১৯৩৬ সালে জন্মগ্রহণ করেন বার্ণিক রায়। পেশায় অধ্যাপক ছিলেন। পঞ্চাশের বিশিষ্ট কবি বার্ণিক বিশ্বসাহিত্যের প্রতি উন্মুখ ছিলেন ও একাধিক ভাষায় দক্ষতা অর্জন করেছিলেন। এলিয়টের ‘পড়ো জমি’ তাঁর উল্লেখযোগ্য অনুবাদগ্রন্থ। ‘হবানগের ও রবীন্দ্রনাথের গীতিনাট্য’, ‘উগানবির উর্দু কবিতা’, ‘উইলিয়াম ম্যাসনের কবিতা’ ইত্যাদি বহু গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ রচনা করেছেন। নাটক, উপন্যাস লেখার পাশাপাশি কবিতায় স্বাতন্ত্র্য এনেছিলেন। ‘চিত্রিত ছায়া’ তাঁর প্রথম কাব্যগন্থ। দীর্ঘদিন বিখ্যাত ‘লা পয়জি’ সম্পাদনা করেছেন বার্ণিক রায়। অসুস্থ বৃদ্ধ মানুষটির মস্তিষ্ক আজও তুমুলভাবে সচল। দীর্ঘ কবিজীবনের বিভিন্ন সময়ে তাঁর লেখা কিছু কবিতা এখানে রাখা হলো।

ভুবনডাঙা

তোমরা আমাকে ভুবনডাঙার
ধুলোয় রাঙানো পথের নিশানা দিতে পারো
বহু পথ হেঁটে এসেছি এখানে
বহু গাঢ় জলে সাঁতার কেটেছি
আমার কাপড়জামা শপশপে ভেজা
দু’পা ছড়ে গেছে, রক্ত, মাথায় তেল নেই
অকূল জলের শূন্যে হাঁটছি আমি একা
ভুবনডাঙায় যাবো আমি
সেখানে কোথাও ঘর নেই, বাড়ি নেই, আমি জানি
আছে শুধু মাটি
মাটির ওপরে ছায়া জড়ো করে
আদিম বৃক্ষে আলোর শান্তি
সারা পৃথিবীর নিভৃত জল
বাতাসের গান শোনে চুপ করে
ঘোলাটে জলের বিষানো কান্না ডুবিয়ে মারে না
ভুবনডাঙায় যাবো আমি –


আকাশের নীচে

আশ্বিনের রোদে সারা পৃথিবীর আলো
সবুজ মাঠের মধ্যে স্থির হয়ে দাঁড়িয়েছিলো
ওপরে আকাশে শাদা মেঘের মায়ায় নীল
জলে ঝুঁকে পড়ে নিজেকে দেখছিলো একা –
নির্জন কাশের বনে আধো ন্যাংটো বালকের ঘুড়ি
রঙিন বাতাসে উড়ছিলো আমাকে ভাসিয়ে দিয়ে... বহুদূরের গানের –
শহরের স্কাইস্ক্র্যাপারের মাথায় হঠাৎ গোঁত্তা খেয়ে ঘুড়িটা আটকে গেলো
ছেঁড়া সুতো হাতে বালক দাঁড়িয়ে আছে আকাশের নীচে -


রাজহাঁসের সংসার

কোথাও বরফ নেই, ঠাণ্ডা গন্ধে পুকুরের জল
পাথরের মতো স্তব্ধ। গাছের ছায়ায় দেহ ভাসে
জলের ভেতরে যেন বেদনার ছায়া টলমল।
সমস্ত বাসনা স্থির আকাশের রঙে ফিরে আসে।

গভীরে কান্নার ঢেউ, নীল দুপুরের রাজহাঁস
জানি না কিসের জন্যে হলুদ পাতার দাঁড় টেনে
ভেসে যায় পুকুরের মাঝখানে, জলজ বাতাস
আলোর কাঁপন আনে, হয়তো চেতনা শুধু চেনে।

তারপর আরো স্তব্ধ; হাঁসের নিজের ছায়া পড়ে,
সুপ্ত নীল ইচ্ছা জাগে ছায়ার ভেতরে, এক হয়ে
মিশে যেতে চায় তার দেহ; অদ্বয় ভাবনা নিয়ে,
হাঁসময় জল হতে স্তব্ধ চৈতন্যের রূপ ঝরে।

বাতাসে প্রচণ্ড ঝড়, আলো কাঁপে, মেঘ উড়ে যায়
বৃষ্টি নাচে, অন্ধকার ঢেউ ভাঙে, সজনে পাতার
উদাসী পতন নাচে, জলে ভাসে শূন্য ব্যথা তার,
হাঁসের সংসারে ফিরে খড়কুটো কেঁচো খুঁটে খায়।

রাজহংসী শুয়ে আছে, অতর্কিত ক্লেদ্গন্ধে পূর্ণ
রাজহাঁসের পালক, যেন উত্তাল কান্নার সুরে
রাত্রির গভীর ছায়া নুয়ে পড়ে দেহের গভীরে,
চারিদিকে নিস্তব্ধতা, তবু আলোর আঁধার চূর্ণ।


