পুরনো কলকাতার ফিরিওয়ালার ডাক, রাস্তার আওয়াজ, পাল্কির বেয়ারাদের হাঁক নিয়ে একটি অসামান্য বই লিখেছিলেন রাধাপ্রসাদ গুপ্ত। অনেকটাই স্মৃতির ওপর দাঁড়িয়ে লেখা এ বই। এছাড়াও লেখক রসরাজ অমৃতলাল বসুর ‘পুরাতন পঞ্জিকা’ ও রায় বাহাদুর শশীচন্দ্র দত্ত-এর ‘দি স্ট্রীট মিউজিক অফ ক্যালকাটা’ বই থেকে অনেক সাহায্য নিয়েছেন। ফিরে পড়া গদ্য নয়, বরং ফিরে দেখা দিনের গল্প বলে এ বইয়ের গদ্য। বন্ধু অমিতাভ প্রহরাজের কাছে আমি ঋণী এ বই হাতে তুলে দেওয়ার জন্যে।


পুরনো কলকাতার ফিরিওয়ালা- ফিরিওয়ালিদের আর রাস্তার গাইয়ে-বাজিয়েদের নিয়ে যিনি প্রথম ছবি আঁকেন তিনি হলেন বেলজিয়ান শিল্পী বাল্‌থাজার সল্‌ভিনস। ১৭৯৯-এ কলকাতায় ছাপা তাঁর ‘এ কালেকসান্‌ অফ টু হানড্রেড এ্যাণ্ড ফিফ্‌টি কালার্‌ড এচিংস ডেসক্রিপটিভ অফ দি ম্যানার্‌স, কাষ্টমস এ্যাণ্ড ড্রেসেস অফ দি হিন্দুজ’ বইয়ে এই ছবিগুলো প্রথম বেরোয়। তারপর তিনি কলকাতায় ছাপা বইটির ছবিগুলো আর তার সঙ্গে আরও আটত্রিশটা অর্থাৎ মোট ২৮৮টা ছবি নিয়ে চার-খণ্ডে তাঁর সুবিখ্যাত ‘লেজ্যাদুঁ’ (অর্থাৎ দি হিন্দুজ) প্যারিস থেকে ১৮০৮-১৮১২-তে ছেপে বার করেন যা তাঁর কলকাতায় ছাপা বইয়ের চেয়ে একটু কম দুষ্প্রাপ্য। ...
কোম্পানির রাজত্বের শুরু থেকে গত শতাব্দীর মাঝামাঝি যে অসংখ্য বিশেষ করে বিলিতি শিল্পীরা কলকাতায় এসেছিলেন তাঁদের মধ্যে কেউ সল্‌ভিনস-এর মতন বছরের পর বছর দিশী কলকাতায় ঘোরা ত দূরে থাক সেই কলকাতার ছায়াও মাড়াননি কেবল দুচারজন ছাড়া। এঁদের মধ্যে একজন হলেন ফরাসি শিল্পী মাদাম বেলেনস।
সল্‌ভিনস-এর পর কলকাতার ফিরিওয়ালাদের আরও ছবি আমরা দেখতে পাই ১৮৩২ খ্রীষ্টাব্দে ছাপা এই মাদাম বেলেনসের ‘হিন্দু এ্যাণ্ড ইউরোপিয়ান ম্যানার্‌স ইন বেঙ্গল’ বইয়ে। এই প্রায় দুষ্প্রাপ্য বইটি ঋদ্ধি-ইণ্ডিয়া অধ্যাপক নিশীথরঞ্জন রায়ের সম্পাদনায় ১৯৭৯-তে বার করেছেন। এর চব্বিশটি সুন্দর রঙ্গিন এনগ্রেভিংসগুলির মধ্যে দুটি ছবি হল পাইকারদের, একটি ‘বান্দারওয়ালা’ আর একটি ছবি মুসলমান ফকির ও তার পরিবারের।
প্রথম ছবিটায় দেখা যায় যে একজন মেমসাহেবের বাড়িতে দুজন পাইকার বা ফিরিওয়ালা জিনিস বেচতে এসেছে। মেমসাহেব কিছু কেনাকাটা করে একজন ফিরিওয়ালাকে তাঁর আয়াকে দস্তুরি দিতে বলছেন আর সে হাত জোড় করে প্রতিবাদ জানাচ্ছে। মাদাম বেলেনস ছবিটির সম্বন্ধে লিখেছেন যে এই সব হিন্দু ফিরিওয়ালারা আসলে তখনকার দিনের চীনেবাজারের জমকালো বড় বড় দোকানদারদের ফড়ে ছিল। বড় বড় টানা দেওয়া বাক্সের মধ্যে আসল ও ঝুটো মণিমুক্তা, বিলিতি ও ফরাসি