জন্ম : ১৯৩৯।
বাংলা সাহিত্যের সিরিয়াস পাঠকের কাছে নতুন করে তাঁর পরিচয় দেবার নেই। অতীন্দ্রিয় পাঠকের উল্লেখযোগ্য ছোটগল্পের বই — নির্বাচিত গল্প (১,২,৩), ভাস্কর্য মানুষ, আলাদা আলাদা পৃথিবী, লক্ষ উপলক্ষ। উপন্যাস — যাবতীয় কমল, বৃত্তমিছিলে মানুষেরা ও পবন সেন, প্রগতি পুরাণ, মিছিল পুরাণ। বেশ কিছু প্রবন্ধের বই আছে তাঁর — শব্দ ও রহস্য এবং অন্যান্য, শাস্ত্রবিরোধী আন্দোলন ও অন্যান্য বিষয়, মানুষ এখনও চলছে। সম্পাদনা করেছেন — গল্প এক দশক, অব্যয় গল্প। এছাড়াও অব্যয় সাহিত্য পত্রিকার দীর্ঘদিনের সম্পাদক। লেখকের এই গল্পটি ‘আহবকাল’ পত্রিকার ২০০৩ সালের বইমেলা সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছিল।


যে যেখানে দাঁড়িয়ে

টি.ভি.-তে সিরিয়াল দেখছে বরুণ ও তাপসী। দুপুরে খাওয়ার পর দুজনেই এই সিরিয়ালটা দ্যাখে। ওরা সবসময় একসঙ্গে বসে টি.ভি. দ্যাখে এমন নয়। বরং দুজনের পছন্দ আলাদা, যার-যার মতো সময় করে আলাদা-আলাদা সিরিয়ালগুলি দেখে নেয়। কিন্তু কীভাবে যেন এই সিরিয়ালটায় দুজনের পছন্দ মিলে গেছে। নিয়ম মতো পর্বগুলি দেখে আসছে, একটাও বাদ যায়নি। দ্যাখার সময় পাশাপাশি বসে না, একজন মুখোমুখি তো অন্যজন লম্বভাবে, বিপরীতটাও হয়। তখন কেউ কারও সঙ্গে কথা বলে না, গল্প, চরিত্র বা ঘটনাগুলি নিয়ে কেউ কোনওদিন কোনও মন্তব্যই করেনি। সিরিয়াল চলাকালীন তো নয়ই, আগে বা পরে তার বিষয় নিয়ে ওদের মধ্যে কখনও আলোচনা হয় না। শুরু হওয়ার সময়ও কেউ কাউকে ডাকে না, সময়মতো যে-যেখানে পারে বসে পড়ে। তখন মাঝখানে যেন অদৃশ্য একটা দেয়াল, শেষ হলে যে-যার মতো উঠে চলে যায়। বিভিন্ন সময়ে সংসারের বা অন্য বিষয়ে আলোচনা অনেক হয় কিন্তু এই সিরিয়ালটা যে দুজনে একসঙ্গে দেখছে, ওদের ব্যবহারে কোনওদিন তা প্রকাশ পায়নি।
সিরিয়ালটার নাম ‘যে যেখানে দাঁড়িয়ে’। ঠিকই, চরিত্রগুলি অনেক ঘটনায় জড়িয়ে পড়ছে, কিন্তু যে-যার নিজস্ব অবস্থানেই দাঁড়িয়ে থাকে। গল্পটায় চতুর্ভুজ প্রেম। রেখা-বিন্যাসে যদি ভাবা যায়,— একটি আয়তাকার ক্ষেত্র। সমান্তরাল দীর্ঘ রেখা দুটি দুজন মহিলার, একজন বিবাহিতা, অন্যজন অবিবাহিতা। নীচের সরলরেখা বিবাহিতা মহিলার, সন্দেহবাতিক হলেও যেহেতু তার সংসার আছে, নিজের অবস্থানে দৃঢ়বদ্ধ। ধৈর্য ধরতে হচ্ছে তাই রেখাটি দীর্ঘ। ওপরের সরলরেখোও দীর্ঘ, হাল ছাড়ার পাত্রী নয় সে। কিন্তু