বিমলচন্দ্র ঘোষের কথা এলেই তাঁর লেখা “উজ্জ্বল একঝাঁক পায়রা” গানটার কথা সবার আগে মনে পড়ে। সলিল চৌধুরীর সুরে সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের গাওয়া এই জনপ্রিয় গানটি ছাড়া অনেক ছায়াছবির বিখ্যাত গানও তাঁর লেখা থেকে নির্মিত হয়েছিল। কিন্তু তাঁর প্রধান পরিচয় একজন কবির। কেউ কেউ তাঁকে প্রগতি শিবিরের অন্যতম প্রধান কবি হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। ১৯১০ সালে জন্মগ্রহণ করেন বিমলচন্দ্র। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ “জীবন ও রাত্রি”। ভারতীয় ও পাশ্চাত্যদর্শন গভীরভাবে পাঠ করেছিলেন তিনি। কিন্তু মার্কসীয় দর্শনের আলোয় তিনি নিজের সদাজাগ্রত চেতনাকে উদ্দীপ্ত করে তোলেন। ষোলো সতেরো বছর বয়সে বিমলচন্দ্র দু’জন রাজনৈতিক কর্মীর সংস্পর্শে আসেন। একজন ছিলেন আত্মগোপনকারী এক বিপ্লবী এবং অন্যজন ছিলেন পুণের এক মারাঠি শ্রমিক কর্মী ও সংগঠক ডব্লু.এস.কার্ডিলে। এই মারাঠি শ্রমিকনেতার কাছেই তিনি প্রথম কার্ল মার্কসের নাম শোনেন। ওঁর বস্তুবাদী যুক্তিতর্কের প্রভাবে তখন থেকেই বিমলচন্দ্রের চিন্তা ভাববাদী দর্শনের বিপরীত স্রোতোমুখী হতে থাকে। পরে তিনি কমিউনিস্ট পার্টি নেতা কমরেড মুজফফর আহমদ প্রমুখের সান্নিধ্যে আসেন। তাঁর মনের ঔপনিষদিক- বৈদান্তিক ভিত্তিভূমির উপর মার্কস-এঙ্গেলস-লেনিন-স ্তালিন অনুসৃত বিজ্ঞান সম্মত বস্তুবাদের ইমারত গড়ে ওঠে। বিমলচন্দ্র হয়ে ওঠেন জনগণের কবি, সর্বহারাদের কবি।
তাঁর প্রকাশিত অন্যান্য উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ হোলো উলুখড়, দ্বিপ্রহর ও অন্যান্য কবিতা, ফতোয়া, নানকিং, সাবিত্রী, বিশ্বশান্তি, রক্তগোলাপ, উদাত্ত ভারত ইত্যাদি। এর মধ্যে নানকিং গ্রন্থটি কংগ্রেস সরকার বাজেয়াপ্ত করে। আর উদাত্ত ভারত গ্রন্থটি কবি বিমলচন্দ্র কর্তৃক নির্বাচিত তাঁর শ্রেষ্ঠ কবিতা সংকলন। কবিতা সৃষ্টির সঙ্গে সঙ্গে তিনি কিছুকাল সাহিত্য পত্রিকা ‘বারো মাস’ এবং ‘এষা’ প্রকাশ ও সম্পাদনা করেছেন। ১৯৬০ সালে তাঁর পঞ্চাশ বছর পূর্তি উপলক্ষে প্রখ্যাত সাংবাদিক বিবেকানন্দ মুখোপাধ্যায়ের সভাপতিত্বে মহাবোধি সোসাইটি হলে বিমলচন্দ্রকে এক গণসংবর্ধনা দেওয়া হয়। কবি প্রতিভার স্বীকৃতি স্বরূপ ১৯৬৮ সালে বিমলচন্দ্র ঘোষ ‘সোভিয়েটল্যান্ড’ পুরস্কার লাভ করেন। ১৯৮২ সালে জীবনাবসান হয় তাঁর। তিরিশের দশক থেকে আটের দশকের গোড়ার দিক অবধি বিস্তৃত তাঁর কবিজীবনের মধ্যে থেকে কিছু লেখা তুলে আনা হোলো...

