চমৎকার একটি বই আবার প্রকাশ করেছেন ভাষাবন্ধন প্রকাশনী। সাদাত হাসান মান্টো তার ‘স্যাম চাচাকে’ লিখেছিলেন সে সব চিঠি। উর্দু, তারপর হিন্দি, সেখান থেকে বঙ্গানুবাদ। অনুবাদ করেছেন শৌভিক দে সরকার। এই চিঠিসমূহ, যা কোনদিনই প্রাপকের কাছে পৌঁছয় নি, যাবেও না কোনদিন, যেহেতু স্যাম চাচার কোন ঠিকানাই নেই। তার মধ্যে ষষ্ট চিঠিখানি হারিয়ে গিয়েছে বলে মান্টো জানিয়েছিলেন। ফলত পাঠক পেয়েছেন মোট আটটি চিঠি। আর তাতেই আক্কেল গুড়ুম!
কেন, তা নিয়ে যেমন দু কথা বলা যায়, সঙ্গে সঙ্গে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠতে পারে আরো কিছু বিচিত্র তথ্য। কিন্তু তার আগে এমন উপযুক্ত ভাষা বন্ধনে আটটি চিঠি অনুবাদ করার জন্য, কেবল বাংলাভাষী পাঠকের জন্য এমন আন্তরিক লেগে থাকার জেদের কারণে শৌভিক-কে সামান্য ধন্যবাদ জানাব না! একটু কৃতজ্ঞতা! তবে জয় হো!
এবার দেখি সাদাত হাসন্‌ মান্টো ( যাকে শৌভিক লিখেছেন সদত হসন মন্টো। কেন এমন বলেছেন তিনি হয়ত জানাবেন বারান্তরে) কখন কোথায় কেমন, কেনই বা গুড়ুম হল আক্কেল। এ সব অবশ্য নিছকই সর্বজনঞ্জাত তথ্য, তবু বলি একটু। সাদাত হাসন্‌ মান্টো-র মৃত্যু হয় ১৮ জানুয়ারি ১৯৫৫। স্যাম চাচাকে উনি ন নম্বর চিঠিটি লিখেছিলেন ২৬ এপ্রিল ১৯৫৪ তারিখে। আর প্রথম চিঠি ২৬ ডিসেম্বর ১৯৫১-য়। মাত্র ৪২ বছর ৮ মাস আয়ুষ্কালের মধ্যে অন্যান্য নানাবিধ রচনার সঙ্গে ২ বছর ৪ মাস জুড়ে তিনি এই সব চিঠি লিখেছেন। সে সময়ে তিনি শারীরিক বা মানসিকভাবে কেমন ছিলেন, পাকিস্তান বা আমেরিকা ছিল কেমন, এই দুই দেশের সম্পর্ক কেমন ছিল, একটু দেখে নিলে কি শিবের গীত গাওয়া হবে!
২৬ ডিসেম্বর ১৯৫১-য় প্রথম চিঠি। ৪ বছর আগে এই নতুন স্বাধীন পাকিস্তান জন্ম নিয়েছে বহু আশা, আশঙ্কা, অবিশ্বাস আর জাতিভিত্তিক মর্মন্তুদ দেশ ভাঙনের মধ্যে দিয়ে। দিশা তেমন কিছু নেই, আর্থিক সামর্থ নেই, আছে শুধু লক্ষ লক্ষ মানুষের আশা আর আবেগ। ভরসা আমেরিকার অনুদান ৯৮ মিলিয়ন ডলার আর নতুন দেশের মানুষের উচ্ছ্বাস। ভারত সে সময়ে পেয়েছিল ২৫৫ মিলিয়ন ডলার। দেশের উন্নতির জন্য উপযুক্ত মানব সম্পদ, পরিকাঠামো, প্রাকৃতিক সম্পদ, কিছুই তখন পাকিস্থানে তেমন সহজলভ্য নয়। আছে শুধু উদ্বাস্তুর অগণন উপস্থিতি আর অশেষ হাহাকার। ১৯৪৭ থেকে ১৯৫২, এ সময়কালে পাকিস্থানের জি ডি পি ছিল ৩%। কোরিয়ার যুদ্ধ না বাধলে অবস্থা হত আরো অবর্ণনীয়। জাতিভিত্তিক এই দেশ বিভাজন যারা দাবী করেছিলেন একদিন, অন্তহীন হিংসা আর রক্তপাতের পরেও তাদের স্বার্থ পূর্ণ করতে আপাত ব্যর্থ হল সেই দেশভাগ।