দুটি পুরুষের সঙ্গে সম্পর্ক থাকার কারণে সাময়িক নড়াচড়া করে, কিন্তু তারপরেই পুরোনো অবস্থানে ফিরে আসে। বাঁদিকের হ্রস্বরেখা অবিবাহিত পুরুষের, বিবাহিতা মহিলার সঙ্গে সম্পর্ক গভীর, কিন্তু অবিবাহিতা মহিলার সঙ্গে সম্পর্কে দোলাচল ভাব আছে, ফলে কখনও-কখনও বেঁকে যায়, কিন্তু একেবারে নয়। ডানদিকের হ্রস্বরেখা বিবাহিত পুরুষের, সংসারে স্ত্রীর সঙ্গে সম্পর্ক দৃঢ় হলেও অবিবাহিতা মহিলার সংস্পর্শে বিচলিত হয়, ফলে কখনও-কখনও তাঁকেও বেঁকে যেতে হয়। অতএব সামগ্রিক রেখা-অবস্থানটি সাধারণভাবে আয়তাকার থাকলেও, কখনও স্থূলভাবে, কখনও সূক্ষ্মভাবে, ডানদিকে অথবা বাঁদিকে সমান্তরালভাবেই ক্ষেত্রটিকে নড়ে যেতে লক্ষ করা যাচ্ছে।
সবমিলিয়ে গল্পটা এরকমই এগোচ্ছে। কখনও স্থির, কখনও নড়াচড়ার ভেতরে, কখনও সন্দেহযুক্ত, কখনও সন্দেহমুক্ত,— পর্বের-পর-পর্ব ধরে এই গল্পটাই বেড়ে চলেছে। দর্শকদের টানটান ধরে রাখতে এই দুটি প্রক্রিয়ায় পালাবদলের পালা— এই সিরিয়ালের এটিই মুল অবলম্বন। শেষ হবার লক্ষণ নেই, অনন্তকাল চলতে পারে এই গল্প, ফলে বরুণ ও তাপসীকেও নির্দিষ্ট সময়ে প্রতিদিনই টি.ভি.-র সামনে বসে থাকতে হচ্ছে, কেউ সরাসরি দৃষ্টি রেখে, কেউ লম্বভাবে দৃষ্টি রেখে।
একদা রমলা ও বরুণের দাম্পত্য সুখ ছিল। একসঙ্গে সিনেমা যাওয়া, বেড়াতে যাওয়া, বিছানায় শুয়ে কত খুনসুটি, মজা। এ-সব মাঝে মাঝে অতীত-দৃশ্যে এসেছে। এখন ওদের তিক্ত সম্পর্ক। বরুণ নামটা এক হলেও দুজনের মধ্যে কী নিদারুণ অমিল।— তাপসী ভাবে। আর বরুণ ভাবে, তাপসীও তো রমলা হতে পারত। কত ছটফটে, কেমন রোমান্টিক, শুধু শুধু সংসার-সংসার করে দিন কাটায় না। রসবোধ আছে, দেখতেও সুশ্রী, জীবনটা ভোগ করতে জানে। এরকম মেয়েই তো পুরুষরা চায়, অথচ ওই বরুণ নামে লোকটার পাল্লায় পড়ে ওর জীবনটা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। বরুণ না হয়ে ওর অন্য নাম হওয়া উচিত ছিল। তাপসী তো জানতেই পারল না, এমন পুরুষের পাল্লায় পড়লে তার কী হাল হত। রমলা ও বরুণের সংসারে বরুণের বন্ধু বিকাশ আর বিকাশের বান্ধবী মাধুরী একসঙ্গে হঠাৎই উপস্থিত হল, সেদিন থেকেই গোলমাল শুরু। বিকাশ এক উদারমনের মানুষ, রমলার তো সেদিনই মুক্তি ঘটে গেল। একটা মেয়ে তা চাইতেই পারে, খুব স্বাভাবিক। সংসার করবে ঠিকই, কিন্তু তার বাইরে মানুষের জীবনে আর কিছু থাকবে না! এই পৃথিবীতে এসে জীবনের স্বাদই যদি