১.
ভাষার জাতীয়করণ ভাষাভাষীদের বিজাতীয় করে তোলে। এমনকি বি-চিন্তক (চিন্তা অবমুক্ত) করে তোলে। প্রথমটি যদি যোগাযোগ তথা কম্যুনিকেশনের সঙ্কট ইঙ্গিত করে, দ্বিতীয়টি অবধারিতভাবে দার্শনিক-রাজনৈতিক সঙ্কটের ইঙ্গিতবাহী। একটু কূটাভাসের মতো শোনালেও ভাষার রাজনীতির চূড়ান্ত দিক হয়তো জাতীয়করণ। যদি জাতীয়করণ না থাকতো তাহলে ভাষা সার্বভৌমই থেকে যেতে পারত, ভাষাভাষী মানুষজনও থাকতেন সার্বভৌম। কোনোরকম বিধিবদ্ধতা আর নিষেধাজ্ঞা ভাষা আর অভিব্যক্তির রাজ্যের মধ্যে থাকত না। কথা উৎপাদন আর কথা কহিবার এক অনন্ত রাজ্যে তখন মানুষ বসবাস করতে পারে। কিন্তু সেই আকাঙ্ক্ষার রাজ্যটি নেহায়েৎ কল্পরাজ্য বটে। বাস্তবে ভাষা একটি জাতীয়কৃত হাতিয়ার, এমনকি জাতীয়তাবাদী হাতিয়ার। এখন, জাতীয়করণ, রাষ্ট্রীয়করণ কিংবা প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ-এগ� �লো নেহায়েৎ শব্দক্রীড়া মনে হতে পারে। কিন্তু আমাদের কাক্সিক্ষত রাষ্ট্র যেমন আমরা না পেতে পারি, তেমনি কাক্সিক্ষত রাষ্ট্রের জন্য চেষ্টা চালানো সম্ভব। প্রতিষ্ঠানও তাই। একটা বলবান প্রতিষ্ঠানের বিপরীতে আমরা আর পাঁচটা দুবলা প্রতিষ্ঠান বা সংঘবদ্ধতা গড়ে তুলতে পারি। পরিসরের একটা লড়াই চালিয়ে নেয়া যায়। কিন্তু জাতীয়তাবাদ মস্তিষ্কমণ্ডলীতে দুর্দমনীয় এক শক্তি নিয়ে বিরাজ করে। ভাষা-জাতীয়তাবাদ তাই বিজাতীয় ভাষাভাষীর জন্য ভয়ানক প্রতিপক্ষ।

[page]
২.
ভাষার বিজাতিসমূহ নানাবিধ, সর্বব্যাপী ও কোণঠাসা। ভাষা প্রাতিষ্ঠানিক হতে শুরু করার পরেই ছাঁটাই হতে থাকে ভাষাভাষীদের একাংশ, আর অবধারিতভাবে প্রান্ত রচিত হতে থাকে। লেখ্য সভ্যতার বর্তমান দুনিয়ায় দীর্ঘকাল বসবাস করবার পর এটা যেরকম উদ্ভটই শোনাক না কেন, ভাষার সবচেয়ে বিপজ্জনক প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ হচ্ছে সম্ভবত লেখ্য ভাষার উদ্ভব। লেখ্য রূপ ভাষাকে দীর্ঘস্থায়িত্ব দিয়েছে, চিন্তা ও মনুষ্য-অভিব্যক্তির দীর্ঘমেয়াদী সংরক্ষণ সম্ভব করেছে, ভাষাভাষীদের মধ্যে তথ্য ও ভাব আদান-প্রদানের জন্য শক্তিশালী ডিভাইস সরবরাহ করেছে। কিন্তু এসব প্রক্রিয়া হবার পাশাপাশি লেখ্য রূপ ভাষাকে স্থির, অনড় আর রূপান্তরহীন করে ফেলবার হুমকি তৈরি করে ফেলেছে; চিন্তাকে আর্কাইভড বা বাক্সবন্দি করে ফেলবার উদ্যোগ নিয়েছে; ভাব আর তথ্যের গুণগত দিকের তুলনায় নিয়ম-বিধিকে প্রগাঢ় করে তুলেছে। লেখ্য ভাষা তথা লিপির দুনিয়ার প্রখর দুই পাহারাদার হচ্ছে সংবাদমাধ্যম আর শিক্ষাব্যবস্থা। পাহারাদার, কারণ মনুষ্যচিন্তার উন্মেষ তা যেমন ঘটাতে সমর্থ তেমনি তা মনুষ্যচিন্তার ধরন গড়াপেটা করে দিতে পারে। পৃথিবীর ইতিহাসে তা দিয়েছেও বটে। লেখ্যভাষা মনুষ্যচিন্তা অধিগ্রহণ করেছে। সাহিত্য-অভিব্যক্তি ছাপাখানার ভূতের প্রজা হয়েছে। অধিকন্তু, লেখ্যভাষার কারণেই ঈশ্বর অনন্ত হয়েছেন, কারণ ঐশী কিতাবসমূহ আবির্ভাব হবার আর কোনো উপায় ছিল না। পরিহাস হলো, লিপিহীন মানুষকুলের অবধারিত ঈশ্বর থাকতে পেরেছেন লিখিত কিতাবের ঈশ্বরই। মানুষের কল্পলোকের নানাবিধ ঈশ্বর লিপির বিধিবদ্ধ ঈশ্বরের সামনে লোপাট হয়েছে। কিংবা জনজীবন লোপাট হতে পেরেছে মুদ্রিত আইনের সামনে।

