সৌম্য হাঁটতে ভালোবাসে। পদযুগলের ওপর তার অসীম ভরসা। হাঁটতে হাঁটতে সে পেরিয়ে যায় অনেক অনেক কিলোমিটার। আগে অবশ্য সবাই কিলোমিটার নয়, মাইল বলত। ইদানীং মাইল অচল, সব দূরত্বই মাপা হয় মিটারের মাপে। তা সৌম্য কখনও মাইল বা মিটার নিয়ে মাথা ঘামায়নি। সে হাঁটতে ভালোবাসে। হাঁটে। হাঁটতে হাঁটতে কখনও বাজার, কখনও টেলিফোনের অফিস, কখনও স্বাস্থ্যকেন্দ্র, কখনও গাছতলা। এসবই অবশ্য উদ্দেশ্যমূলক হাঁটা। কিন্তু সৌম্য কোনো উদ্দেশ্য বা বিধেয়র পরোয়া না করেও হেঁটেছে অজস্রবার। এবং হাঁটতে গিয়ে তার মনে কখনও জ্বলে ওঠে তারাবাতি, কখনও ফুটে ওঠে টগর, কখনও উছলে ওঠে সতী ময়নার বিল। সৌম্য খুব রোমান্টিক হয়ে পড়ে তখন। আরও মজার ব্যাপার, এইরকম ভ্রমণে সে কখনও একা হাঁটে না। কোনো না কোনো নারীসঙ্গ নির্ঘাত জুটে যায়। এই যেমন কখনও চন্দনা, কখনও মৌসুমি, কখনও পামেলাবৌদি, আবার কখনও অঞ্জনাবৌদি...
তা বনশ্রীর কথাই ধরা যাক না কেমন। গত বৈশাখে প্রথম যেদিন কালবৈশাখী ধেয়ে এলো, সেদিন সৌম্যর ভ্রমণসঙ্গীনি ছিল বনশ্রী। কেন এবং কীভাবে বনশ্রী সেদিন হেঁটেছিল সৌম্যর সঙ্গে, সে সব প্রশ্ন অবান্তর। মোদ্দা কথা হচ্ছে, সেদিন সেই কালবৈশাখীকে পাত্তা না দিয়ে সৌম্য ও বনশ্রী হেঁটেছিল বেশ কয়েক কিলোমিটার। বনশ্রীর ভালো লেগেছিল। খুব ভালো লেগেছিল। অথচ এমনিতে বনশ্রী হাঁটতে একেবারেই ভালোবাসে না। হাঁটতে তার বড়ই আপত্তি। কোথাও যেতে হলে সে সরাসরি চেপে বসে তার মোপেডে। হাল্কা গাড়ি। পেট্রল কম খায়। চলেও বেশ দ্রুত গতিতে। হ্যাঁ, বনশ্রী নিজেও সে কথা স্বীকার করে। হাঁটতে ভালো না বাসলেও, মোপেডে চড়ে সে গতির আরাধনা করে। আরও গতি। আরও আরও গতি। প্রচন্ড গতি। বনশ্রীর মনে হয়, এইভাবেই সে দৌড়াতে পারে। এইভাবেই সে দৌড়ায়। নিজের দুটি পায়ের ওপর খুব একটা আস্থা রাখতে পারে না সে। আর আজকের এই প্রযুক্তির চরম উৎকর্ষতার যুগে, নিজের পদযুগলের ওপর নির্ভরশীল হবেই বা কেন! তাই বনশ্রী ওড়ে। উড়ে বেড়ায়। উড়তে তার ভালো লাগে।
অথচ সেদিন সৌম্যর সঙ্গে হাঁটতেও তার খুব ভালো লেগেছিল। কালবৈশাখী ঝড়ের মধ্যে কয়েক কিলোমিটার হাঁটতে তার খুব ভালো লেগেছিল। একটু হাঁটার পরই সৌম্য তার ডান হাতে ধরেছিল বনশ্রীর বাঁ হাত। খুব শক্ত করেই ধরেছিল। বনশ্রীর হাতে সেই প্রথম কোনো পুরুষের হাতের স্পর্ষ। বনশ্রীর শরীরের রক্তকণিকাগুলি বেজে উঠেছিল রিনরিন করে। একটা ঘোরের মধ্যে ছিল যেন সে। তারা এসে পৌঁছেছিল একটি নদীর ধারে। বিকেলের আলো তখন ম্লান হতে হতে ঢেকে যাচ্ছিল নরম অন্ধকারে। ঝিরিঝিরি জলকণা ঝরে পড়ছিল তাদের মাথা, মুখ, হাতের ডানায়, পায়ের