না-পাওয়া গেল, সার্থকতা কোথায়! বরুণের মতো হবে নাকি সব পুরুষ? শুধুই চাকরি, যত বড় চাকরিই হোক, আর কিছু নেই যার জীবনে সে তো মানসিক প্রতিবন্ধী! রমলার রুচি আছে, কত রেকর্ড ওর বাড়িতে— ভীমসেন যোশি, আমির খাঁ, রশিদ খাঁ। ওর রুচির সঙ্গে বিকাশের রুচি মিলে গেছে, তাই তো জমজমাট ওদের আড্ডা। বরুণের এ-সবে রুচি নেই, বাড়িতে এসেই কম্পিউটারের সামনে বসে যাবে। ও তো ওদের সঙ্গে মিশে গিয়ে আড্ডা দিতে পারত, তা না, ওদের আড্ডা দিতে দেখে মুখ গোমড়া করে বসে থাকে। এছাড়া সাহিত্য-শিল্পও ওদের আড্ডার বিষয়। বিকাশ ওরই বন্ধু, তবু সহ্য করতে পারছে না। ঈর্ষা! পুরুষমানুষের হিংসে থাকবে কেন? তুমিও এনজয় করো, তা না, মুখ গোমড়া করে যত অশান্তি ডেকে আনা।
সিরিয়াল দেখতে-দেখতে তাপসীর বরাবরই মনে হয়, মাধুরীর মতো বান্ধবী পেয়েও বিকাশ কী করে রমলার মতো মেয়ের সঙ্গে আড্ডা মারে! ও কি বুঝতে পারছে না, এতে সংসারে অশান্তি হচ্ছে। এমন নির্বোধ, আকাট পুরুষগুলিই যত গোলমেলে, তার ওপর রমলার মতো নির্লজ্জ মেয়ের সঙ্গে যদি যোগাযোগ ঘটে, সোনায় সোহাগা। মাধুরীরও বয়ে গেছে অমন লোকের সঙ্গে বন্ধুত্ব বজায় রাখতে, বরং ওর যে বরুণকে ভালো লেগেছে এটা স্বাভাবিক। ব্যক্তিত্ব আছে, কত বড়ো পোস্টে চাকরি করে, রমলা তার মর্যাদা না-দিলে না-দিক। অনেক মেয়েই সে-মর্যাদা দিতে জানে। বেশ করেছে মাধুরী, বরুণের সঙ্গে অফিসে যোগাযোগ করে, বরুণ একটা চাকরি জোগাড় দিয়েছে ওকে। দেবেই তো, ক্ষমতা আছে, তাই দিয়েছে। নিজের অফিসেই দিয়েছে, বেশ করেছে। তাপসীরও তো ইচ্ছে ছিল চাকরি করার। এমন এক লোকের সঙ্গে ঘর করতে হল, যোগ্যতা নেই, ক্ষমতা নেই, তার ওপর গোঁ,— চাকরি করলে সংসার দেখবে কে? সংসার করাটাই শুধু জীবন নাকি, কোনও সাধ-আহ্লাদ থাকবে না? ঠিকই করেছ মাধুরী, বিয়ের আগেই চাকরিতে ঢুকেছ, বিয়ে করলে চাকরি ছাড়বে না, এই শর্ত রাখবে তুমি। বরুণের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা যদি হয় হবে, রমলার মতো উচ্চিঙ্গে মেয়ের সঙ্গে ও সারাটা জীবন মুখ বুজে কাটাবে নাকি? ওর সামর্থ্য আছে, পৌরুষ আছে, বিকাশের মতো মেয়েলিপনা নেই ওর মধ্যে। আর ওর জন্যেই তো গোলমাল শুরু হয়ে গেল। এ-সব খবর কি চাপা থাকে? যার সঙ্গে মনের মিল হবে, কেউ আটকাবে কি করে? রমলার এতে রেগে যাবার কী আছে! কেন, বিকাশের সঙ্গে অত যে মাখামাখি, মনে ছিল না? তোমার জন্যে বসে থাকবে বরুণ?
