উমাপদ কর
জন্ম - ১৯৫৫, বহরমপুর
সম্পাদক - শ্রাবস্তী ও রৌরব কর্মী
প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ - ঋতুপর্বের নাচ, কয়েক আলোকবর্ষ দূরে, পরিযায়ী চল, ভাঙা পিয়ানোর পা, অপর বসন্ত, ধনুক কথায় স্বর

১) কবিতা ও কবিতাভাবনা

কবিতা কবিতাই। এর বেশি কিছু জানি না। সংজ্ঞায় যাকে বাঁধা যায়নি, যাবেনা। দেশ-কাল-পাত্রে যাকে আটকে রাখা যায়না,যাবেনা। তাকে নিয়ে কী বলব? কোনটা কবিতা নয় সেটা বরং বোঝা কিছুটা সহজ। উরেব্বাস, বড় বড় পন্ডিতরা কবিতা নিয়ে ধরতে পরতে চাননি, তো আমি কোন ছাড়। একটা কথা কিছুটা বুঝি, অন্ধকারের যেমন আলোকে চাই আলোর চাই অন্ধকারকে, তেমনি কবির ও কবিতালেখকের চাই কবিতাকে কবিতারও চাই তাদের, কিছুটা কবিতাপাঠকেরও।
কবিতাভাবনা নিয়ে দু-চার কথা হতেই পারে। একদম সার্বজনীন কিছু নয়। একান্ত আমার। কিছুদিন আগেই একটা কবিতা পত্রিকা ঠিক এটাই জানতে চেয়েছিল। আমার কবিতাভাবনা। সেটা কিছুটা বড়। এখানে সেটারই ছোট রূপ।“আমার কবিতা ভাবনায়‘কবিতা’ ভাবনাই। ভাবনাকে প্রকাশ করি অক্ষরে, শব্দ চিহ্নে, বিনিময়ের ভাষায়। যদিও ভাবনার অপার বিস্ময় জটিলতা চলমানতা সূক্ষ্ণতা বহুধা অনুভূতি অনুসৃতি সর্বোপরি রহস্যময়তা ও মায়ার অনেকাংশই অধরা থেকে যায়। অপূর্ণতাই আমাকে ছোটায় বার বার কবিতার কুসুমকলি ফোটাতে।”। “কবিতা তো হয়েই থাকে। সর্বত্র ছিল আছে থাকবে। আমি পঞ্চেন্দ্রিয় ও মনন দিয়ে তা রিলেট করতে পারলেই নির্মাণ প্রকল্পে মস্তিষ্ক ও হাতের কসরৎ। অবশ্যই একটা প্রক্রিয়ার মধ্যে থাকার ফসল। আবেগ একটা বড় ফ্যাক্টর। এবারে ফিলট্রেশন এবং বাদ, আবারো বাদ। কত কিছু যে হয় তখন। জারণ-বিজারণ, জার্মিনেশন, নিগেশন, প্রেসিপিটেশন।
তারপরেও হয়ত কিছুই দাঁড়ায় না। আবার কখনও সামান্যই”। “পাঠকালে পাঠক কবিতাকে আবার পুনঃসৃজিত করেন। কখনও তালে সমলয়ে বেজে ওঠেন, কখনও বেজে উঠতে পারেন না।”। “কবিতা আপাত সাকার, প্রকৃত ধড়চূড়াহীন অবয়বহীন মৌহর্তিক‘ডায়মন্ড রিং’।
কবিতায় আনন্দ ও ভ্রমণ অনিঃশেষ। কোনো বকলমায় যাকে বাঁধা যায়না। রিলে দৌড়ের ফিতেটা সরে সরে যায়..”। “আমার ভাবনায় কবিতা অজড় অযান্ত্রিক অনির্দিষ্ট এবং কিছুটা অনিয়ন্ত্রিতও।” “কবিতার ইতিহাস ভাষার ইতিহাস। সে ভাষা সততসঞ্চরনশীল, গতিময়। সে ভাষা গড়ে উঠলেও থেমে থাকে না। সিনেমার ভাষা, চিত্রের ভাষা যেমন, কবিতারও নিজস্ব ভাষা চাই। সে খোঁজেই থাকি। ধ্বনির কাছে ঋণী হতে ইচ্ছে করে। ইচ্ছে করে প্রকৃতির ভাষাব্যবহারেও।”
প্রশ্নপত্রের প্রশ্নচিহ্নহীন শব্দ ও শব্দ-বন্ধগুলি কী ধরনের প্রশ্নকে
সূচীত করছে অনেক সময় সেটা সঠিক বুঝতে না পেরে, অনুমানে নিজেই প্রশ্ন তুলে
উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করছি।


