১৯৫২ সালে আমি সাত। ক্লাশ টু। বাড়ি থেকে মাইল খানেক দূরে প্রাইমারি স্কুল। শহরের মধ্যিখানে। সেখানে পড়ি। আমাদের বাড়ির বারান্দায়, বৈঠকখানায়, উঠানে, চায়ের আসরে, ভাতের থালায়, রান্না ঘরে রাজনীতি, দেশ, স্বাধীনতা, রাষ্ট্রভাষা। বাবা তেভাগার নেতা,
জেলা সদরের ইনচার্জ, মাগ্রামাঞ্চলের মেয়েদের সংগঠনে দায়িত্বে। দুজনেই জেলখাটা মানুষ। জেলা শহরে শ্রদ্ধার পাত্র। তেভাগার কবরহয়েছে ৮/৯ বছর আগে। দেশ এখন স্বাধীন পাকিস্তান। স্বাধীনতা মানে তিনভাগ সবুজের বুকে সাদা চাঁদতারা। তো এমন আকাশ
বাতাসেআমি ভাষা আন্দোলনের গন্ধ নাকে পাব, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু তা নয়। মাকে ভাষা আন্দোলনের মিছিলের প্রথম সারিতে দেখলেও কখনো মনে হয় নি, এটা অন্য রকম বেঁচে থাকা। বা অন্য জীবন। আমি নিশ্চিন্তেএই সময় ডান্ডা-গুলি আর মার্বেল খেলা নিয়ে ব্যাস্ত থাকতাম।

পরের বছর, ১৯৫৩ সালে, কান্নাকাটি জুড়ে যখন দূরের স্কুল পিছনে ফেলে বাড়ির কাছেই হাই স্কুলে ভর্তি হলাম, তার কিছুদিন পরেই ২১ ফেব্রুয়ারি এক বড় বিষয় হয়ে উঠল আমার জীবনে। একদিন স্কুলের মাঠে পা দিতেই, উঁচু ক্লাশের নিখিলদা, যিনি স্কুলে খেলা, ব্যায়াম, দৌড়ঝাঁপ ইত্যাদিতে সেরা, আমার বুকে একটা আয়তাকার ব্যাজ সেঁটে দিলেনঃ 'রক্তাক্ত বৃহস্পতিবারকে ভুলিব না'. লাল কালিতে ছাপা। সারাদিন ক্লাশে সেটা বুকে সাঁটা থাকল। দারুণ দৃশ্য। আমাদের সবার বুকে লাল অক্ষর। খেলার মাঠে, বাথরুমে, হল ঘরে, টিফিনের সময় আমাদের সবার বুকে লাল লাল ছোপ। এই পরিণত বয়সে ঐ দৃশ্যগুলো খুব প্রতীকী মনে হচ্ছে। রাতে পড়ার শেষেও বুকে সাঁটা ব্যাজ। মেজদার বয়স তখন ১৪, এটা কী বলত? পারলাম না। লজ্জাও পেলাম না। এবার মেজদা ম্যাপ খুলে ধরলেন। বললেন সব কথা। বোঝালেন আমাদের বাবাকে কিছুদিন আগে কেনো পুলিশে জেলে নিয়ে গিয়েছে। সেই রাতে আমার রাজনীতিতে প্রবেশ ঘটে গেলো। মেজদার পাশে বসে কাঠির আগায় ন্যাকড়া বেঁধে তুলি, বাটিতে আলতার রঙ, খবরের কাগজের শিটে পোস্টার লেখা শুরু হয়ে গেলো। মেজদা একটা কাগজে লিখে দিলেন, কোন অক্ষরের পিছনে কী লিখতে হবে। মা দেখে বললেন, বাবলুকে দিয়েই লেখা, ওর হাতের লেখা সুন্দর। মা'র প্রশ্রয়, আমাকে আর পায় কে?

পাড়ার শিশু কিশোরদের নিয়ে চালু করলাম প্রভাত ফেরী। পাড়ায় গড়ে তুললাম ইঁটের ত্রিকোণ শহীদ মিনার। মোক্তার জ্যেঠিমা তাঁর জবা গাছের ডাল হেলিয়ে ধরে আমাদের পারতে দিলেন লাল টুকটুকে জবা। পাড়ার মেয়েরা ইয়া বিশাল লম্বা জবার লাল মালায় জড়িয়ে দিল শহীদ মিনার। প্রতি বছর। দিনে দিনে বাড়তে থাকে শরীর, বাড়তে থাকে একুশকে ভালোবাসা, ভাষার প্রতি অপার দায়িত্ববোধ। যে মিছিলে মা'র আঙুলের আংটায় কচি তর্জনি আঁকড়ে দৌড়ে দৌড়ে চলতাম, সেই আমি একদিন মিছিলের সামনে চলে গেলাম। স্কুল পেরুলাম। কলেজ। একুশের উদ্দীপনা অব্যাহত থাকে। বেড়ে যায় ভাষার প্রতি ভালবাসা, বেড়ে যায় বাংলার মুখের প্রতি ভালবাসা, দায়িত্ববোধ। বাংলার মুখ গ্রামের সজীবতায় যতটা, আবালবৃদ্ধবনিতার জীর্ণতায়, দারিদ্র্যেও ততটাই দেখতে পাই। সে মুখ শহরের অ্যাসফল্টে, সে মুখ গ্রামের মাঠে, নদীর বুকে, বাজারের শোরগোলে। একুশ ক্রমশ আমার ভেতরে বাঙালি থেকে মানুষ হবার তাগাদা তৈরি করতে থাকে। ভাষা আমার রক্তে সুর তুলতে থাকে।

