দেশের অবস্থা বিশেষ ভালো না। জিনিসপত্রের দাম বাড়ছে। বাড়ছে মানুষ। কার্বন ডাই অক্সাইড। মঈনুদ্দিনের এমনিতেই আজ মেজাজ খারাপ। সব কিছুতেই বিরক্তি লাগে।
এই যে রাস্তা দিয়ে যাচ্ছে। দেখে বুঝা যাচ্ছে না সে বিরক্ত। রাস্তার পাশে কিছু লোকের জটলা দেখা যাচ্ছে। পরিচিত দৃশ্য। প্রায়ই এরকম দেখা যায়। তবে আজকের জটলা একটু অন্যরকম লাগল। অনেক নামী দামী চেহারার মানুষ ও গোল হয়ে দাঁড়ানো। এদের দেখে ধ্বজভঙ্গ বা আগা মোটা গোঁড়া চিকন জাতীয় রোগী মনে হচ্ছে না। মঈনুদ্দিন এই প্রথম রাস্তার পাশের ছোট ভিড়টার প্রতি আগ্রহ অনুভব করল। দ্রুত পা চালিয়ে পৌছে গেল ভিড়ের কাছাকাছি। মধ্যমাত্রার ঠেলাঠেলি করে একটু ভিতরেও ঢুকে পড়ল।
ভিড়ের মাঝখানে এক লোক। গম্ভীর চেহারা। বয়স্ক শরীর। এই গরমেও গায়ে খয়েরি চাদর।লোকটার মাঝে বিশেষত্ব কিছু নেই। সাধারণ দেখতে। মঈনুদ্দিন ভাবে এতসব লোক দাঁড়িয়ে কি এই লোকটাকে দেখছে? আশ্চর্য!

সে কিছুটা কৌতুহলী হয়ে তাকায়। লোকটা নিচু হয়ে কি যেন করছিল। তার চারপাশে শত মানুষ।কারো মুখে কোন কথা নেই। প্রচন্ড গরমে ঘামছে লোকজন।নিঃশব্দে ঘাম মুছছে। আর তাকিয়ে আছে সোজা সামনে। বয়স্ক খয়েরি চাদর পরিহিত লোকটার দিকে।

লোকটা উঠে দাড়ায়। গড়গড় করে বলে, আমি কি মানুষ? কী মনে হয় আপনাদের?

কেউ কোন কথা বলে না। লোকটার কন্ঠস্বরে সম্মোহনের ক্ষমতা ছিল বোধহয়। সবাই সম্মোহিতের মত তাকিয়ে থাকে।
লোকটা বলে, আমি আসলে মানুষ না। মাকড়শা। এই আপনাদের ঘরে বারান্দায় ঝুইলা থাকি। জাল বানাই। বাসা বানাই। বিপদ আপদ আটকাই। আমার নিবাস বহুদূরে। আমি মাঝে মধ্যে এইসব শহরে ও গ্রামে আসি। লোকজনদের বলি। আমার কথা। আমার পাড়া পড়শি বউ পোলামাইয়ার কথা। গল্পসল্প করি। আমাদের বর্তমান ভবিষ্যত এইসব যা আছে। এইসবই আরকি। নাকি আপনেরা মনে করেন মাকড়শাদের কোন লাইফ নাই?
লোকটা সরু চোখে তাকায়। কেউ কোন উত্তর দেয় না। লোকটা খুশি হয়ে আবার বলতে শুরু করে, শুনেন ভাইয়েরা। না ভাইয়েরা ও বইনেরা। আপনাদের জীবন, আমাদের জীবন একই তারে বান্ধা। আপনেরা অনেক চেষ্টা করছেন। ছুটাইবার জন্য। পারছেন?
তীক্ষ্ণ কন্ঠে খয়েরি চাদর পরিহিত লোকটি প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়। এবারো জনতা নীরব থাকে।
লোকটি একটু থেমে আবার বলে, পারেন নাই। পারবেন না। পারতে পারেন না। সবকিছু যদি আপনেরা পারেন তাইলে তো আর হবে না। সবকিছু সবার জন্য না। এই যেমন ধরেন একটা উদাহরণ দেই। আপনাদের জীবন থেইকাই দেই। আমাদের উদাহরণ দিলে তো আপনেরা বুঝবেন না।

