লং উইকেন্ড

লেখালিখির আগ্রহ একেবারেই মরে গেছে। যোগাযোগও কমতে কমতে তলানিতে। একেবারে গা ঢাকা দেওয়ার অপেক্ষায় বসে আছি। নেহাত কিছু মুখ। হাতেগুনে। আজো কেন যে অমনলিন! যেমন রাজর্ষি, শুভংকর, সোমনাথ, শৌভিক কিংবা দিশারী। হয়ত আরও কেউ কেউ। ইদানীং এই যে সামান্য আঁকিবুকি তা স্রেফ ওদের কারণেই। এখানে একপ্রকার ভাল। কেমন? কাউকে চেনো না তুমি/ তোমাকে চেনে না কেউ/ সেই তো ভালো। এই তো...

যাই হোক, প্রশ্ন উঠতেই পারে যে আজকের কিস্তিটা আর্জেন্টিনার মধ্যে কেন?

ঠিকই। তবে এটাও সত্যি যে বুয়েনেস্ আইরেসে ঘাঁটি না গাড়লে আমার হত না। কী? রিও ট্রিপ। রিও ডি জেনিরো। ব্রাজিল। গত মার্চের এক লং উইকেন্ডে। দিন চারেক। কোপাকাবানা বিচের ধারেই আমাদের হোস্টেল। নাম কাবানাকোপা। একজন আইরিশ। একজন নাইজেরিয়ান। আর আমরা চারজন। বঙ্গদেশ থেকে। ছয়জনের ডর্ম। এরকম আরো অনেক ঘর। কোনোটা চারজনের, কোনোটা ছয়জনের আবার কোনোটা বা আটজনের। ছেলে-মেয়ে মিলেমিশে। কেউ নেদারল্যান্ড, কেউ পেরু, কেউবা সুইডেন, কেউ আস্ট্রেলিয়া। আথচ আমাদের হল-কিচেন-বাথরুম সব শেয়ারড্। আলাপ হল। অনেকের সাথেই। আড্ডাও।

একরাতে রুমমেট গবু এসে বলে গেল যে ঘরে একটা ভেনিজুয়েলার ছেলে ঢুকেছে আর বলছে আমাদের এক বং-এর বেডটা নাকি তার। আমি ও সেই বং তখন এক চিলতে ছাদে। ভ্যোদকা নিয়ে। সাথে খুব নরম একটা বৃষ্টি। এরকম ভুলচুক হয়েই থাকে। সিজন্ টাইম। অনেক বলে কয়ে তাকে মাঝরাতে বার করা গেল। জিনিসপত্র গুছিয়ে সে গম্ভীর মুখে অন্য ঘরে চলে গেল। আমরা আবার ভ্যোদকায়। আসলে হিউমিডিটি হিউজ্। সমুদ্রের ধার। তাই ভ্যোদকাই।

টিকিট কেটে ছিলাম অনেক আগেই। মেক মাই ট্রিপ। এমিরেটস্। ক্রেডিট কার্ড। হোস্টেল বুকিংও অনলাইন। রিও যাওয়ার আগে তাই প্রয়োজন ছিল শুধু হাতখরচের জন্য কিছু ব্রাজিলিয়ান রিয়েল। অগত্যা ফ্লোরিডা স্ট্রিট। বুয়েনেস্ আইরেসের মুদ্রা কেনাবেচার ব্ল্যাক মার্কেট। সাথে অন্য ধান্দাও। এই কারণেই আমি প্রথম দিন এয়ারপোর্টে ডলার ভাঙাইনি। ফ্লোরিডা স্ট্রিটের ব্ল্যাকাররা অফিসিয়াল রেট এর চেয়ে অনেকটাই বেশী দেয়। বিশেষত ডলার টু পেসো কি রিয়েল। প্রসঙ্গত এখানকার অধিকাংশ রাস্তার নামই কোনো দেশ-রাজধানী-শহর কি দেশনায়ক বা প্রখ্যাত মানুষের নামে। যেমন ভেনিজুয়েলা-প্যারাগুয়� �-মেক্সিকো বা লিমা (পেরুর রাজধানী)-মন্টেভিডিও (উরুগুয়ের রাজধানী) আবার ফ্লোরিডা (শহর) কিংবা খোরখে-লুই বোরহেস- সব্বাই চেনে। লেখক। কিন্তু সবই এখানকার রাস্তাঘাট। আসলে এদের G এর উচ্চারণ নেই। ওটা খ এর মত হয়। আর J নেই। ওটা হ এর মত। আর সব রাস্তাই প্যারালাল ও পারপেন্ডিকুলার। স্রেফ ক্রশিংটা মনে রাখলেই চেষ্টা করলেও হারানোর ভয় নেই।

কিছু লংশট রিও থেকে

১। বুয়েনেস আইরেস এর তুলনায় সামান্য ঘিঞ্জি। একটু নোংরা। হাল্কা ভিড়ভাট্টা। বাস ধরার তাড়া। ভিখিরি-পাতাখোর-লাথখোর� �� প্রায় সব রাস্তাতেই। এদিক সেদিক হাল্কা বৃষ্টির জমা জল। মানে অনেকটা কলকাতা কাটিং।