[page]
৩.
বহুদিন আগে ইন্ডিয়াতে একবার আমি ট্রেইনে চেপে কোথাও যাচ্ছিলাম। সম্ভবত কোলকাতা থেকে দিল্লি। উপরের বাঙ্কারে গেরুয়া বসনে যে ছেলেটি শুয়ে-বসে যাচ্ছিল ওর ক্ষিপ্র হাতে ল্যাপটপ চালানো দেখছিলাম মাঝেমধ্যে। ওর সঙ্গে কার্যকরী একটা আড্ডা হলো পরদিন সকালে। জানালার পাশে মুখোমুখি আর পাশাপাশি অনেকক্ষণ ধরে গল্প হয়েছে আমাদের। মণিপুরের ছেলে। কোলকাতায় লেখাপড়া করে কোনো একটি চেইন কম্প্যুটার স্কুলে। দিল্লিতে কিছু কাজ সেরে সে ইম্ফল যাবে। আর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে পড়ালেখার উছিলাতেই বিদেশ চলে যেতে। সম্ভব হলে আমেরিকা। না হলে অন্তত থাইল্যান্ড। তার পোশাক আর কথার ধরনে আন্তরিক বৈষ্ণব বলে মনে হলো। কিন্তু সে বিষয়ে বিশেষ আলাপ হলো না। ও কম্প্যুটারে সফটওয়্যার বানায়, বা বানাতে চায়। ইম্ফলের পরিস্থিতি সে বলতে গিয়েও বলে না। ইন্ডিয়ান মিলিটারি নিয়ে কী একটা বললো আধো আধো কিন্তু আসলে সেগুলো নিয়ে আলাপ করতে সে চায় না। যদি তার আগ্রহ থেকেও থাকে এ বিষয়ে, আসলেই কোনো কারণ নেই ভারতীয় রেলের একটা কামরায় বসে, তাও আরেক দেশের একজন সদ্য-পরিচিত আগন্তুকের সঙ্গে, মণিপুরে ভারতীয় সেনা সঞ্চার নিয়ে সে আলাপ করবে। কিন্তু কিছু একটা বুদ্বুদ ছিল তার মধ্যে। ও বলল মণিপুরী ভাষা নিয়ে ওর আগ্রহ বা স্বপ্নের কথা। একজন সফটওয়্যার প্রকৌশলী হিসেবে ওর স্বপ্ন হচ্ছে মণিপুরী ভাষাকে কম্প্যুটিং দুনিয়াতে নিয়ে আসা। একটা মস্ত সমস্যা ওর জন্য এই যে গত শ’ খানেক বছর ধরে লিপি ক্রমাগত বাংলাকরণ হয়ে গেছে আর নতুন উদ্যোক্তারা পুরনো লিপির চর্চা আর কার্যকরী মনে করছেন না, তাঁদের উৎসাহ কম।

