টেরেসার বেহালা

“তুমিই কি সেই বেহালাবাদক?” মেয়েটা আবার জিজ্ঞাসা করল।
প্রথমবারেই প্রশ্নটা কানে গিয়েছিল কিন্তু উত্তর দিইনি। এক, আমি তখন একটা ছোটগল্পে বুঁদ হয়েছিলাম। দুই, আমার কাঁধে কোনও বেহালা নেই।
আমি বড় কষ্টে গল্প থেকে চোখ তুলে তাকালাম। এক স্বর্ণকেশী কন্যা মুখে আলতো হাসি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে অস্বস্তিকর দূরত্বে। তার ধূসর চোখে চোখ রেখে বলা উচিত ছিল, “তোমার জন্যে আমি বেহালাবাদক। এবং একই সাথে সরাইখানার ওয়াইন গেলাস। উপচে পড়ব গালিবের মতো।” কিন্তু সত্যি বলতে কি, তখন এসব লাইন একেবারেই মাথায় আসেনি। শুধু দুদিকে ঘাড় নাড়লাম।
“Why isn’t my life like a situation comedy? …I gotta get my life some writers.” – The wise Calvin

মেয়েটা লাজুক হাসল – “তুমি একেবারে তেমনই দেখতে। কাল সন্ধেবেলায় আমি গিয়েছিলাম...” আমার দিকে বড় বড় চোখ মেলে বাক্য শেষ করল – “অপেরায়।”
বুঝলাম। মেয়েটি কোনও একটি অপেরার কোনও একজন বেহালাবাদকের সঙ্গে আমায় গুলিয়েছে।
ট্রামের বাইরে সকালে সোনালি রোদে পতপত উড়ছে গাইরোসের অস্থায়ী দোকানের পর্দা। পার্কের বেঞ্চে বসে মা আস্তে আস্তে কথা বলছেন তাঁর নবজাতকের সঙ্গে। ছোট মুদি দোকান থেকে খুটখুট বেরিয়ে আসছেন একাকী বৃদ্ধ, হাতে তাঁর ছোট্ট একটা ট্রলি ব্যাগ। আর সামনে এক বিব্রত তরুণী দাঁড়িয়ে আমায় নিরীক্ষণ করছে আর নিজের মনেই ভেবে চলেছে, কীভাবে সে জীবনের মধুরতম ভুলটা করে ফেলল।
আমি তার দিকে তাকিয়ে সামান্য হাসলাম এবার।

“আমি বেহালাবাদক নই, তবে আমি কবিতা লিখি।”
“ছাত্র?” আমার পিঠের বোঁচকার দিকে দেখিয়ে সে বলল। ওতে আমার ল্যাপটপ আছে। কিন্তু কেন যে লোকজন আমায় প্রথম দেখাতেই ছাত্র ভেবে বসেন, কে জানে। এখানে পৌঁছে প্রাগ বিমানবন্দর থেকে ক্যাব নিয়ে হোটেলে গিয়েছিলাম। মিটারে দেখাল ৫৩৩ ক্রোনা। আমি একটা হাজার ক্রোনার নোট এগিয়ে দিয়েছিলাম চালককে। আমার কাছে সদ্য ইউরো ভাঙানো কিছু ক্রোনা, খুচরো প্রায় নেই বললেই চলে। সেই চালক আমায় ৫০০ ক্রাউন ফেরত দিলেন। তিনি কেন ৩৩ ক্রাউন ছাড় দিলেন, জানতে উৎসুক হলাম। ভাঙা-ভাঙা ইংরাজিতে চালক ব্যাখ্যা করলেন – “স্টুডেন্ট। নট মোর মানি।” অর্থাৎ আমায় ছাত্র ভেবেছেন তিনি। ছাতদের তো বেশি পয়সা থাকে না, তাই তিনি ৩৩ ক্রাউন ছাড় দিচ্ছেন।
অবশ্য এ মেয়ে প্রথম দর্শনে আমায় বেহালাবাদক ঠাউরেছে। তাই মনে মনে তাকে ক্ষমা করে দিলাম।

আমি আবার দুদিকে ঘাড় নাড়ালাম – “আমি ছাত্র নই। সফটওয়্যার প্রোফেশানাল।”
তরুণীর চোখে সামান্য বিস্ময় দেখলাম। “তোমায় দেখে বোঝায় যাই না...”
মন্তব্যটা একটু গোলমেলে, তবুও আমি প্রশংসা হিসাবেই নিলাম। কেউ একজন ঠিকই বলেছিলেন, মানুষ তার আনন্দ নিজেই বেছে নেয়।