২) কবিতায় অর্থ, পরম্পরা, অলংকার

কবিতার কোনো অর্থ হয় কিনা এমন সহজ প্রশ্নটা হলে তো এক কথায় বলে দিতাম, না কবিতার কোনো অর্থ হয় না। কিন্তু বুঝতেই পারছি কবিতায় অর্থের ভূমিকার কথাই হয়ত বলা হচ্ছে। অর্থ অর্থে তাৎপর্য ধরলে কবিতাকে অর্থ-বহ হতে হবে, অর্থাৎ যার মধ্যে বিশেষ মানে বা তাৎপর্য নিহিত আছে, তার কোনো মানে নেই। অর্থাৎ ভাবগর্ভ। কিন্তু কবিতা অর্থ-গৌরবের দাবী রাখে নিশ্চিত। অর্থাৎ ভাবের উৎকর্ষ। আবার অর্থ-ভেদ এরও প্রয়োজনীয়তা আছে। অর্থাৎ তাৎপর্যের বিভিন্নতা বা বৈলক্ষন্য। ব্যাখ্যা আমরা যথেষ্ট করি, কিন্তু কবিতা ব্যাখ্যার বিষয়নয়। ভাবানুভবের বিষয়।
পরম্পরা—পরপর বা ধারানুযায়ী। এটি একটি দিকনির্দেশ। আবার একটা ভূমিও(Base)। তো এই ভূমিগত অবস্থান থেকে যে যেদিকে খুশি যেতে পারে। কেউ এগুতে পারে একই সরলরেখা ধরে, কেউ পেছনে যেতে পারে আঁকাবাঁকা রেখায়, কেউ সামনে একটা বড় বাঁক নিয়ে তার মত রেখা টানতে পারে। আবার কেউ ইচ্ছে করলে একটা বড় লাফও দিতে পারে। সে যাই করা হোকনা কেন পরম্পরা বা ভূমিগত অবস্থান একটা থাকেই। পরম্পরা থাকে বলেইতো তাকে ভাঙার প্রশ্ন আসে পছন্দ না হলে।
এখন যে বা যারা লাফ মারল তারা কি পরম্পরাকে অস্বীকার করবে? আমার মতে না।
কারণ পূর্বাপর পরম্পরা তো তার অধীত জ্ঞান বা দর্শন যাই বলিনা কেন, এবং সে ধারামুক্তি চায়, লাফ দেয়। অলংকার—অলংকার আসলে অলংকারই। কবিতা অলংকার হিসেবেই তাকে নেয়। তার বেশি নয়। কথা হচ্ছে, এর প্রয়োজনীয়তা অপ্রয়োজনীয়তা। নির্ভর করে কবিতাকারির মর্জির ওপর, নির্মাণের মেজাজ ও মননের ওপর। তবে অলংকার কিন্তু বাংলা কবিতায় ছিল, আছে, হয়ত থাকবেও। কেননা—অলংকার একটি গুন। এটা ভাষার সৌন্দর্য ও মাধুর্য বৃদ্ধিকারি গুন। যেমন অনুপ্রাস, উপমা, রূপক। যেমন শব্দালংকার, বিশিষ্ট ভঙ্গীর শব্দ বিন্যাস, অনুপ্রাস, শ্লেষ, যমক। বাক্যালংকার, বাক্যের অর্থসন্ধানী। এরা বাংলা কবিতাতে এক সময় বহুল ব্যবহৃত। আজ এদের ততটা সমাদর নেই। অনেকে ব্যবহারে বিরত, অনেকে ব্যবহার করলেও ভিন্ন মাত্রায় করেন, আবার গড্ডলে বিশ্বাসীরা চালিয়েও যাচ্ছেন। নিজের ক্ষেত্রে বলতে পারি, উপোরক্ত অলংকারাদি আমি অনেকদিন এড়িয়ে চলেছি। ব্যবহার করলেও তা চেষ্টা করেছি ভিন্ন মাত্রায় নিয়ে যেতে। তাই বলে অলংকারহীন কবিতা লিখতে পারিনি। কেননা আমি মনে করি আমি যে ভাবনাটা বহন করি তাকে অলংকার পরাই। বলা যাকনা সেটা ভাবনালংকার। আমি যে শব্দের ধ্বনিগুণের কথা ভাবি এবং প্রয়োগের চেষ্টা করি সেটা ধ্বনিলংকার। চিত্রকল্প থেকে যে কল্পচিত্রের দিকে অগ্রসর হই তা কল্পনালংকার। অলংকারের আরেকটা গুণ লক্ষ্য করি। সে যেমন সাজায় তেমনি নিজেও সাজতে ভালবাসে। নিত্য-নতুন তার মডেল চেঞ্জ করে। কবিও মজেন।