মনু

হে নিষ্ঠুর, তুমি নাকি মানবের পিতা?
ঊর্ধ্বমূল অধঃশাখ ধর্মবৃক্ষশাখে
হেঁটমুণ্ডে ঝুলে ঝুলে করাল সংহিতা
উচ্চারিতে শাসনের রুদ্র-জয়ঢাকে
শব্দ তুলে; ভূমিমাতা ভয়ে প্রকম্পিতা!
হে মনু, তোমার খড়গে দারুণ বিপাকে
শূদ্রগণ প্রাণ দিত। বর্ণাশ্রমী চিতা
জ্বলে যেত ব্রহ্মবিদ্যা প্রচারের ফাঁকে।
রেখেছিলে নারীদের জ্ঞান বিবর্জিতা
পিতৃশাসনের দম্ভে বাঁধি শতপাকে
পুণ্যের কী পরিহাস তব যজ্ঞশালা
গ্রাসিত অনলগর্ভে আর্ত নরমেধ!
কণ্ঠে পরি অনার্যের নরমুণ্ডমালা
হে ভীষণ, উচ্চারিতে মুখে চতুর্বেদ!

স্বপ্নডিঙি

সোনালি মাছেরা সাঁৎরে বেড়ায় জলে
হাল ধরে থাকা স্বপ্নের ডিঙি ভাসে,
তোমাকে বসিয়ে দেখি চখাচখী আসে
সাঁঝের সূর্যে রাঙা মোমবাতি জ্বলে।
রঙ কাঁপে হাওয়া লেগে,
মোমগলা রাঙা মেঘে।।

কিছু যে একটা ঘটবেই তুমি ভাবো,
নদীটার তল নিস্তল হতে পারে
হাল-ধরে-থাকা ডিঙিটার অভিসারে
কোনোদিন কোনো লক্ষ্য কি খুঁজে পাবো ?
চখাচখীরাও ভাবে
ডিঙিটা কোথায় যাবে ?

ফড়িং উড়ছে ছিপের ফাৎনা নড়ে,
বুড়ো মানুষটা কাসছে সাঁকোর ওপর
জোয়ারের জলে ভাসছে একটা টোপর
উলু দেয় নদী ঢেউরা মন্ত্র পড়ে।
বর কই? ভাবে কনে
ডিঙিতে উদাস মনে।।

জলতলে কাঁপে সোনালি মাছের ছায়া
ময়ূরপঙ্খী ডিঙিটা হঠাৎ নড়ে
তুমিও উধাও স্বপ্ন-হাওয়ায় চড়ে!
বুড়ো কেসে বলে সংসারটাই মায়া।
নদীর দু’তীর ফাঁকা
ফড়িং কাঁপায় পাখা।।

মহাচীন

লাল পাহাড়ের চূড়ায় জবাকুসুম
ভাঙায় আমার ঘুম
প্রতিটি পাপড়ি যার
ভ্যঁয়রো আলাপ সংহত ঝঙ্কার।
যে মাটির শিখা ভোরের জবাকুসুম।
নীলিমার নীল কপালের রাঙা বাসনার কুঙ্কুম।
সে দেশকে আমি চিনি
সৃজন-সায়রে রণ-তামাসায় খেলে না সে ছিনিমিনি
নব রূপায়নে দেশ গড়ে জাতি গড়ে
সামন্ত- সাম্রাজ্যবাদের দানবের সাথে লড়ে।
পৃথিবীর মানদণ্ড যে গিরি ওপারে এপারে তার
আমাদের মনোবিনিময় আজো উজ্জ্বল চেতনার
প্রবল আত্মসম্ভ্রম-দীপিকায়
ললিতমধু্র শিল্পে কাব্যে লীলায়িত লিপিকায়।
ইতিহাসে কোনো কালে-
আমরা খেলিনি মৃত্যুর খেলা তরোয়ালে তরোয়ালে
ধর্মের কথা ধার্মিক জানে কনফুসি গৌতম!
আমরা মানুষ নির্ভীক প্রেমে বুঝি শুধু সংযম,
ভ্রান্তির নিরসনে
অমিতজ্ঞানের কষ্টি-পাথরে পথ খুঁজি আলাপনে!
লড়াই ক্ষ্যাপারা মিছে করে হাহুতাশ,
যুদ্ধ বাধেনা পুঁজিবাদীদের মেটেনা মনের আশ
আমরা ওদের বিক্রম দেখে হাসি
হত্যায় মেতে স্বেচ্ছাতে কেউ পরে না গলার ফাঁসি
হে মহান বিপ্লবী।
কাব্যে আমরা এঁকেছি তোমার মহনীয় এক ছবি
দূরদৃষ্টির দূরবীক্ষণে দেখেছি শঙ্কাহীন,
আফ্রিশিয়ার শান্তিপ্রহরী অজেয় ভারত-চীন।

কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো শতবার্ষিকী
১৮৪৮-১৯৪৮
“A spectre is Hunting Europe, the spectre of Communism.”

প্রেত নয়ঃ শুধু ইউরোপ থেকে কবর-ফাটানো
আঁকাবাঁকা রাঙা শতবর্ষের
প্রচণ্ডতম রক্তের ধূম
ঘনীভূত মেঘ ক্ষুব্ধ নিঝুম
বাজে-ঠাসা কালোনিঃশ্বাসে জাগা
প্রেত নয়ঃ নরগোষ্ঠীর শালপ্রাংশু কাঁধের
বিদ্রোহী কালবৈশাখে দোলা-লাগা –

প্রেত নয়ঃ রাঙা থমথমে ঝড়
লৌহ নিগড়
ঝন ঝন ঝন
যন্ত্রের মহাশব্দের ঝড়
উন্মাদ ঝঞ্ঝনা!
নেহায়ে নেহায়ে কোটি কোটি কোটি
ঘামঝরা কড়া-হাতুড়ির ঘায়
রুক্ষ শুষ্ক ভূখা-কলিজায়
প্রেত নয়ঃ গাঢ় অন্ধকারের
দীর্ণবুকের পারমাণবিক
রক্তবহ্নিকণা!

প্রেত নয়ঃ মহাশব্দায়মান
শৃঙ্খলছেঁড়া প্রলয়ের গান
সাইরেণ-বাজা ঈথারে ঈথারে কম্পিত রাঙাধুম...

প্রেত নয়ঃ কোটি কোটি আত্মার
মানবেতিহাসে ঋজু ক্ষুরধার
শতবর্ষের আকাশ-রাঙানো শাণিত-সম্ভাবনা!
আশ্বাসে আর বিশ্বাসে নয় বৃথা বসে কালগোনা।

প্রেত নয়ঃ পদধ্বনিত রাত্রি
প্রচণ্ডতম জীবনধাত্রী,
দুনিয়ার যত শোষিত সর্বহারা
প্রেত নয়ঃ ওরা মহাভুবনের
দুর্জয় ক্ষুধা বিস্ফোরণের
শ্রম-চেতনায় উদ্দাম রণধারা...

প্রেত নয়ঃ রাঙাপ্রাণের মশালে
আঠার শ আটচল্লিশ সালে
সর্বহারার চেতনায় জাগা ঘুম
প্রেত নয়ঃ ওরা সারা দুনিয়ার
বিপ্লবী মহাপ্রেম পারাবার
গণ-মানবের রক্তের মহাধূম...

