‘অভিনয় দর্পণ’; প্রধান সম্পাদক: ঋত্বিক কুমার ঘটক। ১৯৬৮’র মে-জুন থেকে ’৬৯-এর জুলাই-আগস্ট, মোট ৮টি সংখ্যা প্রকাশিত হয়ে বন্ধ হয়ে যায় এই পত্রিকা। ‘অভিনয় দর্পণ’-এর ১ম বর্ষ ২য় সংখ্যায় (জুলাই-আগস্ট ১৯৬৮) প্রকাশিত হয়েছিল শম্ভু মিত্রের এই চিঠিটি।
----------------------------

ভাই ঋত্বিক,
    একটা প্রবন্ধ লিখতে বলেছ, নাট্য সম্পর্কে একটা লেখা চাই। কিন্তু কী লিখব? মনে করো একটা লোক না খেতে পেয়ে মারা যাচ্ছে, তখন পাঁচজনে তার মাথার কাছে উবু হয়ে ব’সে যদি আলোচনা শুরু করে যে, তার ভুরুর curve টা ভালোই তবে কিনা বড্ডো wide আর end গুলো একটু undetermined আর colour টা এত light যে balancing টা ঠিক …তাহলে কেমন লাগে?
    নাট্য সম্পর্কেও তাই ! নাট্যমঞ্চ বাঁচবে কী ক’রে তার কোনো চিন্তা নেই, বহুক্ষেত্রেই শুধু ব’সে ব’সে পাত্রাধার কি তৈলাধার জাতীয় আলোচনা। তুমি অবশ্য অলস আলোচক নও, তুমি নিজে কাজ করেছ ও করছো। আচ্ছা বলতো, পৃথিবীর আর কোন্ দেশের খবর তুমি জানো, যেখানে পঁচিশ বছর ধরে পেটে কিল মেরে নাটকাভিনয় করে যেতে হয়, নাটকের মোড় ফেরাতে হয়, নাট্যের রূপ পাল্টাতে হয়, দেশের সম্মান বাড়াতে হয়,— সবই কিন্তু নিখাকী মায়ের নিখাকী সন্তান হয়ে?
    কথাটা কিন্তু কেবল খোরাকীর নয়। কাজ করতে পাওয়ার সুযোগের কথা। নতুন কাজ করবার, ভালো কাজ করবার, সেই সুযোগটাই দিনে দিনে যেন রুদ্ধ হয়ে যাচ্ছে। পঁচিশ বছর আগে যারা শুরু করেছিলুম তারা ভেবেছিলুম যে আমরা যদি আমাদের কাজে সততার প্রমাণ দিতে পারি তাহলে দেশ আমাদের কাজের পথটাকে সুগম ক’রে দেবে। অর্থাৎ দেশের যাঁরা নেতৃস্থানীয়, যাঁরা সমাজের গণ্যমান্য লোক, সমাজের প্রতিনিধিত্ব দাবী করেন, তারাই সমাজের প্রতিভূ হিসেবে আমাদের কাজটাকে সাহায্য করবেন, এই আশা ছিল। দেখা গেল, দেশের সাধারণ লোক করলো। তারা ক্রমশই বর্ধমান হারে এই ব্রাত্য নাট্যকলা দেখতে এল। কিন্তু যাঁদের হাতে সিন্দুক ও বন্দুক তাঁরা গ্রাহ্যই করলেন না। আমরা যে ব্রাত্য সেই ব্রাত্য।
    এমন কি পাড়ার পাগলীর মতো মুখে মাথায় রং মেখে যে-রবীন্দ্রসদনটা দাঁড়িয়ে আছে, যেটার অসংখ্য প্রমাদপূর্ণ মঞ্চ ও প্রেক্ষাগৃহ তৈরি করা হয়েছে আধকোটি টাকা খরচ ক’রে এবং আরো খরচ হচ্ছে, তাকে আজ পর্যন্ত এই নতুন বা ভালো থিয়েটারের জন্য কতোটুকু ব্যবহার করা হয়েছে? একটা খবর তোমাকে বলি। কলকাতা শহরের আরো কিছু বিখ্যাত নাট্যসংস্থার বিখ্যাত শিল্পীদের সঙ্গে কথা বলে,— সকলে মিলে একত্রে যাতে একটা নাট্যপ্রচেষ্টা শুরু করা যায়,— আমি রবীন্দ্রসদনটা দেড় বছরের জন্যে প্রত্যেক রবিবার