৩)কবিতায় যুক্তি-তক্কো-গল্প

কী বলি বলতো! যুক্তি-তক্কো-গল্প কি কবিতা? আমি মনে করি, না। কবিতায় এদের উপস্থিতি কবিতাকে পদে পদে বাঁধা দেয়। যুক্তিনিষ্ঠতা যুক্তির পর যুক্তি খাড়া করে চললে Conclusion এ পৌঁছুতে হয়, যা কবিতায় কাম্য মনে করিনা। তক্ক শুধুই তক্ককে উসকে দিলে কবিতার তাকে প্রয়োজন নেই। আর গল্পটাকেই কাব্যি করে বলার চেষ্টা হলে মনে করি কবিতা লেখার দরকার কী? গল্প লিখলেই হয়।
যুক্তি তার Sublime এ (বিস্ময় উদ্রেককর)থেকে বহুমুখ খুলে দিক। ফাটলও ধরাক। তর্ক আসুক নুপূর পায়ে অনুভব সিক্ত হয়ে। গল্প নৈব নৈব চ, আসুক তার কুহক ঝলক কিংবা আভাস নিয়ে। অভিবাদন জানাব।


৪) কবিতার স্কুলিং ও কাব্য রাজনীতি

কবিতার স্কুলিং এ আমার মোটেও বিশ্বাস নেই। এটা কোনো গুরুবাদী শিক্ষা বা শিক্ষাক্রম নয়। তবে প্রভাবে বিশ্বাসী। প্রথম প্রথম বেশ প্রভাব পড়ে। কারো বেশি কারো কম। যে যত তাড়াতাড়ি প্রভাবমুক্ত হতে পারে তত স্বকীয়তায় পৌঁছায়।
আর অন্ধ অনুকরনকে স্কুলিং বললে তাও আছে বাংলা কবিতায়। সেটা বেশ লক্ষ্য করি। এতে কবির অপমৃত্যু ঘটে। প্রচুর উদাহরণ আছে।

কাব্য রাজনীতি নিয়ে একটি কথাও নয়। যদি থাকত কাব্যে রাজনীতি, তাহলে দু-চারটে কথা বলতে পারতাম। এটা ঠিক, বাংলাবাজারে উক্ত কাব্যরাজনীতির আঁচ পাই। চেষ্টা করি দূরে থাকতে। ভয়ও পাই। রীতিমত শ্রীমতি ভয়ংকরী।


