রাস্তায় তখনি দেখলাম ফুটফুটে একজন যুবতী। সুঠাম পিচের রাস্তায়। মুখ থুবড়ে। পাশে বাইকটা। পুলিশ ঘিরে রেখেছে। একজন নিচু হয়ে বোঝার চেষ্টা করছে শ্বাস চলছে কিনা। হুম্‌। ট্র্যাফিক জ্যাম। বিশ মিনিটের রাস্তা প্রায় চল্লিশ মিনিট লাগল। মনটাও একটু কেমন হয়ে থাকল।
কিছুদিন পর। অফিস ফেরতা। একটা ছিনতাই। বিকেলের আলোতেই। ছেলেটাকে বারকয়েক দেখেছিলাম। ঘটনাটা ঘটার কিছুক্ষণ আগে। ব্ল্যাক। বেঁটে। মাথায় ক্যাপ। সবসময় মাথা নিচু করে দাঁড়িয়েছিল। আর সরু চোখে এদিক ওদিক মাপছিল। তারপর ও একদম দরজার গায়ে ঘেঁসে দাঁড়িয়েছিল (সচরাচর কেউ দাঁড়ায় না; স্টপেজে দরজা ভেতর দিকে খোলে)।
এরকমই একটা স্টপেজে একটি মেয়ে নামল। আর নামতেই চিৎকার করতে লাগল। কারণ তারই ভ্যানিটি ব্যাগটা ঝেড়ে ছেলেটা একছুটে রাস্তা টপকে উল্টোদিকে একটা গলির ভেতর। সবটাই (প্রায়)আমি জানলা দিয়ে দেখলাম। এর দু-স্টপ পরে আমি নেমে গেলাম। আমার প্রথম ঠিকানায়। জমজমাট ও পশ্‌।

‘Never trust any woman from the street.’ এখনো রাস্তায় কোনো অচেনা মেয়েকে বিশ্বাস করে দেখা হয়নি। যদিও একবার একটু রাতের দিকে একজন নিগ্রো কিশোরী আমায় দুবার ‘Senor, senor’ করে ডেকেছিল। নিশ্চয়ই বলে দিতে হবে না সে ছিল একজন স্ট্রিট হুকার ।।