Nicanor Parra বা Elias Petropoulos-কে মনে রেখে Anti-Poetry সম্পর্কে সংক্ষেপে বলা যায় যে প্রথা কবিতার তথাকথিত কাব্যিক বৈশিষ্ট্য বা ভাবালুতাকে অস্বীকার করার আন্দোলন হল Anti-poetry। সেক্ষেত্রে মালতী লতার বদলে ভাঁটফুল এলেও মহা ভারিক্কি ব্যাপার। আশেপাশে এ্যান্টি পোয়েট্রি ব্লো হতে পারে। তাই মোদ্দা বিষয় থেকে সরলে মুশকিল। ভাবালুতা, চেতনা, দর্শন, বিষয় যেখানে হাজিরা দেয় তার কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে দেখতে হবে সে কি পোয়েটালো না এ্যান্টি পোয়েটালো ?

গত সংখ্যায় অনির্বাণের যে কবিতাগুলো নিয়ে কথা হচ্ছিল সেগুলোর দিকে আর একবার তাকালে দেখা যাবে যে ছন্দ, ভাবালুতা, চেতনা, দর্শন, বিষয় নিয়ে প্রথা কবিতার যে কবিতা লিপি আমরা দেখে অভ্যস্ত- তা অনুপস্থিত। বরং মনে হয় কবি যেন কবিতার তথাকথিত স্ট্রাকচারকে তছনছ করছে। অথবা আর্বিট্রারি বা এ্যাবস্ট্রাকশনের লজিকের প্রতি লক্ষ্য রেখে কিঞ্চিৎ গম্ভীর স্বরে বলা যায় স্ট্রাকচারকে সাবভার্ট করা হচ্ছে। তবে সাবভার্ট-কার্লভাট থেকে আমরা ফিরে তাকাতে পারি সেই স্বকীয়তা এবং জনপ্রিয়তার জানলায়।

সেইসময়ে কলকাতায় শূন্য দশকের পত্রিকাগুলিতে (যেমন বৈখরী ভাষ্য, প্রতিষেধক) প্রকাশিত লেখাগুলি পড়লে নিজের স্বর, স্বকীয়তাকে প্রতিষ্ঠা করার প্রচেষ্টা দেখতে পাওয়া যাবে। ফলে এর সাথে এ্যান্টি পোয়েট্রির যে সুচিন্তিত কোন যোগাযোগ ছিল তা বলা যায় না। তাহলে “পালকির ছাদে চাঁদ / বইছে চার বেহারা” চা বানাতো না ঘুঁটেকুড়ুনির আঁচে। সচারচর জনপ্রিয়তা-স্বকীয়তার আলোচনায় আলসেমি আসে এবং আমরা বলে ফেলি এই দুজন দুজনের জানি দুশমন। এ যেন এস্কেলেটরে পাহাড় চড়া ... চড়ে ফেললুম ... বলে ফেললুম ... লক্ষ্য করলে দেখা যাবে যেখানে স্বকীয়তা থাকে না, সেখানে জনপ্রিয়তাও আসে না। হাজারের ভিড়ে যাকে আলাদা করে চেনা যায় না, মানুষ কেন তাকে মান্যতা দেবে ? গোল পাকায় জনপ্রিয়তার অভ্যাস ... আলসেমি, সেফ থাকা, ঝুঁকি না নেওয়া ... কমার্স। এই মধ্যবিত্ততা জনপ্রিয় নন, এমন ক্রিয়েটিভের মধ্যেও আসতে পারে। কারণ ক্রিয়েশন একটি স্বভাবত: অস্বাভাবিক ক্রিয়া ... সেটাতে নিয়মিত নুন-জল-তেল লাগলে ওয়াইড এ্যাঙ্গেলে তিরতির বয়ে যাওয়া নদীটিরও ঘুম পায় ... আর সবসময় এ্যাঙ্গেলবাজি হয় না। তখন এক স্বঘোষিত চুরমার জরুরী, খোঁজ পড়ে যুক্তি তক্ক গপ্পের। তা সবার ক্ষেত্রে সবসময় খুব ডিসিপ্লিনড নাও হতে পারে। আমার সামনে কে ? আমি তালেবর ... হুঁ হুঁ বাবা ... এমন এক ঘোর কাজ করে।