মান্টো তখন কোথায় কি করছেন? পাঞ্জাবের লুধিয়ানার এক অনামা গ্রামে ১৯১২-র ১১ মে তাঁর জন্ম। ১৯৩৬-এ লাহোর চলে আসেন। উর্দু ভাল জানতেন না। বস্তুত এ কারণে ম্যাট্রিকুলেশন-এ তিনি দু বার আটকে গিয়েছিলেন। কিন্তু তারপরেও লাহোরে আবদুল বারি নামীয় এক ভদ্রলোকের উৎসাহ এবং প্রশ্রয়ে মান্টো লেখা শুরু করেন। অনুবাদ করলেন ভিক্টর হুগো-র The Last Day of a Condemned Man, অস্কার ওয়াল্ড-এর ভেরা, প্রকাশিত হল রাশিয়ান ছোট গল্পের একটি উর্দু সঙ্কলন। ১৯৩৬এ বোম্বে-তে(অধুনা মুম্বাই) চলে এলেন। মুম্বাইয়ে এসে তিনি রুজির প্রয়োজনে মাসিক চলচ্চিত্র পত্রিকার সম্পাদনা করলেন, লিখতে শুরু করলেন হিন্দি চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্য এবং সংলাপ। এখানে থাকাকালীন তিনি বিয়ে করলেন।
এরপর দিল্লি চলে গেলেন ১৯৪১-এ। এবার অল ইন্ডিয়া রেডিও-য়। চারটি নাটক তিনি লিখে ফেললেন রেডিওর জন্য। এর মধ্যে ছোট গল্প লেখা তো চলছিলই। প্রকাশিত হল ছোট গল্প সংকলন ‘ধুঁয়া’ (SMOKE), ‘মান্টো কি আফসানে’ এবং বিষয়ভিত্তিক নিবন্ধ সংকলন ‘ মান্টো কি মাজামিন’। ১৯৪৩-এ প্রকাশিত হল ‘Afsane aur Drame’। অল ইন্ডিয়া রেডিও-র কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বনিবনা হল না। চলে এলেন আবার মুম্বাইয়ে। ১৯৪২-এ আবার ফিল্ম ইনডাস্ট্রিতে ঢুকে পড়লেন। তাঁর কলম থেকে ফিল্ম ইনডাস্ট্রি পেল ‘আট দিন’, চল্‌ চল্‌ রে নওজোয়ান এবং ‘মির্জা গালিব’-এর চিত্রনাট্য।
এরপর এসে গেল দেশভাগের মত মর্মন্তুদ ঘটনা। অবিশ্বাস, ঘৃণা আর অবিরাম রক্তপাত। ফিল্ম ইনডাস্ট্রিতে মান্টো তখন একজন মুসলমান মাত্র। পরিবার চলে গেছে লাহোরে। তিনি ঠিক করে উঠতে পারছেন না কি করবেন। ঘনিষ্ঠ বন্ধুজন আশ্বাস দিচ্ছেন। ইসমত চুঘতাই মান্টোকে একটা সময় অবধি খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ পেয়েছিলেন। এই সময়ে মান্টোকে তিনি সুবিধাবাদী বলেছিলেন। কিন্তু মান্টো, যে কি না দেখছে ১৯৪৭-এর ১৫ আগস্টের পর কি দ্রুত পালটে যাচ্ছে তাঁর চারপাশের পৃথিবীটা, বোম্বে টকিজ-এ মুসলমানকে বিতারন করার জন্য নিরন্তর হুমকি দেওয়া হচ্ছে, ঘরের সোফা আর মদ ছাড়া যার আর কোন আশ্রয় থাকছে না, তিনি যদি ভেবে বসেন লাহোরে গেলে আরো একটু ভাল ভাবে বেঁচে থাকা যাবে,তবে ‘সুবিধাবাদী’ এমন আখ্যা কি তাঁকে দেওয়া সঙ্গত! মান্টো, যার পক্ষে পাকিস্তানকে ভারত থেকে কিম্বা ভারতকে পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন করা সম্ভব নয়, তিনি নিজেকে একদিন যদি কেবল একজন মুসলমান হিসেবে আবিস্কার করেন, ১৯৪৮-এর ঐ ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক গোলযোগের পর কি ভাবে আর থাকবেন বম্বেতে! এই বিভাজন, রক্তক্ষয়, হিংসা প্রবলভাবে আলোড়িত করেছে মান্টোকে। ১৯৪৮-এ প্রকাশিত তাঁর লেখা ‘শিয়াহ্‌ হাসিয়ে’-র স্কেচগুলি আর Jelly, Warning, The Garland, Modesty আমরা স্মরণ করতে পারি এ প্রসঙ্গে। এ যেন চলমান চিত্রাবলীর একেকটি বীভৎস Snap Shot যা কি না মান্টোর সঙ্গে আমরাও বিস্মৃত হতে চাই। কিন্তু পারি কই!
