ছোটি সি মুলাকাত

সুমনকে যখন প্রথম দেখি জাস্ট পাঁচ মিনিট লেগেছিল। আমাদের। একে অন্যকে মাপতে। এত অল্প সময়ে এত সখ্যতা এই প্রথম। আমার। কথায়-আড্ডায়। গাঁজায়-নেশায়। দীর্ঘ আট বছর পর আমার এই দ্বিতীয় দফার ককটেল। মদ আর গাঁজার। আমি আর সুমন। যুগলবন্দী।

ওর বাড়িতেই প্রথম। অপূর্ব সুঘ্রাণ। নির্ভেজাল ও জমাট। মনপসন্দ্। আমার বয়স যেন কমে গেছিল। দশ বছর। অন্তত। অনেকদিন পর মাথাটা খালি হয়ে গেছিল। একদম। ধূর্ হয়ে গেছিলাম। আর মনে পড়ছে কথার গলি থেকে গলতায় ঢুকে পড়ছিলাম। খেই হারিয়ে যাচ্ছিল বারবার। লাতিন দেশের গাঁজা এই আমার প্রথমজ মনে ও ব্রেনে।

সুমনের সাথেই একরাতে ‘রাতের কড়া নাড়া’।
শিকার মিলে যাওয়ার একটা আনন্দ ছিল। চূড়ান্ত। আর মদে-গাঁজায় মিলে একটা নেশা। ফুলটুস্।

‘পোর্তে মাদেরো’র কাছে এক বিকেল আর একটা গোলাপের বাগান। ভরন্ত। প্রায় বিশ রকম বাহার। গোলাপি-সাদা-হলুদ-বেগুন ি-রক্তলাল। আরও নানান। পারফিউমড্ গার্ডেন যেন। সেই আমি আর সুমন। নেশায় ধূর্। রঙে মশগুল্। সাথে পুরোনো বন্দর এলাকার একটা জলো জমাট হাওয়া। আঃ! এক স্বর্গীয় ধুনকি। সূর্যাস্তের পর আমরা ফিরে আসি। প্রচুর ছবি তুলি।

সুমন আর আমি একছুটে পার হয়ে গেছিলাম পৃথিবীর সবচেয়ে চওড়া রাস্তাটা। একবারে। একদিন। অফিসে তখন ফায়ার ড্রিল। আর এর সামান্য কিছু আগেই আমি ওকে দেখি একটা বহু পরিচিত রাস্তায়। জমজমাট ও ব্যস্ত। ওর সাথে ছিল মিগুয়েল। মেরেকেটে পাঁচফুট। নেই ঘাড়। পাক্কা আর্জেনন্টাইন। ওরা পাশাপাশি হাঁটছিল। খানিক পর মিগুয়েল ওর হাতের জ্যাকেটটা দিল সুমনের হাতে। কয়েক পলকেই সুমন ফের ফেরত দিয়ে ওকে ‘চাও’ বলে ভিড়ে মিশে গেল। আমি ওর পিছু নিলাম। জ্যাকেটের ভেতরেই ছিল। পুরিয়াটা। আর ‘চাও’ মানে ‘বিদায়’।
হাঁটতে হাঁটতে কখন এক ফাঁকে সুমন গুঁজে দিয়েছে। মিগুয়েলের হাতে। কড়কড়ে দেড়শো পেসো।

সুমনের মুখেই শুনেছিলাম এরকম আরেক হাত বদল। সেদিন অন্য রাস্তা। অনেক ফাঁকা। সুমন একাই হেঁটে চলেছিল। আর মোবাইলে কেউ ওকে বার বার ইন্সট্রাক্ট করে যাচ্ছিল ক্রমাগত এগিয়ে যাওয়রার জন্য। হঠাৎ ও দেখে একটি মেয়ে এগিয়ে আসছে। উল্টো দিক থেকে। সুমন সেই প্রথম পেরে ওঠে। একটা গাঁজার পুরিয়া বদলে একশো পেসো। মোবাইল নির্দেশ মতই। আর ও এও বলেছিল যে একটা ছোট বাচ্চা এই সবে হাটতে শিখেছে ধরা ছিল মেয়েটির অন্য হাতে।

লা পারিসা। একটা দোকানের নাম। রেকোলেতায়। বুয়েনস্ আইরেসের সবচেয়ে জমজমাট নেবারহুড্। মানে বড়লোক পাড়া যাকে বলে। হাঁটা দুরত্বে পৃথিবী বিখ্যাত রেকোলেতা সিমেট্রি । ‘পারিসা’ আসলে কাঠকয়লায় ঝলসানো মাংসের টুকরো। বড় বড়। চিকেন-বীফ-পর্ক সব মিলিয়ে মিশিয়ে। আজ এখানে প্রথম এলাম। সুমনই নিয়ে এল। দেখলাম। একজন বৃদ্ধা। সত্তরোর্ধ। একা এবং নান। দোকানটা চালান। কেউ নেই তার নিজের। এক ভাই ছিল। খুন হয়ে গেছে। সুমনই বলেছিল। প্রথম দিনই আমি একইরকম একটা ‘মা মা’ গন্ধ পেলাম যেমন সুমন পেয়েছিল অনেক আগেই। তাই সুমন এখানে বারবার। কত আদরে মায়ায় উনি জড়িয়ে ধরলেন সুমনকে। আলাপ হতেই আমাকেও। সুমন ওনার সাথে অনেক কথা বলল। সবটাই স্প্যানিশে। আমি না বুঝে চুপচাপ দেখে গেলাম। ওনার এক্সপ্রেশন। উনি সুমনের হাতটা জড়িয়ে ছিলেন আগাগোড়া। ছলছল করছিল ওনার চোখ আর গলাও যেন ধরে এল অনেক। সুমনকে উনি একদিন নাকি বলেছিলেন যে সে তাঁর ‘স্পিরিচুয়াল সান’ তাই সুমন যেন কখনো পয়সার কথা না বলে। খিদের মুখে সুমন কিছু বলতে পারেনি। ফলতঃ সুমন আসে কখন ফুলের তোড়া, কখন বা চকোলেট হাতে করে। তার এই আর্জেন্টাইন ধর্মমায়ের জন্য। ওনাকে আর সুমনকে দেখে মনে মনে ভাবছিলাম এতটা মায়ায়-এতটা যত্নে যেন আমি কখনো না এখানে বাধা পড়ি। আমার যে বড় ভয়। পিছুটানে...

সুমন আজ দেশে ফিরে গেল। আর যাওয়ার আগে ঝরঝর করে কেঁদে ফেলল। হুনিনের রাস্তায়। আমারও যে কেন চোখ ভিজে যায়! এভাবে। বারবার...

হয়ত অন্য কোন দিন, অন্য কোন শহরে, অন্য কোন ভাবে দেখা হয়ে যাবে আমার এই পার্টনারের সাথে।