সদ্য-পরিচিত এই ছেলেটির উদ্যম আর হতাশা দুটোই খুব পরিষ্কার বুঝতে পারছিলাম। ছেলেটি মণিপুরী ভাষা বলতে মেইতেই ভাষাকেই বুঝিয়েছে যা মণিপুর রাজ্যের বাসিন্দাদের মধ্যকার প্রধান ভাষা। ব্রিটিশ সম্প্রসারণের পর তাঁদের পূর্বতন চীনা-তীব্বতি লিপি খোয়া যেতে বসেছে। এত ভেঙে না বললেও ওর বিক্ষোভ খুব স্পষ্ট ছিল। নিখিল ভারতীয় আধিপত্যের বিষয়ে তার বোঝাপড়া থাকতে পারে। ছিল বলেই হয়তো ওর ওই বিক্ষোভ। আর মণিপুর রাজ্যের বাসিন্দাদের মধ্যে সেই একমাত্র ক্ষুব্ধ নয় যে সেটা অনুমান করা যায়। ভারতীয় সেনাবাহিনীর হিসেবে বরং আরও নিবিড় ভাবে ‘আতঙ্কবাদী'দের বিশাল একটা মণিপুরী তালিকা থাকার কথা। নিখিল ভারতীয় আধিপত্যের বিষয়ে একজন মণিপুরীর সংক্ষুব্ধতা আর গত দেড় শতক ধরে প্রচলিত পূর্ব-দেবনাগরী তথা বাংলা/আসামীয় লিপির স্পষ্ট যোগসূত্র আবিষ্কার করা কঠিন। কিন্তু একটু নিবিড় বিচারে খুব কঠিনও নয়। ব্রিটিশ সম্প্রসারণের অন্যান্য অর্থের মধ্যে নিকটবর্তী মেট্রোপলিটান কোলকাতার বিকাশ গুরুত্বপূর্ণ। একজন মণিপুরীর জন্য ব্রিটিশ সম্প্রসারণ তথা উত্তরকালের ভারতীয় আগ্রাসন আর ইম্ফলের উচ্চশ্রেণীর কোলকাতাকেন্দ্রিকতা একাকার হয়ে যেতে পারে। নিজেদের প্রাক-ব্রিটিশ লিপির প্রতি টান আসলে ঠিক সম্মুখে থাকা অধিপতির সাংস্কৃতিক মেটাফরের বিরুদ্ধে প্রত্যাখ্যানও বটে। ভারতের আধিপত্য সেখানে বাংলার আধিপত্যের সমান্তরাল। বাংলার আধিপত্য বাংলাভাষার বিস্তারের সঙ্গে সমার্থক। বাংলায় ব্যবহৃত লিপি সেই আধিপত্যের মূর্ত লক্ষণা। তাকে প্রত্যাখ্যান করে প্রাক-ব্রিটিশ লিপিকেই আবার হাজির করতে ইচ্ছুক সে। তার মতো নিশ্চয়ই অনেকে। আমি হিন্দি জানি না, ও বাংলা জানে কিনা জিজ্ঞেসও করিনি। কিন্তু আমি নিশ্চিত চীনা-তিব্বতি ভাষা-পরিবারের সঙ্গে কেবল নয়, ইংরেজি ছিল তার ওই মুহূর্তের আত্মীয়তা। ভাষা প্রসঙ্গ আসলেই সত্তার সীমানার সঙ্গে সম্পর্কিত।

এই পরিস্থিতিটা আরও ব্যাপক পরিসরে দেখার সুযোগ আছে। বাংলাদেশের কিংবা ত্রিপুরা রাজ্যের ত্রিপুরা জাতির ভাষা ককবরক-এর আদিলিপি বিলোপের পর বাংলা এবং রোমান লিপি জনপ্রিয় করবার বিষয়টি একটা রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক সংঘর্ষের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। নিকট ভবিষ্যতে এই সংঘর্ষ নিষ্পত্তির নয়। ভাষা ভাব বিনিময়ের মাধ্যম নয় শুধু, আত্ম-পরিচয় প্রকাশের রাজনৈতিক মেনিফেস্টোও বটে।