কোনও একটা কাজে আটকে গিয়ে বরুণের সেদিন ফিরতে দেরি হল। তাপসী টানটান বসে আছে, গভীর মগ্ন, কিছুটা দৃশ্য এরমধ্যে হয়ে গেছে। জামাকাপড় না-ছেড়েই বরুণ বসে গেল। টি.ভি.-তে তখন রমলা গোঁজ হয়ে বসে আছে, বরুণ কম্পিউটারের সামনে নেই, একটা বই হাতে দাঁড়িয়ে। একটা টেনশন চলছে বোঝাই যাচ্ছে। এর আগে নিশ্চয়ই কিছু একটা সংঘর্ষ। কী হয়েছে? উৎকণ্ঠায় বরুণ, তাপসীকে জিজ্ঞেস করা যাচ্ছে না। ওর মুখে কিন্তু টেনশন নেই, একটু খুশি-খুশি ভাব যেন, নিজের মতো চলতে গিয়ে বরুণ কখনও বেকায়দায় পড়লে তাপসী যেমন খুশিই হয় মনে-মনে, অনেকটা সেইরকম। যাই হোক, দৃশ্যটা বদলে গেছে।– একটা রেস্টুরেন্টে বিকাশ আর মাধুরী মুখোমুখি। ওদের পারস্পরিকতা স্বচ্ছন্দে নেই, বিকাশ মাধুরীকে বোঝাবার চেষ্টা করছে, বরুণের সঙ্গে ওর মেলামেশার ফলে ওদের সংসারে অশান্তি। মাধুরী গ্রাহ্য করছে না। ওর চাকরি দরকার, সুযোগ পেয়েছে, সম্পর্কটা ভালো রেখেছে এই মাত্র। একটি পুরুষ ও একটি মেয়ের মধ্যে সম্পর্ক থাকবে না! সব সম্পর্কই কি খারাপ নাকি? যে সন্দেহ করে সে-ই খারাপ। বিকাশের সঙ্গে ওর সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন তুললে মাধুরী এড়িয়ে যায়, বিকাশ পীড়াপীড়ি করলে ওর মুখে রহস্যময় হাসি ফুটে ওঠে। সেই হাসিতে বিদ্রুপ। বরুণ লক্ষ করল, তাপসীর মুখে-চোখে একইরকম বিদ্রুপের ভঙ্গি। বিকাশের জন্য কষ্ট হচ্ছে, একূল ওকূল দুই-ই যেতে বসল! অপরাধটা কি?— গান, সাহিত্য, শিল্প ভালোবাসে, তাই নিয়ে গল্প করে আর কিছু তো নয়। মাধুরীর মতো নেহাতই স্বার্থপর মেয়ের সঙ্গে ওর যে কীভাবে ঘনিষ্ঠতা হয়েছিল!
সিরিয়ালটা শেষ হলে জামাকাপড় ছাড়তে গেল, তারপর খেতে বসল। তাপসী পাশে-পাশেই আছে, বেশ উদ্দীপ্ত যেন। কিন্তু ঘটনাটা কী হয়েছিল! এর আগেও তো রমলা বরুণের কাছে মাধুরীর প্রসঙ্গ তুলেছে, তখনও যে-যার মতো, বরুণ কম্পিউটারের সামনে, রমলা টি.ভি.-র সামনে, টুকটাক দু-একটা কথা শুধু। কিন্তু আজ একেবারেই অন্যরকম, কী হল? বরুণের উৎকণ্ঠা যাচ্ছে না, তাপসীকে জিজ্ঞেস করতেও ইচ্ছে করছে না।
এরপর থেকে বরুণ এ-সময়টা অন্য কাজ রাখে না, নিয়মিত দেখছে। কিন্তু পর্বগুলি অন্যদিকে সরে যাচ্ছে। মাধুরীর নিজের বাড়ির সব ঘটনা, আরও কত সব চরিত্র। বিকাশ এরপর থেকে রমলার কাছে আসছে না, মাধুরীর সঙ্গে মাঝে-মাঝে দ্যাখা হয় কিন্তু ওরা আর পুরনো সময়-সম্পর্কে নেই। রমলা একা-একা মিউজিক সিস্টেম চালিয়ে গান শোনে, মুখে পাণ্ডুর ছায়া ঘন হচ্ছে। কিন্তু এমন কী হয়েছিল সেদিন?— তার কোনও আভাসই নেই পর্বগুলিতে। এদিকে, সিরিয়ালটা আবার অন্যদিকে চলে যাচ্ছে। এই এক গোলমাল, ধৈর্যচ্যুতি ঘটে যায়। ওরা কি এ-সব বোঝে না? আশ্চর্য!