লোকটা খানিকক্ষণ চারিদিকে তাকায়। মঈনুদ্দিন ভিড় থেকে মুখ বার করে লোকটির কাণ্ডকারখানা দেখছিল। লোকটি কড়া সুরে ডাক দিল, এই যে মিয়া ভাই! আপনে আসেন। হ্যা হ্যা আপনেরেই বলতেছি। আপনের নাম মঈনুদ্দিন না?

মঈনুদ্দিন তথমত খেয়ে যায়। কোনরকমে বলতে যায়, হ্যা কিন্তু মানে... কিন্তু ততক্ষণে ভিড়ের লোকগুলো তাকে সামনে এনে ফেলেছে। একেবারে খয়েরি চাদরওয়ালার কাছাকাছি। ঘটনার আকস্মিকতায় মঈনুদ্দিন হতবাক। সে লোকটার কাছাকাছি। কড়া এক ধরনের ঝাঁঝালো গন্ধ তার নাকে আসছে। কড়া গন্ধ। তেলাপোকার সংগমের সময় যে গন্ধ বের হয় ঠিক সে রকম গন্ধ।।

লোকটা সবার উদ্দেশ্যে বলে, এই যে মিয়া ভাইরে দেখতেছেন। উনার নাম মঈনুদ্দিন। ঠিক না মিয়া ভাই?
মঈনুদ্দিনের কথা যেন বন্ধ হয়ে আসছিল। সে আস্তে করে বলল, হ্যাঁ। কিন্তু আপনে জানলেন ক্যামনে?
এইটাই তো কথা মিয়াভাই। এইটাই কথা। লোকটা মুচকি হাসে।

মঈনুদ্দিন কিছুটা শক্তি সাহস ফিরে পায়। সে আরেকটু জোর দিয়ে বলে, জানলেন ক্যামনে বলেন?আমি তো আপনারে বলি নাই।

লোকটা উঠে দাড়ায়। মঈনুদ্দিন কে মাঝখানে রেখে কয়েকটা চক্কর দেয়। তারপর বলে, মিয়াভাই, আপনে তো একটা বদ মেয়েছেলে বিয়া করছেন। বিরাট বদ মাইয়া। এরে পাইলেন কই? হারামজাদী আপনের বন্ধু কেরামত শেখের লগে বিয়া বওয়ার ড্রিম দেখতেছে। বুঝলেন, দুইমাসের মইধ্যে তারা ভাইগা গিয়া বিবাহ করব। দুইশ এক টেকা দেনমোহর।
আপনে সেইটা আটকাইতে পারবেন না। আটকানো আপনার হাতে নাই। এজন্যই বলছি সবাই সবকিছু পারে না। আপনের ঘটনা উদাহরণ হিশাবে আনলাম। মাইন্ড খায়েন না।

মঈনুদ্দিনের মাথা ঝিম ঝিম করছিল কথা শোনে। সে হঠাৎই হ্যাচকা টানে লোকটাকে মাটিতে ফেলে দিল। রাগে জ্বল জ্বল করছিল তার চোখ।

হারামজাদা! হুদা প্যাঁচাল পারার মানুষ পাও না? বলে সে সামনে এগুতে চাইলে কয়েকজন এসে ধরে ফেলল। লোকটাকেও কয়েকজন ধরে তুলেছে।

লোকটা উঠেই কথা শুরু করল, মিয়াভাইয়েরা এসব কিছু না। আমি, আমরা কিছু মনে করি না।মিয়াভাই আমার কথা বুঝেন নাই। তাই রাগ করছেন।
বয়স্ক চেহাড়ার আরেকজন লোক ভিড়ের মধ্য থেকে বললেন, কিন্তু তুমি বলতেছ কী? তোমার কথার কিছু তো বুঝা যায় না? আর এই লোক নিয়া তুমি যা বললা তা যদি মিথ্যা হয়?

