আমি একটি গদ্যে লিখেছি, ‘শূন্যদশকের কবিদের কবিতা পড়তে আমার খুব ভালো লাগে, এদের নিয়েই কাটে সময়। তবে কবিতা নিয়ে ভাবনা বলতে যা বোঝায়, তা নেই আমার কারণ, আমার রিডিং- সকলেই পাঠক নন, তবে অনেকেই পাঠক। শূন্যের প্রেক্ষিতে প্রকৃত পাঠককেও দীক্ষিত হতে হবে; ‘নতুন কবিতার’ কয়েনজ-লব্ধ সম্যগ্ জ্ঞান অর্জন করতে হবে। সেই হিসেবে শূন্য’র কবিদের (বৈখরীভাষ্য শূন্যদশক) কবিতা ভালো লাগলেও- ‘নতুন কবিতা’ এই কয়েনেজটির গূঢ়তা আমার বোধি অদ্যাবধি নিতে পারেনি। সেটা আমার সীমাবদ্ধতার কারনে। আমার সীমাবদ্ধতা হল- ১. আমি ভ্যাজাল কবিতার মোহ ত্যাগ করতে পারিনি। ২. লিরিক ছেড়ে অর্থাৎ কবিতার মূল ধারা ছেড়ে বেরিয়ে আসতে পারিনি। ৩. কবিতার বোধ জীবনে একটা সাধনা- এই বোধোদয় (বৈখরী ভাষ্য/ পৃঃ ১৩২- বারীন ঘোষাল) অদ্যাবধি আমার হল না, হবার চেষ্টাও করিনা। সুতরাং ‘অনেকেই পাঠক’ পর্যায়ের বাইরে সেই ভেজাল পাঠকের এরিনায় আমার অবস্থান।
এই যখন আমার অবস্থা ও অবস্থান, তখনই শূন্য দশকের নতুন কবিতার কবি রমিত দে-র ‘মার্জিনের কাকাতুয়া’ (২০১২, বইমেলা) গ্রন্থটি আমার কাছে এলো। স্বভাবতই ‘নতুন কবিতা’-র বিষয়ে একজন অদীক্ষিত (ভেজাল) পাঠক হিসেবে আমি আমার ভালোলাগার কথাটুকুই জানাবো। দীক্ষিতদের মতন করে নয়। আমি দেখেছি, শূন্য দশকের কবিরা যতই নিজের ‘নতুন কবিতার’ কয়েনেজ-যুক্ত কবি মনে করুন, তাঁদের অনেকের কবিতাই (অংশ বিশেষ হলেও) লিরিক সিক্ত মাধুর্যের অধিকারী বা অক্ষরবৃত্তের (মিশ্রকলাবৃত্ত) চাল তার সচেতনতাকে ডিঙিয়ে কবিতার গায়ে চাদরের মতন লেপটে আছে। অথচ এইসব অপগুন ‘নতুন কবিতা’-র কয়েনেজটিকে ক্ষুণ্ণ করে কিনা আমি জানি না, মানিনা; কারণ, এইসব লক্ষণযুক্ত কবিতা মুক্তি খুঁজতে গেলে শ্রম পণ্ডে পরিণত হতে পারে। তাই ওপথেও আমি যাব না। আমি মার্জিনের এক কাকাতুয়া হয়ে রমিতের কবিতার পাঠে অনুদৃষ্টি দিতে চাই। রমিতের কবিতার ‘ স্বপ্ন আর সামগ্রীর মাঝে চামচ নাড়ানো’-র ধ্বনিচিত্র সনাক্ত করতে চেষ্টা করব। তার আগে যখন, শূন্য দশক শেষ হবার মুখে তখনকার দু-একটি ‘আশাবরী রক্তিম’ খুঁজে দেখিঃ ১. নদী পেরিয়ে শ্যাওলাটে লোকটা লেখা হবে জোনাকি করিডোরে’ সুন্দর দৃশ্যকাব্য; এবং এক অনিশ্চিত সম্ভাবনাময়ের ইংগিত আছে... শীতের খবরের প্রজাপতি হয়ে ওড়ার সম্ভাবনা আছে। ২. যেমন ঘুরছে ঘাসের গন্ধ/ কেউ জানে না/ পাতা উল্টাবার মুহূর্তরা হাত ধরাধরি করে/ নেমে যাচ্ছে বিচ্ছেদ পর্যন্ত।/ অনুপস্থিতি বলে কিছু নেই।’ বৈখরীভাষ্য থেকে লেখা এই পাঁচলাইনের কবিতায় ‘ঘাসের গন্ধ’ জীবনানন্দের কথা মনে করিয়ে দিলেও, ঘাস, তার রাইজোম্যাটিক চলনে যেন- হাতে হাত, আঙুলে আঙুল এক মুক্তশৃঙ্খলার পরিসর তৈরি করেছে। আর পঞ্চম লাইনে দার্শনিক উচ্চারণঃ ‘অনুপস্থিতি বলে কিছু নেই’- তাহলে আধারে আধেয়-র অনুপস্থিতি বা কবিতায় বিষয়ের অনুপস্থিতির ভাবনাই কি এসে যাচ্ছে? শূন্যের পর, অপর বা অপার-শূন্য-... তার পর? তার আর পর নেই... শুধুই অপর; যেমন নতুনের পর আবার নতুন... আবার একই কয়েনেজ- যা পাঠককে বিশেষত ভেজাল পাঠককে বিভ্রান্ত করলেও কিছু করার নেই।

