Free Indirect Subjectivity-র কথা প্রখ্যাত চলচ্চিত্র-স্রস্টা পাসোলিনি উল্লেখ করেছেন তাঁর “The Cinema of Poetry” প্রবন্ধে। পাসোলিনির মতে “the cinema is a system of signs whose semiology corresponds to a possible semiology of the system of signs of reality itself.”। পাসোলিনি কি চলচ্চিত্রকে বাস্তবতার সমতুল্য একটি মাধ্যম হিসেবে দেখছেন। আন্দ্রে বাঁজাও চলচ্চিত্রকে এই তাত্ত্বিক পরিসরেই দেখেছেন। সেই পরিসরকে আমরা “respect for reality” বলে অভিহিত করতে পারি। এখানে চিহ্ন বস্তু বা রেফারেন্ট-এর আইডেন্টিকাল হয়। কিন্তু চলচ্চিত্র কি প্রকৃত প্রস্তাবেই কেবলমাত্র বাস্তবতার প্রতিরূপ ? তাই যদি হয়, সেক্ষেত্রে চলচ্চিত্র কেবলমাত্র mechanical duplication-এ পর্যবসিত হত। সেখানে এক্সপ্রেশনের অবকাশ থাকে না। পাসোলিনি চলচ্চিত্রকে এই সংকীর্ণ পরিসরে রাখতে চাননি। তিনি এই প্রতি-তুলনার অবসরে বাস্তবতার সীমাকে বিস্তৃত করেন। তাঁর মতে চলচ্চিত্রের গঠন স্বপ্ন বা স্মৃতির মত। এই দুই ক্ষেত্রেই এক্সপ্রেশনের অবকাশ অনেকখানি বেড়ে যায়।

মানুষ সাধারণত শব্দ বা ধ্বনির মাধ্যমে কম্যুনিকেট করে। ইমেজ বা প্রতিমা বা দৃশ্যের মাধ্যমে নয়। চলচ্চিত্রের মূল একক হল ইমেজ। ফলে চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে যে চিত্র-ভাষা তৈরি হয় তা অধিকতর বিমূর্ত। সেক্ষেত্রে চলচ্চিত্রে কম্যুনিকেশন-স্পেস সঙ্কুচিত হওয়ার কথা। কম্যুনিকেশন স্পেস না থাকলে মাধ্যম হিসেবে চলচ্চিত্রের অস্তিত্বও বিলুপ্ত হওয়ার কথা। তা হয়নি কারণ ইমেজ সর্বদা একপ্রকার কম্যুনিকেশন তৈরি করে। নির্দিষ্ট আলোচনার সুবিধার্থে একে কম্যুনিকেশন না বলে ডায়ালগ বলা যেতে পারে। ইমেজ কোন নির্দিষ্ট বার্তা, বক্তব্য বা এক্সপ্রেশন হয়ত বহন করছে না কিন্তু কিছু টুকরো মুহূর্ত, টুকরো এক্সপ্রেশন প্রকাশ করতে সক্ষম। যেমন বিভিন্ন মুখভঙ্গি বা Gesture, স্বপ্ন বা স্মৃতির অংশ। এখানে এসে “আন্দালুশিয়ান কুকুর”-এ বুনুয়েলের সফল বয়ন আন্দাজ করা যায়। অবচেতনকে প্রকাশ করার যে প্রকল্প সুররিয়ালিজম গ্রহণ করেছিল সেই প্রেক্ষিতে চলচ্চিত্রের নিজস্ব গঠনগত বৈশিষ্ট্য বুনুয়েলকে সুবিধা দিয়েছিল – “…it is the true oniric nature of dream and of unconscious memory which surrealism finds in cinema.”। যদিও পরবর্তীকালে অবচেতনের প্রকাশ নিয়ে লাকা যে বিতর্ক উত্থাপন করবেন সেটা পৃথক আলোচনার বিষয়। যাইহোক স্মৃতি বা স্বপ্নের কথায় ফেরা যাক। Gesture বা স্বপ্ন ও স্মৃতি মানব সভ্যতার শুরু থেকে থাকলেও সংগঠনগত অবকাশের নিরিখে তা সাহিত্যের ভাষার থেকে অনেক দুর্বল এবং প্রবৃত্তি-জাত। ফলে বলা যেতে পারে “The linguistic instrument on which cinema is founded is thus of an irrational type”। আর এই irrationality থেকেই চলচ্চিত্রের objective বৈশিষ্ট্য ও সম্ভাবনার প্রসঙ্গ আসে।