বসন্ত এল

ব্রহ্মাবর্তের পাথুরে হাওয়ায় লাল ধূলো উড়িয়ে
বসন্ত এল।
কুরুক্ষেত্রের সারথিরা পেট্রলগন্ধী বাতাস কেটে লরী চালায়।
দুঃস্বপ্নের বিষে মরে গেছে ইতিহাস
দুচোখ-কানা ধৃতরাষ্ট্রের পৃথিবী।
বিশ্বরূপের বিরাট হাঁ-করা মুখের গর্তে
ধর্মীয় মাহাত্ম্য আজ ভয়াল চর্বণে বিলুপ্ত।
ভারতভুক্তির বেনামদারীতে নেটিভ-ক্ষত্রিয়দের উল্লাস
পদ্মপাতায় শিশির!
সূর্য-চন্দ্র-বায়ু-বরুণ -
রাঠোর-চৌহান-ঘোরী-খিলজী -লোদী বংশাবতংসেরা
সরকারী দপ্তরে কলম পিষছে।
বাৎসায়ন কল্যাণমল্লের কামোদ্রিক্ত পৌরুষের নির্বীর্যতায়,
রাজা-উজির-সামন্তরা পুড়ছে নিভো আগুনের আঁচে।
হোটেল খুলেছে সুভদ্রা রিজিয়ারা।
ওদিকে পার্কে পার্কে সমানাধিকারের আওয়াজ!
জীবন-চেতনার প্রবল উদ্দীপনায় ফুটপাত লোকারণ্য!

কারখানার বাঁশিতে নবযুগের পাঞ্চজন্য।
মাঠে মাঠে ঝলসে ওঠে কলের লাঙল
যান্ত্রিক রূপান্তরের অবশ্যম্ভাবিতায় ।
লাল ধূলো উড়ছে কুলি-ব্যারাকের শুকনো রক্তে,
মিছিলের ঘূর্ণিশ্বাসে হোলীর আবীরমাখা বসন্ত এল!
বসন্ত এল
ব্রহ্মাবর্তে- আর্যাবর্তে- দাক্ষিণাত্যে- অঙ্গে-বঙ্গে- কলিঙ্গে।

ভারত পরিক্রমা

সূর্যের লোহা গলিয়ে ঢালাই করা এই বুকে
গরুড় বাসা বেঁধেছে।
যার অমিত সংকল্প
দুর্ভাগিনী বিনতার দাসীত্বমোচন।
মাঝে মাঝে অতিকায় আগুনের ডানা মেলে
কলকাতার ওপর দিয়ে তার মহাপরিক্রমণ
দূর-দূরান্তে, কাল কালান্তে!

নিচে পশ্চিমবাংলার বুকচেরা নদী
গঙ্গা রূপনারায়ণ দামোদর।
জ্বলন্ত রূপোর স্রোত
দিনে সূর্যের, রাতে চন্দ্রের লাবণ্যদীপ্তিতেও স্তিমিত।
কূলে কূলে
নতুন ভারত গড়ে ওঠার কর্ম-চাঞ্চল্য
বিদ্যুতে ইস্পাতে কংক্রিটে মন্দাক্রান্তা!
হাজার ঘোড়ার গতিবেগ
থর থর করে কাঁপছে আগামীর বিদ্যুদাধারে।

অসংখ্য মানুষ সেই দিনটির প্রতীক্ষা করছে
যেদিন ভারত মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে
ধনবাদী দাসত্ব-শৃঙ্খল চূর্ণ করে
স্বয়ংসৃষ্ট মহাসাম্যের প্রশান্ত-গম্ভীর মহিমায়।
ঐশ্বর্যের একাধিপত্যলোভীরা যেদিন থাকবে না,
থাকবে না অতিলোভের মহাপঙ্কশায়ী জলৌকারা,
মানবকল্যাণের সেই পরম দিনে।

অগ্নি-গরুড়ের মহাপরিক্রমা আজ তাই অশান্ত
দূর থেকে দূরান্তে
সীমা থেকে সীমান্তে
কলকাতা-দিল্লী-বম্বে-মা দ্রাজ-
কন্যাকুমারিকায়।
তার ইস্পাতের মত বজ্রকঠিন ঠোঁটে
অমৃত উদ্ধারের স্বপ্ন!
তার দুই চোখে
লোকমাতা বিনতার দাসীত্ব মোচনের বৈদূর্যমণি
ক্রান্তিকালের তন্ময়তায় জ্যোতিষ্মান।