সদ্য বৃষ্টি-ভেজা রাস্তাকে বরাবরই ভীষণ অন্তরঙ্গ মনে হয়। একটা মোড় ক্রস করার সময় যে জলের ফোঁটা পড়ল আর একটা মোড়ে গিয়ে শেষ হয় তার ইনভার্টেড কমা। গলা জড়ানো বিকেল বা কলপাড়ের অন্তরঙ্গতায় মন একটু এঁটো হয়ে যায়। অফিস যাওয়ার সময় যে মেয়েটি কলতলায় ছিল ফেরার সময়ও যদি তাকে দেখি তো দৃশ্যটার সাথে একান্ত কথোপকথন শুরু হয়--

- কোথা থেকে ফিরছ ?
- অফিস থেকে
- রোজ যেতে হয় ?
- হ্যাঁ ...
- কি কর অফিসে ?
- এই .. সবাই যা করে .. ছুটির অপেক্ষা ..

শুনে কলতলা হেসে ফ্যালে। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই হাসতে থাকে। বসা বা হাঁটার অভ্যাস নেই ওর। আমি একটু সমস্যায় পড়ে যাই .. সিগারেট খাওয়ার ইচ্ছে হচ্ছে কিন্তু বসতে পারছি না। সেদিনের মত ওকে বাই বলে চলে আসি। কিন্তু মনে মনে ভাবতেই থাকি- রোজকার অফিস নিয়ে আমি এত বিরক্ত .. ও তো দিব্য আছে ! যখন সময় হচ্ছে জল দিচ্ছে, লোকজন আসছে-যাচ্ছে।

পরদিন প্রিন্সেপ ঘাটে একা একা বসে আছি। ডেকে নেই ওকে। জিজ্ঞেস করি .. ও কেন বিরক্ত হয় না ? হেসে বলে--

- ডায়ালগ ..
- ডায়ালগ !
- হুঁ .. একদম
ইমোশন, বিরক্তি, খুশি, আনন্দ- কোন একটি নির্দিষ্ট চিন্তা বা বক্তব্য-- এদের সাথে আমরা
ডায়ালগই চালাতে পারি। আর কোন এক্সপ্রেশন হয় না ... ঐ যে মেয়েটি আমার কাছে জল নিতে আসে-- তার জল নেওয়া, স্নান করায় স্থান-কাল ইনভার্টেড কমার মত ফিক্সড হয়ে গেছে। বাকি যা চলছে তা হল ইনভার্টেড কমাকে লক্ষ্য করে তোমার ডায়ালগ।

স্বাভাবিক মানুষের কাছে ডায়ালগ হল কথোপকথন। যার সম্ভাবনার ডোরবেল নেই তার কাছে এই হল এক্সপ্রেশন-- যেখানে চিতকে হেলান দেওয়ার জন্য বাতের গা খুঁজতে হয় না। এই মোডে অনেক ভারমুক্ত থাকা যায়, শর্তহীন হয় প্রকাশ। শিল্পের ক্ষেত্রে শর্তহীনতা এক বহুমুখী সম্ভাবনাকে উন্মুক্ত করে। শব্দের যখন অর্থ নেই, ইমেজ দিয়ে যখন নির্দিষ্ট প্রতিরূপ উপস্থাপন করার প্রশ্ন নেই-- তখন ইনভার্টেড কমা, মুক্ত ডায়ালগ, কিছু উল্লেখ সম্ভাবনার সামনে দাঁড় করায়।

