ইয়ানা নোভাকোভার খোঁজে

“এই যে মিস্টার! এদিকে...” ঘাড় ঘুরিয়ে দেখি গলির মোড়ে দাঁড়িয়ে একটা মুশকো লোক আমায় তর্জনীর অদৃশ্য আঁকশি দিয়ে কাছে টানার চেষ্টা করছে। তার দিকে এক ঝলক তাকিয়ে আবার সামনের বাড়িগুলোর দিকে চোখ বোলালাম। নাহ! এ রাস্তার দিশে পাওয়া আমার কম্মো নয়। সেই কোনকালে হলেও হতে পারে এ রাস্তার ৫ নাম্বার বাড়িতে থাকতেন ইয়ানা নোভাকোভা। কিন্তু এখন এখানে ৫ নাম্বার বলে আলাদা কোনও ঠিকানা নেই। খুব কাছাকাছি যেটা পেয়েছি, সেটা ‘বেলজিচকা ৫/৩’। এমন অপ্রকৃত ভগ্নাংশ মার্কা একটা ঠিকানার অপাঙক্তেয় একটা গলির সামনে দাঁড়িয়ে সন্ধে নেমে এল সেদিনের মতো।
“ও ভালোমানুষের পো!” এবার দেখি মুশকোর পাশে এসে জুটেছে একটা হুমদো। “এদিকে শোনোই না একবার।” ভাঙা ইংরাজির টান শুনে মনে হয় এরা জার্মান। হয়তো বাপ-পিতেমোদের কেউ জার্মানি থেকে এসে বাসা গেড়েছিল এই দেশে। এখন তাঁরা হয়তো থুত্থুড়ে হয়ে আসন গেড়েছেন কোনও বৃদ্ধাশ্রমে। আর এই অপোগণ্ডগুলোকে খোলা ছেড়ে দিয়েছেন ধর্মের ষাঁড়ের মতো রাস্তায় ঘুরে বেড়াতে। বিদেশ-বিভুঁইয়ে এইসব মাস্তান টাইপের লোকজনের সঙ্গে কথা বলা মানেই ঝামেলায় পড়া। ওদের এড়িয়ে আমি গলি থেকে বেরিয়ে বড় রাস্তার উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। হঠাৎ পেছন থেকে আওয়াজ এল – “কুলি! ঐ কুলি!”
কান গরম হয়ে গেল। এশিয়ান লোকজনকে ইউরোপের (হয়তো বা আমেরিকারও, ঠিক জানি না) সাদা চামড়ার লোকগুলো ‘কুলি’ বলে হ্যাটা দিয়ে থাকে। ব্যাপারটা কয়েক বছর আগে শমিতদার কল্যাণে জানা হয়েছিল। এক মুহূর্ত ভাবলাম। বীরপুঙ্গবের মতো রুখে দাঁড়াব? নাকি দুপায়ের মাঝে লেজ ঢুকিয়ে চোঁ-চাঁ দৌড় দেব? শমিতদার ওপর সামান্য অভিমান হল কুলি কথাটার মানে আমার মাথায় ঢোকানোর জন্যে। কখনও কখনও বেশি জানাটাও সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়।
আমার দ্বিধাটা বোধ হয় ওরাও আন্দাজ করেছে। পেছনে পায়ের আওয়াজ পেয়ে ঘুরে দাঁড়াতেই দেখি চারটে লোক আমার ফুট চারেকের মধ্যে এসে দাঁড়িয়েছে। হুমদো আর মুশকো বোধ হয় এই দলের বড়দা, মেজদা। পেছনে একটা সিড়িঙ্গে আর একটা ঝাঁকড়া চুল। হাবভাব দেখে মনে হয় এরা দলের হায়েনা, দাদাদের উচ্ছিষ্টভোগী। আচমকা পকেট থেকে ঠিকানা লেখা কাগজটা বাড়িয়ে ধরলাম – “ইয়ানা নোভাকোভা কোথায় থাকেন জানো তোমরা?”