[page]
৪.
সংগ্রামী ভাষা কালক্রমে শাসকের ভাষা হয়ে দাঁড়াতে পারে। সেই শাসকের ভাষাও দিব্যি অন্যের সামনে চোখরাঙানি করতে পারে। সময়ে সেটা প্রথাগত নিপীড়ণ হয়তো নয়, কিন্তু অন্য ভাষার জন্য, অন্যান্য ভাষাভাষীর জন্য একটা দমবন্ধ করা পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে। স্বাধীন বাংলাদেশে উর্দূ ভাষাভাষীদের সঙ্কোচ এবং উর্দূ ভাষা অনুশীলনের ক্রমহ্রাসমান চিত্র একটা গুরুতর পরিহাসময় উদাহরণ হতে পারত। কিন্তু আরও প্রাসঙ্গিত উদাহরণ মনে হচ্ছে বাংলাদেশে অনেকগুলো জাতির ভাষা-বাস্তবতা।

নিজ নিজ মাতৃভাষার বিস্তারের চেষ্টা এবং শাসক বাঙালির ভাষার সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন এই যুগপৎ টানাপড়েনে একটা দুরূহ জমিন তাঁদের প্রায় সকলের জন্য। প্রথমত, আত্ম-পরিচয় নিয়েই রাষ্ট্রের সঙ্গে আর জাতীয়তাবাদী বাঙালিদের সঙ্গে বিস্তর এক অসম সংঘর্ষে তাঁরা জড়িয়ে আছেন। কিন্তু জাতিগত এই পরিচয়-সংগ্রাম নিয়ে স্বতন্ত্র আলাপ করা দরকার। আপাতত, সেসব জাতির ভাষা-বাস্তবতার কয়েকটি জরুরি দিক খতিয়ে দেখা যেতে পারে। প্রথমত, অধিকাংশ জাতির ভাষা নানান ঐতিহাসিক কারণে আক্রান্ত। এতে অনেকগুলো ভাষার কথ্য প্রচলন থাকলেও লিপির কোনো গুরুতর যোগসূত্র বা চর্চা আর অটুট নেই। অন্য কিছু জাতির কথ্য ভাষাও বিলীয়মান, কিংবা প্রবল ভাষা আক্রান্ত। দ্বিতীয়ত, মাতৃভাষায় শিক্ষাদান করবার তাগিদ যতই তাঁরা বোধ করুন, রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া সেটা কেবল নিজ-জাতির উদ্যোগে সম্ভব নয়। তৃতীয়ত, রাষ্ট্র ভাষার উপর খুব ভালমতো দখল না-আনতে পারা পেশাগত ও সামাজিক জীবনে খুব নিগ্রহের অভিজ্ঞতা বয়ে আনতে পারে। চতুর্থত, মাতৃভাষা আর রাষ্ট্রভাষা নিয়ে এই জাতির মানুষজন যে দুটো পরস্পরবিরোধী পরিস্থিতিতে বসবাস করতে থাকেন সেটা পাশের বাড়ির বাঙালি প্রতিবেশিকেই তাঁরা বোঝাতে সমর্থ হন না। এই প্রান্তিক দশাটি কেবল চারটি বৈশিষ্ট্যে পরিসীমিত হবার নয়।

পক্ষান্তরে, রাষ্ট্রবাসী ভিন্নভাষী সেই জাতির জন্য শাসকের ভাষা আয়ত্ত্ব করা ছাড়া তার অভিব্যক্তির কোনো পথ খোলা নেই। যত অল্প বাঙালি লোকেই পড়ে থাকুন না কেন, কল্পনা চাকমা’র বাংলা ভাষায় লিখিত ডায়েরি পাহাড়ি অঞ্চলের প্রায় সকল লিপি-প্রশিক্ষিত মানুষ পড়েছেন। আর কল্পনা চাকমা’র ডায়েরি সমেত আরও কিছু জন-অভিব্যক্তি জুম্ম মানুষজন বাংলা ভাষাতে প্রকাশ করেছেন বলেই বলবান বাঙালির কিছু পাঠক সেগুলো পড়েছেন। অবশ্য তার জন্য পার্বত্য সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক কর্মীদের প্রায় ফিরিওয়ালার মতো করে বাঙালি পাঠকের ঘরে ঘরে ঘুরতে হয়েছে। বলবান বাঙালি অত সহজে প্রান্তভাষীর অভিব্যক্তির খোঁজ রাখেন না, এমনকি প্রবল রাষ্ট্রভাষায় লিখিত হলেও। শাসকের ভাষায় আরও দখল নিতে পারলে হয়তো চলেস রিসিলের সংগ্রামটাকে আরও একটু জানতে পেতেন বলবান বাঙালি, কিংবা তাঁদের শিক্ষিত প্রতিনিধিরা। চলেস রিসিলের সংগ্রামের প্রতি সমর্থন থাকা অবশ্য আরেকটি প্রসঙ্গ।

