কাতিউশার জানালা

মেয়েটি থাকে গলির ওপারে। গলিটা খুব সরু নয়, সামনের বিয়ার কারখানার ট্রাক যাতায়াত করে অনায়াসে। তবু আমার জানালা থেকে মেয়েটির ঘরের জানালায় রাখা গোলাপি নীল ফুলগুলো চাইলেই যেন ছুঁতে পারা যায়। মেয়েটির নাম রেখেছি কাতিউশা। সে যখন ঘরে থাকে, তার জানালার নকশি পর্দা আলগোছে উড়ে যায় কখনও-সখনও। কাজ করতে করতে আড়চোখে দেখি, এক হাতে বই আর অন্য হাতে একটা কফি মাগ নিয়ে সে পায়চারি করে। মাঝে মাঝে কফি নামিয়ে রেখে পেন তুলে বইয়ের কোনও নির্দিষ্ট লাইন দাগায়। এখন যেমন তার হাতে একটা চটি বই, পেপারব্যাক কবিতার বই যেমন হয়। আজ সে মেয়ের স্তন ঢেকে রেখেছে তুলতুলে মেঘ আর যোনি সোনালি পশম। কবিতায় তন্ময় হয়ে সে আকাশি বক্ষবন্ধনী খুলে রাখতে ভুলে গেছে। অন্যান্য দিন তার গোলাপি স্তনবৃন্ত আড়াল করে রাখে তার বইয়ের পাতাগুলো, তার হাতের মুদ্রা বা কফির মাগ।
সুন্দর কবিতা পড়লে বুকের মধ্যে চিনচিন করে। এখন সেই চিনচিনে ব্যথাটা ফিরে এলো। কবিতা না লিখে ছবি আঁকতে পারলে এমন করেই আঁকতাম। বাতাসের আলতো ছোঁয়ায় উড়তে থাকা পর্দার অন্যদিকে মেয়েটি আজ যেন নিমগ্ন পরী। মুহূর্তের জন্যে স্থান-কাল ভুলে মুগ্ধ তাকিয়ে রইলাম কাতিউশার দিকে। দৃষ্টি অনুসরণ করে সে-ও তাকাল আমার দিকে। তার চাহনিতে ক্ষণিকের বিস্ময়, তারপর তীব্র বেদনা। বিশ্বাসভঙ্গের। আমি কবিতা-লিখিয়ে, তবু স্বাভাবিক ভদ্রতা-অনুশাসন-আব্রু অতিক্রম করে আর এক কবিতাপ্রেমীর ব্যক্তিগত জানালায় চোখ রেখেছি। কাতিউশা হাতের বইটা দিয়ে যতটা সম্ভব শরীর আড়াল করে এগিয়ে এলো। তারপর আর একবার বিষণ্ণ দৃষ্টিতে আমায় দেখে জানালাটা বন্ধ করে দিলো।

ভেলভেট বিপ্লব

ঘড়ির হিসাবে এখন সন্ধ্যা সাড়ে ছটা। কিন্তু প্রাগে এখন গ্রীষ্ম। সোনালি আলোয় চিকচিক করছে গাছের পাতা, ট্রামলাইন আমার পাশের টেবিলে বসে থাকা প্রেমযুগল। এক কাপ কফি আর একচিলতে পাই নিয়ে এখানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকা যায়। কাগজ-কলম নিয়ে আলগোছে খেলা যায়। কেউ বিরক্ত করে না। মৃদু মন্দ বাতাস ছুঁয়ে যাচ্ছে আমায়। কফিশপের খোলা আঙিনায় বসে চোখ মেলি সামনের মেট্রো স্টেশন থেকে বেরিয়ে আসা ভিড়ের দিকে। স্টেশনের নাম এ্যান্ডেল। যার ইংরাজি মানে হলো এ্যাঞ্জেল। এই স্টেশনটা নাকি সোভিয়েত - চেকোশ্লোভাকিয়ার বন্ধুত্বের প্রতীক হিসাবে বানানো হয়েছিল। এখানে প্রাগের বুকে মস্কোর নামে তৈরি হয়েছিল মস্কেভস্কা। আর ওদিক মস্কোতে প্রাগের নামে বানানো হয়েছিল প্রাজস্কায়া স্টেশন। সে প্রায় ১৯৮৫-৮৬-র ব্যাপার। তারপর একদিন চেকোশ্লোভাকিয়া ক্লান্ত হয়ে গেল এমন সাংস্কৃতিক আদান-প্রদানে। বস্তুত কমিউনিস্ট শাসনের জোর করে চাপিয়ে দেওয়া সমস্ত কিছুর প্রতিই মানুষের বিতৃষ্ণা বাড়ছিল। ১৯৮৯-এর ডিসেম্বরে লাল পতাকার তলা থেকে বেরিয়ে এলো দেশটা। চার দশকের কমিউনিস্ট শাসন মুখ থুবড়ে পড়ল স্বতঃস্ফূর্ত জন আন্দোলনের চাপে। গড়ে উঠলো গণতান্ত্রিক পার্লামেন্ট। ১৯৯০-এর শুরুতে মস্কেভস্কার নাম পালটে রাখা হলো এ্যান্ডেল।

