এক ধর্মযুদ্ধ শেষে তিন রণক্লান্ত সৈনিক খানিকক্ষণ জিরিয়ে নিচ্ছিলেন নিজেদের অবস্থান খুঁজে নিতে। আশপাশে তাকিয়ে দেখলেন পরিচিত বহু মানুষ, পরাক্রমী সেনাপতি এমন অনেকেই কবরে শেষ শয্যায়। বাড়ি ফিরে যাওয়ার পালা এবার। মনের গভীরে জ্বল জ্বল করছে প্রাজ্ঞ সেনাপতির শেষ কয়েকটা শব্দ, “তাহলে যুদ্ধ শেষ!... এবার আসল যুদ্ধ শুরু তোমাদের। বাকিটা জীবন কাটাবে সেই যুদ্ধে যেখানে নেই কোনো বিজয়ী বীর। যদি পারো পরাজয়ের ভেতরেই খুঁজে নিও জয়ের গৌরব।”
অর্থাৎ বিশ্বাস কোরো না সমাজ চলতি 'বিজয়'-এর ঝলকানি। মনে স্থান দিও না 'বিজয়ীর' অহং। বরং যুদ্ধ শুরু হোক এবার। প্রচলিত সবকিছুতে অবিশ্বাস করে প্রশ্নরা ধেয়ে আসুক। যুদ্ধ শুরু হোক এবার, বাকি বেঁচে থাকাটুকুর জন্যে।

চমকে গেছিলাম বইটা শুরু করেই। প্রথম পাতা থেকেই তিরের মত ধেয়ে এল সহজ শিশুর মত দামাল সব প্রশ্ন ...
“সারাটা জীবন আমরা তর্ক করে কাটাই
ছোট্ট এ দুটো কথার হিসাব কীভাবে মিলাই?”

চলতে শুরু করলাম ওই তিনজন সৈনিকের সাথে। সামিল হলাম সৈনিক থেকে তীর্থযাত্রী হবার এই তর্কযজ্ঞে, এই দর্শনবোধে, এই জীবন জিজ্ঞাসায়। ওই তিন তীর্থযাত্রী এগোচ্ছিলেন কখনও পঞ্চগ্রামের উন্মুক্ত প্রান্তর দিয়ে, কখনও বা হরিদ্রাগ্রামের মাঠে আবার কখনও বা শূন্য জনপদের উপত্যকায়। এ শুধু পথ পেরোনো নয়। মনের গভীরে খুরপি চালিয়ে রক্তাক্ত করা, প্রশ্ন করা নিজেকেই, ঠিক যেমন ডান হাতে সবুজ পাখি আর বাম হাতে লাল পাখি বসে থাকা অন্ধ বৃদ্ধ প্রত্যয়ের সুরে বলছিলেন,
“পৃথিবীতে ভালো আর মন্দের সংঘাত অনিবার্য বিষয়
মন্দ আর মন্দের সংঘাতও নূতন কিছু নয়
তবে ভালো আর ভালোর সংঘাতেই মানবতার আসল পরাজয়
এর থেকে দূরে থাকাই শ্রেয়।”


আবার ইরাবতী নদীর ওপারে দেখা হওয়া এক ফকির যখন বলে উঠলেন, “প্রয়োজনহীন কর্ম আর কর্মহীন সাধই জগতের সবচেয়ে বড় মহামারী” চমকে উঠেছিলেন ওরা। মনে বাজতে লেগেছিল দীর্ঘদেহী সাদা ঘোড়ায় চড়ে আসা প্রাজ্ঞ সেনাপতির শব্দগুচ্ছ , “বীরের মতো যুদ্ধ করো।... ধ্বংস আর হত্যার মাধ্যমে যুদ্ধজয় ভূমিজয়েরই নামান্তর। বিজয় তখনই যখন শত্রুপক্ষের বিবেক জয় করতে পারবে।”
হাঁটতে হাঁটতে ক্লান্ত হয়ে আলতামিরার কাছে এসে বৃদ্ধ গুহাবাসীর কাছে ওরা শুনতে পেলেন এক অদ্ভুত কথা। বৃদ্ধ বলছিলেন, “প্রত্যেক মানুষের ভেতরেই তার একটা নিজস্ব বন্ধু আছে। অদৃশ্য বন্ধু।” ছায়ার মতোই লেগে থাকে সে। অন্যের সাথে আমরা যখন কথা বলে সময় কাটাই সে থাকে চুপ করে, নৈশব্দে!অপেক্ষা করে কখন আমরা তার কাছে আসব!
সেই অদৃশ্য বন্ধুকে পাশে নিয়েই আবার ওরা উঠে পড়লেন। এবং চলতে শুরু করলেন। আর চলতেই থাকলেন।
এ পর্যন্তই থাক। আর বলব না। ওঁরা কি কোথাও পৌঁছতে পারলেন? এভাবে কি কোথাও পৌঁছনো যায়? প্রিয় পাঠক, সেসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে বইটি পড়তে অনুরোধ জানাই।
পুরো বইটি জুড়েই তো শুধু চলার গল্প। বইটিকে কী বলব? উপন্যাস? নাকি পরিব্রাজকের আত্মকথন? জানি না। কিন্তু বইটি পড়তে পড়তে মনে হচ্ছিল, অনেক অনেক মানুষের পড়া দরকার এমন বই। লেখক তো কোনও সমাধান বাতলে দেবার চেষ্টা করেননি। নিজের মত চাপিয়ে দেননি। বরং একটা খেলা খেলেছেন। প্রশ্নের খেলা। নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করা আর উত্তর খোঁজার খেলা।
পথ চলা তো আসলে একটা খেলাই। তবে ছেলেখেলা তো নয়।
এই বইটি আসলে পথ চলার গল্প। চলতে শেখার দর্শনবোধের গল্প।


বইঃ তীর্থযাত্রী তিনজন তার্কিক
লেখকঃ হুমায়ূন কবির
প্রকাশকঃ সৃষ্টিসুখ প্রকাশন (ভারতীয় সংস্করণ)