সিংহ শিকার আমাদের এক প্রিয় খেলা ছিল। তখন চারজন মিলে একটা মেসে থাকতাম। মাটিতে ঢালা বিছানা – আমি, অনির্বাণ, আর্য্য আর অমিতাভ। শিকারি অনির্বাণ। সে’ই মাঝে মাঝে আর্য্যকে সিংহ ভেবে শিকার করত। জঙ্গলে গিয়ে আমরা কেউ কোনদিন সিংহ দেখিনি। আর্য্য’র কথা ঠিক বলতে পারব না, আমরা তিনজন কেউ কোনদিন চর্মচক্ষে মাসাইও দেখিনি। জঙ্গল, সিংহ, মাসাই নিয়ে ভাবালুতা রয়েছে ... বীরের জাত, অজানা পৌরুষ, আশঙ্কা, জঙ্গুলে পাতার বাঁক ... সে ছিল কল্পনার রাজত্ব। রাজকাহিনী না হলেও কোথাও কোন অবন ঠাকুরও ছিল হয়ত। কল্পনাকে কি কবিতা-সূত্র হিসেবে ধরা যায়? এ্যারিস্টটলের অনুকরণের তত্ত্ব অনেকদিনের। বাঁজার তত্ত্ব দিয়ে যেমন বর্তমান সময়ের চলচ্চিত্রের কাছে পৌঁছানো যায় না তেমনই এ্যারিস্টটল। চরকা বুড়ী চাঁদে কেমন ভাবে পা ছড়িয়ে বসত? কেমন ছিল তার চরকা? তার বোনা রেশম যে চাঁদে এক-একদিন দেখতে পাওয়া যায়, তার ছায়ায় সেই অধোবদন মুখটি যাকে স্কুল পেরোনোর পর আর কোনদিন দেখা যায়নি তাকেও দেখতে পাওয়া যায় – একথা ঠিক মানা যেত না। খালি মনে হত দিগন্তের ঐ সীমানাতে বুঝি কবিতা আছে। কিন্তু তাকে চেনা-ছোঁয়া যাবে কিভাবে?

বরাবরই এই প্রশ্ন মানুষকে ভাবিয়েছে। কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী তাঁর ‘কবিতার কী ও কেন’ (দে’জ পাবলিশিং, কলকাতা, ১৯৯৮) বইয়ের প্রথম গদ্যটির শিরোনাম রেখেছেন ‘কবিতা কী। সেখানে জঙ্গলে সিংহ দেখার প্রসঙ্গ আছে, আছে কবি-সমালোচক আর্চিবল্ড ম্যাকলিশের কথা। আর আমাদের ছিল সিংহ শিকার খেলা .. মজা। দিগন্তের ঐ সীমানা টের পেয়েই যেন খুশি, তাকে সন্ধান করার নিবেদনে সে রাজি নয়। বরং অনেকটা মিল আছে নীরেন্দ্রনাথের বলা সেই অন্ধদের হস্তী-দর্শনের গল্পের সাথে – “গল্পের অন্ধরা যখন হাতির বর্ণনা দিয়েছিল তখন তাদের একজন বলেছিল, হাতি হচ্ছে সাপের মতো; একজন বলেছিল, হাতি হচ্ছে কুলোর মতো; একজন বলেছিল, হাতি হচ্ছে থামের মতো; আর যে-অন্ধটি হাতির শুঁড়, কান বা পা ছোঁয়নি, শুধু – হাতি যখন তার পাশ দিয়ে চলে যায়, তখন – আন্দোলিত বাতাসের একটা ঝাপ্টা খেয়েছিল মাত্র, সে বলেছিল যে, হাতি হচ্ছে একটা ঝড়ের মত ব্যাপার।” এই যে পারসেপশন অনুযায়ী কাহিনী বদলে যাচ্ছে, বদলে যাচ্ছে কনক্লুসন।