দেশের রাজনৈতিক পালাবদলে যেন দেবদূতের পাখায় এসে বসল সুখ। আমার পাশের ফ্ল্যাটের বুড়ো ক্রাটোকভিলের ঘোলাটে চোখে মোমবাতি জ্বলে ওঠে। “১৭ই নভেম্বর আমাদের ছাত্রদের ধরে পেটালো পুলিশ।” একটা সিগারেট বের করে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে আবার প্যাকেটে রেখে দিলো বুড়ো। “তার আগের দিন ছিল আন্তর্জাতিক ছাত্র দিবস। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নাজ্জি সেনারা এক ছাত্রকে খুন করেছিল। তার পঞ্চাশ বছর পূর্তিতে মিছিল করা হবে এমনটাই ঠিক করা হলো। মিছিল শান্তিপূর্ণভাবেই হয়েছিল। কিন্তু ১৭ই নভেম্বর আবার মিছিল বেরোলো। একদল ছেলে সকালে ঝান্ডা নিয়ে বেরিয়েছিল। সারাদিন তারা শহরে ঘুরে বেড়ালো। কী করে যেন একজন একজন করে তাদের সাথে জুটে গেল। বিকেল ৪টে বাজতে দেখা গেল মোট পনেরো হাজার লোক মিছিলে পা মিলিয়েছে।”
আমি অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে তাকাই – “পনেরো হাজার?”
বুড়ো ধূমপানের তৃষ্ণা আর সামলাতে পারে না। সিগারেট ধরিয়ে টেবিলের এ্যাশট্রেতে পোড়া কাঠি গুঁজে দিয়ে মাথা নাড়ে। তারপর মৌজ করে টান দিয়ে ঠোঁট বাঁকিয়ে একদিকে ধোঁয়া ছাড়ে।
“তার বেশিও হতে পারে। সরকার এতক্ষণ নজর রাখছিল। কিন্তু লোকজন যখন শয়ে শয়ে কমিউনিস্টদের বিরুদ্ধে স্লোগান দিতে দিতে প্রাগে জনস্রোত বইয়ে দিলো, তখন আর তারা সহ্য করতে পারল না। যারা তেতাল্লিশ বছরে দেশে একটাও ইলেকশান হতে দেয়নি, তাদের মতো অসহিষ্ণু শয়তানরা এটা কখনও মানতে পারে? সাড়ে সাতটার সময় রায়ট পুলিশ এসে ছাত্রদের লাঠিপেটা করতে লাগল। সমস্ত রাস্তা বন্ধ করে বেদম মার একেবারে।”
আমি ফুট কাটলাম, “পনেরো হাজার লোককে পেটাতে কত পুলিশ লেগেছিল?”
আমার কথায় গুরুত্ব না দিয়ে ক্রাটোকভিল কৌতুকে মাথা নাড়ে। “মজা হলো, যখন মিছিল ছত্রখান হয়ে গেল দেখা গেল একটা দেহ পড়ে আছে। সে নড়ে, চড়ে না, উঠে বসে না, দৌড়ায় না। মড়ার মতো পড়ে আছে। এ্যাম্বুলেন্স এলো। তার দেহটা তুলে নিয়ে গেল পুলিশের লোকের সাথে।”
আমি ভুরু তুলে জিজ্ঞাসা করলাম, “একটা লোক মরে গেল, সেটা মজার ব্যাপার হলো?”
বুড়ো ঘড়ঘড় করে হাসে এবার। দুদিকে মাথা নাড়তে নাড়তে বলল, “লোকটা মরেনি। অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিল লাঠি চার্জের হুড়োহুড়িতে। লোকটা প্রতিবাদী মিছিলের কেউ ছিল না। কমিউনিস্টদের পোষা কুকুর ছিল। গোপন পুলিশের একজন এজেন্ট। কমিউনিস্টদের বিরুদ্ধে কেউ কিছু বলছে কিনা, কোনও বিরোধী রাজনৈতিক পার্টি মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে কিনা এইসব দেখাশোনা ছিল গোপন পুলিশের কাজ। কোনও বেগতিক দেখলে এরা ধরপাকড় শুরু করত। কাউকে মারধোর করে ছেড়ে দিত। তাতেও না কাজ হলে একেবারে হাপিশ করে দিত। সেদিন মিছিলের ওপরও ওরা নিশ্চয় নজর রাখছিল। সামনের সারিতে যারা আছে তাদের চিনে নিচ্ছিল, পরে দাওয়াই দেবে বলে।” হলুদ দাঁত বেরিয়ে আসে ক্রাটোকভিলের। “যাই হোক, চারদিকে রটে গেল পুলিশের লাঠিতে একটা ছাত্র মরে গেছে। দেহটা তুলে নিয়ে যেতে দেখেছিল একটা মেয়ে। যা হয় আর কী, সে আর কিছু লোককে বলল। তার মধ্যে একজন আবার এক বেতার সাংবাদিকের স্ত্রী। এইভাবে ছাত্রমৃত্যুর খবর দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ল সারা দেশে। পুলিশের মার খেয়ে পালিয়ে যাওয়া জনতা আবার জ্বলে উঠল নতুন উদ্যমে।”
সিগারেটের ছাই ঝেড়ে ফেলে ক্রাটোকভিল জানালার দিকে তাকায়। বাচ্চাদের স্কুলটার ওপরে পতপত করে উড়ছে চেক প্রজাতন্ত্রের জাতীয় পতাকা। “নাজ্জিদের হাতে মরে যাওয়া ছাত্রের পঞ্চাশ বছর পূর্তিতে আর একটা ছাত্রকে মেরে দিয়েছে কমিউনিস্টরা। ভাবতে পারো, দেশের মানুষের মাথায় কেমন মোচড় দেবে এমন খবর? কমিউনিস্ট-নাজ্জি ভাই ভাই জাতীয় চিন্তাভাবনা সেঁধিয়ে গেল সবার মাথায়। প্রথমে ধর্মঘট করল ছাত্ররা আর থিয়েটারের লোকেরা। সারা দেশে জায়গায় জায়গায় মানুষ ধর্নায় বসল। এক সপ্তার মধ্যে শুধু প্রাগেই আট লাখ মানুষ নেমে পড়ল প্রতিবাদে। ব্রাতিশ্লাভায় এক লাখ। সরকারের সাথে আন্দোলনকারীদের কথাও হতে থাকল কখনও কখনও।”
এ্যাশট্রেতে সিগারেটটা গুঁজে দিয়ে বুড়ো আমার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসে। “২৪শে নভেম্বর কমিউনিস্ট সরকারের সবাই ইস্তফা দিলো। তারপর একটা একটা দিন এগোয়, জনতার জয় হতে থাকে। সত্যিকারের সরকার গড়ে উঠল। বিরোধী দল গড়ে উঠল। মানুষ রাস্তায় বেরিয়ে হাতে হাত ধরে হাঁটল। আমি আর আমার বউ পার্কের বেঞ্চে পাশাপাশি বসে থেকেছি সারা বিকেল। গান গাইতে গাইতে সারা রাত আমরা রাস্তায় টালমাটাল ঘুরে বেড়িয়েছি বোতল হাতে। মুক্তির আনন্দে মানুষ পাগল হয়ে গিয়েছিল।”
বুড়োর বলিরেখা আলোয় মাখামাখি হয়ে টানটান। মৃদু স্বরে ঝুঁকে পড়ে আমার দিকে, “সারা যৌবন খাঁচায় কাটিয়ে আমরা তখন আকাশে উড়ছি।” তারপর যন্ত্রণায় ডুবে যায় কণ্ঠস্বর, “ক মাস পরেই কদিনের মাত্র অসুখে আমার বউ মারা গেল।”

ক্রাটোকভিলের বউয়ের অকাল প্রয়াণে কফি হাউস লাগোয়া এই বিকেল বিষণ্ণ হয়ে ওঠে। কফির দাম মিটিয়ে উঠে পড়ি। মিশে যাই এ্যান্ডেল মেট্রো স্টেশনের জনস্রোতে।