ধরা যাক কোন ফিল্মে পরিচালক আবহমান সংস্কৃতির আলেখ্য তৈরি করতে চান। কোন কাহিনী হয়ত আছে কিন্তু সেটা পরিচালকের মূল লক্ষ্য নয়। তিনি ছবিটিকে দেখতে চান বর্তমান সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের দলিল হিসেবে। কিন্তু চলচ্চিত্র তো দলিল লেখার স্থান নয়। সে তো গদ্যের জায়গা। তখন সেই চলচ্চিত্র পরিচালক কি করবেন ? কিভাবে তাঁর ছবি হয়ে উঠবে-- an essay on contemporary culture ? ঋত্বিক ঘটক অবিভক্ত কম্যুনিস্ট পার্টির কালচারাল ফ্রন্টের উপর একটা থিসিস লিখেছিলেন-– ভারতবর্ষের কম্যুনিস্ট পার্টির কালচারাল ফ্রন্টের ভূমিকা ও কর্মকাণ্ড কেমন হবে ? আজ সেটা পুস্তকাকারে পাওয়া যায়। কিন্তু সেই অর্থে তাঁর ‘কোমল গান্ধার’ হল an essay on contemporary Bengali culture। গণনাট্য আন্দোলন-- তার অভ্যন্তরের তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব-বিরোধ, অগ্নিযুগের প্রতি-তুলনা, শকুন্তলা নাটক-- প্রকৃতি-মানুষ-ভারতীয় সংস্কৃতি নিয়ে রবীন্দ্রনাথের সেই তাত্ত্বিক অবস্থান-- এসব তো ছিলই। কিন্তু ছবি জুড়ে এত গান কেন ? গণনাট্যের গান, রবীন্দ্রসঙ্গীত, বাংলা আধুনিক গান থেকে লোক সঙ্গীত ! শেষে কি না দেবব্রত বিশ্বাসকে দিয়ে অন স্ক্রিন-– ‘সুরে আসমান ...’ ! কেমন যেন মনে হয় ঋত্বিক এই ‘সুরে আসমান ...’ দিয়ে বাংলা সংস্কৃতির এক ধারাবাহিক সুরের উল্লেখ করতে চেয়েছিলেন। আর সেই উল্লেখ করতে গিয়ে ঋত্বিককে গল্প বলার প্রথাকে কিছুটা সরিয়ে রেখে গল্পের ডাইজেটিক লাইনের উপর কিছু ভার্টিক্যাল ইন্টারসেপশন রাখতে হয়েছিল – শুরুর বিয়ের লোকগীতি। পার্টিশন ট্রিলজির একটি ছবি বলে উল্লেখ করা হয় ‘কোমল গান্ধার’-কে। কিন্তু ‘কোমল গান্ধার’ যেন বাঙালীর সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, সেই ঐতিহ্যের যে অন্তর্নিহিত মিলনের সুর আর তার মধ্য দিয়ে ইয়োরোপীয় জাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা ভারতীয় নেশন-স্টেট তত্ত্বের সমালোচনামূলক এক চলচ্চিত্র-প্রবন্ধ। আর সেই চলচ্চিত্র-প্রবন্ধ রচনাকার ঋত্বিক কুমার ঘটক ‘কোমল গান্ধার’-এ যে কাজটা করছেন তাকে আমি ডায়ালগ বলব-- ফিল্মের সাথে গদ্যের এক অন্তরঙ্গ ডায়ালগ।

‘ব্রেদলেস’ দেখুন। অস্তিত্ববাদ ও তৎকালীন ফরাসী সমাজের অন্তঃসারশূন্যতার উপর গোদারের উইটি কমেন্ট বলে মনে হতে পারে। কিন্তু চিরাচরিত প্রবন্ধের মত দৃঢ় সংঘবদ্ধ নয়। বরং অসংখ্য ইনভার্টেড কমা অবহেলায় ছড়িয়ে রাখা এক ওপেন এন্ডেড কনভারসেশন--- যা কাহিনীকে ছলনা করে, ছলনা করে দর্শন অভিজ্ঞতাকে, সে তখন কবিতার স্বজন।