হুমদো একটু থতমত খেয়ে আমার হাত থেকে কাগজটা নিয়ে চোখ বোলাল। তারপর সেটা মুশকোকে দেখাল। ওরা পেছনের গলির দিকে এক মুহূর্ত তাকিয়ে আঙুল দিয়ে অদৃশ্য আঁচড় কেটে জরিপ করতে লাগল। বুঝলাম, এতক্ষণে হিসাব সমানে সমান হয়েছে। এদেশের মানুষের এই এক দুর্বলতা। কেউ ঠিকানা জিজ্ঞাসা করলে এরা প্রাণে ধরে ‘জানি না’ বলতে পারে না। যতক্ষণ না পর্যন্ত রাস্তার দিশা ঠিকঠাক বুঝিয়ে দিতে পারছে, ততক্ষণ ছাড়াছাড়ি নেই। কিন্তু হুমদো আর মুশকোর মুখ দেখেই বুঝতে পারছি, এরা এই ঠিকানাটা জানে না। তাই গোবেচারার মতো মুখ করে আমার দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়ল। যাকে একটু আগেই ‘কুলি’ বলে আওয়াজ দিচ্ছিল, তাকে পথ বাতলে না দিতে পেরে বেচারারা অন্তর্দ্বন্দ্বে জেরবার মনে হল। হুঁ, হুঁ, বাবা! আমি গান্ধীর দেশের লোক। কোনওরকম ঝগড়াঝাটি না করেই গোরাদের সঙ্গে টক্কর দিতে পারি সমানে-সমানে।
কিন্তু সামনের বদমাশগুলোর বাপ-পিতেমো যে হিটলারের দেশের লোক তা ভুলে গিয়েছিলাম। মুশকো দেখি হঠাৎ একগাল হেসে ফেলল – “আমরা ঠিকানাটা তোমায় খুঁজেপেতে বলে দিতে পারি। তিনদিন পরে এসো। কিন্তু তার বদলে তোমায় বিয়ার খাওয়াতে হবে।” আমি সাত-পাঁচ ভেবে ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানালাম – “ঠিক আছে, তাই হবে। আমি তিনদিন পরে এই সময় আসছি এখানে। তোমরা ঠিকানাটা খুঁজে রেখো, বিয়ার খাওয়াব।” মুশকো খুশিয়াল কুকুরের লেজের মতো হাত আর মাথা নাড়তে লাগল – “না। না। বিয়ার এখন।” তারপর নিজেদের দলের দিকে দেখাল – “এখন একবার। তিনদিন পর আর একবার।”
একটু থমকালাম। সত্যি বলতে কি, ইয়ানা নোভাকোভাকে খুঁজে পেতে আমার কাছে সূত্র হিসাবে আছে চেক ভাষায় লেখা একটা বিবর্ণ চিঠি, একটা পোকায় কাটা ফোটোগ্রাফ আর একটা ঠিকানা লেখা কার্ড। কী করে যে এই ভদ্রমহিলাকে খুঁজে পাব তার কোনও ধারণাই আমার নেই। এই মাতালের দল কী সত্যিই কোনও হদিশ দিতে পারবে, নাকি ঘাড় ভেঙে শুধু বিয়ারই গিলবে? ওদের দিকে তাকিয়ে বললাম – “আমি এখন ১০০ ক্রাউন দিচ্ছি। খোঁজ দিতে পারলে আরও ১০০ দেব।”
আমার হাতে নোট দেখে চকচক করে উঠল ওদের চোখ। হুমদো মাথা নেড়ে বলল – “এখন কমসে কম ২০০ ক্রাউন দিতে হবে। কাজ হয়ে গেলে আরও ৩০০। মোট ৫০০।”
কাছেই দেখতে পেলাম দুটো উর্দিধারী পুলিশ অফিসার দাঁড়িয়ে আছে। এখনও আমাদের দেখেনি। কিন্তু এদিকে চোখ পড়লেই নিশ্চয় আসবে। আমি অফিসের ফর্মাল পোশাকে কাঁধে ল্যাপটপ ব্যাগ নিয়ে মাস্তান চেহারার হুমদো, মুশকো আর হায়েনাদের সঙ্গে দাঁড়িয়ে যেভাবে বাতচিত করছি, তা কোনও মতেই শহর প্রাগের সহজচিত্র হতে পারে না। আমার দৃষ্টি অনুসরণ করে মাতালগুলোও পুলিশকে দেখেছে। ওদের চোখেও অস্বস্তি। আমি প্রমাদ গুণলাম। পুলিশ দেখে এরা কেটে পড়লে কোনও কাজের কাজ হবে না। তাই চটজলদি পকেট থেকে একটা ৫০ ক্রাউনের কয়েন বের করলাম – “এখন দেড়শ ক্রাউন রাখো। আমি সামনের শনিবার আসছি এখানে। তখন বাকি হিসাব-নিকাশ হবে।”