কাপালিক

কাপালিক হৃদয় আমার!
শান্ত হও, শান্ত হও!
পৃথিবীর বিষতিক্ত প্রচণ্ড আগুন
আমার স্বপ্নের মেঘ পুড়িয়ে দিয়েছে;
বুকের উদ্যানে ফুল, গন্ধ বায়ু জল
শুধু ছাই, কোথাও জলের চিহ্ন নেই।
ভস্মের গোধূলি অন্ধকার,
আমার দেহের শব ভস্মধূলি হয়ে
সমস্ত পৃথিবী ছেয়ে আছে,
শ্মশানের ভালোবাসা চিতার আগুনে
ছাই হয়ে ওড়ে আজ। বুকের শ্মশানে
কার নাচ শুরু হবে, হে আমার প্রেম!
তোমার দুচোখে ভয়, এক হাতে খড়গ
অন্য হাতে টাটকা রক্তে ভীষণ খর্পর;
তোমার মুখের গর্তে লেলিহ আগুন
আমার অধর স্পর্শে পুড়ে ভস্ম হলো
বিশ্বের অনন্ত ভালোবাসা-
চারদিকে চেয়ে দেখি সমস্ত মানুষ ভূতপ্রেত
পিশাচ-বেতাল হয়ে ভেঙেচুরে নাচে।
নগ্নিকা চণ্ডিকা প্রেম, তুমি নাচো, নাচো,
তোমার নাচের ধ্বনি আমার হৃদয়ে ছাই হয়ে
সমস্ত ভুলিয়ে দিক বিশ্বের বাসনা।।


সঙ্কেত

স্থির সময়ের মতো
প্রচণ্ড গ্রীষ্মের শাদা তপ্ত রোদে পৃথিবী জ্বলছে,
কোথাও জায়গা নেই ঘাসে বসবার

খাঁ খাঁ ধু ধু এই রোদে
বাসে করে যেতে-যেতে প্রায়ই আমার চোখে পড়ে
দেহাতি মানুষ এক ঘুমনো শিশুকে কাঁধে নিয়ে
রবীন্দ্রসদন প্ল্যানেটরিয়াম ফাইন-আর্টস
জীবনদীপের বাড়ি টাটাসেন্টার ও উচ্চ হর্ম্য
অবাক বিস্ময়ে দেখে নিয়ত হাঁটছে,
পেছনে-পেছনে তার রঙিন ছোপানো শাড়ি পরে
লাজুক ঘোমটা-ঢাকা স্ত্রী দুপায়ে ফোস্কা ফেলে
খুঁড়িয়ে-খুঁড়িয়ে হাঁটে ঘর্মাক্ত শরীরে ক্লান্ত চোখে,
মায়াময় রহস্যের অদ্ভুত আল্পনা দেখে হাসে।
কৌতূহলে ক্লান্তি নেই, রেড রোডে গাছের ছায়ায়
খানিক বিশ্রাম নিয়ে গড়ের মাঠের রাস্তা ধরে
এসপ্ল্যানেডের দিকে শহিদ মিনারে এসে বসে,
শস্তা কিছু খেয়ে নেয়, তারপর বস্তিতে কোথাও ঘরে ফেরে।

এমন বিস্ময় মেলে কী দেখে, কিসের খোঁজে হাঁটে,
ঘরবাড়ি দেখে দেখে ক্লান্ত হয়, বাড়ির জৌলুশ
কখনো ভেতরে গূঢ় অন্ধকারে টেনে নিয়ে যায়?
অজানা রহস্য, জাদু? কোনোদিন ভেতরে ঢুকতে
পারবে না এরা; তবু, শহুরে আকাশে স্বপ্নময় নীল মেঘ
এদের হৃদয় ঢাকে ছায়ার মায়ায়।
ভেতরে ঢুকবো কিন্তু প্রবেশের দরোজা কোথায়!
বাইরে দাঁড়িয়ে শুধু জীবনকে ক্লান্ত দেখে যাবো?
ভেতরে কী আছে এর, রহস্য আনন্দ, অন্ধকার!
না কি পুষ্পময় শূন্য! রেশমি পর্দার ভাঁজে-ভাঁজে
গোলাপি নীরবতার কোনো গান নক্ষত্র আলোয়
উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে মহাশূন্যে পাখার কাঁপনে!
নিবিড় আশ্লেষে মুগ্ধ সুরাময় তারার তরঙ্গ
ঐশী বেদনার গন্ধ কখনো চমকে দেয়,
চোখের বিদ্যুতে ফোটে সংশয়ের পদ্মরাগমণি,
বন্ধ্যা নিদ্রা টেনে তোলে কালিয়ের ক্লেদময় বিষ
প্রজ্বলন্ত বিছানায় রেশমি হাওয়ার নীরবতা-
ঘরের ঝুলের মধ্যে মাকড়শার লালার বিষ
সমস্ত দেয়াল কালো নোংরা করে দেয় আস্তে আস্তে-
মাটি ইট হয়ে গেলে শিল্পের নির্মাণ ব্যবধান
ভেতরে বাইরে গড়ে-
জলের ফোয়ারা তৃষ্ণা-স্বপ্ন হাঁকে নির্জন দুপুরে।
মঞ্চের আলোয় দোলে সর্বহারা মানুষের নাচ!
অথবা আরও এক অতল রহস্য, যার কোনো
নাম নেই; টপটপ পাহাড়ের জলে যার ধ্বনি
মেঘের আকাশে ভাসে অরণ্যের সবুজ নিশ্বাসে।
বাইরে, আকাশে বাষ্প, ডিজেলের ধোঁয়া, চিৎকার;
জ্বলন্ত সংশয় তুলে জলো ঠাণ্ডা হাওয়া ছুঁয়ে যায়
দিনান্ত শেষের কৃষ্ণচূড়ার হৃদয়
সমস্ত শরীরে মনে; রহস্যের ভেতরে সঙ্কেত!