জানলাম তার নাম টেরেসা। সে প্রাগের একটা রিয়েল এস্টেট এজেন্সির ব্রোকার। এতক্ষণে তার ঝরঝরে ইংরাজির রহস্য খুঁজে পেলাম। যাই হোক, আমি তখন হন্যে হয়ে নতুন বাড়ি খুঁজছি। প্রথম সাতদিন হোটেলে থাকার বন্দোবস্ত আছে কোম্পানির খরচে। কিন্তু এর মধ্যে নিজের আস্তানা না খুঁজে পেলে বিপদ। তারপর দিনপিছু ৫০ ইউরো করা ঘরভাড়া দিতে হবে।
টেরেসাকে তাই জিজ্ঞাসা করলাম, “আমায় একটা বাড়ি খুঁজে দিতে পারবে?”
যদিও আমি বেহালাবাদক নই, তবুও টেরেজা আমায় সাহায্য করতে পারবে আনন্দে উছলে উঠল। ঠিক হল, লাঞ্চের সময় সে আমায় নিয়ে যাবে একটা বাড়ি দেখাতে। আমার দরকার ৩টে বেডরুমওয়ালা একটা ফ্ল্যাট। সপ্তাদুয়েক পরে ইয়েতি আর লামাও আসবে এখানে।
“সাথে রান্নাঘর থাকা চাই। ওয়াই-ফাই কানেকশান। ওয়েশিং মেশিন।”
টেরেসা এর মধ্যেই একটা ছোট্ট নোটবুক বের করে নোট নিচ্ছিল। মুখ তুলে জিজ্ঞাসা করল, “আর ডিস ওয়াশার?”
আমি মানসচক্ষে দেখতে পেলাম, আমি রান্না করছি ২টো চুলোর ওপর দুটো পাত্র বসিয়ে। আমার চারদিকে খবরদারি করে বেড়াচ্ছে ইয়েতি আর লামা। ঐ গাধা দুটোকেও কিছু কাজ করতে দেওয়া উচিত। বসে খাবে তা তো হয় না। তাই মাথা নাড়লাম। “ডিস ওয়াশার দরকার নেই।”
ততক্ষণে আমাদের গন্তব্য এসে গেছে। আমরা দুজনেই নামব ই পে পাভলোভায়। টেরেজার অফিস ট্রামস্টপ থেকে সামান্য দূরে।
“ওখানে।” একটা পিজ্জা দোকানের দিকে হাত দেখাল সে। “দুপুর দেড়টায় ঠিক ওখানে অপেক্ষা করব। দেরি কোরো না।”
হাত নেড়ে আমি ভূগর্ভস্থ মেট্রো স্টেশনের দিকে পা বাড়ালাম। এখান থেকে যাব পানক্রাস। আমার অফিসে ওখানেই।

এ শহরের যোগাযোগ ব্যবস্থা স্বর্গীয়। মাসের শুরুতে একটা টিকিট কেটে নাও। ভারতীয় মুদ্রায় হাজার দেড়েক টাকা হবে। সেই টিকিটে যেখানে খুশি যাও, যতদূর খুশি যাও। শহরের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে পৌঁছাতে ট্রাম-বাস-মেট্রো সবকিছু মজুত। অধিকাংশ মানুষই যাত্রার সময়টুকুর সদ্ব্যবহার করেন বই পড়ে। তাঁদের দেখাদেখি আমিও কিন্ডলটা নিয়ে বের হই।

ট্রেনে দাঁড়িয়ে গল্পের বাকিটা পড়তে পড়তেই টেরেসার কথা মনে পড়ল আবার।
বাইরে প্রায়ান্ধকার সুড়ঙ্গ। তাই ট্রেনের জানালায় আমার নিজের ছায়া। ল্যাপটপের ব্যাগ পিঠে, ব্লেজার চাপানো ঐ প্রতিবম্বকে কী করে কারও বেহালাবাদক মনে হতে পারে? আমি যদিও বেহালাওয়ালাদের ব্যাপারে বিশেষজ্ঞ নই, তবু তাদের সামান্য হলেও শিল্পীসুলভ কিছু অগোছালো ব্যাপার থাকবে। যেমন, না আঁচড়ানো চুল।