একসময় বাংলাদেশের স্বাধীনতার যুদ্ধ পাল্টে দিল সব। একুশের ভাষা রক্ষার প্রত্যয় বদলে গেল দেশ রক্ষার মহান ব্রতে। একুশ আটকে গেল সাংস্কৃতির স্বাধীনতা উৎসবে। আর ১৬ ডিসেম্বর সামনে এল রাজনৈতিক স্বাধীনতা দিবসের বিশালত্ব নিয়ে। ২১ এখন স্মৃতিমেদুর গান গায়, ১৬ বীরদর্পে কুচকাওয়াজ করে বাঙালির পদক্ষেপে পৃথিবী জুড়ে দামামা বাজাতে। এ ছবি ওপারের। এপারে?

এরপর এপারের বাংলায় একুশ এলো প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষে সরকারী মদতের ঢেউয়ে চেপে। সেটা আশির শেষার্ধ ও নব্বুই দশকের শুরুর সময়। বাংলায় এক সময়ের ভিয়েতনাম বিরোধী আন্দোলনের নায়ক, পরবর্তিতে তথ্য মন্ত্রী এবং কিছুদিনের মধ্যেই বাংলার মুখ্যমন্ত্রীর পদে বৃত ব্যক্তি, চলমান সরকার-বিরোধী প্রচারের মুখ বন্ধ করতে নতুন নীতি গ্রহণ করলেন। বাংলার সাহিত্য ও সংস্কৃতির ধারাগুলোকে তোষণ করে সরকার বিরোধী সমালোচনার ঝড় স্তিমিত করার ব্যাবস্থা করলেন। বুদ্ধিজীবী মহলে আন্তর্জাতিক মানসিকতা নামিয়ে আনলেন তলানীতে। বামপন্থী মানসিকতার যে লড়াকু মুঠি তা করলেন শিথিল। বাংলার সমগ্র পটভূমি জুড়েই সাফল্যের সঙ্গে প্রোথিত হল এই নতুন বীজ। বুদ্ধিজীবীর দল গণতান্ত্রিক চেতনা থেকে অজান্তেই সরে গিয়ে একমুখীনতার ভয়ঙ্কর পথে পা বাড়ালেন আশ্চর্য অন্ধতায়।

এই সময়েই গড়ে উঠল নগর ভিত্তিক সাহিত্য-সংস্কৃতির রাজ্য আকাডেমিগুলো। আলাদাভাবে গড়ে তোলা হল লোক সংস্কৃতির প্রতিষ্ঠানগুলি। নানা অনুষ্ঠানের অন্যতম অনুষ্ঠান হয়ে উঠল, ২১ ফেব্রুয়ারি উদযাপন। অনুষ্ঠানে গান বাজনা বক্তৃতা, সেমিনার সব যুক্ত হল। দু দেশের বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে সাহিত্যিক সাংস্কৃতিক আদান-প্রদান্ও শুরু হল। দল বেঁধে এপার বাংলার লেখক কবিরা বাংলাদেশে একুশ উদযাপন করতে যান অবশ্য ওপারের কতজন এপার বাংলায় আসেন, আমার জানা নেই। সেই থেকে সাম্প্রতিক কাল অবধি ২১ উদযাপিত হয়ে আসছে, অনুষ্ঠান হয়। তবে ইতিহাস থাকে কবরেই। ফলে প্রাণ পায় না এপারের একুশ-স্মৃতি, আবেগ ধায় না বুক থেকে আগল খুলে। স্বাভাবিক, এপারের একুশের জন্ম তো আর ভাষার প্রতি ভালবাসার বাগানে ফোটেনি!

'সাম্প্রতিক কাল' বললাম এই কারণে, গত কয়েক বছর ধরে একুশকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে চিহ্নিত করে, এপার বাংলায় এখন একুশে বাংলার লেখকদের অস্তিত্ব রক্ষার মৌখিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে মাত্র।