৫) তত্ত্ব কবিতা, প্রয়োগ কবিতা

বিষয়টা ঠিক পরিস্কার নয় আমার কাছে। তত্ত্বটা প্রতিষ্ঠা করার জন্য কবিতা লেখার চেষ্টা হলে তাতে তো তত্ত্বটাই প্রতিষ্ঠা পেল। কবিতা প্রতিষ্ঠা পেলনা। তাহলে তাকে কবিতা বলব কেন? তত্ত্ব প্রতিষ্ঠা করা তো এক ধরনের কোথাও পৌঁছে দেওয়া। কবিতা তো আমাদের কোথাও পৌঁছে দেয়না। কোনো পরিণতি।
ভাবনা কবিতায় প্রযুক্ত হয়। অনুভূতি কবিতায় আশ্রয় এমনকি প্রশ্রয় পায়। এগুলো কবিতা হয়ে উঠলে ও তাকে প্রয়োগ কবিতা বললে আমার সায় আছে। তবে কবিতা লেখার আগে তত্ত্ব বা প্রয়োগ নিয়ে সত্যি যদি কোনো কচকচি থাকে তাকে এড়িয়ে চলাই শ্রেয়। নির্মাণ কৌশল নিয়ে পূর্ব-পরিকল্পনা থাকা এবং কবিতায় তার প্রয়োগ তা অবশ্য যুগ যুগ ধরে হয়ে আসছে। আগামীতেও হবে।


৬) কবিতায় দর্শন

দর্শন, দেখা বা অবলোকন করা অর্থে হলে সেটা তো থাকেই, থাকতেই হবে। আর দর্শন, জ্ঞান হিসেবে প্রযুক্ত হলে বলব বা যা বিশ্বাস করি, তাতে কবিতায় জ্ঞান দেবার দরকার নেই। তবে বিষয়টা এতটা সরলীকৃত নয়। কবিকে বহুদর্শী ভূয়োদর্শী এসব বলা হয়। ঠিকই বলা হয়। তার অভিজ্ঞতা লব্ধ জ্ঞান রসের(বিভিন্ন) ভিয়েনে থেকেই কবিতার দরজা খোলা। সে কেন কবিতায় লীন হয়ে থাকবে না? সে কেন দীপ্তি পাবেনা কবিতায়? কবিরা বহুদূর পর্যন্ত দেখতে পান, বলা হয়। ঠিকই বলা হয়। যে স্বপ্ন আর সম্ভাবনার জাল বোনা, সেতো আগামীর, ভবিষ্যতের। সেই স্বপ্ন আর সম্ভাবনা তো গাছ থেকে পড়েনা। আসে কবির অধীত জ্ঞান থেকেই। কবিকে শ্রেষ্ঠ ভ্রমণকারী বলা হয়। ঠিকই বলা হয়। তার Journeyটা উপভোগ্য হয় তার বহুদেখার আর অভিজ্ঞতার বিচিত্রতায়। তাহলে সেসব থাকবেনা কবিতায়? অবশ্যই থাকে। এখন কথা হল কিভাবে থাকবে। আমি মনে করি, তত্ত্বজ্ঞান এবং যুক্তি ও প্রমাণের ওপর প্রতিষ্ঠিত তত্ত্বের ভিত্তিতে থাকলে কবিতাকে তা ভীষণভাবে খর্ব করে। পোস্টার মনে হয়। কাম্য নয়। আর জ্ঞানের কিরণে থাকলে ছুঁয়ে যেমন যায় তেমনই নিজেকে ঋদ্ধ করে।