লোকটি বিচিত্র ভঙ্গিতে হেসে উঠল। তার হাসির শব্দ আবার সম্মোহীত করে ফেলল পুরো মানুষের ভীড়কে। সম্মোহীত হয়ে গেল ওই এলাকার এক টুকরো আকাশ। কিছু দুরন্ত বাতাস। অজস্র পশুপাখি ক্ষুদ্র পোকার দল। শুধু মাকড়শারা ছাড়া। তারা আগের মতই জানালার ধারে, এখানে ওখানে, তাদের জালে প্রাত্যহিক কাজকর্ম করে যাচ্ছিল।
লোকটা বলল, যাই। মঈনুদ্দিনের দিকে তাকিয়ে বলল, মিয়াভাই যাই।

অদ্ভুত কারণে মঈনুদ্দিন ছিল সম্মোহনের বাইরে। তার ভিতরে হুড়মুড় করে ভেঙ্গে পড়ছিল অনেক কিছুই যা একেকজন স্বাভাবিক সুস্থ মানুষ বয়ে নিয়ে বেড়ায় জীবনের অন্তিম মুহূর্ত পর্যন্ত।
মঈনুদ্দিনকে এসে ঘিরে ধরল একরাশ পা কাঁপানো, হাড় কাঁপানো ভয়। তার মনে হল এই লোক চলে গেলেই সব শেষ। সে লাফিয়ে গিয়ে ঝাপটে ধরতে চাইল লোকটাকে।
চাদরে ধরা মাত্র লোকটা চাঁদর রেখেই চলে যেতে লাগল দ্রুতবেগে। খুব সামান্য কিছু সময় পড়েই তাকে আর দেখা গেল না।

জনতার সম্মোহনের ঘোর কাটল। তারা দেখল মঈনুদ্দিন দাঁড়িয়ে। তার গায়ে সেই খয়েরি চাদর।লোকটা নেই।
সম্মোহনের ঘোর কেটে যাবার পর লোকজনের মনে হল তাদের অনেক কাজ পড়ে আছে। যে যার কাজে চলে যেতে লাগল তারা। শুধু মঈনুদ্দিন দাঁড়িয়ে রইল ওই জায়গাতেই। তার কানের কাছে বাজছে খস খস খস কিছু শব্দ। অস্ফুট ভাষায় কে বা কারা যেন তাকে আহবান করে সম্মিলিতভাবে। মঈনুদ্দিনের মনে হচ্ছে শব্দগুলো খুব চেনা, কিন্তু বুঝতে পারছে না সে। মোহগ্রস্তের মত তাই সে দাঁড়িয়ে রইল।

এরপরের ঘটনা খুব অল্প। মঈনুদ্দিন কে সেদিনের পর আর এলাকায় দেখা যায় নি। অনেকে বলেছে উত্তর দিকে তাকে হাটতে দেখেছে। খয়েরি চাদর তখনো তার গায়ে ছিল।

এই ঘটনার পর মঈনুদ্দিনের বউ বাপের বাড়ি চলে যায়। সেখানে তার নতুন বিয়ে হয়। তার নতুন স্বামীর নাম কেরামত শেখ।

মঈনুদ্দিনের ঘর এখন খালি পড়ে আছে।তার লাগানো জলপাই গাছের ফোকরে যে মাকড়শাগুলো থাকত সেগুলো এখন নির্ভয়ে বাসা বেধেছে তার ঘরে। এখন মঈনুদ্দনের ঘর মাকড়শাদের নির্ভয় আবাসস্থল।