সে’সময় আমি ও অনির্বাণ যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের চলচ্চিত্রবিদ্যার ক্লাসে যে ছবিগুলো দেখছিলাম তার সাথে এই হস্তী-দর্শনের বেশ মিল ছিল। অন্ধ ছিলাম কিনা তা ভেবে দেখেনি কিন্তু কনক্লুশন নিয়ে তর্ক হত বেশ। সত্যি বলতে কনক্লুশনে পৌঁছানোর তাগিদ আমাদের বা ছবিগুলোর ছিল বলেও মনে হয় না। চলচ্চিত্রবিদ্যার সূত্র ধরে যে সমাজবিদ্যা, কালচারাল স্টাডিজের আলোচনা হত তা কোথাও যেন বলত আমার কথাটা আমি আমার মত করেই বলব। তার জন্য আমাকে ছন্দ শিখতে হবে কেন ? মন্দাক্রান্তা ছন্দ বাংলায় সফলভাবে প্রয়োগ সম্ভব কি সম্ভব নয় – এ কূট তর্কে কি প্রয়োজন? এম.এ ক্লাসের ডিসার্টেশনে এটা নিয়ে প্রবন্ধ লেখা যেতে পারে বা পি.এইচ.ডি প্রস্তাবনা। সুতরাং কবিতার বাকি খুঁটিনাটি, তত্ত্ব -তল্লাশ বাদ দিয়ে প্রায় কবিতার প্রতি-বিন্দুতে দাঁড়িয়ে একধরণের চর্চা চলছিল।

এ’প্রসঙ্গে আমার এক বন্ধুর গল্প মনে পড়ে। সত্যজিৎ রায় ফিল্ম এন্ড টেলিভিশন ইন্সটিটিউট (SRFTI) –এর এ্যাডমিশন টেস্টে সে এডিটিং কোর্সে ভর্তি হওয়ার জন্য পরীক্ষা দিয়েছিল। পরীক্ষা দিয়ে সে খুবই উত্তেজিত ... চান্স পাচ্ছেই। জিজ্ঞেস করায় বলল, প্রিয় এডিটরের নাম ও তাঁর সম্পর্কে লিখতে বলায় সে আইজেনস্টাইন নিয়ে লিখে এসেছে। আইজেনস্টাইন পূর্বতন সোভিয়েত রাশিয়ার প্রখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক। বিশ্ববরেণ্যর মত ভারী শব্দ লিখতে আজকাল আঙুল ওঠেনা, না’হলে তাই লিখতাম। আমার সেই বন্ধুর মতে আইজেনস্টাইন, যার মন্তাজ বিখ্যাত, তাঁকে তো এডিটর হিসেবে উল্লেখ করা যেতেই পারে। তর্কের খাতিরে বন্ধুর এই যুক্তি হয়ত গ্রহণযোগ্য। কিন্তু চলচ্চিত্র এমন একটি মাধ্যম যেখানে বিভিন্ন ব্যক্তির মিলিত প্রচেষ্টার প্রয়োজন ঘটে। পরিচালক তার ক্যাপ্টেন। তাঁর গুরুত্ব এখানেই যে তিনি ছবিটি শেষ হওয়ার আগেই ছবিটি দেখতে পেয়েছিলেন। কিন্তু আইজেনস্টাইনকে এডিটর হিসেবে দেখালে এই বিস্তৃতি সীমাবদ্ধ হয়ে যায়। এবং আমার সেই বন্ধু SRFTI-তে চান্স পায়নি।

সেই সময়ে যে কবিতা-চর্চার কথা বলছি সেখানে inconclusiveness-এর সাথে এই মন্তাজ তত্ত্বেরও একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। সেখানে চিন্তা বা চেতনাকে কবিতার মাধ্যমে এক্সপ্রেস করাই সবথেকে গুরুত্ব পেত। কিন্তু সেই এক্সপ্রেশন বা চর্চা কি এ্যাহিস্টরিক্যাল ছিল? কেমন ছিল বাংলা কবিতার আগাপাছতলা?

----------------
প্রথম কিস্তি এখানে

দ্বিতীয় কিস্তি এখানে