২। দেখলাম। সেই আশ্চর্য যীশু। পাহাড়ের মাথায়। সপ্তআশ্চর্যের একটা। অনেকবার গাড়ি পালটে পালটে পাহাড়ের মাথায় উঠতে হয়। অবশেষে দেখা মেলে। একটা অদ্ভুত ফিলিং। তাজমহল কি নায়াগ্রা দেখার মতই। যদিও এ জামানায় নায়াগ্রা কি তাজ পাড়ার নাটুও দেখে ফেলেছে। এই তো ওমুক-তমুক সব বাবুরই কৃতি সন্তান তো এখন মার্কিং দেশে। কিংবা নয়ডায়।

৩। পাও দে আজুগার। বা সুগার লোফ মাউন্টেইন্। যার ওপর থেকে আখ্খা শহরটাই দেখা যায়। রোপওয়েতে করে চড়ে এলাম। ওখানেই কিছু বাংলাদেশী ব্যুরোক্র্যাটের সাথে আলাপ হল। অমায়িক। হাসিখুশি। আর ও হ্যাঁ, ভুট্টা খেলাম। এরা পোড়াতে জানে না। গরম জলে সেদ্ধ কোরে মশলা মারে। খারাপ লাগল না।

৪। ইপানেমা বিচের ধারে হাট বসেছে। রোববার তাই। মেট্রো করে ঘুরে এলাম। মূলত চামড়া আর কাঠের জিনিস। ব্যাগ-চটি-খেলনা-আসবাব-� �ো-পিস। জাঙ্ক জুয়েলারি আর নানান ডিজাইনের জামাকাপড়। ঘুরে ঘুরে একটা রেক্সিনের ব্যাগ, কাঠের যীশু আর খানদুয়েক টি-শার্ট কিনলাম। এইসব ছোটছোট আস্থায়ী দোকানগুলোতেও ক্রেডিট কার্ড নেয়। আসলে একটা ক্রেডিট কার্ড পকেটে থাকলে গোটা ব্রাজিলটই ঘুরে ফেলা যায়। এ ব্যাপারে দেখলাম আর্জেন্টিনার চেয়ে এরা অনেক এগিয়ে।

৫। সবচেয়ে ইন্টারেস্টিং যেটা সেটা হল আইল্যান্ড ট্রিপ। অনেকেই জানে না। স্রেফ শহর ঘুরে ফিরে যায়। আংরা। রিও শহর থেকে আড়াই ঘন্টা বাসে। ওখান থেকে বোটে করে তিনটে আইল্যান্ড। আটলান্টিকের ওপর ছ-ঘন্টা। এমনকি অতলে নেমে প্রচুর মাছ ও ফোটোশুট। বোটে পর্তুগীজ আর ল্যাটিন মেশানো গান-নাচ-অঢেল মদ-বিকিনি সুন্দরী। সাথে তরমুজ ও আনারস। দফায় দফায়। ফালা করে কাটা। লাস্ট আইল্যান্ডটায় কমপ্লিমেন্টারি লাঞ্চ। একানকার রান্না অনেকটা ভারতীয় টাইপ। ভাত-ব্ল্যাকবীন কারি-ফিশ আর চিকেন ফ্রাই। সাথে সালাড। অপুর্ব। নিজে রেঁধে ভাত আমি এখানে রোজই খাই। বাসমতী চালও। কচ্চিৎ। কিন্তু বেড়ে দেওয়া-ধোঁয়া ওঠা ভাত। সত্যিই মা আন্নপূর্ণা!

৬। যে কদিন ছিলাম কোপাকাবানার ধারে পেঁদিয়ে মাল খেয়েছি। এমনকি ছিনতাই এর ভয় আগ্রাহ্য করে সারারাত। সাথে অপুর্ব সব চাট। জিভে জল আসার মতঃ
চিংড়ি ভাজা
সার্ডিন ভাজা
বীফ ডিপ ফ্রাই সাথে রাঙ্গাআলু নরম করে ভাজা
মাটন কাবাব
পিন্টোদা (একরকম মাছ)কাবাব
সাথে ছিল ডাব। মিস্টি জল। আর কলকাতার মত চিরে দেয়। জল খাওয়ার পরে। নরম বা পুরু শাঁস। ভিতরে। বিচের ধারে ছোট ছোট সব আস্থায়ী দোকান। ভিখিরি-হিজড়ে-আর পাতাখোরের হাল্কা উপদ্রব আছে বটে কিন্তু পাত্তা না দিলেই হল।

চব্বিশ তারিখ রাতে বুয়েনেস্ আইরেস ঢুকেছি। পঁচিশ তারিখ থেকে ফের অফিস। চলছে একরকম। আগামী হপ্তায় বাড়ি পাল্টাচ্ছি। শীত আসতে এখনো কয়েক মাস।