পাতায়। সৌম্য আরও ঘন হয়ে আসছিল। বনশ্রীর ঠোঁট কাঁপছিল তিরতির করে। তার দুই স্তনবৃন্ত স্ফীত ও কঠিন হয়ে উঠছিল ক্রমশই। সৌম্য আরও গহীন হয়েছিল। না, বনশ্রী কোনো প্রতিরোধ করেনি। কোনো অসহযোগিতা করেনি। সৌম্য সেদিনের সেই ভয়ংকর প্রকৃতির অলৌকিক আধো অন্ধকারে, বনশ্রীকে দু’হাতের বৃত্তের ভেতর বেঁধে ফেলে, বনশ্রীর ভেজা ঠোঁটের নির্জনতায় নিজের ঠোঁট ডুবিয়ে গভীর চুম্বন করেছিল। গভীর। গভীরতর। গভীরতম। বনশ্রী সেই চুম্বনের অতলে হারিয়ে গেছিল সেদিন। নিজেকে আবার খুঁজে পেতে বয়ে গেছিল অনেকটা সময়। বয়ে গেছিল নদীর অনেকটা জল।
বনশ্রী কৃতজ্ঞ সৌম্যর কাছে। সৌম্যই তার যৌবনের পলতেতে প্রথম আগুন লাগিয়েছিল। তাকে উসকে দিয়েছিল। বনশ্রী এখন ঠিক বুঝে উঠতে পারে না, ‘সে এই ভরা যৌবন লইয়া কী করিবে!’ যৌবনের আবেগ তাকে অস্থির করে তোলে। ভেঙে দিতে চায় তার সব সংযম। বনশ্রী এখন তাই শুধু গতি চায়। গতির প্রাবল্যে ভেসে বেড়াতে চায়। উড়তে চায়। অনেক অনেক দূর। অনেক অনেক কিলোমিটার। ভরা যৌবনের উন্মত্ততায় সে ঝড় তোলে তার মোপেডের স্পিডোমিটারের স্কেলে।
সোনাবৌদি একদিন সৌম্যর সঙ্গে হাঁটতে হাঁটতে চলে গেছিল এক রুক্ষ পাহাড়ের পায়ের কাছে। সোনাবৌদি খুব মিষ্টি। সোনার মতোই মিষ্টি। গায়ের রঙও সোনার মতো ঝকঝকে। সুন্দর মুখের ছাঁদ। ছিমছাম। ফিটফাট। চটপটে। হাসিখুশি। মোটকথা, সোনাবৌদিকে এক ঝলক দেখলেই ভালো লাগে। কোনো কামনা নয়, বরং ভালোবাসতে ইচ্ছে করে।
তা সোনাবৌদিকে সবাই ভালোবাসে। উজ্জ্বলদার সঙ্গে বিয়ে হয়েছিল সম্বন্ধ করেই। আগে থেকে কোনো ভালোবাসাবাসি ছিল না। কিন্তু বিয়ের পর তাদের মধ্যে এত ভালোবাসা, সবাই বলে, ভালোবাসার বিয়েতেও নাকি এত হয় না। শ্বশুর বাড়িতে তার খুবই আদর। শ্বশুর-শাশুড়ি-ননদ-দেওর সবাইকে নিখুঁতভাবে দেখভাল করে। আরও বড় কথা, সে ইতিমধ্যে একটি ফুটফুটে পুত্রসন্তানের জন্ম দিয়েছে। আর সেই দৌলতে সংসারে বেড়ে গেছে আরও সম্মান। সোনাবৌদির গুণগানে সবাই ক্লান্তিহীন। তা সেই সোনাবৌদি খামোকা কেন এবং কীভাবে সৌম্যর সঙ্গে হাঁটতে হাঁটতে অনেকদূর চলে গেছিল, সে প্রশ্ন নিতান্তই অবান্তর। আসল কথা হচ্ছে এই যে, সেদিন সৌম্যর ভ্রমণসঙ্গীনি ছিল সোনাবৌদি। যারা অদৃষ্টবাদী, তারা বলতেই পারে, এটা যে ঘটবে তা তো জন্মমুহূর্তেই কপালে লেখা হয়ে গেছিল! আবার যারা যুক্তিবাদী, তারা বলবে, সব ঘটনার পেছনেই থাকে এক বা একাধিক কার্যকারণ সম্পর্ক।