দুপুরে টেরেসার সঙ্গে দেখা হতে সে কথাই বললাম। সে একটা হাত দিয়ে পিজ্জা সামলাতে সামলাতে আরেক হাত দিয়ে আমার চুল ঘেঁটে দিল। আমি বাধা দেওয়ার আগেই সে তার কাজ সেরে ফেলেছে।
তারপর আমার মাথার দিকে তাকিয়ে নিজের শিল্পকর্মের দিকে তাকিয়ে মনোযোগী শিল্পীর মতো ঘাড় নাড়ল – “এবার তুমি অনেকটাই বেহালাবাদক।”
আমার দুটো হাত পিজ্জা আর চাটনিতে মাখামাখি তাই চুল ঠিক করার চেষ্টা না করে কাউন্টারের দিকে উঠে গেলাম আর এক স্লাইস পিজ্জা নিতে। এবার মাশরুম, ভুট্টাছানা আর ক্যাপসিকাম।
টেরেসা আমার কাগজের প্লেটের দিকে তাকিয়ে হাঁ – “তিনটে বড় বড় স্লাইস! তোমার চেহারা দেখে বোঝাই যায় না। তুমি রোজ জিমে যাও, না?” শেষ বাক্যের সাথে এমন কাতরতা মিশে ছিল যে, আমি হেসে ফেললাম। বেচারী তন্বী থাকার ফিকিরে একটা স্লাইসের বেশি নেওয়ার সাহস করেনি।

মিনিট পনেরোর মধ্যে লাঞ্চ সেরে আমরা বেরিয়ে পড়লাম বাড়ি দেখতে।
প্রথমটা কাছেই। ই পে পাভলোভা থেকে ৩-৪টে ট্রামস্টপ পরেই, কারলোভো নামেস্তিতে। দ্বিতীয় বাড়িটা এ্যান্ডেলে। সেটার নাম ‘ব্লু রিভার এ্যাপার্টমেন্ট’। পাশেই একটা বিয়ার কারখানা।
“বিয়ারের নাম স্টারোপ্রামেনা।” চোখ নাচিয়ে বললে টেরেসা। “তবে তুমি যদি বিয়ার খেতেই চাও, তাহলে তোমায় যেতে হবে ওখানে।” মোড়ের মাথায় একটা দোকানের দিকে দেখাল সে। দোকানের সামনে বড় করে লেখা ‘কোজেল’। আর একটা বিয়ার কোম্পানি। তাদের লোগো হচ্ছে ছাগল। বাঁকানো শিং, দাড়িওয়ালা দামড়া একটা ছাগল। ঠিক যেন হ য ব র ল-এর ব্যাকরণ শিং।
মজার কথা হল, কোজল-এর ঐ বিয়ার বারের দেওয়ালে কার্নিশে ৪টে ছাগল ঘুরে বেড়াচ্ছে। স্পাইডারম্যানের মতো কেউ দেওয়ালে হাঁটছে। কেউ কার্নিশ থেকে মুখ বাড়িয়ে নিচের ফুটপাতে হেঁটে যাওয়া মানুষজন দেখছে।

ফ্ল্যাটের জানালা থেকে নদী দেখা যাচ্ছে। ভ্লাতাভা নদীর জল এই দুপুরে রূপোর মতো স্থির। রাজকীয় আলস্যে সাঁতার কাটছে একদল রাজহাঁস। নদীর পাড়ে একটা কংক্রিটের বেঞ্চে বসে এক যুবক তার প্রেমিকার মুখটা দুহাতে আলতো ধরে গভীর চুমু খাচ্ছে। দুপুরের রোদ তেরছা দেখছে তাদের।
সেদিক থেকে চোখ সরিয়ে আমি টেরেজার দিকে তাকালাম – “আমার পছন্দ হয়েছে। এটাই নেব।”

স্থির হল, সামনে শনিবার আমি হোটেল থেকে জিনিসপত্র তুলে এনে ডেরা বাঁধব এখানে। ফেরার সময় টেরেজা মনে করিয়ে দিল – “কাল আমার অফিসে টাকা নিয়ে চলে এস। এক মাসের ভাড়া, সিকিউরিটি ডিপোজিট আর আমাদের কমিশন। মোট ৩৯ হাজার চেক ক্রাউন।”
অর্থাৎ তিন মাসের ভাড়া। লাঞ্চের সময় টেরেজার ঘেঁটে দেওয়া চুল আঙুল চালিয়ে সোজা করতে করতে আমি হিসাব করতে লাগলাম, ঠিক কত ইউরো ভাঙাতে হবে।

---

প্রথম পর্ব