[page]
৫.
ভাষার প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ কথ্য ঐতিহ্যের মর্মমূল ধ্বংস করেছে-বাউল ঐতিহ্য থেকে লোককাহিনী, কিসসা থেকে জন-কথামালা, পালাগান থেকে লোকদর্শন সবকিছু। এসবের অবলোপের চেহারা ও বৈশিষ্ট্য নানাবিধ। নিষ্ঠাবান গবেষণা ও মনোযোগী শাস্ত্রীয় দৃষ্টিকোণ ছাড়া খালি চোখে দেখাই যায় না প্রায়। কিন্তু এতে সম-সামর্থ্যরে মানুষজনও কোণঠাসা হয়ে পড়তে থাকেন বা অবধারিত সাংঘর্ষিক স্বার্থ তৈরি হতে থাকে। সাম্প্রতিক বাংলাদেশে সবচেয়ে সংঘাতময় অবস্থা তৈরি হয়েছিল মানবাংলার ব্যবহার করবার অবধারিত্ব নিয়ে। সাম্প্রতিক বললেও অন্তত তিনটা পরিসরে গত কয়েক বছর ধরেই এই সাংস্কৃতিক সংঘর্ষ চলমান ছিল। বিস্ময়ের না যে পরিসর তিনটাই শিক্ষিত মধ্যবিত্তকুলের বিচরণ এলাকা। তিনটা পরিসরের একটা হচ্ছে যেটাকে বলা হচ্ছিল ‘ডিজ্যুস ভাষা’।
অন্যটি হচ্ছে মিডিয়া বিশেষত এফ. এম. রেডিওর সাম্প্রতিক উত্থানের মধ্যে সেখানকার উপস্থাপকদের ভাষা। আর শেষোক্তটি হচ্ছে জন-রচনা তথা ব্লগের ভাষা।

এই তিন ভাষাজগৎ নিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক মানুষদের অশান্তি, অস্বস্তি, আপত্তি ছিল লক্ষ্য করবার মতো। এত গুরুত্ব এগুলো নিয়ে তাঁরা দিয়েছেন সেটা খোদ ভাষার প্রাতিষ্ঠানিকীকরণেণর শক্তিমত্তাকে সামনে হাজির করেছে। আর স্মরণ করিয়ে দিয়েছে কয়েক বছর আগে মাকসুদ-এর গাওয়া একটা রবীন্দ্রনাথের গানের প্রতি উল্লম্ফিত প্রতিক্রিয়াকে। আপত্তিগুলো প্রবল ছিল। সভা-সমিতি, টিভি টক-শো কিংবা পত্রিকার ক্রোড়পত্র ভাষার মুরুব্বিহীন হয়ে-পড়ার আতঙ্ককে জায়গা দিয়েছিল। সেই হিসেবে এটাকে ‘বিগ ইভেন্ট’ই বলতে হয়। সান্ত্বনার কথা হলো মিডিয়া আগ্রহের জীবনচক্র আছে এবং ওই বিলাপ বিশেষ দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। কিন্তু বিলাপের মধ্যে ঘোরতর কিছু বিচক্ষণতার সঙ্কটও লক্ষ্য করা গেছে। যেমন, উদাহরণ হিসেবে, যাকে ‘ডিজ্যুস ভাষা’ বলা হচ্ছিল তার সঙ্গে ব্লগের বা জন-রচনার ভাষাকে অবিমিশ্র গুলিয়ে ফেলা হয়েছে। কিংবা, নানান অ-মানভাষার উপস্থিতিতে আসলে অভিযোগটা যে কী সেটাও খুব পরিষ্কার ছিল না। খুব স্পষ্ট থাকা দরকার এগুলোর পরিমণ্ডল খুব স্বতন্ত্র এবং কোনোটা কিছুতেই অন্যটা নয়। উপরন্তু, নানান রকম সার্বভৌম ভাষাভঙ্গি প্রাতিষ্ঠানিক ভাষার শক্তিশালী প্রতিপক্ষ নয়, কারণ প্রাতিষ্ঠানিক ভাষাকে রক্ষা করে বিধিমালা।

