নির্দিষ্ট কোনও একজনের বদলে কয়েকজনের একটি করে লেখা রাখা হোলো। পঞ্চাশের দশকের তুলনামূলকভাবে স্বল্প পরিচিত কিছু কবির কবিতা এবারের পেশকাশ... এক মুঠো পঞ্চাশ...


স্মৃতি / শান্তিকুমার ঘোষ

সমতল উপত্যকা ছুঁড়ে ফেলে এলে ঋজু
                                         চাঁদিনী শিখরে।
নিস্তার তবু কি মেলে।
আকাশ-উপুড়-করা স্ফটিক আয়না হানে
                                         উৎসুক বীতনিদ্র প্রাক্তন প্রেমিকঃ
আপনার ঔদাসীন্য কবেকার প্রত্যাখ্যান
                                         ভয়ংকর পিছে ধাবমান।।


একটি ভ্রমর / দীপংকর দাশগুপ্ত

সারা দুপুর একটি ভ্রমর ঘরের মধ্যে উড়ে বেড়ায়;
ছবির ফ্রেমে কড়িকাঠে এদিকে ওদিক ঘুরে বেড়ায়।
জানলা খোলা, পাশেই বাগান,
ইচ্ছে হলেই যেতে পারে;
মস্ত বড়ো আকাশটাকে
ইচ্ছে হলেই পেতে পারে
তা যাবে না, দেয়াল থেকে দেয়ালে সে উড়ে বেড়ায়।

সে-ফুল ফুটে অন্তরালে
সংগোপনে গন্ধ ঢালে,
কোথায় সে-ফুল, কোথায় সে-ফুল, খুঁজে বেড়ায়।
আমার ঘরের যা কিছু সব ছুঁয়ে ছুঁয়ে পরখ করে,
ভয়ে আমি কাঁপতে থাকি, বুকের মধ্যে রক্ত ঝরে।
সারা দুপুর একটি ভ্রমর পাগল করে উড়ে বেড়ায়।।


হাসপাতালের মাঠে / শংকর চট্টোপাধ্যায়

বিদায় বেলায় সাদা রুমাল উড়ায়ে আমি বহুকাল পথের ধারেই
দাঁড়িয়ে দেখেছি বেলা বেড়ে যায় ক্রমে, বেলা যায়, রক্তিম জাহাজে পণ্য
স্বল্পমূল্যে উত্থান পতন ভালোবাসা
অতিরিক্ত মুনাফার সমাধিফলক, স্মৃতি, পিকাশোর নীল কিংবা ঈশ্বরের
অটোগ্রাফ সই
পরীদের গ্রামোফোন, অলৌকিক একগুচ্ছ অদ্ভুত ব্যান্ডেজে বাঁধা মৃত্যুর কবিতা
পতঙ্গ, মাস্তুল, ছাতা, কাঁচের গোলাপ, নৌকা, আতুরালয়ের লাল জামা –
বিবাহের চিঠি কিংবা দশলক্ষ মেসিনগানের রসায়ন
তিন কপি সংবিধান, গণতন্ত্র, আত্মার নির্যাস
ইত্যাদি সকল কিছু, বিশুদ্ধ রসদ কিছু, লুট করে ক্ষিপ্ত আততায়ী
আলোকের সিঁড়িগুলি, আঁধারের সিঁড়িগুলি দেখা দিলে
                                         কেঁপে উঠি দীর্ঘ খোলা মাঠে।


শব্দের ভিতরে ঘুম / শঙ্করানন্দ মুখোপাধ্যায়

সেলাইকলের শব্দে বড় ঘুম পায়।
মাথাধরা সারবে বলে কবে কোন তেলের প্রত্যাশা
নিয়ে কোন বৃক্ষসহচর ছায়া খুঁজেছি ভ্রমণে...
পলাশ যেমন লাল বায়ুস্ফুরণের কোন উজ্জ্বল বুদ্বুদ
উঁচুনীচু দেশান্তরে তেমন রক্তিম ভালবাসা
কোথাও মেলেনি। অকৃপণ সেলাইকলের শব্দে
চারিদিকে স্বাবলম্বনের সাড়া পড়ে গেছে মনে হয়...
উনিশশতকে সব নারীমঙ্গলের প্রস্তাবনা
আজো কোনোখানে কোনো রক্তের ভিতরে হেঁকে যায়।
কিস্তিতে সেলাইকল কিনেছিল সাধন মাষ্টার
কিস্তিতে কি ভালবাসা মেলে
শব্দের ভিতরে এই সাতপাঁচ ভেবে ভেবে দিন যায়...
তুমি এঁকেছিলে ফুল সে কোন জামায় –
সার্থকতা করতলগত, যেন হাসিতে বিম্বিত,
সেলাইকলের শব্দ থেমে গেলে মুহূর্তে কি জোড়া লাগে
                                         প্রতীক্ষিত গভীর প্রণয়?


মালী / শোভন সোম

তোমার দুটি চোখের জন্যে
আমি দিনের পর দিন যত্নে
ফুল ফোটাই।
ওদের ছিঁড়তে বুকে বড়ো লাগে
তবু নির্মম আমার আঙুল...
মালীর হাত একে ফোটাবে বলে ওকে ছিঁড়ে
ফের একে ছিঁড়ে অন্য ফুল ফোটায়।


হে চিরদিনের একা / বীরেন্দ্রনাথ রক্ষিত

পৃথিবী ফুরিয়ে আসে আচারের টক-ঝাল-নোনতা পৃথিবীতে;
জিভের ছুঁচলো ডগা স্টেইনলেস চামচজীবীদের
যেভাবে চাখছে, তুমি চুমো-খেয়ে জেগে ওঠো, বাক্যজীবন!
অন্বয়, পূর্ণচ্ছেদ, কাচের বয়াম থেকে কালো সে-তলানি
চেঁছে তোলো;
হে চিরদিনের একা অবসরকালীন সমাজ -
তেতো ও বিব্রত, তোলো ছাঁচভাঙা মাটির স্বর্গীয় হাতদুটি
অবসরপ্রাপ্ত এই হাতে।
দ্যাখো দেখি, মরচে পড়ে গেছে কিনা-
লোহার মতো সে-শক্ত জলের হাতটি? গেছে পৃথিবী ফুরিয়ে?


জিভেরই খোলায় যদি খইফোটানো শাদা, ঐ নিঃশব্দ কখনো
আকাশের তারা হয়,...
তাহলেও কথা থাকে, শুধু কথা থাকে।
তুমি যে কোথায় কোন ক্রিয়াকর্মহীন বাক্যে পুনর্বহাল
হয়ে আছো- তা জানি না।
চোখকাননাকত্বকজিভের জগৎ এই হাইস্কুল...
অল্প দূর থেকে, ন্যাসপাতি গাছের খইফুলে
ঝ’রে পড়ছে কথা... আর পৃথিবী হাইবেঞ্চে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়েছে।