ও ছুটির দিনগুলো ভাড়া চেয়েছিলুম। রবীন্দ্রসদনের কমিটি বোধহয় গত মাসের শেষ সপ্তাহে এই চিঠি নিয়ে আলোচনা করেছেন। কিন্তু এখনো লিখিতভাবে তাঁদের রায় জানানোর প্রয়োজন বোধ করেননি। আজ এমাসের ১৯ তারিখ। তবে শোনা গেল যে সে আবেদন তাঁরা নাকচ করে দিয়েছেন। আমাদের চিঠির মধ্যে অনুরোধ থাকা সত্ত্বেও কমিটি আমাদের ডেকে একসঙ্গে কোনো আলোচনা করারও প্রয়োজন বোধ করেনি। যেন ভিখিরি এসেছিল দরজায়, কথা না ব’লে দরজাটা বন্ধ ক’রে দেওয়া হল।
    এই তো হল তোমার চেয়ারগত লোকদের ব্যবহার। এর মধ্যে আর কী লিখব, আর কীইবা বলব! মাঝে মাঝে শুধু ব’লে উঠতে ইচ্ছে যায়, পাগল ভালো করো মা, পাগল ভালো করো।
    এখন, যদি নাট্য সম্পর্কে তুমি সিরিয়াস হও, তাহলে তোমরা এই কথাগুলো বলো লোককে। জানাও সকলকে যে Piscator নিজে একটা থিয়েটার পেয়েছে, Brecht একটা থিয়েটার পেয়েছে, Jean Louis Barrault পেয়েছে,— এরকম অনেকে পেয়েছে। কিন্তু এই বাংলা দেশে, যেখানে নতুন ধরনের নাট্যসৃষ্টি প্রথম হল, সেখানে সেই নতুন থিয়েটারের অনেকগুলো শিল্পী একত্রে কাজ করতে চাইলেও মঞ্চ পায় না।
    যদিও এ প্রশ্ন তোলা যায় যে রবীন্দ্রসদনগুলো আসলে কাদের? যারা ভালো থিয়েটার সৃষ্টি করবার চেষ্টা করেছে ও করছে— তাদের, না, অন্য সব লোকদের? তবু রবীন্দ্রসদনটাই আমার বক্তব্যের লক্ষ্য নয়। আমার প্রশ্ন হচ্ছে যে এই দেশের নেতৃস্থানীয়রা কে কী করেছেন? মাঝে মাঝে করপোরেশন হুমকি দেয় খাজনা বাড়াবে, মাঝে মাঝে সরকার হুমকি দেয় নতুন আইন করে অভিনয় আটকাবে, আর নয়তো দলীয় রাজনীতির প্রশ্রয় দেয় নানা প্রকারে। অথচ অন্যদিকে প্রত্যেক নাট্যমঞ্চের ভাড়া বাড়তে বাড়তে চলে। খবরের কাগজের বিজ্ঞাপনের দাম বাড়তে বাড়তে চলে, ঠেলাওয়ালা থেকে আলো বালব্ পর্যন্ত সমস্ত জিনিসের দাম বাড়তে বাড়তে চলে। এর মধ্যে কী ক’রে যে ভালো নাট্যপ্রয়াস টিকবে তা বলতে পারো? অথচ সমাজের গণ্যমান্য লোকেরা পিঠ চাপড়ে যান, বিগলিত বৈষ্ণবহাসিতে বলেন— চালিয়ে যান, চালিয়ে যান, আপনারাই যা হয় কিছু করছেন, অন্য সব দিকে তো—।
    বলে পরিতৃপ্ত নিশ্চিন্তমুখে বেরিয়ে যান। (হয়তো সেই ‘অন্যসব দিকে’-র চোরাপথগুলোর লুব্ধ সন্ধানে)।
    যাকগে, নিজেদের কথা নিজমুখে আর কতো বলব। আর, বলা উচিতও নয়। তোমরা যদি মনে করো যে এসব নিয়ে কিছু খোঁজ করা উচিত, কিছু জানা উচিত, এবং সেইগুলো লোককে জানানো উচিত, তাহলে তোমরা কর। আমার অনেক বয়স হয়ে গেল।
    তাই বলছি, লিখব কী বলো? মাপ করে দাও। তোমার কাগজের সর্বাঙ্গীন মঙ্গল হোক এই কামনা করি।

    ইতি
    শম্ভু মিত্র
    ১৯/৭/৬৮