দেশভাগ নিয়ে তার ছিল অসীম তিক্ততা। এই স্বাধীনতা ভারতবর্ষ নামের দেশটার সঙ্গে সঙ্গে তাকেও দু টুকরো করে দিয়েছিল। এই যন্ত্রণা তাকে আজীবন তাড়া করেছে। এমন নানাবিধ জাগতিক এবং মানসিক সঙ্কটের মধ্যে মান্টো প্রথম চিঠিতে কি বলছেন? ‘ ...এখন আমার দেশের নাম পাকিস্তান যেখানে ব্রিটিশদের সময়ে আমি মাত্র পাঁচ ছ বার এসেছিলাম। ব্রিটিশ সরকার আমাকে একজন পর্ণোগ্রাফি লেখক মনে করত। আমার দেশের সরকারও অবশ্য আমাকে তাই মনে করে। ...আমি সত্যিই একটা গরীব দেশে থাকি।‘ তবু YMCA Hall-এ তিনি যখন স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিমায় তাঁর ‘তোবা টেক সিং’ পড়া শেষ করেছেন, হলভর্তি লাহোর তথা পাকিস্তানের নিস্তব্ধ মানুষের চোখে তখন জল। এই লাহোরেই তিনি লিখেছেন ‘ঠান্ডা গোস্ত’, ‘খোল্‌ দো, ‘তোবা টেক সিং’,’ইস মাঝাধার মে’,’বাবু গোপিনাথ’-এর মত গল্প। পঞ্চাশতম জন্মবার্ষিকীতে ডাকটিকিট প্রকাশ করে এবং ‘Nishan-e-Imtiaz’ উপাধি প্রদান করে এই কথাশিল্পীকে সম্মান জানিয়েছে পাকিস্তান। বিভিন্ন বিখ্যাত প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হয়েছে তাঁকে নিয়ে নানান আলোচনা। কিন্তু লৌকিক জীবনে তিনি কত ভাবেই না বিব্রত। তিনি লিখছেন, ‘ আমি জীবনে বাইশটা বই লিখেছি, কিন্তু আমার নিজের কোন বাড়িঘর নেই, কোন গাড়ি নেই, একটা প্যাকার্ড কিংবা ডজ নেই। এমন কি সেকেন্ড হ্যান্ড-ও কিছু নেই।‘ এই আত্মকথন প্রতি চিঠির কিছু অংশ জুড়ে থাকে। তারপরেই মান্টো স্বমহিমায় জ্বলে ওঠেন। তীব্র শ্লেষে তিনি লিখতে থাকেন, ‘...আমি তো অবাক হয়ে গিয়েছিলাম যখন শুনলাম, আপনাদের দেশ, সাতটা স্বাধীনতার দেশেও অশ্লীলতার দায়ে আরস্কিন কল্ডওয়েলের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। আপনাদের দেশে তো সবই খুব খোলামেলা, খোসা ছাড়ানো, তা সেটা ফলই হোক কিম্বা মহিলা, মেশিন কিম্বা পশুপাখি, বইপত্র কিম্বা ক্যালেন্ডার। আপনারা তো নগ্নতার সম্রাট। কিন্তু এটা কি করেছেন চাচা, আরস্কিন কল্ডওয়েল ভাইজানের বিরুদ্ধে শেষমেষ মামলা ঠুকে দিলেন আপনি!’ আমেরিকার এই দ্বিচারিতা, যে আমেরিকা পাকিস্তানকে তখন প্রায় লালন করছে, তার দিকে এমন আঙুল তোলা মান্টোর পক্ষেই সম্ভব, যার তুলনা জর্জ অরওয়েল-এর সঙ্গে অল্প আয়াসেই বোধহয় টানা যায়। এই সেই মান্টো, যাকে প্রগতিপন্থীরা মনে করতেন প্রতিক্রিয়াশীল এবং মান্টো-ও অনায়াসে বলতে পারেন, প্রগতিটগতি নিয়ে তিনি থোড়াই কেয়ার করেন। এই সেই মান্টো, যিনি লিখতে পারেন ‘...আসল কথাটা হল স্যামচাচা আমরা ঠিক মত বাঁচতেও জানি না, ঠিক মত মরতেও জানি না।‘ কি তীব্র বিবমিষা নিয়ে তিনি এই উচ্চারণ করেন!