এখনও ঢুকতেই পারলাম না মার্জিনের কাকাতুয়ার ভিতরে, অথচ দরজা খোলা। এবং সেই ‘দরজা খুলে গাছ/ দেখতে গেল সবাই আসছে/ বেশ শব্দ করে মেঝেয় পড়ল ওদের আসা।’ খোলা দরজার পর কেবলি দৃশ্যের জন্ম হয়, -বরফ গলে। রমিতের অনুভবে, শব্দের ভ্রমনে- ‘নতুন কবিতা’-র ভাষা সৃষ্টি হয় নাম কবিতায়, চোদ্দ টুকরো তুলে নেওয়া আনন্দে। সে আনন্দে জল, মাছ, ফুল, ফুলের পন্যতা, ভাত, ধান কাটা মানুষের হাত কবিতার শরীরে নয়- অভ্যন্তরে। কিন্তু ভাই, যাঁরা বলে থাকেন- ‘প্রথমে শ্রাব্যতা, দ্বিতীয়ে দৃশ্যতা মিলে কবিতা তৈরি হয়’- তোমার ‘মার্জিনের কাকাতুয়া’-র চৌদ্দটুকরো মাছের আঁশ ছাড়াতে গেলে ‘শ্রাব্যতা’ ‘নিপুণ রক্তাল্পতা’-য় ভুগতে পারে- এসব ভেবে কি কবিতা হয়, ‘নতুন কবিতা’? আমি ‘নতুন কবিতা’ সম্বন্ধে যেহেতু এমন ছক বাঁধা প্রবণতা বুঝিনে বা মানিনা, তাই এই চৌদ্দ টুকরো সংহত কবিতাগুলির জন্য এক ভিড় অভিনন্দন জানানো ছাড়া গত্যান্তর দেখিনা। কিছু কিছু শব্দ এমনভাবে এসেছে, যা জীবনের, প্রাত্যহিক জীবনের ছবি, অবস্থা- যেমন;
১. ঝড়বাদলার দিনেও ফুলটি উঠে পড়ছে
ক্রেতার দিকে

২. জলে দাঁড়াতেই আমরা কী নিখুঁত অভাবের!
নাকি প্রবেশ আর প্রস্থানের মাঝে
কাদা পায়ে কর ফাঁকি দেওয়া!