সামনেই ট্রাম এসে দাঁড়িয়েছে একটা। ওটা ধরে এখন আমার গন্তব্য ই পে পাভলোভা। ট্রামে উঠে বাইরে তাকালাম। চার মাতাল আমার দিকেই তাকিয়ে হাসাহাসি করছে। বোধ হয় আমার ১৫০ ক্রাউন জলেই গেল। নিজের ওপর রাগ হল সামান্য। এরকম যেচে কেউ যদি হালাল হতে যায়, তাহলে আর মুশকোদের দোষ কী! ওরা হয়তো আর একটু অন্ধকার হলে পায়ে পা দিয়ে ঝগড়া বাধিয়ে, মারপিট করে টাকা ছিনিয়ে নেয়। তার জায়গায় আমি নিজে থেকেই ওদের হাতে টাকা দিয়ে এসেছি। অন্তত মারধোরটা খেয়ে হয়নি। এহেন সৌভাগ্যে আমার খুশি না হওয়ার কোনও কারণ দেখছি না। :-P

ইয়ানা নোভাকোভার ব্যাপারটা আমায় মাথায় ঢুকিয়েছেন অর্ণব রায়, আমার নেটতুতো অসমবয়সী বন্ধু। লেখালেখির সূত্রেই মূলত পরিচয়। দিন দুয়েক আগে একটা মেল পেলাম।

রোহণ,

তুমি প্রাগে আছো জেনে অনেক আশা নিয়ে এই মেলটা করলাম। আমার এই কাজটা করে দিতেই হবে।
তোমায় আগে একবার বলেছিলাম, আমার বাবা একাধিকবার ইউরোপের বিভিন্ন দেশে গেছেন মূলত ট্রেড ইউনিয়নের সেমিনারে অংশগ্রহণ করতে। এমনই একটা সফরে চেকোশ্লোভাকিয়ায় ওনার এক বান্ধবী হয়েছিল মনে হয়।
বাবার বাক্স থেকে খুঁজে পাওয়া তাঁর একটি চিঠি আর ফোটোগ্রাফ পাঠালাম। চিঠিটি তিন পাতায় লেখা। ছবির পেছনে সম্ভবত চেক ভাষায় কিছু লেখা আছে। আর আছে ঠিকানা লেখা একটা কার্ড। প্রাগেরই ঠিকানা দেখলাম। ঠিকানা ধরে যদি তাঁর সন্ধান পাও তাহলে খুব ভালো হয়। ফোন নাম্বার বা ইমেল আইডি নিয়ে আসবে। ভদ্রমহিলার ছবির একটা এনলার্জড ভার্সানও পাঠালাম।
তুমি কাজটা করতে রাজি কিনা জানিও।
অর্ণব রায়

মেলের সাথে এ্যাটাচমেন্ট হিসাবে স্ক্যান করা ভদ্রমহিলার বিবর্ণ ছবি। ছবির উলটো পিঠটাও স্ক্যান করা হয়েছে – ইংরাজি হরফে বিজাতীয় ভাষায় কিছু লেখা। আর আছে ভদ্রমহিলার নামসহ প্রাগের একটা ঠিকানা। সবশেষে ৩ পাতার একটা চিঠি। চিঠির তারিখ ১৩ই জানুয়ারি ১৯৫৭। চিঠির হস্তাক্ষর বোঝার মতো নয়। নিশ্চয় চেক ভাষা। মাঝে মাঝে কিছু ইংরাজি হরফ চেনা যায় মাত্র।

মেলটা মনের মধ্যে নড়াচড়া শুরু করল। ৫৫ বছর আগে লেখা একটা চিঠির ভিত্তিতে যদি কেউ ভিনদেশের এক ভদ্রমহিলাকে খুঁজে বের করতে বলেন, সেটাকে কী বলব? মামাবাড়ির আবদার? নাকি রহস্যের খাসমহল? বাবার সঙ্গে এক ভদ্রমহিলার আলাপ হয়েছিল আর আমার সঙ্গে এক ছোকরার আলাপ হয়েছে। এই ভদ্রমহিলার আর ছোকরা এখন একই শহরে আছে। অতএব ছোকরাকে বলে দেখি সেই ভদ্রমহিলাকে যদি খুঁজে বের করতে পারে। কিন্তু কেন? দুর্বল কিছু সূত্র দিয়ে প্রাগের মতো এতবড় একটা শহরে একজনকে খুঁজে বের করা কি শুধুই আবিষ্কারের আনন্দ? সে আনন্দ তো একান্তই আমার হওয়ার কথা (যদি এমন বেয়াড়া আবদারে আমি রাজি হই এবং কোনও মিরাকলের কল্যাণে এই ইয়ানা নোভাকোভাকে খুঁজে বের করতে পারি)। বাবার পুরানো বান্ধবীর ইমেল আইডি বা ফোন নাম্বার নিয়ে অর্ণব রায় কী করবেন?