২য় চিঠিতেও কৌতুক প্রতিটি শব্দে। অবশ্য এমন রস তার কোন চিঠিতেই বা নেই! কিন্তু এ সবের সঙ্গেই প্রায় শীতল নিস্পৃহতায় বলে যান ‘... কিন্তু এর জন্য আপনার কাছে ক্ষমা চাইব না, কারণ এসব লেখাই তো আপনার ভালো লাগে’।
৩য় চিঠিতে ধর্ম আর রাজনীতির কিছু বহুতর্কিত চরিত্রের উপর তার কলম আছড়ে পড়ছে চাবুকের মত। অর্ধ শতকের পরে সেই চিত্র আরো প্রকট হয়েছে। মান্টো কি বলছেন? ‘...অনেক দিন থেকেই আমি সাংঘাতিক ভালো কিছু একটা করতে চাইছি। খুব স্বাভাবিক ভাবেই আপনি নিশ্চয়ই জানতে চাইবেন যে কাজটা কি? আপনি তো অনেক ভালো ভালো কাজ করেছেন আর এখনো করেই চলেছেন। বোমা ফেলে হিরোসিমা, নাগাসাকিকে গুঁড়িয়ে ধুলো করে দিয়েছেন। এখনও হাজার হাজার পঙ্গু বাচ্চা জাপানে জন্মাচ্ছে। আমিও কয়েকটা ড্রাইক্লিনারওয়ালাকে ওভাবে উড়িয়ে দিতে চাই। এখানে কিছু মোল্লা টাইপের লোকজন আছে যারা পেচ্ছাপ করার পর লোকজনের সামনেই খোলা পাজামার ভেতর হাত ঢুকিয়ে পাথর দিয়ে পেচ্ছাপ মোছার কাজ করে। আমি যখনই লোকগুলোকে ঐ সব করতে দেখব তখনই ওদের ওপর আপনাদের পাঠানো অ্যাটম বোমা ছুঁড়ব আর ওরা পাথর-টাথর নিয়েই হাওয়া হয়ে যাবে।‘
আর কি বলছেন? ‘...আপনার যা কিছু বাতিল অস্ত্রশস্ত্র আছে সব এই দুই দেশকে বেচে দিন।......ও আর একটি বিষয়। আমরা এখনও আমাদের সংবিধানের খসড়া করে উঠতে পারি নি। আপনি কয়েকজন এক্সপার্টকে এখানে পাঠিয়ে দিন। যে জাতি জাতীয় সঙ্গীত ছাড়াই ম্যানেজ করে ফেলতে পারে, তাদের জন্য অবশ্যই একটা সংবিধানের প্রয়োজন রয়েছে।‘ একদিকে পরমুখাপেক্ষিতা, অন্য দিকে দাদাগিরি। সার্বভৌম শব্দটাকেই অর্থহীন করে তোলা, অস্ত্র আর কতৃত্ব বজায় রাখার জন্য সারা বিশ্ব জুড়ে এক ঠান্ডা যুদ্ধের বাতাবরণ তৈরি করে রাখা—এ সব এখন আরো তীব্র, আরো নগ্ন। একদিকে পণ্যসর্বস্ব বিশ্বায়ন, অন্য দিকে বিশ্বশান্তি, মানবাধিকার রক্ষার দায় নিয়ে অন্য দেশের অভ্যন্তরীন বিষয়ে ক্রমে নাক গলানো, এ সবই, ষাট বছর পরেও, আজ নীতিহীনতার মতই স্বাভাবিক।
৪র্থ চিঠির অনেকখানি জুড়ে রয়েছে চলচ্চিত্র। রয়েছে পাকিস্তানের অর্থনৈতিক সামাজিক সাংস্কৃতিক বৈষম্যের বিবরণী। কৌতুক আর অদ্ভুত করুণ রসের ভিয়েন যেন। ‘...এই দেশের নিম্নবিত্ত আর মধ্যবিত্তদের জন্য আপনি অনেক কিছু করবেন। কারণ, এদেরকেই তো আপনি চাকরিবাকরি দেবেন। অফিসগুলির ক্লার্ক আর পিওনরা তো এখান থেকেই আসবে। মায়নাপত্তরও আমেরিকার মতোই হবে। একবার টাকাকড়ি এলে আর পায় কে! কমিউনিজ্‌মের ভূত পালাবে এখান থেকে।‘ কিংবা ‘...