খুব ভেবে, দু'মন তেল পুড়িয়ে, গলায় দাঁড়কাক ঢেলে বলা যায় ... এ তো এ্যাহিস্টোরিক্যাল। হ্যাঁ স্যার ... স্বীকার করি এ ঘোর এ্যাহিস্টোরিক্যাল। কিন্তু ঐ যে, বেবি বৈখরীতে সম্পাদকীয়েছিল- "এদের প্রায় সবারই ধারণা ৮২% পত্রিকা রদ্দি, ৮৩% লেখক রদ্দি, ৮৪% লেখা রদ্দি, ৮৫% ফিলোসফি রদ্দি, ৮৬% কনসেপ্ট রদ্দি ..." [বৈখরী ভাষ্য, ষষ্ঠ বর্ষ, বইমেলা সংখ্যা/সম্পাদকীয়/অমিত� ��ভ প্রহরাজ/ কলকাতা/২০০৫] নিঃসন্দেহে এহেন উক্তি বৈখরী এবং বৈখরীয়ানদের সম্পর্কে এক অতি উঁচু দাগের গিমিক। তবে এই গিমিক শূন্যের সেই শুরুর দিকে নিজের মত লিখতে আসা সকল তরুণকেই লক্ষ্য করে। সেখানে অনির্বাণ, দেবাঞ্জন, অর্ঘ্য, সৌপ্তিক, সোমনাথ- সবাই আছে। অবশ্য এক পৃথক থাক তৈরি করে অরূপরতন ঘোষ, অমিতাভ প্রহরাজ, ইন্দ্রনীল ঘোষ। কিন্তু সেই গাড়িবারান্দায় পরে আসব। আবারও ফিরে যাই অনির্বাণে-

একটি পেঁয়াজের যাবতীয় রঙ নিয়ে
শ্রমিক কাঠ খোদাই শুরু করে
বার্ণিশ ঠোঁটে করে উড়ে যায় পাখি।
আমার এই কল্পনা
দিগন্তে ও খাটে
আমিষ মাখিয়ে দিল।।

[সিরিজ/১/অনির্বাণ চট্টোপাধ্যায়/বৈখরী ভাষ্য, ষষ্ঠ বর্ষ, বইমেলা সংখ্যা/কলকাতা/২০০৫]

কবিতাটিকে তিনটে সেগমেন্টে ভাঙ্গা যেতে পারে- প্রথম তিন লাইন, শেষের দুই লাইন, আর মাঝের একটি লাইন। একটি কল্পনা ও কল্প-অনুভূতিকে মাঝের পঙক্তি দিয়ে রিলেট করানো হয়েছে। কোথাও কি দৃশ্য স্থাপনার কথা মনে পড়ছে ? ... একটা ছবি হয়ে ওঠা .. একটা ফিল্ম। একদা চলচ্চিত্র সম্পাদক হওয়ার ইচ্ছে রাখা ঢ্যাঙ্গা, লম্বা ছেলেটি উঠে দাঁড়াল ... সিংহের মন্তাজ পেরিয়ে, ইভান দ্য টেরিবল ... সের্গেই আইজেনস্টাইন যদি ইন্টেলেকচুয়াল মন্তাজের আরও কিছু কাজ করে যেতেন ...