৭) কবিতা এবং যৌনতা

যৌনতা এক মহিমময় অনুভূতি। যৌনতা শরীরীর এক আদি ও অকৃত্রিম টান। যৌনতা সাহিত্যের নয় রসের প্রথম ও প্রধান।(বাকিগুলো বীর করুন অদ্ভুত রৌদ্র ভয়ানক হাস্য বীভৎস ও শান্ত)। তো এই অনুভূতি, টান, ও রস ছাড়া কবিতা ভাবা যায়না। ভাববই বা কেন? এতো কোনো অসামাজিক অপরাধমূলক কিছু নয়। অনেক সময় একটি যৌনচেতনা থেকেও একটা কবিতা আবিস্কৃত হতে পারে। সুতরাং ছুঁৎমার্গতার কোনো প্রয়োজন দেখিনা। বহুদিন আগে লেখা(২০০০ সাল) আমার ২য় কাব্যগ্রন্থ ‘কয়েক আলোকবর্ষ দূরে-র একটা অংশ ‘অন্ধকারের কথা-য় প্রায় ৮-১০ টা কবিতায় আমি‘যৌনতা’ আমার মত করে কবিতায় ভেবেছিলাম। এখানে মাত্র একটা কবিতার কয়েকটা পঙক্তি উল্লেখ করছি।
“শরীর বলতে বিন্দু, বিন্দু বিন্দু আলো থেকে/ উঠে আসে বোধের করোটি, আর কিছু/ ক্রোধ, মায়া এবং যৌনতা, বৃক্ষেরা আলাদা/ কিছু নয়, কচিডাবের মত আলো; বাতিদান/ বলতে কিছু নেই, সব বাতি, কয়েকটি আলোকবর্ষ/ দূরে কিছু আলো-প্রজাপতি উড়ে যায়”।


৮) কবিতা ও সিনেমা

দুটো সম্পূর্ণ আলাদা মাধ্যম হয়েও কেন যেন অনেক সাযুজ্য খুঁজে পাই। আমার দেখা অনেক সিনেমা বা ফিল্মএ(খুব কমই দেখেছি) আমি কবিতা খুঁজে পেয়েছি, মনে হয়েছে যেন কবিতা তার দৃশ্যতা আর শ্রাব্যতা নিয়ে হাজির হয়েছে। আবার কবিতা পড়তে গিয়েও অনেক সময় তাকে যথেষ্ট সিনেম্যাটিক বা ফিল্মি মনে হয়। মনে হয় যেন চলছে কাট করছে আবার চিত্রিত করছে, একটা কবিতা যেন একটা চিত্রনাট্যকে বয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে। কেন যে এটা হয় তা এতটা তলিয়ে ভাবিনি। তবে হয়। আর মনে হয় শিল্পের যে কোনো মাধ্যমের সঙ্গেই বোধহয় কবিতার কোনো একটা যোগসূত্র আছে। কখনো প্রত্যক্ষে কখনো পরোক্ষে।