আপনাদের ওখানকার সিনেমাকরিয়েরা আজকাল কিন্তু হিন্দুস্তানের সিনেমা নিয়ে খুব বেশি মাতামাতি করছে। আমরা এটা একদম সহ্য করব না। কিছুদিন আগে গ্রেগরি পেক ওখানে গিয়ে সুরাইয়ার সাথে ছবি তুলেছে এবং সুরাইয়ার সৌন্দর্জ নিয়ে অনেককিছু ফলাও করে বলেছে। আরেকজন ডিরেক্টর নার্গিসের কোমড় ধরে ছবি তুলেছে এবং সবার সামনে তাকে চুমুও খেয়েছে। এগুলি কি ঠিক হচ্ছে? পাকিস্তানি নায়িকারা কি এতটাই খারাপ যে তাদের কেউ পাত্তাই দেবে না?......আমার অবশ্য মনে হয় যে এরা আসলে ঠিকমত চুমুই খেতে পারে না। কয়েকজন তো এমনভাবে চুমু খায় যে মনে হবে, তরমুজ খাচ্ছে।‘
পাকিস্তানের অর্থনৈতিক চিত্র ফুটে ওঠে পঞ্চম চিঠির কয়েকটি শব্দে-‘...এতটাই খারাপ যে ভালো সময়ের কথা ভাবতেও পারছি না আমি। নিজের লজ্জ্বা ঢাকাটাই কঠিন ব্যপার রখন। জামাকাপড়ের এত দাম, গরীবরা তো কাফনের কথাও ভাবতে পারছে না। যাদের আছে , তাদেরগুলোও ছিঁড়েখুড়ে শেষ। আমি তাই একটি ন্যুডিটি ক্লাব খোলার কথা ভাবছি।‘
এই সব রচনার সময়ে মান্টোর শারীরিক বা মানসিক অবস্থা, কোনটাই ভাল নয়। ইতিমধ্যে তিনি মানসিক অ্যাসাইলাম থেকে ঘুরে এসেছেন বেশ কয়েকবার। তবু এই সেই সময়কাল যখন পাকিস্তানের সঙ্গে আমেরিকার দোস্তির ঊষাপর্ব এসে পড়েছে। ভাঙবে, পরে নষ্ট হয়ে যাবে গোলাপী বন্ধুত্ব। মান্টো যেন রক্তস্নাত সেই পাকিস্তানের গন্ধ আগাম পেয়ে যান। তার উদ্বেগ চাপা থাকে না দ্বিতীয় স্বদেশের বিপন্নতার সম্ভাবনায়। ‘...আমার মনে হয় এই সব মোল্লাদের হাতে বন্দুক তুলে দেওয়াটাই আপনার আসল উদ্দেশ্য। আসলে আমিও তো আপনার একজন পাকিস্তানি ভাতিজা, তাই আপনার চালগুলো ঠিকই বুঝতে পারছি...’। আর তীব্র বিদ্রুপে বলে উঠতে পারেন ‘...আপনি নাকি সমস্ত ইসলামি রাষ্ট্রগুলিকে সামরিক সাহায্য দিতে রাজি হয়েছেন। ওরা এটাও বলেছে যে এই সাহায্য না কি আপনি কোন শর্ত ছাড়াই দেবেন! চাচাজান, কোথায় আছেন আপনি? আমি আপনার পায়ে একবার চুমু খাব, আল্লাহ্‌ আপনাকে চিরদিন বাঁচিয়ে রাখুক।‘
দীর্ঘ হচ্ছে উদ্ধৃতি। নাচার আমি। মান্টো-র যে চিহ্ন শৌভিক পাঠকের সামনে তুলে ধরার প্রয়াস করেছেন, তার কিছুটা আমি আনবোই এখন আপনার সামনে, এমন কসম করেই এই কলম ধরা। পড়া না পড়া, আপনার ব্যপার। রুজির টানাপোড়েন, লেখকসত্ত্বার পরিচিতির আকাঙ্খা, দেশভাগ, রাজনৈতিক-সামাজিক বিশ্বাসভঙ্গের মোকাবিলা করা, এক নিখাদ ধর্মীয় আবহে অনিবারণীয় সংকীর্নতার ঘেরাটোপ মান্টো-কে বারবার তছনছ করে দিয়েছে। এক মুক্তমনা স্বাধীন সত্ত্বা, যে