চেক কবি মিরোস্লাভ হোলুব ১৯২৩ সালে জন্মেছিলেন। মারা যান ১৯৯৮ সালে। পেশায় তিনি ছিলেন গবেষক ও বৈজ্ঞানিক। প্রাহায় মেডিক্যাল ইন্সটিটিউটে তিনি ইমিউনোলজি নিয়ে গবেষণা করতেন। এই গবেষণার সূত্রেই এককালে গিয়েছিলেন ফ্রাইবুর্গ বা নিউ-ইয়র্ক। কিন্তু পূর্ব-ইয়োরোপের কোনো-কোনো লেখকের মতো তিনি দেশত্যাগী বা দেশান্তরী কবি নন। গবেষণার কাজ শেষ হতেই ফেরেন প্রাহায়। জীবিকা ও প্রবাসজীবন তাঁর কবিতাকে পুষ্ট করেছিলো নানাভাবে।

তাঁর লেখা কিছু কবিতা এই পাতায় ধরা রইলো। কবিতাগুলির অনুবাদ শ্রী মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের।

আমেরিকা

একটা পিয়ানো ছুটে চলেছে
মাত্রাছাড়ানো বেগে
রাতের বিতান ধ’রে

সোজা গিয়ে ধাক্কা খায়
আইল্যান্ড পার্কের কাচের সিন্দুকে
ভেঙে চুরমার
আর মাইলফলকগুলোর গায়ে জাপটে থাকে
স্বর কোমল-ঋষভ
                     কোমল-ধৈবত
                                         কোমল-গান্ধার।

কালো মেয়েটির
সিন্ধুআনন
নুয়ে পড়ে আমাদের ওপর,
পিয়ানোর রক্ত ঝ’রে চলে ক্ষীণ-এক
অস্ফুট সুরেলা ধ্বনিতে -

আমেরিকা

কিন্তু তুমি তা প্রমাণ করতে পারবে তো?

লঙ আইল্যান্ডে রাত্রি

যেন বাদুড়ের মড়ক লেগেছে।
এমনভাবে রাত ঝাপট মারে গাছের ডালে।
জেলিমাছের মতো বাড়িগুলো ভাসে
ম্যাগনোলিয়া বুলভার ধ’রে।

আমরা উলটো-পৃথিবীর জীব।
আমরা হাতে হাঁটি।

স্বয়ংক্রিয় ঝাঁঝরিরা
উঠোনে জল ছিটোয়,
যেন পৃথিবী এখনও আছে।

কিন্তু এটা তো মাত্র পৃথিবীর এক স্বতঃসিদ্ধ জমি।
স্বতঃসিদ্ধ বাড়ি
জানলায় চোখের জল।


রাত সাড়ে-এগারোটা, ফার রকঅ্যাওয়ে

মোড়ের কাছে একটি ষাঁড় ফেটে পড়ে
গ’র্জে জানাতে
জগতের অবস্থা, বয়েস।

মোড়ের কাছে এক কালো মেয়ে যায়
শাদা পোশাকে -
যেন
শুভ্রতাই।
মোড়ের কাছে এক রক্তরাঙা চাঁদ
সমুদ্রকে মাই দেয়।

আর দূরে শেষ বাস
ছেড়ে দেয়,
অতএব এখন কিছুই নেই
যা থেকে তুমি

চ’লে যেতে পারো।


রাতের বেলায় বৃষ্টি

ইঁদুর-মার্কা দাঁতে
বৃষ্টি শিলাপাথর ঠোকরায়।
গাছগুলো কুচকাওয়াজ ক’রে চলেছে শহরে
পয়গম্বরদের মতো।

হয়তো এটা অন্ধকারের দানবীয় দেবদূতদের
ফোঁপানি,
হয়তো এটা বাইরে বাগানে ফুলগুলোর
চেপে-রাখা হাসি,
সরসর ক’রে
চাচ্ছে ক্ষয়রোগ সারাতে।

যে-কোনোরকম ঢাকার তলায়
পবিত্র খরার
সাদর রোঁয়াফোলানো ঘড়ঘড় হয়তো।

এক অকথ্য সময়,
যখন লাউডস্পিকারের কণ্ঠে ফাট ধ’রে যায়
আর কবিতারা
তৈরি হয় শব্দে নয়
ফোঁটায়-ফোঁটায়।


প্রেম

দু-হাজার সিগারেট।
দেয়াল থেকে দেয়ালে
একশো মাইল।
এক অনন্তকাল আর রাতজাগার এক অর্ধেক
তুষারের চেয়েও ফাঁকা।

টন-টন কথা
বালির ওপর প্লাটিপাসের
পথরেখার মতো পুরোনো।

শ-খানেক বই যা আমরা লিখিনি।
শ-খানেক পিরামিড যা আমরা গড়িনি।

কেবল ঝাঁট।
ধুলো।

বিশ্বের সূচনার মতোই
তিক্ত।

আমায় বিশ্বাস কোরো যখন আমি বলি
                                         তবু তা ছিলো সুন্দর।


কয়েকজন ভারি চালাক-চতুর লোক

তারা কথা বলতো পিন দিয়ে
তারা চুপ ক’রে থাকতো ছুঁচের মধ্যে।

রাত্রি ভর দিয়ে দাঁড়ালো
জগৎ নামক ছোট্ট ছেঁড়াখোঁড়া জন্তুটার গায়ে
তার হিমশীতল হাতে ভর দিয়ে

পরে, যখন তারা ঘরে ফিরে এলো,
তারা লাথি কষালে
                     রুটিকে

এ-কোণ থেকে
                     ও-কোণে।


শিক্ষক

পৃথিবী ঘুরছে,
                     বললে ছাত্র।
না, পৃথিবীটি ঘুরিতেছে,
                     বললেন শিক্ষক।

তোমার পাতারা মাঠের মধ্যে ঝ’রে পড়েছে,
                     বললে ছাত্র।
না, তোমার পাতারা মাঠের মধ্যে ঝরিয়া পড়িয়াছে,
                     বললেন শিক্ষক।

দুয়ে আর দুয়ে চার,
                     বললে ছাত্র।
দুই আর দুই মিলিয়া চার,
                     শিক্ষক তাকে শোধরান।

কেননা শিক্ষক বেশি ভালো জানেন।


ওলসানির য়িহুদি গোরস্থান,
কাফকার কবর, এপ্রিল,
রৌদ্রোজ্জ্বল

মেপল গাছের তলায় লুকিয়ে আছে
নিঃসঙ্গ কয়েকটা নুড়ি
ছড়িয়ে-পড়া কথার মতো।
নিঃসঙ্গতা এত কাছে
যে সে নিশ্চয়ই পাথরের তৈরি।

ফটকের কাছে যে-বুড়ো লোকটা,
যে-একজন গ্রেগর সামসা
রূপান্তরিত হয়নি,
নগ্ন আলোয়
চোখ পিটপিট করছে,
সব প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছে এই ব’লে

দুঃখিত, আমি জানি না।
আমি প্রাহার লোক নই।