৯) বাংলা কবিতায় মুক্তির দশক

বিংশ শতাব্দীর সাতের দশককে সাধারন ভাবে মুক্তির দশক বলা হয়ে থাকে। এখানেও সম্ভবত তাই নির্দেশিত। এই দশকটির ভারতে বিশেষত পশ্চিমবঙ্গে একটা বিশেষ তাৎপর্য আছে। ৭১ এর ভারত পাকিস্থান যুদ্ধ। উপমহাদেশে একটি নতুন রাষ্ট্রের জন্ম, যে দেশের মানুষ বাংলায় কথা বলে। পশ্চিমবঙ্গ উদ্বাস্তুতে ভরে যায়।
অর্থনৈতিক অবস্থানে দারুন চাপ পড়ে। অভ্যন্তরে নকশাল বাড়ির আন্দোলন পশ্চিমবঙ্গের চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। ৭২ এ যুক্তফ্রন্ট সরিয়ে কংগ্রেস শাসন কায়েম। আন্দোলনের ঢেউ রুখতে শুরূ হয় দমন পীড়ন। আন্দোলনকারীরা স্লোগান তোলে ‘চীনের চেয়ারম্যান আমাদের চেয়ারম্যান’। শুরু হয় মুর্তি ভাঙা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো আন্দোলনের পীঠস্থান হয়ে ওঠে। জেলের পাগলাঘন্টি বেজে ওঠে বিভিন্ন জায়গায়। লাসের পাহাড় জমে। পাড়ায় পাড়ায় খুন হত্যা পুলিশনিধন রাইফেল ছিনতাই। মার্ক্সিষ্টদের উগ্রবাদীরা নরমবাদীদের শত্রু চিহ্নিত করে হত্যা করতে থাকে। কৃষক আন্দোলন ব্যাক্তিহত্যার রাজনীতিতে মোড় ঘোরায়। দেশে জারি হয় ‘জরুরী অবস্থা’।
তার পূর্ন সুযোগে সরকার গনতান্ত্রিক ব্যবস্থাপনাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে, প্রধান রাজনৈতিক দল আন্দোলনের গতিপ্রকৃতিকে নিজ স্বার্থে ব্যবহার করে, রাষ্ট্রিয় শক্তিকে কাজে লাগিয়ে জেলে ভরে, হত্যা-খুন দিয়ে আন্দোলনকে পর্যুদস্ত করে ফেলে। ৭৭ এ রাজনৈতিক
পালাবদল ঘটে। বামফ্রন্ট খমতাসীন হয়। এটুকু বলে সেই সময়কালকে প্রায় কিছুই চিহ্নিত করা যায়না। আর্থ-সামাজিক, সামাজিক, এবং রাজনৈতিক মুক্তিকামী কিছু মানুষের স্বপ্ন ভঙ্গ হয়। তাই এ দশক আমার কাছে যতনা মুক্তির দশক তারও চেয়ে স্বপ্নভঙ্গের দশক বলে মনে হয়। এ সময়টা আমার কৈশোর-উত্তীর্ণ যন্ত্রনার সময়। আমার যৌবন উত্তলতা শুরু হওয়ার সময়। আমি খুব কাছ থেকে এসব দেখেছি। এ সময়েই আমার সামান্য লেখালিখিরও শুরূ। শুরূ পত্রিকা করার। এ সময় মঞ্চে মঞ্চে বিতর্ক, অ-পূর্বকল্পিত ভাষণ, আবৃতি, সেমিনার করে বেরিয়েছি। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সাহায্যার্থে চাল-ডাল জামা-কাপড়, অর্থ সংগ্রহ করে বেরিয়েছি। এত সব কথা বললাম শুধুমাত্র সামাজিক অবস্থানটা কিছুটা তুলে ধরতে। বাংলা কবিতা এর প্রভাবের বাইরে যেতে পারেনি। সম্ভবত যেতে চায়ওনি। উটপাখী হয়ে থাকতে চাননি বেশির ভাগ কবিই। কেউ তীব্র,রাগী,জেদী ভাবে স্থান দিয়েছেন তার ভাবনাকে। কেউ মধ্যপন্থায় বিশ্বাস স্থাপন করতে চেয়েছেন। আবার কেউ নরমভাবে। শ্লেষে বিদ্রুপে রূপকে পাল্টাতে চাওয়ায়। কিন্তু রেখেছেন। এই
দশক বাংলা ক্ষুদ্র পত্রপত্রিকায় ভরে উঠেছিল। ফলে লেখার চর্চায় এসেছিল বান। আবার কবিতার ওপর নেমে এসেছিল রাষ্ট্রিয় কোপ। তার বিরুদ্ধেও ছিল প্রতিবাদ। সবকিছুর পরও বলছি স্বপ্নভঙ্গের শুরুও এই দশক থেকেই। বাংলা কবিতা স্বপ্ন গড়া ও স্বপ্ন ভাঙা দুটোতেই প্রভাবিত হয়েছে।