বিশ্বাস করত ‘...A human being is just a human being first and last’, তাকে বেঁধে রাখলে যা হয়, তার ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। বারবার মানসিক স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধারের জন্য অ্যাসাইলামে যেতে হয়েছে, একান্ত সঙ্গী হয়েছে মদ। হয়ত অপ্রাসঙ্গিক, মনে পড়ে যাচ্ছে সৈয়দ মুজতবা আলী সাহেবের কথা, ঋত্বিক ঘটক মহাশয়ের কথা।
তবু শেষ অবধি কলমেই আস্থা রাখা। কৌতুকবোধ মান্টোকে ছেড়ে যায় নি কখনো। ইংরেজি অনুবাদে তাঁকে পাচ্ছি এ ভাবে ‘...where does Uncle find such an assemblage of pretty legs?’ শৌভিক-এর অনুবাদে (১) ‘...ঐ তিনশো টাকা অবশ্য আমি ইতিমধ্যেই খরচ করে ফেলেছি। আপনি যদি টাকাটা ফেরত চান, তবে আমি আপনাকে প্রতিমাসে একটাকা করে ফেরত দেব’; (২) ‘ ...ওমর খৈয়ামের রুবাইয়ের মতো ও রকম একজন সুশ্রী সাকি আমি কোথায় পাব যেখানে মদ দেওয়ার জন্য একটা নোংরা মোচওয়ালা চাকরই আমার জুটছে না;(৩) ‘...ওনার (চার্লি চ্যাপলিন) তাহলে ইংল্যান্ডে চলে যাওয়া উচিত। ওখানকার লোকজন তা হলে আমেরিকানদের মতো হাসতে শিখবে না। না হলে তো ওরা সবসময়ে গোমড়া মুখে কেমন একটা সবজান্তা ভাব করতে থাকে! এবার ওদের ওইসব ভান বন্ধ করা উচিত...‘; (৪) ‘...আপনি বরং আমাদের কয়েকজন আমেরিকান মেয়ে পাঠান যারা ফার্স্ট এইড দিতে জানে আর আমাদের ছেলেছোকরাগুলোকে পাবলিক প্লেসে চুমু খাওয়া শেখাতে পারবে। এতে অবশ্য আপনারই লাভ...’; (৫) আচ্ছা এই চিরস্থায়ী শান্তির জন্য কয়টি দেশকে উড়িয়ে দেবেন আপনি? আমি ঐ দেশগুলির নাম জানতে চাই। ...আপনার কাছ থেকে জেনে নিতে হবে যে শেষমেষ কোন দেশগুলি টিকে থাকবে...‘; (৬) ‘...আমার শরীরস্বাস্থ্যের কথা কি একবারও ভেবেছেন আপনি? ভাবলে অন্তত একবার এলিজাবেথ টেলরকে নার্স হিসেবে আমার সেবাযত্ন করার জন্য পাঠাতেন...’ (৭) ‘যাই হোক নদিম কাসমি একজন দোষী আর ওর শাস্তি হওয়া উচিত। এই লোকটিই ‘পঞ্জ দরিয়া’ ছদ্মনামে একটি কলম লেখে আর আপনাকে নিয়ে ঠাট্টাতামাশা করে। অবশ্য ওকে শায়েস্তা করতে বেশি কিছু লাগবে না। আপনি পাঁচ ছয়জন আমেরিকান মেয়েকে ওর বোন বলে রটিয়ে দিন। ব্যাটার কমিউনিজ্‌ম গাধার শিংয়ের মতো উবে যাবে...।
এমন কৌতুক, এমন ব্যঙ্গ, তীক্ষ্ণ বিদ্রুপ, নিজেকে নিয়েও, ঐ আটটি চিঠিতে বারবার আমাদের কাঁপিয়ে দেয়। আর কি অবাক কান্ড, এমন উচ্চারণের প্রাসঙ্গিকতা, আশঙ্কা হয়, এই সভ্যতার শেষ দিনেও থাকবে।