ক্রেতা, করফাঁকি শব্দগুলি চিত্ররসের জারকে মিশিয়ে দিয়েছে পন্যতা ও করফাঁকি-র অর্থনীতির দুটো এলাচ, দারুচিনি। এতে কবিতার কোন ক্ষতি নেই, বরং এই নিপুনতাকে আমার মনে আনন্দ দান করেছে। ‘চুরি হবার আগেই তুলে নাও আনন্দ’।
অথবাঃ-
‘ ওইযে নিরঞ্জন এসেছে
ওর সাথে চিত্রার্পিত বেলফুল,’।
নাই বা হল শ্রাব্যতার ধ্বনিচিত্র, জলের পিপাসায় আর্ত যে ‘সুশীল মোষ’ তার বাঁটে জল ঢাললে, সে কতটা শান্তিময় হত, তাও তো জানি না, তবু ভাল লাগেঃ
‘ দু পো জল ঢালছি সুশীল মোষের বাঁটে
তার জিভগুলো ঝুলে পড়ছে নির্মেদ মাটির দিকে’।
মোষের বাঁটগুলো জিভের মতো ঝুলে থাকার যে পিপাসার্ত দৃশ্য রচিত হচ্ছে রমিত দে-র কলমতুলি দিয়ে, তাতে তার শুরুতে শ্রাব্যতা ফোড়নের অভাব ‘নতুন কবিতার’ ‘টেমপ্লেট’ কি কলাইয়ের ডাল গলাতে পারবে? এ প্রশ্ন আমার নয়, যারা নতুন কবিতার একমাত্র টেমপ্লেটকে আঁকড়ে থাকেন, তাঁদের। রমিত নিজে এক জায়গায় (গদ্যে) বলেছেন – ‘নতুন কবিতা’, অন্যত্র ‘অপর কবিতা’।
এক জায়গায় রিজিড থাকেননি। আমার সঙ্গে এখানেই তার মতৈক্য।
‘যা যা হারালো অনুবাদে’ কবিতার ১৫ টি অংশ সংহত কবিতা থেকে রমিত আরো একটু যেন ছড়িয়ে দিল নিজেকে। আসলে অনুবাদ এমন একটা বিষয়, যা আক্ষরিক হয় না। হয়না বলেই, তাকে অনেক কিছু হারাতে হয়। যেমন প্রতিশব্দ, শব্দার্থ ইত্যাদি। আবার হাত ধরতে হয় ভাবানুষঙ্গের, আমিত্বের। এতো ওপরকার কথা –চালাক চালাক। আসলে কবির প্রকৃত মুখের অনুবাদ আয়নায় পাওয়া যায়না; রমিত অদ্ভুত এক বাস্তব, না পরাবাস্তবের আবছা পর্দাটার আভাস এনেছেন অসাধারণ অতিচৈতন্যে। তাই
- ‘ জলে ধোঁয়া হবে দুএকটা আয়না
সারা রাত গুঁড়ো হবে মুখটি কার জানতে চেয়ে’।

কেউ যদি খুঁতখুঁতে ‘নতুন কবিতা’-কামী হন, তাহলে রমিতের কবিতায় তিনি লিরিক্যাল, মিনিংফুলনেস খুঁটে খুঁটে বার করতেও পারেন। আমার ওসব খুঁতখুঁতেমি নেই; তাই মনে হয় রমিত নিজেই যে ছবি তৈরি করেন, পাঠক, পাঠিকাও তাতে ছবির নান্দনিকতায় প্লুত হতে না হতেই ছিট্কে যান অনিশ্চিতির বাস্তবেঃ
‘ফুল থাকতেও পারে
                               পোকাও’
অপূর্ব! এতো সংহত, এতো এতো বিপ্রতীপতা। না oxymoron নয় মোটেই- কিন্তু আমার মতন পাঠক চমৎকৃত হই। ব্যাখ্যা করতে পারব না। মানেও বোঝাতে পারব না হে আমার ক্লাসরুমের ছাত্রগণ। তোমাদের আমি রূপসী বাংলার পাঠদান করেছি, সরলার্থ বুঝিয়েছি। এসব কবিতার সরলার্থও হয়না বক্রার্থও হয়না। এশুধু পাঠের দিন, এ লগন অনুভব করবার...
একভাগ কাঠের সাফল্যে কি করে বুঝবে
ছিটকিনি খুলে ঢুকলো কে?
কে আবার! ভেজাল পাঠক আমার মতন। তাই আমি খুঁজে পাই রমিতের এই কাব্যগ্রন্থে ভাতের গন্ধ, ধানকাটা মানুষের হাড়ের শ্রমানুভবতা এবং
‘পাথরের ওপর বসে থাকতে থাকতেই
আত্মজীবনী লিখে ফেলল জেলেরা
তাদের আসল খেলা জল থেকে বঞ্চিত হওয়া’