[page]
৬.
ভাষার রাজ্য কি কেবল একটি ভাষায় আমাদের দক্ষতা আর যোগ্যতার প্রসঙ্গ? আকাঙ্ক্ষা কি ভাষাকে রূপদান করে না? সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা? চিন্তা আর ভাষার সম্পর্ক নিয়ে দুশ্চিন্তা অনেক পুরনো প্রসঙ্গ, মীমাংসাগুলোও পুরনো। আমার এই মুহূর্তের আগ্রহ সেটা নিয়ে নয়। বরং, আকাঙ্ক্ষা নিয়েই আমার এই মুহূর্তের ভাবনা। যদি আকাঙ্ক্ষা ভাষাকে রূপদান করবার সামর্থ্য না-রাখে তাহলে কীভাবে আগামীর বনিয়াদ বানানো হয়? কীভাবেই বা রাজনীতি গড়ে ওঠে? ক্ষমতা সংগঠিত হয়? কিংবা ক্ষমতার প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেয়া হয়? রাজনীতি কিংবা প্রতি-রাজনীতি?

বলা হচ্ছে, শাহবাগে, প্রজন্ম চত্বরে, তারুণ্য জেগে উঠেছে। ‘তারুণ্য'কে দেখা হয় প্রাণোচ্ছলতা, আবেগপ্রবণতা আর প্রাণশক্তির প্রতীক হিসেবে। এই দেখাদেখির শক্তি এতটাই যে কাল থেকে কালান্তরে এই অর্থগুলো জড়ো হয় যাকে তারুণ্য বলা হয়ে থাকে তার মধ্যে। একটা বয়সবাদী পরিকাঠামো তার মধ্যে আছে। কিন্তু সেটার অতিক্রমণও আছে। আছে বলেই নানান বয়সের মানুষ ‘তারুণ্য’কে যাচনা করেন, নিজের ‘তারুণ্য’ ঘোষণা করেন, জৈব-বয়সবাদকে প্রত্যাখ্যান করেন ‘অন্তর' কিংবা ‘চেতনা’র কথা বলে। হয়তো তাঁরা চিন্তনপ্রণালীর কথা বলেন, কিংবা তাঁরা আকাঙ্ক্ষার কথা বলেন। আকাঙ্ক্ষা চিন্তনপ্রণালীর একটা বিন্যাস বলে আমি মানি।

আকাঙ্ক্ষা যখন নানান সূক্ষ্ম পরিমণ্ডলের ছন্দোময়তাকে ধারণ করে ভাষা তখন বহুবর্ণিল, বহুত্ববাদী হয়ে ওঠে। ভাষা তখন বিবৃত করে একটা নিরাপদ নিবাসের দিনলিপি, কিংবা প্রতিশ্রুতি। ভাষা তখন স্থপতি হয় ক্ষমতা আর সম্পদের টানাপড়েন আর বিবাদের ঊর্ধ্বের এক সমতল জমিনের, জমিনটি প্রতিষ্ঠিত হবার ঢের আগেই। কিন্তু আকাঙ্ক্ষা যখন দ্রোহ আর বিক্ষোভের, এমনকি হয়তো ক্রোধের পরিমণ্ডল থেকে উদ্ভূত হয় তখন ভাষা-অভিব্যক্তি পরিসীমিত হয় একটি দাবিনামায়।

শাহবাগের তরুণদের মুখে যেমন হচ্ছে।