সিংহ এই যে গর্জন করিলেন- তা কি নিছকই চলচ্চিত্র বিদ্যার সমাপতন ? হ্যাঁ এ'কথা সত্যি যে অনির্বাণ যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিল্ম স্টাডিজ পড়ত। তার সাথে অন্যরাও পড়ত, এই আমিও পড়িতেন। তো অনির্বাণ নামক তালেবরের তালপুকুরে ফিল্ম কি ঘটি উপুড় করেছিল ? এখানে কিঞ্চিৎ সরে আসা যাক, না হলে থার্ড পার্সনের গোসা হবে। ফিল্মের রেসপেক্টে ভাবার সুবিধা হল সেখানে বিন্যাসের লজিকে কোহরেন্স অবশ্য শর্ত নয়। যেহেতু ফিল্ম একটি মিশ্র মাধ্যম তাই তার আন্ডারটোন-ওভারটোনে মেসি-রোনাল্ডোর করতুদ বেশি। শুধু সংস্থাপনই যে সিগনেচার হয়ে উঠতে পারে তা বোধহয় ফিল্মের মত অন্যকোন মাধ্যমে এত অনায়াস নয়। আর সে'কারণেই ফিল্মে এক্সপ্রেশনের লিবার্টি অনেক বেশি। নতুন শুরু করা মানুষের পক্ষে এই লিবার্টি অনেক বড় পরিসর। প্রথা কবিতার পারম্পরিক ঐতিহ্যকে অস্বীকার করতে এই লিবার্টির প্রয়োজন ছিল। বড় আয়াসে উপস্থাপন, সংস্থাপন, জাক্সটাপজিশন, রিপ্লেসমেন্ট দিয়ে এক্সপ্রেশনকে খুঁজে নেওয়া যায়। কবিতা হয় কবিতানো কদমবুসিতে। এই প্রসঙ্গে অবশ্য একটা গোঁত্তা উঠি উঠি করে- কবিতা কি এই কদমবুসিতে একেবারেই অনভ্যস্ত ছিল ? না তা অবশ্যই নয়। মঙ্গলকাব্য থেকে নকশা সে কথা বলে না। কেবল ফিল্মের ক্ষেত্রে সেই প্রক্সিমিটি অনেক বেশি। ল্যাঙ্গুয়েজ, সিনট্যাক্স আর প্রথার চোখরাঙানীকে হেলায় সরিয়ে রাখা যায়। এই অনায়াসের দিকে একটু তাকানো যাক-

২.
ঔরসহীন বীর্যের জট
পিউবিক হেয়ারের ফাঁকে পদ্মার উৎস।
সারারাত জগুবাবুর ঠেক
পদ্মায় এ্যাকোয়াফিনা মেশাচ্ছে কলকাতা।
[আড়ালে পদ্মা/দেবাঞ্জন দাস/বৈখরী ভাষ্য/কলকাতা/২০০১]

দেবাঞ্জন লিখেছিল। দেবাঞ্জন পড়ছে। তো লেখা আর পড়া থাকছে। পড়া দেখছে অনায়াস আবেগ .. প্যাশন ... সংস্থাপন এবং অন্তিমে প্যাশনেট স্টেটমেন্ট। এই সংস্থাপনই তৈরি হচ্ছে কবিতার মত .. না কল্পনা .. না কবিত্ব। সিরিজ শুরু হয়েছিল- "টুপটুপ করে ঋত্বিকের রক্ত পড়ছে/ পদ্মার জলে টপস্পিন ঘূর্ণন।"- দিয়ে। সারা সিরিজ জুড়ে সেই প্যাশন, সংস্থাপন আর ডিটাচমেন্ট। পঙক্তিগুলো কাট-টু-কাটে রয়েছে। দৃশ্য ছিঁড়ে যাচ্ছে প্যাশন আর বক্তব্যের ভারে। কেবল শেষ পঙক্তিতে এসে এক অসম্ভব প্রস্তাবনা, উপস্থাপন দ্যোতনা তৈরি করছে। তাকে কি কাব্যিক বলা যায় ? ... না বোধহয়। কেবল কিছু ভাবনার উদ্রেক করে ... জার্নি শুরু হয়।

যদি এই কবিতার সরাসরি স্ক্রিপ্ট করা যায় তাহলে দেখা যাবে এই প্রায় সম্পর্কহীন পঙক্তিগুলির দৃশ্যরূপে পারস্পরিক সম্পর্ক থাকা সম্ভব।সরাসরি দৃশ্যকে বাদ দিলেও মিশ্রমাধ্যমহেতু চলচ্চিত্রে শব্দ, রঙ, মিজ-আন-সী'র সূত্রে সেই সম্পর্ক রাখা যায়। এখন এই প্রসেসকে উল্টে দিলে অর্থাৎ চলচ্চিত্রের করতুদ যদি সরাসরি কবিতা লিপিতে আনা হয় লাইনগুলো তখন কাট-টু-কাটে আসতে থাকে ... যেন ছড়িয়ে দিল পথের ধারে ... ফলে এই রেন্ডারিং অনেকাংশেই বহিরঙ্গের। অন্তরঙ্গ তখনও অনুপস্থিত। খালি লিবার্টি তার পরিসর নিয়ে পথ চলছে।