নিলামবালা ছআনা
রুণা বন্দ্যোপাধ্যায়
এখন বাংলা কবিতার কাগজ

২০১৩ বইমেলায় অতনুদা আমাকে রুণাদির বইখানি হাতে দিয়ে বলেছিলো বইটা পড়ে রুণাদিকে ফোন করিস। সৌভাগ্যবশত বইটা নিয়ে অল্পকিছু লেখার সুযোগ পেলাম, আমার মতো করে।
ইঙ্গিতময়তার পরিচিত বিন্যাস থেকে অনুভূতিকে বিস্তার করে শব্দের মিথকে উপস্থাপনা করেছেন যা নির্মাণশৈলী ও শব্দচয়নের এক অন্যতম নিদর্শন। অর্থের ডোর ধরে রেখে সমান্তরাল ভঙ্গিমায় ব্যক্ত হয়েছে। রুণা বন্দ্যোপাধ্যায়ের "নিলামবালা ছ আনা" বইয়ে শব্দ প্রয়োগের সচেতন ভাব প্রদর্শিত...
শুরুতেই 'গলন থেকে খুলে রাখা অঙ্কগুলো' কবিতাটি অসম্ভব ইমাজিনেশনের কবিতা। কবিতার মাত্রাবোধ এতো সুচারু ও বাদশাহী হতে পারে এর আগে দেখিনি। বৃত্তের চারুলতা থেকে শুরু করে প্রমিতক্ষরণ বিন্দু সবই মুগ্ধতার সামনে দাঁড় করায় --
'অঙ্ক থেকে অলঙ্কারে চন্দ্রছোবল চারুকলা'

অন্যদিকে, মনের অন্তঃপুরে পৌঁছে যাওয়া ভাবনার উষ্ণতায় মজে যাওয়া খেয়াল যেটা রাখুন-
'ক্রিয়া সম - প্রতি দুটুকরো দুটো অসমতার ভেতর যেন বাতাস বুনে দেয়
ক্রিয়া অসম - প্রতিটি অসমতায় পাখির ডাক
ক্রিয়া হীন - প্রতিটি ডাকে একটু ডাকহরকরা আকাশ'
এমন তিনটি লাইন! 'দাবা থেকে দোয়াবঘেরা ছকে' কবিতাটিকে ভাষ্য করে তুলেছে। মনের জ্যামিতিটুকু ফাঁকা ক্যানভাসে সাজিয়ে বিনির্মাণ।
'স্কয়ারের সমান্তরাল বাহুর অসহ্য সমতাগুলো দুটুকরো করি'
এরপর কি বলা যেতে পারে ...!

খণ্ডচিত্রে ভরপুর 'আজ কোনো বৃষ্টির সম্ভবনা নেই' কবিতায় শব্দ প্রয়োগ এবং ব্যঞ্জনা অসামান্য ব্যবহার লক্ষিত হয় --
'এক চুমুক নীতির সঙ্গে
দু একটা হালকা হরিণী কানুন
জাহাজডুবির সম্ভাবনারা বন্দর ছাড়িয়ে বহুদূর'
কবিতায় অনুদৃশ্য আর অদ্ভুতভাবে একটা শব্দই দৃশ্য হয়ে গেছে। রুণাদির বইয়ের কবিতাগুলো মন দিয়ে পরেছি,ভুলে গেছি, আবার পরেছি এবং আরো ১০টার সাথে কোন পার্থক্য পায় না। কি অদ্ভুত তাই না?
একজন সাধারন পাঠক হিসাবে বলতে পারি, একটা কবিতা পড়ে কতটা মনের তৃপ্তি হতে পারে। এই তৃপ্তি যেমন একটা কবিতা পড়ে হতে পারে তেমন আবার কবিতার মধ্যে থাকা একটা লাইন পড়েও...
'ইসফিসকুলের এলিজি' কবিতাটাও ঠিক তেমনি, এই কবিতায় শব্দ বুনন পদ্ধতিতে রয়েছে কম্পন উত্তেজনা_ 'স্তিমিত মাত্রাবোধ খুঁজছে ফুলস্টপ/ স্থিতি নামছে বর্ণমালিত মগজে'
উজ্জ্বল কল্পশক্তি...
'হাতলভাঙা কেদারার ধুন' কবিতায় কখনো কখনো ফ্লোলেস মনে হলেও লেখনির অব্যক্ত স্পীড আমাকে আকৃষ্ট করেছে। ছোটো ছোটো যাপনের পরিসরকে একত্র করে লেখা যেখানে সিম্বলিক ভাবকে ক্ষুণ্ণ করে না...
এছাড়াও 'কামায়ন' 'বেহায়া' 'চাঁদ কৌণিকতা' 'তেকোনা এপিসোড' কবিতাগুলি ভাল লেগেছে।

ক্রমশ বদলে যাওয়া আঙ্গিকে বাংলা কবিতার সময়ে রুণা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বইখানি অন্যতম বলা যেতে পারে,শব্দের অনুভব ও বিচিত্রতা মানুষকে এমনই একীভূত করে দিতে পারে...