১০) কবিতা আন্দোলন ও একবিংশ শতাব্দীর কবিতা

গত শতাব্দীতে ‘কল্লোল’ ‘কালি ও কলম’ ‘কৃত্তিবাস’ ইত্যাদি পত্রিকা কেন্দ্রীক কিছু সাহিত্য ভাবনার বাঁক আমরা দেখেছিলাম। এগুলোকে কোনো আন্দোলন বলা হয়ত সঠিক হবে না। ষাটের দশকে বেশ কিছু আন্দোলন আলোড়ন উঠেছিল।
যার মূলে ছিল মূলত কবিতা। যেমন শ্রুতি, হাংরি, নিম, শাস্ত্রবিরোধী ইত্যাদি। কারো ছিল লিখিত, কারো ছিল অলিখিত ম্যানিফেস্টো। এগুলি কোনোটাই দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। বলা ভাল, স্বল্পস্থায়ী। তবে এর কিছু Impact তো ছিল।
সাতের দশকে কাব্য-আন্দোলন তেমন কিছু না দেখা গেলেও একদম শেষের দিকে পোষ্টমডার্ন ভাবনার শুরূ লক্ষ্য করা যায়। আটের দশকের মাঝের দিকে ‘নতুনকবিতা’এই কয়েনেজে কাব্য-ভাবনার শুরু। পরে একটা আলোড়নও তৈরী হয়। প্রায় এই সময়েই ‘পোষ্টমডার্ন কবিতা’ এই কয়েনেজেও আলোড়ন শুরূ হয় যা বিস্তৃতি লাভ করে নয়ের দশকে। নয়ের দশক জুড়ে ‘নতুন কবিতা’ নতুন সব তত্ত্বে একরকম আলোড়ন তুলে ফেলে এবং বিস্তৃত হয়। ‘পোষ্টমডার্ন কবিতা’ বলতে কী বোঝানো হয়, তা আমি খুব ভাল বলতে পারব না। কেননা পোষ্টমডার্ন বলতে আমি এক কালখন্ডকে বুঝি। তাহলে সেই কালখন্ডের সিম্পটম (Symptom) যে কবিতায় থাকে তাকেই হয়ত বলা হয়। আর ‘নতুন কবিতা’ চেয়েছিল ধারামুক্তি। এক কথায় পুরোনো চিহ্ন বর্জিত কবিতা। এই দুয়ের মধ্যে সামান্য কিছু মিল থাকলেও অমিল প্রচুর। নয়ের দশক জুড়ে বেশ কিছু কবি, যারা মিডিয়ার দিকে ঝোঁকেনি কিন্তু কবিতাকে একটা মাত্রায় তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছে, এই আলোড়ন আন্দোলনগুলোতে সিক্ত হয়েছে।
একবিংশ শতাব্দীর কবিরা এ সব কিছুই দেখেছে, শুনেছে, অনেক কবি তা আত্মস্থ করেছে। ফলে সেখান থেকে যতটুকু যা নেবার তাই নিয়ে এদের পথ চলা শুরু। এখন আমার Observation জানিয়ে কথা শেষ করি।
১) এরা যে ভাষাটা ব্যবহার করছে তা পূর্ববর্তী চলন বলন কথন থেকে অনেকটাই আহৃত।
২) এরা কোনো আন্দোলন আলোড়নের লিখিত বা অলিখিত ম্যানিফেস্টো হুবহু না মেনে তার পরিসরগুলোকে কাজে লাগিয়ে এগিয়ে চলেছে।
৩) আটের দশকের পর থেকেই বাংলা কবিতায় উচ্চশিক্ষিত (বিভিন্ন দিকের) ইংরেজী জানা বুদ্ধিদীপ্ত ছেলেমেয়েরা কবিতা লিখতে অগ্রসর হয়ে আসছে।
সে ধারা একবিংশ শতাব্দীতে এসে যেন আরো বেশি করে ঘটছে।
৪) প্রযুক্তিকে এরা দারুনভাবে কাজে লাগাতে পারে। কথাটাকে সরলীকৃত করে দেখলে হবে না। বলতে চাইছি, প্রযুক্তিকে আত্মস্থ করা, মননে আসন দেওয়া, তারপর ব্যবহার করা।
৫) ভাবনার জগৎটাকে অনেক বিস্তৃততো করতে পারছেই তার সঙ্গে নতুন নতুন কায়দা-কৌশল রপ্ত করতে শিখেছে।
৬) এদের কবিতা নির্মাণের মক্সো পিরিয়ড খুব কম সময়ের। হতে পারে এটা গতির যুগের ধর্ম। সব কিছুই একটু তাড়াতাড়ি।
৭) মেধা কবিতা নয়। কিন্তু এরা মেধাকেও ব্যবহার করছে সুচতুরভাবে।
৮) অনেকেই গদ্য-পদ্য-কবিতার সীমারেখা মুছে দিতে চাইছে।
৯)মেনস্ট্রিম বা ধারা কবিতা যাই বলিনা কেন, আর অন্যধারা অপর নতুন কবিতা যাই বলিনা কেন এরা সব গুলিয়ে ঘুলিয়ে একটা অন্য মাত্রা আনছে কবিতায়। মনে হচ্ছে অচিরেই এটাই মেনস্ট্রিম হয়ে উঠবে।
১০) অন্যান্য মিডিয়ার শিল্পবোধকেও এরা কাজে লাগাতে সমর্থ হচ্ছে।
তবে দুটো বিষয়ে কিছু অভাব বোধ করি।
১)বেশির ভাগই বেশি সিরিয়াস। মজাটা যেন হারিয়ে যাচ্ছে।
২) ‘যা ব্যাক্তিগত তাই পবিত্র’
একসময় কবি বুদ্ধদেব বসু বলেছিলেন। যেন তাকে খুব বেশি মান্যতা দিয়ে কবিতা হচ্ছে। সমাজ অর্থনীতি রাজনীতি এসব একটু দূরে দূরে। হতে পারে সময়কালের রাজনীতির স্ব-রূপ এরা একটু তাড়াতাড়িই বুঝতে পেরেছে। হতে পারে কবিতায় এদের ভূমিকা নিয়ে এদের অনেক দ্বিধা কাজ করে।
এই আলোচনায় আমি যে একবিংশ শতাব্দীর গোটা বাংলা কবিতাকেই উল্লেখ করতে পেরেছি তা নয়। এর বাইরেও মিডিয়া লালিত কিছু আছে যা আমি নিজে সেভাবে খুব বেশি পড়িনি বা বিশ্লেষণে এগোইনি।
আমি খুব আশাবাদী। আমি এদের বেশ পড়ি। আনন্দ পাই, বেশ রিলেট করতেও পারি, ভাল লাগে, আগ্রহভরে তাকিয়ে থাকি।