সে যাইহোক, সোনাবৌদি সেদিন সৌম্যর সঙ্গে হাঁটতে হাঁটতে এক রুক্ষ পাহাড়ের পায়ের কাছে পৌঁছেছিল। সময়টা ছিল শীতের শেষ দুপুর। আকাশে ছিল ফ্যাকাশে নীল চাদর। বাতাসে মিষ্টি মিষ্টি হিমের ছোঁয়া। গাছে গাছে কি নীরব কানাকানি ছিল? হয়তো ছিল! ফুলেরা কি গন্ধ ধরে রেখেছিল তখনও তাদের বুকে? হয়তো তাই! গাছ গাছালির ফাঁকে ঘাসের সবুজ শয্যা কি ছিল নিষ্কন্টক? নিশ্চয়ই তাই! জনমানবহীন সেই অরণ্যঘেঁষা রুক্ষ পাহাড়ের তলায় বসেছিল তারা। একটি পুরুষ ও একটি নারী। অনেকটা পথ হাঁটার পর তারা হয়তো ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল। সৌম্য ছিল সহজ, স্বাভাবিক, শান্ত। কিছুটা নৈর্ব্যক্তিকও। সোনাবৌদি ছিল গভীর, গহন, গাঢ়।
একথা সেকথার পর সোনাবৌদি কিছুটা যেন ব্যগ্রতায় বলে যাচ্ছিল তার সুখ দুঃখের কথা, তার ভরা সংসারের কথা, তার বিয়ের আগের জীবনের কথা। সৌম্য শুনছিল। শুনে যাচ্ছিল। তার কিছুই বলার ছিল না। কিন্তু সৌম্য একথা ধারণাও করতে পারেনি, সোনাবৌদির এই স্নিগ্ধ কোমলতার আড়ালে লুকিয়ে আছে এক ভীষণ আগ্নেয়গিরি। মুখিয়ে আছে ভয়ংকর অগ্ন্যুৎপাতের জন্য। আর তাই তার আকস্মিক বিস্ফোরণে শিহরিত হয়ে উঠেছিল সৌম্য। ক্রমশই সোনাবৌদি হয়ে উঠিছিল মুখরা। হ্যাঁ, সোনাবৌদি জীবনে পেয়েছে অনেক কিছুই। ভালো বর, ভালো শ্বশুরঘর, ফুটফুটে পুত্রসন্তান, আর্থিক স্বচ্ছলতা, প্রত্যাশিত সমৃদ্ধি, সব কিছুই। কিন্তু এত সব কিছুর আড়ালে, তার শরীর ও মনের যে উদগ্র কামনা বাসনা আছে, তার খোঁজ কে রেখেছে! কে পেরেছে তাকে পরিতৃপ্ত করতে! না, উজ্জ্বলদা পারেনি। দাম্পত্য মিলনের কোনো অঙ্কেই সোনাবৌদি পায়নি শিখর তৃপ্তির অভিজ্ঞতা। আর কামনার এই চরম অতৃপ্তি ও ব্যর্থতা তাকে ভেতরে ভেতরে উন্মাদ করে তুলেছে। আজ সোনাবৌদি তাই হতে চায় চরম উৎশৃঙ্খল, বেপরোয়া, লাগামছাড়া। না, সৌম্যর কাছে আর কোনো বিকল্প ছিল না। বাঘিনীর মতো সৌম্যর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল সোনাবৌদি। দুমড়ে মুচড়ে গেছিল পাপ-পুণ্য, বৈধ-অবৈধ, ন্যায়-অন্যায়ের নির্ধারিত সীমারেখা।
সোনাবৌদি কৃতজ্ঞ সৌম্যর কাছে। সৌম্যই তার যৌবনের বারুদঘরে নিপুণভাবে প্রথম বিস্ফোরণ ঘটিয়েছিল। সোনাবৌদি আরও হাঁটতে চায়। অনেক দূর হাঁটতে চায়। অনেক অনেক কিলোমিটার। সোনাবৌদি জানে, ‘সে এই ভরা যৌবন লইয়া কী করিবে!’ সোনাবৌদির দৌড়াতে ভালো লাগে না। উড়তেও ভালো লাগে না। শুধু হাঁটতে ভালো লাগে।
সৌম্যর ভ্রমণসঙ্গীনি ছিল মোনালিসাও। তারা দুজনে হাঁটতে হাঁটতে সেদিন গেছিল স্থানীয় বাজারের মসলাপট্টিতে। কিছু মশলাপাতি কেনার প্রয়োজন ছিল। তারা সবজি মন্ডিতেও হেঁটে হেঁটে যায়। আর মাঝে মাঝে যেতে হয় স্বাস্থ্যকেন্দ্রে। মোনালিসা সৌম্যর স্ত্রী। ভালো না লাগলেও মোনালিসাকে হাঁটতেই হয় সৌম্যর সঙ্গে।