সাটিন ও সিল্ক, মসলিন, ক্যামব্রিক, রিবন ইত্যাদি নানান ধরনের সৌখিন ও গেরস্থালির জিনিস এরা দু-তিনজন মিলে তিন চারজন মুটের মাথায় করে সাহেবটোলার বাড়ি বাড়ি ঘুরে ফিরি করত। এদের পরনে থাক্লত মসলিনের জামাকাপড় আর মাথায় পাগড়ি। এদের ভাঙ্গা ভাঙ্গা ইংরেজিতে যে ডাক ছিল সেটা হল ‘ফাইন রিবিন গট্‌ মেম (ম্যাদাম), সাটিন গট্‌, বুক মসলিন গট্‌, লিনো, সিল্কো এস্‌টোকিং, গ্লোবস্‌ (গ্লাভস্‌), প্লেনটি ফাইন, ফাইন টিংগস্‌ গট্‌ মেম, ওয়ানটো এনি টিংগস্‌ মেম।’ এই সব কথা শুনলে রামকমল সেনের ১৮৩৪ খ্রীষ্টাব্দে ছাপা ইংরিজি-বাংলা ডিকসেনারির মুখবন্ধে তাঁর সেই বিখ্যাত উক্তির কথা মনে আসে :
The Dhoba by frequent intercourse with the English learned their language, in about the same perfection as the lalbazar bearers, who are frequently to be seen surrounding the sailors when they land. He may be considered the first English Scholar among the natives of Calcutta.
রামকমল সেনের কথার জের টেনে বলা যায় সাহেবটোলার দিশী ফিরিওয়ালারাও ধোপা ও লালবাজারের বেয়ারাদের মতন আমাদের প্রথম ইংরিজি স্কলারদের মধ্যে পড়ে।
এ কথাটা একেবারে হেসে উড়িয়ে দেওয়া যায় না যখন আমরা ১৮৭২ খ্রীষ্টাব্দে জাতীয় সভায় রাজনারায়ণ বসুর ‘সেকাল ও একাল’ বক্তৃতায় পড়ি যে তখন ইস্কুলে ছেলেদের ইংরিজি শেখানো হত এই রকম পদ্য ‘ঘোষিয়ে’ :
                          পম্‌কিন্‌ লাউ কুমড়া, কোকোম্বর শশা।
                          ব্রিঞ্জেল্‌ বার্ত্তাকু, প্লোমেন্‌ চাসা।।
কিম্বা খাম্বাজ রাগিনীতে ঠুংরি চালে এই ধরনের গান গেয়ে :
                          নাই (Nigh) কাছে, নিয়র (Near) কাছে,
                          নিয়রেষ্ট (Nearest) অতি কাছে।
                          কট্‌ (Cut) কাট্‌, কট্‌ (Cot) খাট্‌,
                          ফলোয়িং (Following) পাছে।।
[...] লোলা মোনতেজ ছিলেন গত শতাব্দীর (১৯ শতকের কথা বলছেন এখানে লেখক) একজন সুন্দরী নাচিয়ে আর নটী। তিনি ছিলেন ব্যাভেরিয়ার প্রথম লাড্‌ভিগের মিস্ট্রেস, রাশিয়ার প্রথম নিকোলাসের চিত্তহারিনী, ফ্রান্‌জ লিস্টের প্রেমিকা, ‘প্যারিসের রাজা’ বালজাক্‌ আর আলেকজান্দার দুমার প্রিয় বান্ধবী। এই লোলাই আবার পুরনো কলকাতার পাল্কিওয়ালাদের হাঁকের কথা লিখে গেছেন। কথাটা অবিশ্বাস্য শোনালেও সত্যি। তাঁর আসল নাম ছিল মারি দোলোরেজ এলিজা রোজান্না গিলবার্‌ট এবং তিনি লেঃ জেমস্‌ বলে একজন ইংরেজ সৈনিককে বিয়ে করেন। বিয়ের কিছুদিন বাদে তাঁর স্বামী