মানুষ সচারচর কীভাবে কম্যুনিকেট করে ? লোগোসেন্ট্রিক ভাষার ক্ষেত্রে sign-signifier-signified সূত্র মেনে নিলে প্রাথমিকভাবে ভাষার কথাই মনে আসে। অর্থাৎ মানুষ শব্দের মাধ্যমেই মূলত কম্যুনিকেট করে। চিহ্নক (signifier)-এর মজা তার চিহ্নন (signified)-এ বোঝা যায়। চিহ্নক বা ধ্বনিরূপকে যদি চিহ্নন (signified) বা তাৎপর্যের সূচক বলে ধরা যায় তাহলে দেখা যাবে এই পদ্ধতি নেতিকরণ বা নেগেশনের দিকে অঙ্গুলিনির্দেশ করছে। আঙুল তুললেই অনেকগুলো না মনে পড়া পেরিয়ে আম্পায়ারে এসে থামবে। কলম বা পেন প্রকৃত প্রস্তাবে ‘না-কাঠি’, ‘না-আঙুল’, ‘না-তরবারি’- কে চিহ্নিত করে। তাই কলম কখনও পেন হবে, কখনও লেখনী হবে কিন্তু বাছাধনকে কোনদিন বামাল সমেত ধরা যাবে না। অর্থাৎ তার কলমত্ব কি জিনিস তা নির্দিষ্ট করা যাবে না। কেবল বলা যাবে- ইনি অমুকবাবু নন। তো আমরা এরকমভাবেই পেড়ে থাকি কথাবার্তা- সাস্যুর সাহেব বলেছিলেন। কিন্তু এর থেকে কি বলা যায় যে মানুষ মূলত: শব্দের মাধ্যমেই কমিউনিকেট করে ?
যদি সেকথা মেনেও নেই তো ছবিটা কি দোষ করল ? অর্থাৎ কলমে কলমত্ব না থাকলেও তার ইমেজটাকে তো অস্বীকার করতে পারি না। মাথার মধ্যে ফাউন্টেন চুলবুল করতে থাকে। ইমেজ অনেক বেশি সুদূরপ্রসারী হতে পারে। আলতামিরা ডিকোড করতে লম্ফ হাতে দশ মাইল না হাঁটলেও চলে।
কিন্তু ইমেজ দিয়ে যখন কোন পৃথক মোড অফ কম্যুনিকেশনের প্রশ্ন ওঠে, যাকে চিত্রভাষাও বলা যেতে পার, সেক্ষেত্রে এ্যাবস্ট্রাকশনের প্রসঙ্গ উঠবে। কারণ লাং বা ভাষাতন্ত্রের নিরিখে ইমেজ এক বিলম্বিত প্রস্তাবনা। আগে প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলিতে TLM (Teaching Learning Material)-এর হুটোপুটি ছিল না। সাস্যুরের কল্যাণে ততদিনে অবশ্য জানা হয়ে গিয়েছিল যে চিহ্নক-চিহ্ননের মেলবন্ধন হঠাৎই পড়ে পাওয়া এক চোদ্দ আনা। চিহ্নকের কোন চিরায়ত অর্থ নেই। তবু তাকে লাং বা শব্দতন্ত্রের নিরিখে মানের চক্করে বেঁধে রাখা হয়- আমাদের শেখানো হয়েছিল ক্যাট মানে বেড়াল। পরে যখন TLM–এর বাড়বাড়ন্ত হল তখনও ছবির সপ্রতিভ মার্জার থেকে বেড়াল এলো না। আগে বেড়াল বলা হল তারপর এলেন তাঁর শ্রীযুক্ত ইমেজ।
কিন্তু এই গঠনবাদের তত্ত্বে ঐ ‘না-কাঠি’, ‘না-আঙুল’, ‘না-তরবারি’-র যে দমবন্ধ হয়ে আসছিল। নেতিকরণই যদি চিহ্নকের মূল আকর হয় তো পথের ধারে যে আম ঝুলছে তাকে আম ভাবতেই হবে কেন ? ভাবা যেতেই পারে ‘গাছের অপেক্ষা’ বা আর এক ধাপ এগিয়ে ‘গাছের সামাজিক ট্যাঁকঘড়ি’। সেক্ষেত্রে ‘লাং’বাবু চোখ রাঙাবেন –তাঁর ব্যক্তি অতিক্রম করে অর্থ ও পদ্ধতির গণতন্ত্রীকরণ চৌপাট হয়ে যাবে।
তবু একদিন একঘেয়ে মৌরলা মাছ থেকে মুক্তি চাওয়া হবেই এবং লেখা হবে –‘মত মাছ ঔরলা’। আসলে টেক্সট বস্তুটি তো থানইঁট নয় যে তাকে গাঁথার সময় যেমনটা বসানো হয়েছিল তেমনই থেকে যাবে। টেক্সট-এ এমন কোন অর্থ নিহিত থাকতে পারে না যার অবিকল উদ্ধার সম্ভব। গঠনবাদের সমালোচনায় পিয়ের মাশের, বাখতিন, ভলোশিনভ এবং সর্বোপরি জাক দেরিদা উত্তর গঠনবাদের যে প্রস্তাবনা আনলেন সেখানে টেক্সট অর্থের নিগড় থেকে বেরিয়ে এক সম্ভাবনাময় উপস্থাপনা বলে বিবেচিত হতে লাগল। আর এই সম্ভাবনার পরিসরে ফর্ম এবং বহুস্তরীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার স্বাধীনতা আরও বাড়ল। ষাটের দশকে একদিকে যখন উত্তর গঠনবাদ, টেক্সট, রিডার রেসপন্স থিওরি বিকশিত হয়েছে অন্যদিকে ফরাসী চলচ্চিত্রে চলছে ‘নিউ ওয়েভ’ বা ‘ন্যুভেল ভাগ’ আন্দোলন। বারীনদা ‘গিনিপিগ একটি তথ্যচিত্র’-এ ন্যুভেল ভাগের উল্লেখ করেছেন। ন্যুভেল ভাগে ফিল্ম গল্প বলা থেকে মুক্তি পেল। সাহিত্যে অবশ্য ১৯২২ সালেই জেমস জয়েসের ‘ইউলিসিস’ প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু হাফপ্যান্ট থেকে ফুলপ্যান্টে আসতে ফিল্মের আরও চল্লিশ বছর লাগল। এই সময়েই ইংল্যান্ডে ‘ফ্রি সিনেমা’ এবং মার্কিন দেশে ‘আন্ডারগ্রাউন্ড’ চলচ্চিত্র আন্দোলন চলছিল। এরাও নিজের দেশে চলতি সিনেমাটোগ্রাফি, ন্যারেশনকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছিল।
‘ন্যুভেল ভাগ’ ছবিতে দ্রুত দৃশ্য পরিবর্তন, জাম্প কাটের ব্যবহারে মসৃণ সম্পাদনা যুক্ত হলিউড ক্লাসিক্যাল শ্লথতা নয়, গুরুত্ব দেওয়া হল গতিকে। আখ্যানের পারম্পর্য, যুক্তি ক্রমের অনুপস্থিতিতে দর্শকের কল্পনার বিকাশ ও পার্টিসিপেশনের সুযোগ গেল বেড়ে। রচয়িতা (auteur)-দর্শকের আলাপ-সমবায়ে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হল।
Polemics লিখতে গিয়ে কবি বারীন ঘোষাল কি এই আলাপ-সমবায়ের প্রতিই মনযোগী হয়েছিলেন ? ধারা কবিতার পৌনঃপুনিক অবস্থান থেকে বেরিয়ে আসতে ‘নতুন কবিতা’-র সম্ভাব্য দিকগুলি তুলে ধরতেই কি ফিল্ম নামক একটি বহুমাত্রিক মাধ্যমকে ব্যবহার করতে চেয়েছেন ? সেই অবসরেই জমিয়ে তুলতে চেয়েছেন আলাপ-সমবায় –