খুঁজে পাই রমিতের তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণময় পর্যটন; বরফ থেকে জলের
-‘বেড়াতে যাওয়ার কথা
                               রাখা আছে জলে,’।
এই জল থেকে জেলেদের বঞ্চিত হওয়াও তাঁর নজর এড়ায়না।
আসলে নতুন বা অপর কবিতার মার্জিনের অস্তিত্বকে, তার দৃশ্যকে, বোধকে, ভাবনাকে, ফসলকে, ফুল, পোকা, মাছের টুকরো এবং মাটিকে- যে মাটি ভাতের উৎস- তাকে অসাধারণ শব্দচিত্র ও স্বপ্ন-মধ্যবর্তী ধ্বনি-সঙ্গমে চিত্রার্পিত ও শ্রাব্য করেছেন চায়ের টুংটাং শব্দসঙ্গীতের ছোঁয়ায়; যা আমরা সনাক্ত করতে শিখিনি বলেই বিষয়, বিষয় বলে বিস্ময় প্রকাশ করছিঃ
‘কেবল সনাক্ত করতে শেখনি
স্বপ্ন আর সামগ্রীর মাঝে চামচ নাড়ানো’।

তবে, এভাবেই কেন্দ্রাতিগ ভ্রমণে নিজেকে ছেড়ে দেন সেখানে, যেখানে ‘পিঠ পুড়িয়ে পায়চারী করছে রাস্তা’, নতুন গাছের গল্প নিয়ে ভাড়া বাড়ি ছাড়ছে কেউ.../ আলসের কৌশলে/ লাফিয়ে নামছে নির্বিরোধ বেড়াল’।
এভাবেই আলসে, কার্নিশ, মার্জিন, প্রান্তিকের জন্যই যেন রমিতের ভ্রমণ, ভ্রমণের আলোর ছোঁয়া... যেখানে শেষবারের মতন দুলতে বলেছেন কবি সেই কাকাতুয়া-কে। তবে কবিতা গ্রন্থের শেষদিকে খুনীর আবির্ভাব কবিতাকে, পাঠককে আরও বেশি সচকিত, চিন্তিত করে তোলে, একবার নয় একাধিকবারঃ
১. নতুন জামার ঝুলে সূচ রেখে
ছড়িয়ে পড়ে খুনির হাসি...

২. গভীর হলেই ঘুমিয়ে পড়বে খুনীর কথা
                                                             অনেকটা ভেতরে

৩. দোলো, শ্রাবণের কেনা টেক্কা নিয়ে
                               দড়ি শুকিয়ে শেষবার দোলো
                                                             মার্জিনের কাকাতুয়া...।

কেন ডট ডট-এর পর পূর্ণচ্ছেদ দিলেন? কেন শেষবার দুলে থেমে যাবার আভাস দিলেন কবি?
তবে কি শূন্যদশক পেরিয়ে শূন্য দশকের কবি রমিত দে-র পরবর্তী গ্রন্থে আমরা পেতে চলেছি অন্য কোনো অপর-বাঁকানি?

অলমিতি বিস্তারেণ- নারায়ণ ঘোষ