তাঁকে ছেড়ে আর একটি মেয়েতে আসক্ত হয়। ফলে ১৮৪১ খৃষ্টাব্দে লোলা কলকাতা ছেড়ে ইউরোপে চলে যান। সেকালে কলকাতায় চলাফেরার জন্যে তাঁকে পাল্কি চড়তে হত কিন্তু তিনি পাল্কিটাকে খুব আরামদায়ক যান বলে মনে করেন নি। তিনি লিখেছেন যে একবার একজন বিশাল মোটা ইংরেজ পাদরী যাঁর ওজন কম করে দু’শ পঁচিশ পাউণ্ড ছিল তাকে নিয়ে যেতে যেতে পাল্কি বেয়ারারা প্রত্যেক লাইন আলাদা আলাদা সুরে এই ধরনের গান করছিল:
                          উঃ কি ভারি মাল রে বাবা
                          নাঃ ! এটা একটা হাতি।
                          উঃ ! এর কি ভীষণ ওজন
                          এসো এটাকে আমরা নাবিয়ে দি।
                          এসো একে আমরা দিই কাদায় ফেলে—
                          তারপর ওর যা হবে হোক।
                          কিন্তু ভাইরে, তাহলে বেটা
                          ওর মোটা লাঠি দিয়ে আমাদের ঠ্যাঙাবে।
                          তাই জলদি করে চলা যাক্‌
                          লাফিয়ে চলো চট্‌পট্‌।
তারপর তারা ছুটতে ছুটতে একসঙ্গে একসুরে ‘লাফিয়ে চলো চট্‌পট্‌’, ‘লাফিয়ে চলো চট্‌পট্‌’, গাইতে গাইতে চলে গেল। এই অতিকায় হয়ত চলেছিলেন কলকাতার কোন বাজার বা জুতসই রাস্তার মোড়ে হিদেনদের উদ্ধারের জন্য ‘অতঃপর যীশু সকলকে প্রেম দান করিলেন’ গোছের বক্তৃতা দিয়ে ক্রিশ্চান ধর্ম ফিরি করতে। ১৮শ শতাব্দীর শেষে কেরী সাহেবকে ধর্ম প্রচার করতে দিনেমার সহর শ্রীরামপুরে বাস করতে হয়েছিল। কিন্তু মোনতেজ-এর সময়ে বিলিতি পাদরীদের বক্তৃতা কলকাতার মোড়ে মোড়ে আর গ্রামের হাটে-গঞ্জে নিয়মিত শোনা যেত।
লোলা মোনতেজ তারপর বলেছেন যে তিনি জানেন না যে পাদরীবাবাজী পাল্কি বেয়ারাদের কথা বুঝতে পেরেছিলেন কিনা। তবে একবার তাঁর ‘মানুষ-ঘোড়ারা’ তাঁর সম্বন্ধে যে গান গাইতে গাইতে পাল্কি নিয়ে ছুটছিল সেটা শুনে তিনি খুব আনন্দ পেয়েছিলেন। সেই গানটা হল :

                          ইনি মোটেই ভারি নয়
                          কাব্বাডা (খবরদার)
                          ছোট বাবা মিসি
                          কাব্বাডা
                          চট্‌পট্‌ নিয়ে চল
                          কাব্বাডা
                          মিসি বাবা
                          কাব্বাডা


[গদ্যাংশটি শ্রীরাধাপ্রসাদ গুপ্ত প্রণীত ‘কলকাতার ফিরিওয়ালার ডাক আর রাস্তার আওয়াজ বা টক-নোনতা-মিষ্ট-ঝাল- কষায়-তিক্ত রস মিশ্রিত সখের জলপান’ গ্রন্থ থেকে সংকলিত। পুরনো বানান অপরিবর্তিত।]