অবশেষে ধৈর্য হারিয়ে ফেলেছে বরুণ। সেই একই দৃশ্য, কম্পিউটারের সামনে বরুণের গম্ভীর মুখ, রমলার উদাস-বিষণ্ণ দৃষ্টি, বিকাশ-মাধুরীরা কী-সব এলোমেলো কাণ্ড করছে, আরও সব বিচিত্র চরিত্র এসে জুটেছে। মুল সূত্রটাই আর খুঁজে পাওয়া গেল না। এখন আর বরুণ টি.ভি.-র সামনে বসে না, তাপসী একাই বসে প্রতিদিন দেখে যাচ্ছে। বরুণ যে বসছে না, কেন বসছে না, এতে ওর কোনও হেলদোল নেই, তীব্র চোখ-মুখ সেঁটে থাকে টি.ভি.-র পর্দায়।
কী হয়েছিল সেদিন! বরুণ নিজেই আবিষ্কার করতে চেষ্টা করছে। রমলা নিশ্চয়ই বরুণ-মাধুরীর কোনও বিশেষ সম্পর্ক জানতে পেরেছে, তাই নিয়ে প্রশ্ন করছে বরুণকে। বরুণ স্বীকার করেনি, বা এড়িয়ে গেছে, কিংবা রমলা-বিকাশ সম্পর্ক নিয়ে পালটা প্রশ্ন করেছে। তারপর থেকেই ওরা আর সহজ সম্পর্কে নেই। বিকাশই বা কেন আসা বন্ধ করল! বরুণ ওকে কিছু বলেছে? অথবা ওদের বাড়িতে দু-একবার এসে ছন্দপতনটা লক্ষ করেছে, তারপর আসা বন্ধ করল। এটাই স্বাভাবিক, বিকাশ ভদ্র, রুচিশীল ছেলে, এটাই তো করা স্বাভাবিক তার পক্ষে। মাধুরীর বাড়িতেই বা কেন যায় বিকাশ? ওর তো বোঝা উচিত, মাধুরীর মতো উন্নতিলোভী মেয়ের সঙ্গে কোনও সম্পর্কই আর রাখা উচিত নয়। ভবিষ্যতে আরও কষ্টই পাবে শুধু। বরং রমলার মতো আরেকটি মেয়েকে ও খুঁজে নিক।
রমলাই বা কেন অকারণ মনখারাপ করে নিজেকে ক্ষয় করে ফেলবে? আর্থিক বা সামাজিক নিরাপত্তার কথা ভাবছে নাকি! এভাবে কি বাঁচবে? বরং বিকাশকে ফোনে ডাকতে পারে। ওদের সম্পর্ক তো সুস্থ, মানসিক আশ্রয় যে-কেউ যার কাছে খুশি চাইতে পারে। বরং বরুণকে বুঝিয়ে দিক, ওর হাবভাবে রমলার কিছু এসে যায় না। খুব বেশি কী হতে পারে? বরুণ ডিভোর্স চাইবে? রমলা সে-ক্ষেত্রে দেবে না। অত সাহসীও নয় বরুণ। এরমধ্যে এমন কিছু ঘটানাও নেই যে ওর পক্ষে ডিভোর্স পাওয়াটা সহজ হবে। রমলা বরং আত্মপ্রত্যয় নিয়ে বরুণের একগুঁয়েমিকে অগ্রাহ্য করুক। ওর একান্ত-সাহচর্য ছাড়াও রমলার মতো মেয়ে জীবনটা নিজের মতো ভোগ করতে পারে, বুঝিয়ে দিক ওকে।

ওদিকে তাপসি ভাবছে, বরুণ হঠাৎ সিরিয়ালটা দ্যাখা বন্ধ করল কেন! দুই বরুণের ব্যক্তিত্বে সংঘাত? ঠিক হয়েছে। আসলে ওই বরুণের চাকরিতে সাফল্য এই বরুণ সহ্য করতে পারছে না। জীবনে সফলতারও প্রয়োজন আছে, একটু বেশিই প্রয়োজন। এ-সব দেখেশুনে ওর শিক্ষা নেওয়া উচিত ছিল। তা না, হিংসেয় জ্বলেপুড়ে মরছে। এমন সফল পুরুষের কাছেই তো মেয়েরা নত হতে পারে। রমলা নিজেকে কী মনে করে? বরং মাধুরীকে দেখে ওর শেখা উচিত ছিল; বরুণের মত পুরুষের