একদিন প্রতিদিন আমাদের দেখা হয়ে যেত। কখনও ছুটির দিনের সকালবেলায় আমরা ফুল-থ্রটলে গীয়ার বদল করতাম, কখনও সারাদিনের কাজের শেষে আবারও একটা সূর্যোদয় হোত, শুধু আমাদেরই জন্য। এত কথা ছিল আমাদের। আমগাছ, জামগাছ, বনতুলসী, কুসুম, কামিনী। শাল সেগুন মহুয়া পলাশের সেই চরাচর। লাল মোরামের রাস্তায় ধূলো উড়িয়ে ছুটে গিয়েছে পঞ্চাশ টনের ম্যাক। দূরে দূরে নোয়ামুন্ডি, জোডা, বরবিল, কিরিবুরু, শিকারী রোড।
একটা বাড়ি ছিল সীসম রোডে, সমগ্র সিংভূমের পাতা ঝরে পড়তো। লাল রঙের মেঝে, উঠোনে চাঁপা গাছ, যুঁই ফুল, দোলের আবীর। আমরা এখানে একসাথে বসে কবিতা পড়তাম। সাল ১৯৮০-’৮৫। স্বদেশদা তখনও নির্বিশেষে ‘ভালো, ভালো’ বলা রপ্ত করেননি। বলতেন ‘হচ্ছে না, কিচ্ছু হচ্ছে না। এত সহজ ভেবেছ?’ -আমরা ক্রমে পাহাড়ি পথে, দলমায়। চারপাই, বনমোরগ, ভাজা মাংস, মহুলজল। পাতা পোড়ানোর গন্ধ ভাসে বসন্তবাতাসে। হাইওয়ের ওপরে ছুটন্ত টায়ারের অবিরল হিসহিস। পাখিরা বাসায় ফিরছে আর আমরা কবিতা পড়ছি। স্বদেশদা পড়ছেন, ‘আমরা কি সেই আখ মাড়িয়ে স্রোতের দেখা পাবো?’ আমি পড়ছি, ‘আমরা যাবো, -ক্রমে জল ঠান্ডা ও পটাসিয়াম গাঢ় হয়ে উঠছে’।
একদিন অনেকদিন আমরা সমুদ্রতীরে। ভরা জোয়ারে লাল কাঁকড়াদের ফৌজের মুখোমুখি। খড়ে ছাওয়া সেই গোলঘরে, কখনও কাজুবাদামের গাছে হ্যামকে আমাদের কবিতার খাতা। স্বদেশদা লিখছেন, ‘জলের ওপরে এক জাঙিয়া রঙের সূর্য ওঠে দেখা গেল’।
এক নৌকোয় গায়ে গায়ে বসে আমরা পার হয়েছি বুড়ি বালাম নদী। আরও কত নদী ছিল আমাদের। সুবর্ণরেখা, খরকাই, কোয়েল, কারো, ঔরঙ্গা। কত আদিবাসী গ্রাম, টাটার কারখানা, কত জলচুঁয়া আর বালুস্তর। আমাদের রাজ্যপাট ছিল শিশির থেকে সমুদ্র পর্যন্ত। আর তাঁর কবিতা নিয়ে দিনরাত্রি আমাদের গর্ব ও মুগ্ধতা। কৌরবের কবিতার ক্যাম্পের সেইসব অপার দিনগুলো, রাতগুলো। ওঁর ‘পরাণকথা’-য় স্বদেশদা আমায় লিখেছিলেন, ‘দেওয়ালের অন্ধকার ভেঙ্গে আমরা যখন মাঝরাতে সমুদ্রে গিয়ে পড়েছিলাম সেসব কথা তুমি একদিন লিখো শংকর’। এখন আমার আর কিছু লিখতে ইচ্ছে করবে না। আর কাকে পড়ে শোনাবো? শহরের মেয়রও এখন জেনে গেছেন...
আর কখনও কোথাও দেখা হবে না আমাদের। অনেক আলোকবর্ষ পাড়ি দিলেও নয়। এ জীবন তবে শুধু কবিতাকে সঙ্গী করে ধীরে ধীরে ‘একমনে ঝরে যাওয়া’ নাকি ? -একদিন আমি তাঁকে জিগ্যেস করেছিলাম। স্বদেশদা লিখেছিলেন ‘এই আমি ভেতরে তৈরি হলাম বরং নীল বরং দুঃখী’। মৃত্যুর অনেকদিন আগেই।