সফোদের মধ্যে একটা চালু কথা আছে – “Assumption is the mother of all screw up.” আমি তাই কোনও রকম প্রকল্প বা কল্পনাকে প্রশ্রয় না দিয়ে অফিস থেকে ফিরে ফোন করলাম অর্ণব রায়কে। ল্যাপটপ খুলে সফটফোনে ওনার নাম্বার ডায়াল করতে করতে হিসাব করলাম – আমার ঘড়িতে সাড়ে সাতটা মানে ভারতে এখন এগারোটা। এত রাতে কাউকে ফোন করাটা নেহাতই অভদ্রতা, কিন্তু যেহেতু ব্যক্তিগত কারণে অফিসের ফোন ব্যবহার করতে এখনও গায়ে লাগে এবং তার থেকেও বড় কথা যেহেতু অর্ণব রায় সম্ভবত একটা উদ্ভট মেল করে আমার সঙ্গে মশকরা করছেন; অতএব তাঁকে রাত এগারোটার সময় জ্বালানোই যেতে পারে।
বেশ কয়েকবার রিং হওয়ার পর ভদ্রলোক জড়ানো গলায় বললেন – “হ্যালো!” প্রীত হলাম, ঘুম ভাঙিয়েছি।
“অর্ণব, আমি রোহণ বলছি। আপনার মেল পেলাম।”
ওদিক থেকে বিরক্তি আশা করেছিলাম। কিন্তু ভদ্রলোক দেখলাম তেড়েফুঁড়ে দ্বিগুণ উৎসাহে কথা শুরু করলেন – “ওহ! রোহণ! আমার মেল পেয়েছ? বাহ! বাহ! তা কাজটা হবে বলে মনে হচ্ছে?”
অফিস থেকে বাড়ি ফেরার সময় ট্রামে বসে সারাটা রাস্তা ভেবেছি কী, কী যুক্তি দিয়ে অর্ণব রায়কে বোঝাব কাজটা কেন অসম্ভব। কিন্তু ফোনে এই রাত এগারোটার সময়ও কাঁচা ঘুম ভেঙে ওঠা ওনার কণ্ঠস্বরের শিশুসুলভ উচ্ছ্বাসে আমার সেই সব যুক্তির তালিকা কোথায় যেন খেই হারিয়ে ফেলল।
“কাজটা কঠিন...”
“আরে, তুমি চেষ্টা করলেই হবে।”
আমি একটু দ্বিধা নিয়ে আমার কৌতূহলের জায়গায় এলাম – “কিছু মনে করবেন না জিজ্ঞাসা করছি বলে। কিন্তু ভদ্রমহিলার হদিশ জেনে আপনি এতদিন পরে কী করবেন?”
অর্ণব রায় এক মুহূর্ত থেমে শান্ত স্বরে বললেন – “তুমি তো আমায় জানোই রোহণ। কেউ বিদেশে গেলে তাকে বলি সেই শহরের একটা নুড়ি পাথর এনে দিতে। কোনও রেস্তোঁরার বিল। আধছেঁড়া ট্রেনের টিকিট। এসব আমি জমিয়ে রেখে দিই। নিজে কোনওদিন হয়তো যেতে পারব না।” তারপর আবার একটু থেমে যোগ করলেন – “এই ভদ্রমহিলার সঙ্গে আমার বাবার সখ্য হয়েছিল। হয়তো তাঁরা প্রেমেও পড়েছিলেন। হয়তো সমাজ-সংসারের চাপে এক হতে পারেননি। বা হয়তো এমনিই দূরত্বের প্রতিবন্ধকতায় তাঁদের আর যোগাযোগ হয়নি। বা হয়তো তাঁরা এমনিই বন্ধু ছিলেন। আমি জানতে চাইব সেসব ওনার কাছে। গল্প শোনার মতো করে।”
আমি বলতে যাচ্ছিলাম, যে ভদ্রমহিলা নিজের বয়সকালে ভারতের এক বন্ধুকে (যিনি ইংরাজি ছাড়া অন্য কোনও বিদেশি ভাষা বোধ হয় জানতেন না) চেক ভাষায় চিঠি লিখেছিলেন, তিনি এখন সেই বন্ধুর সন্তানের সঙ্গে কীভাবে আলাপ করবেন, তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় থেকে যায়। কিন্তু যে লোকটা বিদেশের কোনও শহরে এক টুকরো নুড়ি পাথর হাতে নিয়ে রোমাঞ্চিত হন, তাঁকে এইসব যুক্তি শোনাতে মন চাইল না। “ঠিক আছে অর্ণব।” একটা অস্পষ্ট হাসি চলে এল আমার ঠোঁটের কোণে – “কাজটা কঠিন, কিন্তু আমি চেষ্টা করব।” আগের বাক্যটা সম্পূর্ণ করলাম।

----

১ম পর্ব

২য় পর্ব