তাঁর গদ্য বিষয়ে মান্টো নিজে কি বলছেন? বলছেন, ‘If my stories are intolerable, it is because the world that I wrote about is intolerable” ; আবার তিনিই বলছেন ‘As a human, I have several shortcomings…And I am always scared lest these give birth to hatred for me in others’ hearts’. এত বর্ণময় অথচ সংক্ষিপ্ত এক বন্ধুর জীবন, এত বিচিত্র অভিঞ্জতা, অথচ তিনি যখন লিখছেন, সে লেখা এক নির্লিপ্ত দর্শকের। এমন লিখতে গিয়ে, এমন যাপনের ফলে মান্টোর একদা বহু প্রিয়জন অপ্রিয় হয়েছে, সবথেকে বোধহয় নিজেই নিজের কাছে, আবার বহু মানুষ তাঁকে চিরকাল রেখেছে হৃদয়ের খুব কাছাকাছি। তবু কি এক অন্তহীন হাহাকারে তিনি নিজের এপিটাফ লিখছেন
‘Here lies Sadat Hassan Manto. All the secrets of the art of story writing are buried here in his breadts weighed down by the earth, he is wondering still ‘who is the greater writer, God, or himself?’
কথা হচ্ছিল স্যামচাচাকে লেখা মান্টো-র চিঠিগুলো নিয়ে। গিয়ে পড়েছি অনেকদূর। হয়ত বাহুল্যই হল সে সব শব্দব্যবহার, কিন্তু এই মানুষটা তো শুধু ঐ চিঠিতে ছিলেন না! এমনকি কোন পাঠক যখন সাদাত হাসন্‌ মান্টো নামে মানুষটার অস্তিত্ব নিয়েই সন্দেহ পোষণ করতে শুরু করে, প্রয়াস থাকেই তখন সেই মানুষের কালো জাদু-র ব্যাপ্তিটুকু কেবল ছুঁয়ে যাওয়ার। মান্টোকে আমরা ভুলে যেতে চাই। মান্টোর সময়কে আমরা ভুলে যেতে চাই। ঐ রক্তগন্ধী স্বাধীনতার তিতকুটে স্বাদকে আমরা ভুলতে চাই। তবু আপনি, শৌভিক, সাত স্বাধীনতার শান্ত আবহে কেন তুলে আনলেন সাদাত হাসন্‌ মান্টোকে। মান্টো, যে কি না স্বাধীনতার সময়কালের ট্রমা থেকে ছোট গল্পের তাবৎ বেড়া ভেঙে দেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন আজীবন, সেই তাগত্‌ কি বর্তমানের কলমচি-দের মধ্যেও চাগিয়ে দিতে চাইছেন! আপনি কি চাইছেন, শ্লেষের ছোবলে এমন সৃষ্টিছাড়া গদ্য লিখতে লিখতে দেশহীন বান্ধবহীন নিকৃষ্ট মদ্যপানে থাকতে থাকতে ৪২ বছরেই ফৌত হয়ে যেতে! তবু পাঠক হিসেবে নিজেকেই সামান্য আধুনিক করে তোলার জন্য শৌভিক এবং ভাষাবন্ধন-কে আবার অভিনন্দন। এই বর্ণাঢ্য মানুষটির কিছু বিশিষ্টতা তুলে ধরার যে চেষ্টা, তা যে এই অনুবাদে অনেকটাই সফল, এমন তো নির্দ্বিধায় বলা যায়। রাজীব চক্রবর্তী প্রচ্ছদ করেছেন অসাধারন।
প্রসঙ্গঃ স্যাম চাচাকে লেখা চিঠি ঃ সদত হসন মন্টো (ভাষান্তর ও সম্পাদনা-শৌভিক দে সরকার
সূত্রঃ কবিতা দাইয়া / Dr Waqas Khwaja/ Anwer Azeem/ Khurram Ali Shafique/Amardeep Singh