১১) আপনার সাম্প্রতিক একটি লেখা

আমাকে কিসে পেয়েছে? রু তে
ভু আসলে আটকে থাকে রু তেই
ভুতে পেলে পাজামা ভিজিয়ে ফেলতাম নিশ্চিৎ
আমাকে পেয়েছে রু, ফ্রি তে
খানাদানা ফ্রি, সাওনা ভি
আমাকে পেয়ে পেয়ে রু শেষে মুক্তদল
জোড়া ভেঙে জোড়া গড়া পাওয়া
আমাকে পায় ক্রুশ, হাত দুখানা দেখলেই রু র
কথা মনে হতে বাধ্য
আমাকে পায় দ্রাক্ষা
কুঁচকে তারাও রু হতে চায়
রু কে পেতে আমাকে কিসে পেয়েছে জানতে হয়
জানতে হয় শোওয়া শোনা ফ্রি কি ফরমাইসি
আমাকে তামাক পাচ্ছে, তামাকের কোনো রু অবধারিত
আমাকে ভীষণ পায়, ভীষনের বিভীষণ থাকতেও পারে নাও পারে
তার মানে বিভীষণের কোনো রু নেই
ক্রুশ নেই দ্রাক্ষা নেই ফরমাইসি নেই
মাসিক নেই ত্রৈমাসিক নেই ঋ ঋতু কিচ্ছু নেই
রু আমাকে জলখাবারের টেবিল এ প্লাক করতে বলে
বিভী র তাও বাতাসা
আমাকে রু পায় তো আমি পেয়ে যাই রু র রকমফের...।