গ্রাফিত্তি প্রকাশনী থেকে ১৯৯৯ সালে প্রকাশিত কবি সজল বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পাণ্ডুরলিপি’ কাব্যগ্রন্থ থেকে নির্বাচিত একগুচ্ছ কবিতা রাখা হল ‘ফিরে পড়া - কবিতা’-র এবারের সংখ্যায়।
উল্লেখ থাকুক, সজল বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রথম কবিতার বই ‘তৃষ্ণা আমার তরী’ প্রকাশিত হয় ১৯৬৬ সালে। তারপর ‘স্বপ্নে উপকূলে’, ‘পিকাসোর নীল জামা’, ‘ব্রায়ার পাইপ’ ইত্যাদি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়। ১৯৯৪ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর নির্বাচিত কবিতা।


একটি পাণ্ডুলিপি

জন্মের মুহূর্তে
কালপুরুষ মন্ত্র উচ্চারণ করলেন –
পাণ্ডুলিপি হও –

সেই থেকে ভালবাসার হরফ
ঘৃণার দাঁড়ি
খ্যাতির উদ্ধৃতি-চিহ্ন
অপমানের অর্ধ-ছেদ

নিজেই অক্ষরে অক্ষরে ক্ষতবিক্ষত
একটা পাণ্ডুলিপি
আর শেষে একটা সই -
সজল বন্দ্যোপাধ্যায়


ঘরকন্না

আমি একটি রঙীন পাথর আনলুম।
রোজ ঘষি মাজি,
আরো চকচকে করে তুলি,
রঙ-বেরঙ ঠিকরে পড়ে।
আমার কপালের ঘাম
ওর ওপর ঝরে পড়ে,
ও নিজেই যেন ঘেমে নেয়ে যাচ্ছে।
আমার চোখের জল
ওর ওপর ঝরে পড়ে,
সেটাই ওর চোখের জল ফেলা।

পাথরটা কুঁদে কুঁদে
কিছুতেই একটা জ্যান্ত মূর্তি গড়তে পারছি না।


ভুল

যে সব চিঠিতে লেখা থাকে –
ডব্লু ২বি ১৬/১০ গলফ গ্রীন কোলকাতা – ৯৫,
পিয়ন আমার দরজার ডাকবাক্সে ফেলে দিয়ে যায়।
কিন্তু
আমার বাড়ির চারপাশের
বাড়িগুলোতে কারা থাকে?
ওদের আমি চিনি?
কার বউ মাঝরাতে চোখের জল ফেলে?
কার ছেলের চাকরী গেছে?
কার মেয়ে কেন বিয়ে করতে চাইছে না?
ওরা কি জানে –
কার কোথায় অভিমান?
আমার ঘরে অত রাত পর্যন্ত আলো জ্বলে কেন?
ভুলটা কার?
আমার না পিয়নের?
নাকি যারা চিঠি লেখে তাদের?


জন্যে

অন্তত আমার জন্যে বেঁচে থাক –
পিকাসোর ছবিটা বল্ল –
অন্তত আমার জন্য বেঁচে থাক –
আমার কবিতাগুলো বলে উঠল –
অন্তত আমার জন্যে বেঁচে থাক –
ফরাসী মদ টলটল করে উঠল –

অন্তত আমার জন্যে তুমি তো মরতে পার,
মেয়েটি বলে উঠল –

বাঁচার জন্যে তৈরি ছিলুম –
এখন থেকে মরার জন্যে


প্রশ্ন

আমি একই বাড়িতে ফিরি
আমি একই বিছানায় ঘুমোই –
আমি একই জনের সঙ্গে শুই –

আমি একই কথায় কবিতা লিখিনা কেন?
আমি একই মানুষ থাকিনা কেন?


একটা ঘর

আমার একটা দরজা আছে,
আমার দুটো জানলা আছে,
আমার চারটে দেয়াল আছে,
আমার একটা টেবিল আছে,
আমার পাঁচটা কলম আছে,
আমার একটা কুঁজো আছে,
আমার দুটো বিছানা আছে,
আমার দুটো মাথার বালিশ আছে,
আমার একটা পাশবালিশ আছে,
আমার একটা চাদর আছে,

দোহাই, কেউ প্রশ্ন কোরো না-
তোমার ঘরটা কোথায়?