কিন্তু Gesture-এর ক্ষেত্রে না হলেও স্বপ্ন বা স্মৃতি একজনের ব্যক্তিগত অন্তর-কথন যা অবশ্যই সাবজেক্টিভ (যদি কোন যৌথ মুহূর্ত বা শেয়ারিং না থাকে)। গদ্য ও কবিতার ভাষার গঠনের পরিপ্রেক্ষিতে সাধারণভাবে বলা যেতে পারে এই সাবজেক্টিভিটির কারণে চলচ্চিত্র অনেক-বেশি কবিতার কাছাকাছি। এখানে এসে চলচ্চিত্র বেশ ইন্টারেস্টিং হয়ে ওঠে একই সাথে objectivity ও subjectivity-র মেলবন্ধনে। বিষয়টা একটু পরিষ্কার করা যাক – ধরা যাক একটা পতাকার ইমেজ দেখানো হচ্ছে। পতাকাটি হাওয়ায় উড়ছে। এখানে হাওয়া এবং পতাকা ছাড়া আর কিছু নেই। কিন্তু এই ইমেজই সমাপ্ত বা অসমাপ্ত বিপ্লবের কথা বলতে পারে। শান্তির কথা বলতে পারে ... বা আরও অনেক কিছু। এই “আরও অনেক কিছু” objectivity-কে নির্দেশ করে। আর objectivity-র নিরিখে যখন author-এর expression / dialogue বা intervention ঘটে তখন subjectivity-র অবকাশ তৈরি হয়, যার সূত্র হল author-এর চয়েস। সাহিত্যের ক্ষেত্রেও “কবিতার ভাষা” ও “গদ্যের ভাষা” দেখতে পাওয়া যায়।

চলচ্চিত্র ইতিহাসের অধিকাংশ সময় জুড়ে যার মুল অংশকে “classical Hollywood” বলে অভিহিত করা হয়, চলচ্চিত্রের যে ধারা দেখতে পাওয়া যায় তাকে সাহিত্যের পরিভাষায় “language of narrative cinematic prose” বলে অভিহিত করা যায়। এই ধরণের চলচ্চিত্রে কম্যুনিকেশনের নিরিখে স্পষ্ট, সহজ গল্প বলাটাই রীতি। দর্শক যেন গল্প উপভোগ করা থেকে কোন ভাবেই বিচ্যুত না হন সেকারণে একধরণের cinematic convention মেনে চলা হত। আজও তা অনেকাংশে মেনে চলা হয়। ফলে এই রীতি ট্রাফিক সিগন্যালের মত “objective” হয়ে উঠেছিল। এই কাহিনীমূলক ক্লাসিক্যাল চলচ্চিত্র ঘরানায় অনেক অসাধারণ কবিতা মুহূর্ত বা poetic cinema তৈরি হয়েছে। যেমন বার্গম্যানের ছবিগুলি। সেখানেও ক্যামেরাকে গোপন রাখা হয়। অর্থাৎ কেউ একজন ক্যামেরা নিয়ে দৃশ্যগুলো রেকর্ড করেছে তা পেক্ষাগৃহের ওই নিকষ অন্ধকারের মধ্যে ভুলিয়ে দেওয়া হয়। দর্শক voyeuristic pleasure অনুভব করে এবং ঘটনার কেন্দ্রবিন্দুতে গিয়ে উপস্থিত হয়।

এই ধরনের ছবির ক্ষেত্রে কবিতার প্রতি-তুলনা চিত্র-ভাষা বা কৌশলের নিরিখে আসে না। তা অনেকক্ষেত্রেই একধরণের অন্তর্লীন অনুভূতি দ্বারা জারিত হয়। যেমন অনেকক্ষেত্রে কোন গদ্য বা উপন্যাসকে আমরা “কবিতার মত” বলে থাকি।