“ছবি শব্দে ধরা যায় না। ধরলে তা নাটুকে হয়ে যায়। সাজানো গোছানো, রিহার্স করা, মাপা। তাই লেখার ব্যাপারটা বেশ গোলমেলে। যখন কলম আর হাতের মধ্যে কোন তফাৎ নেই, হাত আর মনের মধ্যে-ধরা যাক-লেখা আর মনের মধ্যে কোন তফাৎ নেই তখনই, মনই কবিতা হয়ে যায়। আগে থেকে ভেবে চিন্তে লেখার অর্থই হল –কবিতা হয়নি”।

গিনিপিগ একটি তথ্যচিত্র/বারীন ঘোষাল/কৌরব প্রকাশনী/জামশেদপুর/ ১৯৯৫

কত অবলীলায় বারীনদা এখানে যেকোনো কবির আল্টিমেট স্বপ্নের কথা বলেন – যা ভাবব সেটাই কবিতা হবে। শুধু কবি কেন ? যেকোনো ক্রিয়েটিভেরই স্বপ্ন –তার ক্রিয়েশন ফর্ম-কন্টেট, বাস্তব-চেতনা’র বাইনারি, দ্বন্দ্ব অতিক্রম করবে। ক্রিয়েটর আর ক্রিয়েশন একই বিন্দুতে অবস্থান করবে। কিন্তু এর শুরুটা –“ছবি শব্দে ধরা যায় না”। পাঠকের ভাবনার দুয়ারে আঘাত করছেন কবি বারীন ঘোষাল। সত্যিই তো কোন দৃশ্যকে যখন মানুষের দৃষ্টির লজিক অনুযায়ী টু-ডি ফ্রেমে আনতে হয়, শব্দের পরিসরে সেই চিত্রকল্প স্থাণুবৎ হয়ে যায়। টাইগার হিলের সূর্যোদয়কে পাঠকের কাছে তুলে ধরতে, পাঠককে আকর্ষিত করতে যে বিশেষণ, আয়োজন, আবেগের ঘনঘটা করতে হয় সেখানে সূর্যের পায়াভারী হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়। পরবর্তীকালে বারীনদা সরাসরি কবিতায় চিত্রকল্প বাদ দেওয়ার কথা বলবেন তাঁর “ছাব্বিশ দফা প্রতারণা” প্রবন্ধে।
কিন্তু দৃশ্যটিকে যদি গতিশীল বা বহুস্তরীয় করা যায় ? যদি সূর্যোদয়কে সবাক ও এবং সচল করে রাখা হয় দৃশ্য ?