যুগান্তর

একযুগ সঙ্গম করিনি
একযুগ চোখ বুঝিনি
একযুগ গান গাইনি
একযুগ স্বপ্ন দেখিনি

একযুগ কথা বলিনি
একযুগ দীর্ঘনিঃশ্বাস
একযুগ নিজে নিজের থেকে দূরে
একযুগ একটা কথাও লিখিনি

একযুগ পাথরের সামনে আয়না
একযুগ আয়নার সামনে একটা পাথর


একটা স্থির ছবি

রেকর্ডগুলো পড়ে থাকবে -
পাইপগুলো ঠাণ্ডা -
বইগুলোর পাতা হলদে -
বোতলে হয়তো অল্প একটু ভডকা -

অথচ
সবকিছু
সব্বাই
সবসময়

ক্যালেন্ডারে একটা সাল
একটা মাস
একটা দিন
একটা স্থির ছবি


সকাল হতেই

ছায়ার পাশে আরেকটা ছায়া -
আমরা তিনজনে
একে অন্যকে ছুঁ’য়ে
হাঁটতে লাগলুম -

কেউ কোন কথা বলছে না
কেউ কোন শব্দ করছে না
এবং রাত বাড়ছে

সকাল হতেই
কোথায় কার ছায়া
কোথায় কেউ

শুধু একা একটা কষ্ট


কুয়াশা

ঠিক এইভাবে
কেননা
এখন কুয়াশা
চুল থেকে চুণবালি

পুরোনো ক্যালেন্ডারের পাতায় তৈরি
বইয়ের মত মলাট
ছিঁড়ে গিয়ে

আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে
আর দেখতে পাবনা।


বিধিসম্মত নিষেধবাণী

আপনি স্বপ্ন দেখা ছেড়ে দিন
আপনি ফুটবল মাঠে যাওয়া ছেড়ে দিন
আপনি ধূমপান ছেড়ে দিন
আপনি মদ খাওয়া ছেড়ে দিন
আপনি কবিতা লেখা ছেড়ে দিন
এবং

তার বদলে
তার বদলে
এবং তার বদলে...


স্বপ্ন

আমি পাহাড়ে ছুটি কাটানোর স্বপ্ন দেখি।
আমি সমুদ্রে ডুবে থাকার স্বপ্ন দেখি।
আমি না-জামা না-কাপড় মেয়েমানুষের স্বপ্ন দেখি।

আমি কিন্তু
মৃত্যুর স্বপ্ন দেখিনা।
এবং
সেই ঘুমের মধ্যে অপেক্ষায় থাকি –
কখন বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখব।


অমোঘ

আপনি গুরুর ভজনা করছেন।
আপনি ছেলেপুলে মানুষ করছেন।
আপনি মদে টাকা ভেজাচ্ছেন।
আপনি মেয়েমানুষের ভেতর টাকা রাখছেন।
আপনি ব্যাঙ্কের অংক কষছেন।
আপনি বাড়ি গাঁথছেন।
আপনি জমি কিনছেন।

খরগোশগুলো গর্তে মুখ লুকিয়ে
কেমন বসে আছে!


প্রাত্যহিক

যার সঙ্গে সঙ্গম করি
তার মুখ দেখিনা
যার মুখ দেখি
তার সঙ্গে সঙ্গম করিনা –

মেয়েটির মুখ দেখলাম –
সেদিন থেকে মেয়েটি সে হয়ে গেল –
ঘর করার ঘর হয়ে গেল –

সমুদ্র সমুদ্রের কাছে রইল
নদী নদীর কাছে -


কথা

সারা সহরে কথা হচ্ছে
কথার কথা,
কথার মত কথা;
এবং কথায় কথায়
কখন যে দিন, কখন যে রাত!
শুধু কথা আর কথা জড়িয়ে
আমরা ঘুমের কথা ভাবছি
এবং জাগার কথাও।

সবাই বলছে সহরের কথা
সহরে সবাই কথা বলছে।


দর্শক

বাড়ির দেওয়াল নোংরা হচ্ছে।
পরা গেঞ্জিতে ফাট ধরছে,
বইয়ের পাতাগুলো হলুদ হয়ে আসছে,
বন্ধুদের সঙ্গে কম দেখা হচ্ছে,
স্তূপীকৃত হচ্ছে ডায়েরী আর ক্যালেন্ডার,

বলো, কিই বা করার আছে!


শেষ লেখা

নিজের পথে চলতে
নিজের চোখে দেখতে
নিজের জগৎ গড়তে
নিজের ভাষায় কথা বলতে

যা পেরেছি - অতৃপ্তি
যা পারিনি – অক্ষমতা

কলম রইল, খাতা রইল

বারান্দা থেকে শোনা যাবে -
কাগজওয়ালা ডেকে চলেছে -
পুরোনো কাগজ,পুরোনো কাগজ -

অভিযোগ নয়, সমস্ত অভিমান
মেপে মেপে ওকেই নিয়ে যেতে দিয়ো -