কাছে মেয়েরা উপকৃত হয়ে কত সাফল্য পায়। আসলে মেয়েরা চাকরি করুক, বরুণ এটা পছন্দ করে না বলেই মাধুরীর সাফল্য সহ্য করতে পারছে না। মাধুরী এখন তাই বিকাশকে অগ্রাহ্য করতে পারছে। বাড়িতে ওর কত খাতির, মাধুরীকে নিয়ে বাড়ির লোকের কত স্বপ্ন, এ-সব বরুণের পছন্দই হচ্ছে না। বয়ে গেছে, না-দেখতে চাও দেখো না, কিন্তু মনে রেখো, জীবনটা তুমি যেমন একতরফা দ্যাখো, তা আসলে ঠিক নয়, জীবনের অন্য দিকও আছে। এটা জানতে পারছ না বলেই তো তোমার এত রাগ! কিন্তু তোমার কী হল জীবনে? বলার মতো চাকরি তো করলেই না, তোমার বন্ধুবান্ধবরাও বা কেমন, সবই ওই বিকাশের মতোই, বরুণের মতো একটাও দেখি না। সমস্ত জীবন ধরে তবে এত বড়ো-বড়ো কথা কেন? আমি বলেই এত বছর মুখ বুজে সহ্য করে গেছি, অন্য মেয়ে হলে এতদিনে—

দিন-দশেক পরে ওদের বিবাহবার্ষিকী পঁচিশ বছরে পড়বে। বরুণের ঘনিষ্ঠ বন্ধু সজল এটা জানে। ওর কাছ থেকে অন্য বন্ধুরা জেনে সবাই মিলে ওদের বাড়িতে।
সজল বলল, তোদের বিয়ের রজতজয়ন্তী বর্ষ ধুমধাম করে পালন করব। বরুণের কিছু টাকা খসবে, উপায় নেই। বাইরের লোক থাকবে না, ঘনিষ্ঠ আত্মীয়স্বজন আর ঘনিষ্ঠ বন্ধুরা মিলে জমিয়ে উৎসব করব। পার্টির পর নতুন করে ফুলশয্যা, তারপর থেকে নতুন জীবন শুরু। ম্যাডামের আপত্তি নেই তো?
তারিখটা বরুণের মনে ছিল না। তাপসীর ছিল, হিসেব করে দেখল, সত্যিই তো পঁচিশ বছর হয়ে গেল!
সজল আবার হল্লা শুরু করেছে, আমরা নেপোরাই শুধু চিৎকার করছি। বর-কনের মুখে বাক্যি নেই যে!
বরুণ বলল, এই বুড়োবয়েসে এ-সবের কোনও মানে হয় না। তাপসী সুন্দর করে গুছিয়ে হাসল, কোনও কথা বলছে না।
সজল বলল, তার মানে প্রোগ্রাম ও.কে.। বরুণটা বেরসিক। এ-সবের মানে একটাই, কচিবয়েসে চোখ বুজে ঝাঁপ দিয়েছিলি। এই বুড়োবয়েসে, তোরা চোখ খুলে ঝাঁপাবি। এর মজাই তো বেশি।
সবাই একসঙ্গে হেসে উঠল।
অনুষ্ঠান সন্ধ্যে থেকেই জমে উঠল।– বরুণের একমাত্র শালি অনিমা, তাপসীর একমাত্র দেওর তরুণ, সজল, অভিষেক, মনোজ, তাপসীর কলেজের বন্ধু চন্দনা, একমাত্র ওর সঙ্গে যোগাযোগ রয়েছে এখনও। সবাই কিছু-না-কিছু এনে, ফুলে, রঙীন কাগজের মালায়, বিচিত্র সব উপহারে শোবার ঘরের চেহারাটাই পালটে দিল ওরা। জোর করে মালাবদল, আংটিবদল, খাটটাও ফুলে-ফুলে সুশোভিত হল।
ডাইনিং টেবিলে অত জায়গা নেই, হাতে-হাতে সবাই প্লেটে খাবার তুলে নিয়েছে। সজলরা চন্দনাকে নিয়ে পড়ল।
বলুন তো ম্যাডাম, তাপসীর কলেজ জীবনের কথা বলুন। তখন তো কো-এডুকেশন মানে সাংঘাতিক ব্যাপার। ওর কোনও বিশেষ ঘটনা ছিল কি?