চলচ্চিত্রে চিত্র-ভাষার নিরিখে কবিতার অনুপ্রবেশ ঘটে মূলত নিউরিয়েলিজম পরবর্তী সময় থেকে। এই সময় থেকেই ক্যামেরাকে গোপন রাখার রীতি অস্বীকার করা হল। চলচ্চিত্রে authorial subjectivity এলো। হ্যান্ড হেল্ড ক্যামেরা, কোন দৃশ্যের উপর excessive cinematic stress, জাম্প কাট ইত্যাদি “improper” সম্পাদনা-শৈলীর মাধ্যমে চলচ্চিত্রে কবিতা-ভাষা আসে। রসোলিনি থেকে গোদার- চলচ্চিত্রে কবিতার সেই প্রকাশ দেখতে পাওয়া যায়। মনে করা যেতে পারে “ব্রেদলেস”-এ চলন্ত গাড়ি থামিয়ে দৌড়ে গিয়ে ফুটপাথে মেয়েটির স্কার্ট টেনে নামিয়ে দেওয়ার কথা। ডাইজেটিক লাইনে (কাহিনীর মূল গতিপথে) এই দৃশ্য সম্পূর্ণ অপ্রয়োজনীয়। কেন যে বেলমন্দ এই কাণ্ডটি ঘটালেন তা স্পষ্ট নয়। সমগ্র ছবিটি দেখে এবং প্যারিসের ক্ষয়িষ্ণু বুর্জোয়া কালচারের পরিপ্রেক্ষিতে এটি গোদারের একটি কমেন্ট। বা ধরা যাক “কোমলগান্ধার” ছবিতে দেবব্রত বিশ্বাসের হঠাৎ গেয়ে ওঠা- “সুরে আসমান”। কাহিনী বিন্যাসের ক্ষেত্রে হয়ত খুব প্রয়োজন ছিল না। কিন্তু বঙ্গসংস্কৃতির উপর একটি সামগ্রিক উপস্থাপনার প্রেক্ষিতে ঋত্বিক ঘটক এই গান ও দৃশ্যটি রেখেছিলেন।

এই দুটি ক্ষেত্রকেই “free indirect subjectivity”-র উদাহরণ হিসেবে নেওয়া যেতে পারে। পাসোলিনি যেমন আনবেন দান্তের উদাহরণ বা ন্যাচারালিজমের প্রসঙ্গ। কিন্তু আপাতত কবিতায় মনযোগ দেওয়া যাক। গত সংখ্যার নাতিদীর্ঘ প্রস্তাবনার প্রেক্ষিতে এক দীর্ঘ মতামত জানিয়েছিল অমিতাভ প্রহরাজ। ওকে ধন্যবাদ এই আলোচনার অবসর তৈরি করার জন্য। কবিতার স্মরণযোগ্যতা, ছন্দ ইত্যাদি নিয়ে অমিতাভর হাইপোথিসিস ইন্টারেস্টিং। সত্যি এভাবে কি ভাবা যায় – “গুটিকয় মানুষের কাছে কিছু অভাবনীয় অনুভব বা চিন্তা সাংকেতিক ভাবে কুক্ষিগত করে রাখার জন্য তৈরি হয়েছিল” ? বা “স্মরণযোগ্য” “কম্যুনিকেশনের পরিপ্রেক্ষিতে” ছন্দ নিয়ে আমি ঠিক কি বলতে চেয়েছিলাম ?

প্রথমেই বিনীতভাবে স্বীকার করে রাখি আমি যেমন অযোনিসম্ভূত নই ... আমার বক্তব্যও নয়। সেভাবে তাকে উপস্থাপনও করা যায় না। ফলে পুনরায় কিছু পাসোলিনি, গোদার, রল্যাঁ বার্থ-এর প্রসঙ্গ আসবে। বিশ্বাস করুন, অনেক রাত হয়ে গেছে এঁদের আর ঘাটাঘাটি করতে ইচ্ছে করছে না। আগামী কিস্তির জন্য রেখে আপাতত ঘুমোতে যাই ...

----------------
প্রথম কিস্তি এখানে