খগেন্দ্রনাথ মিত্র (১৮৯৬- ১৯৭৮) একাধারে জনপ্রিয় শিশুসাহিত্যিক, একজন উল্লেখযোগ্য স্বাধীনতা সংগ্রামী। 'কিশোর' নামে একটি দৈনিক শিশুসাহিত্য পত্রিকা প্রকাশ করতেন। ছোটদের জন্য লেখা বইয়ের সংখ্যা শতাধিক। লিখেছেন ভারতবর্ষ, প্রবাসী, মহিলা প্রভৃতি পত্রিকায়। ওঁর লেখা 'ভোম্বল সর্দার' বইটি হিন্দি ও রুশ ভাষায় অনূদিত। ব্যালেন্টাইনের বিখ্যাত বই ‘গোরিলা হান্টার’ অবলম্বনে লেখেন ‘আফ্রিকার জঙ্গলে’। ১৯৪৮ সালে প্রকাশ করেন এশিয়ার সর্বপ্রথম শিশু-দৈনিক ‘কিশোর’। অনুবাদ করেছেন 'বেন হুর’, ‘লাস্ট ডেজ অফ পম্পেই’, ‘ব্ল্যাক অ্যারো’। বড়দের জন্যেও লিখেছেন খগেন্দ্রনাথ, 'গড় জঙ্গলের কাহিনী’, ‘ঠাকুরদার বুনো গল্প’, ‘ডাকাতের ডুলি’, ‘গণেশচন্দ্রের অশুভ যাত্রা’ ইত্যাদি।
‘ভোম্বল সর্দার’-এ যখন ভোম্বলকে ফিরে পাওয়ার আনন্দে বাড়িতে ঢাক বাজছে, আর ঢাকিরা মহানন্দে বাজাচ্ছে ঢাক, ঢাকের বোল বাজছে “ঢাট্টা ঢানা ঢট্টে ঢাক্, ঢাট্টা ঢানা ঢট্টে ঢাক্” আর ভোম্বলের কানে আসছে “টট্টা নগর ফস্কে গেল, টট্টা নগর ফস্কে গেল”। জার্নির এই সংখ্যার ‘ফিরে পড়া গদ্য’-এ খগেন্দ্রনাথের ‘ভোম্বল সর্দার-এর কিছু অংশ...


ততক্ষণে ঢাক কাঁসির আওয়াজ থেমে গেচে। সব নিঝুম। কিন্তু চালের বাতায়, ঘরের কোণে, ঝোপেঝাড়ে অবিরাম ঝিঁঝিঁ ডাকছে। বাঁশের মাচায় কালো পোর্টম্যানটোর ওপর টাইমপিসটা করচে টক টক, টক টক, যেন সময় নদীতে দাঁর টেনে চলেছে। কাছে কোথাও বোধহয় পুকুর আছে। না হলে এমন পাল্লা দিয়ে ব্যাঙগুলো ডাকবে কেন? কুয়োর ধার থেকে পাঁকের, বাড়ির বাইরে থেকে গাছপালার বুনো ও কথা থেকে যেন ভিজে শিউলির গন্ধ এসে নাকে লাগচে। ভোম্বল চেয়ারে তেমনি কাঠ হয়ে বসে আছে। কিন্তু নায়েব মশায় আবার একমনে হুঁকো টানতে লাগলেন। তবে এবার বেশিক্ষণ টানলেন না, হারানকে ডেকে হুঁকোটা তার হাতে দিয়ে, উঠে দাঁড়িয়ে ভোম্বলকে বললেন “খেতে রাত হবে। ততক্ষণ একটু ঘুমিয়ে নাও। আমি ওইদিকটা একবার দেখে আসি।’’ নায়েব মশাই চটি চট চট করতে করতে বারান্দা থেকে নামলেন। উঠোনে নেমে বললেন “হারানে এখানে থাক। এই স্বরূপ আলোটা ভেঙেছিস? এটা কোনটা?” স্বরূপ গলার স্বর নামিয়ে উত্তর দিলে, “সেইটেই। গুঁড়ির ওপর কাত হয়ে গিয়েছিল। নোকসান হয়নি। খারাপ তেল। তাই চিপনিতে কালি পরেচে। ওই বসন্তর দোকানের তেল। ব্যাটা রোজ ঠকায় । বললে শোনে না।’’ নায়েব মশাই বললেন, “বটে। আচ্ছা।’’ তারপর আর তাদের গলা শোনা গেলো না। হাই তোলার শব্দে ভোম্বল পিছন ফিরে দ্যাখে হারানে দরজার বাইরে একখানি চাটাই পাতছে। ভোম্বলও উঠে দাঁড়িয়ে পিছনের সেই জানলাটি দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে দেখলে। জ্যোৎস্না সরে গেচে। অন্ধকারে জোনাকির ঝাঁক উড়ে বেড়াচ্ছে। অন্ধকারের ভেতর দিয়ে একটি আলো দুলতে দুলতে চলে গেল । কাছেই কোথায় কুকুর ডেকে উঠল। হারানে বললে, “দাবাবু, শুয়ে পড়েন । আমি বাইরে আছি। ভয় নেই।’’ বলে সে বাইরে থেকে দরজাটি ভেজিয়ে দিলে এবং একটু পড়েই খাটো গলায় গান ধরল- “বল রসনা হরে, বহুদিন তোমারে করেচি যতন—’’ ভোম্বল দুর্গাপুরে থাকতে, বিশেষ করে গরমকালে নিশীথে অনেকবার গানটি শুনেছে। গানটির কথাগুলো তার ভালো লাগেনা। কিন্তু সুরটি তার মন স্পর্শ করে। শুনলেই মনে হয়, গায়ক অতি দুঃখে কাঁদচে । হারানের গলা বেশ মিঠে। ও বোধহয় যাত্রার দলে ছিল। না হলে এমনভাবে গায়? কাল ওকে জিগ্যেস করবে, ও যাত্রার দলে ছিল কি না? কিন্তু পরের দিনটির জন্য অপেক্ষা করার মত ধৈর্য তার হল না। সে উঠে গিয়ে জিগ্যেস করলে, “হারানে, তুমি কি যাত্রা করতে?” হারানে শুয়েছিল। উঠে বসল; বললে, “আপনার মতো কচি বয়সে দলে ছেলাম।“ “কি সাজতে?” “কেষ্ট।“ “তুমি লেখাপড়া জান?” “না।’’ “তবে কি করে পার্ট মুখস্থ করতে?” “শুনে শুনে” “দল ছাড়লে কেন?” “ভারি কষ্ট দাবাবু। ভালো খাওয়া-দাওয়া ছিল না। ঠিকমত মাইনে দিত না। কত গাঁ যে ঘুরেচি! বড় বড় জমিদারবাড়িতে গেচি। আমার গান শুনে বাবুরা সাতখানা মেটেল দিয়েছিল। আমার মামা বেহালা বাজাত। শেষ একবার এক গাঁয়ে গিয়ে মামার আর আমাদের চারজনের কলেরা হোল। মামা মারা গেল। আর একটা ছোকরাও মরল। আমরা দুজনে উঠলাম বেঁচে। তারপর বাড়ি এসে আর গেলাম না!” “তোমার সেই মেডেলগুলো আছে?” “গরিবের ঘরে সে কি থাকে দাবাবু? সব রুপোর দরে বেচে খেয়েচি। আপনি যান, শোন গা-’’ ভোম্বল বসে বসে ভাবতে লাগল। আর কারও বা আর কিছুর কথা নয়, তার নিজের কথা। কিন্তু যা মশা! একদণ্ড স্থির হয়ে বসা যায়না। সে মশারি ফেলে দিয়ে তার ভেতর বসে রইল। তার মনে হল, অতি আদর-যত্ন তো সে তার কাকার কাছ থেকে কোনদিন পায়নি। সে দোষ করে শাস্তির ভয়ে পালিয়ে এসে শাস্তির বদলে আদর পাচ্ছে, তার মানে কি? সে টাটানগর যাচ্ছিল কারিগরের কাজ শিখে চাকরি করতে। কিন্তু তা কি ফসকে গেল? বাড়িতে সে কার জন্য ফিরে যাবে? তার বাবা, মা, নিজের ভাই-বোন কেউ নেই! কথাটি মনে হতেই তার মনে ভেসে উঠল কাকিমা ও খুড়তুত বোন রানিদিদির স্নেহ মাখা মুখ দুখানি আর ছোট্ট ভাগ্নেটি। বাড়ি থেকে এ পর্যন্ত যতটা পথ সে পার হয়ে এল তার সমস্তটাই, সব ঘটনাগুলোকে নিয়ে তার চোখের সামনে এসে দাঁড়াল।

ভোম্বল সর্দার, খগেন্দ্রনাথ মিত্র, ১ম খণ্ড, শিশুসাহিত্য সংসদ