চন্দনা বলল, ছিল একটা। অরুণ নামে একজন জুটেছিল, ওরই আগ্রহ ছিল বেশি।
অরুণ তাহলে বরুণে বদলে গেল কেন?
তাপসীর সাহসে কুলোল না।
তাপসী শুনতে পেয়েছে। চট করে মাঝখানে এসে, ওর যতসব আজেবাজে কথা। তেমন কোনও ব্যাপারই ছিল না ওটা।
তরুণ হাসছে। বললে তো হবে না, বিয়ের পর দেখতাম তো, বউঠান কেমন উদাস-উদাস।
অভিষেক বলল, বিয়ের আগে প্রেমের ট্রেনিং থাকলে বিয়ের পর প্রেমটা জমে ভালো। তাই না?
আন্দাজে কথা বলিস না তো। মনোজ কথার মধ্যে ঢুকল। তোর তো সারাজীবন নবিশি করেই কাটছে।
আর তোরই বা কী। ট্রেনিং আর চাকরি একই জায়গায়। প্রেম করে বিয়ে আর ব্যাচেলার থাকার মধ্যে কোনও তফাৎ নেই। বরুণ কী বলো?
বরুণ হাসছে। আমার আর বিশেষ কি? ওই একজনই, প্রেম বলো অপ্রেম বলো, ওই তাপসীর সঙ্গেই যা-কিছু।
অনিমা হইহই করে উঠল। তরুণদাই বলবে, বরুণদার বিয়ের আগে কী একটা যেন ছিল।
তরুণ বলল, তেমন কিছু না। কমলা বলে একটা মেয়ে ছিল, দাদার কাছে পড়তে আসত। এর বেশি আমার কিছু জানা নেই।
সবাই ঘিরে ধরল বরুণকে। বলো, বলো, কমলা কীভাবে তাপসীতে বদলে গেল?
বরুণ সপ্রতিভ। কেউ বদলায়নি তো। কমলা কমলাই আছে, এককালে আমার ছাত্রী। আর তাপসী তাপসীই। এখন আমার স্ত্রী।
সজল হেসে উঠল। নির্ঘাত ভয় পেয়েছে বরুণ। সবাই তো সবার মতোই থাকে, মানুষে-মানুষে সম্পর্ক তবে হয় কীভাবে?
সবাই চলে গেছে। ফুলে শোভিত খাটটা অন্য মাত্রা পেয়ে, সেখানে পাশাপাশি শুয়ে আছে বরুণ ও তাপসী।
কিছুক্ষণ চুপচাপ দুজনে। একসময় বরুণ বলল, ওরা সবাই মিলে ঘটনাটা মন্দ সাজায়নি, কী বলো? সবটাই বাড়াবাড়ি। এভাবে কি পঁচিশটা বছর মুছে দেয়া যায়? কত পলি পড়ল তার ওপর। এক জায়গায় চিরকাল কেউ দাঁড়িয়ে থাকে নাকি?
তবু তো অরুণ ফিরে এল পলি ভেদ করে। নতুন বরুণের ভেতর দিব্যি তো ঢুকে পড়েছে।
তাই নাকি! কমলাও কি তবে রমলাকে আশ্রয় করল? তার কষ্ট দেখে আর দেখতে চাইলে না বুঝি?
আসলে এসব কিছু নয়, স্বপ্নই বাস্তবকে একটু-একটু করে এগিয়ে নিয়ে যায়।
তাই কি? আমার তো মনে হয়, স্বপ্নটপ্ন কিছু না। আমরা মাঝে-মাঝে কষ্ট পেতে ভালোবাসি।
কষ্ট কী আনন্দ জানি না, বাস্তবের একটাই মাত্রা। আমরা সবাই যে যেখানে দাঁড়িয়ে, সেখানেই থাকি। মাঝে-মাঝে ঘুঁটি চালাচালি করে একমাত্রাকে বহুমাত্রিক করি।
তাপসীর দীর্ঘশ্বাস শোনা গেল। আমরাও কি একজায়গায় দাঁড়িয়ে? তোমার কী মনে হয়?
কথা বলতে বলতে কখন ওরা মুখোমুখি হয়েছে, টের পায়নি। দুজনেই লক্ষ করল, মাঝখানে একটা অদৃশ্য দেয়াল, সিরিয়ালটা দেখতে-দেখতে রোজই যে-দেয়ালটা দাঁড়িয়ে পড়ত।