যখন কোন লেখন-শিল্পী চলচ্চিত্রের সাথে এই অন্তরঙ্গতা পাতাবেন .. কেমন হবে তাঁর ডায়ালগ ? কবিতা সম্ভাবনার উন্মুক্ত দুয়ারে অবস্থান করে-- লিপিত কবিতা থেকে পাঠকের কবিতা এবং সেখান থেকে আরও ব্যাপ্তিতে তার বিচরণ। এই ওয়ান-টু-ওয়ান কম্যুনিকেশন মাথায় রেখে কবিতাকে একটি পার্সোনাল মিডিয়াম বলা যেতেই পারে। অবশ্য ব্যাপকতর অর্থে যেকোনো মাধ্যমই শেষ পর্যন্ত পার্সোনাল। কোন শিল্পীই জনগণের সাথে কম্যুনিকেট করেন না-- বা বলা যেতে পারে জনগণ সেখানে সমষ্টিসূচক মাত্র, অনেকগুলো ফ্ল্যাট নিয়ে যেমন ফ্ল্যাটবাড়ি। কিন্তু ফিল্ম একটি মিশ্র-মাধ্যম। আর তার ভিউয়িং এক্সপেরিয়েন্সটা ভেবে দেখুন-- অন্ধকার পেক্ষাগৃহে একটা লার্জার দ্যান লাইভ পর্দায়, ডলবি ডিজিট্যাল সারাউন্ড সাউন্ড ... এমনকি থ্রি ডি অবধি। এই এতকিছুর যোগফল কি কোন লেখন-শিল্পীকে বিস্তৃত, বহুস্তরীয় কম্যুনিকেশনের দিকে আকর্ষিত করে না ?

কলিকাতা পুস্তকমেলা, জানুয়ারি ১৯৯৫—প্রকাশিত হয়েছিল ‘গিনিপিগ একটি তথ্যচিত্র’। বারীনদা (ঘোষাল)-র ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ একটি কাজ। বইটি যখন প্রকাশিত হচ্ছে তখনও আমি মাধ্যমিক পাশ করিনি। আর বইটা যখন হাতে পেলাম তখন এম.এ. পাশ করে গেছি। নাম দেখেই চমকে যাই ... তথ্যচিত্র ! পাতা উলটে প্রজেক্টটা বোঝার চেষ্টা করি .. প্রকাশকের কলমে কমল চক্রবর্তী লিখেছেন—

“গত বর্ষার এক সন্ধ্যায় কবিকে বলি, মাস খানেকের মধ্যে চল্লিশটি নতুন কবিতা দেওয়া সম্ভব !
আত্মমগ্ন সে মাত্র কুড়ি দিনের মাথায় এই অসামান্য শব্দ-স্বাতন্ত্র্য নির্মাণ করে। আশ্চর্য !”

প্রকাশক কবিতা লিখতে বলেছিলেন। লেখক নির্মাণ করলেন শব্দ-স্বাতন্ত্র্য (কবিতা নয়)। তার নাম ‘গিনিপিগ একটি তথ্যচিত্র’ ! সাব হেডে জ্বলজ্বল করছে—“a collection of theoretical polemics by Barin Ghoshal” ! তবে কি কবিতা-গদ্য-ফিল্ম নিয়ে এক প্রজেক্ট ? ডকুমেন্টারি শব্দটা তাড়িয়ে নিয়ে গেল কবিতা ও ফিল্মের দিকে। ভেবে বসলাম ফিল্মের টেকনিক নিয়ে কবিতার কোন কাজ/প্রজেক্ট। তারপর যখনই বইটা পড়েছি কেবলই মনে হয়েছে সময়ের থেকে এগিয়ে থাকা এ’রকম একটা প্রজেক্টকে জাজ করা, তার নেম ট্যাগিং করা অসম্ভব। লেখকও হয়ত তা চাননি। এ যেন একজন লেখন-শিল্পী (কেবল কবি নয়) ফিল্মের সাথে অন্তরঙ্গ ডায়ালগে মেতেছেন। স্বীকার করছেন, করছেন অস্বীকার আর সেখান থেকে ছিটকে বেরোচ্ছে কবিতা।

কেমন হয় যদি বই প্রকাশের ১৮ বছর পর গিনিপিগ নিয়ে আড্ডায় বসা যায় ? বারীনদা, গিনিপিগ কি প্রকৃত প্রস্তাবে তথ্যচিত্র ? উত্তরে কি বলতে পারেন সোনারি ওয়েস্ট লে আউটের ঐ বাসিন্দা ?