. জুলাই ১৮৭১, প্যারি

Debout, les damnés de la terre
Debout, les forçats de la faim
La raison tonne en son cratère
C'est l'éruption de la fin…

(Stand up, damned of the Earth
Stand up, prisoners of starvation
Reason thunders in its volcano
This is the eruption of the end).


সিন নদীর পারে সেবারের জুলাইটা ছিল সত্যিই অন্যরকম। ইউজিন, তোমার কি মনে পড়ে? জুলাই বরাবরই এই ফরাসী দেশে ভিন্ন আভা, ভিন্ন দীপ্তি নিয়ে আসে। প্রায় পৌনে একশ বছর আগের জুলাইয়ের চোদ্দ তারিখের গল্পটা পিতামহ পিতামহীরা শোনায় নি কি? দিকে দিকে খবর রটে গেছিল যে বাস্তিল দুর্গের উপর কামান থেকে গুলি ছোঁড়া হবে সাধারণ, নিরস্ত্র মানুষের উপর। আর সে খবরে এত দিনের ক্ষুধার্ত, ক্লান্ত ও বিপন্ন মানুষ যত ভয় পাবার বদলে বরং উল্টো হঠাৎই অতিকায় দৈত্যের মনের জোর নিয়ে ছুটলো সো-জা বাস্তিল দুর্গ বরাবর। ১৪ই জুলাইয়ের দু’দিন আগেই রাজা ভার্সেই থেকে সৈন্যবাহিনী নিয়ে এসে জনতার উপর আক্রমণ চালিয়েছিল। জনতাও এর উত্তরে সাথে সাথেই পাল্টা আক্রমণের জন্য প্রস্তÍত হয়ে গেছিল। শহরের ঘণ্টা বেজে উঠলো। জনগণের পক্ষ থেকে সতর্ক ঘণ্টা। জনতা দরকারে রাষ্ট্রীয় অস্ত্রভা-ারও দখল করতে প্রস্তÍত। একটি গার্ড রেজিমেন্ট জনতার পক্ষে অবস্থান নিল। ঠিক তার দু’দিন পরেই অর্থাৎ চোদ্দ তারিখেই যেই না খবর রটলো যে বাস্তিল দুর্গ থেকে মানুষের দিকে গুলি ছোঁড়া হবে, অমনি সব ধেয়ে গেল দুর্গ বরাবর। তারপর বাকিটা ইতিহাস। গিলোটিনে অভিজাতদের মাথা। লিবার্তে-ফ্রাতের্নিত� �-ইগালিতে...সাম্য-মৈত্রী -স্বাধীণতা...মানুষ স্বাধীণ হয়েই জন্মায়...তথাপি সে সদা শৃঙ্খলিত! তবু, ইউজিন...যেমনটা তোমার পিতামহ বলতেন আর এ-ও জানা কথাই...প্রতিটা বিপ্লবের পরই আসে একটি করে প্রতিবিপ্লব...হাজার অন্যায়ের প্রতিবাদেও কারখানায় শ্রমিক ধর্মঘট করতে পারত না। নারী রয়ে গেল আগের মতই নিরক্ষর, গৃহকর্মের দাসী। তবে বিপ্লবটা কোথায়? তবু ১৭৯২ থেকে ১৮৭০...গুনে গুনে ৭৮টা বছর পরে আবার এই জুলাই...সে যেন একইসাথে রক্তবর্ণ অথচ পিঙ্গলাভ মেঘ, যা যে কোন ঝড়ের আগে দেখা যায়।

‘আমাদের প্রেসিডেন্ট মানে লুই বোনাপার্ট হঠাৎ জার্মানী আক্রমণ করতে গেলেন কেন? ইউজিন, তোমার কি মনে হয়?’
সিন নদীর পাড়ে ছোট ছোট কাফেতে তাদের আড্ডা জমতো। বন্ধুদের ভেতর ক্ষুদে দোকানী, শ্রমিক, ছাত্র, পত্রিকায় লিখিয়ে কিম্বা ইউজিনের মত একই সাথে গোপণ বিপ্লবী দলের সভ্য আর পিয়ানো স্কুলের বয়ষ্ক ছাত্র সবাই বসতো।
‘কি আর মনে হবে? প্রেসিডেন্ট নিজের এন্তার দুর্বলতা ঢাকতে প্রতিবেশী দেশ আক্রমণ করে জাতীয়তাবাদী উন্মাদনা সৃষ্টি করতে চাইছে। নিজের জনপ্রিয়তা বাড়াতে চাইছে।’
‘সেটাই হবে। নয়তো হঠাৎই পড়শি দেশের সাথে এমন যুদ্ধ ঘোষণা কেন?’ স্যুপের বাটিতে চামচ ডোবায় জাঁক।
‘যুদ্ধের হম্বি-তম্বির আভাস অবশ্য প্রেসিডেন্ট সেই ডিসেম্বর মাস থেকেই দিচ্ছেন। আর শ্রমিকেরা, লে পতি বুর্জোয়াজি বা ক্ষুদে বুর্জোয়া শ্রেণী সবাই এই যুদ্ধের প্রতিবাদই করছে। তবু প্রেসিডেন্ট অনড়। তার মতলব যে কি?’ মাথা চুলকাতে চুলকাতে বলে লেদার কারখানার শ্রমিক পিয়ের।
‘আজ ত’ ১৫ই জুলাই। বারো তারিখের লিফলেটটি দেখেছ? কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশনালের লিফলেট?’ ইউজিন পেতিয়ে বলে তার শরতের আকাশের মত স্বচ্ছ, নীল দুই চোখ তুলে।
‘তা’ আর দেখি নি বলতে?’ পিয়ের তার কোটের পকেট থেকে একটি দোমড়ানো, ছাপানো কাগজ বের করে, চোখের সামনে নাচিয়ে পড়তে থাকে,

‘ইউরোপীয় শক্তি-সাম্য রক্ষার অজুহাতে, জাতীয় সম্মান রক্ষার অজুহাতে, বিশ্বশান্তি আর একবার রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্খায় বিপন্ন। ফরাসী, জার্মান, স্পেনীয় শ্রমিক, আসুন আমরা গলায় গলা মিলিয়ে একযোগে যুদ্ধকে ধিক্কার জানাই। ...রক্তক্ষয় থেকে নিজেদের গা বাঁচিয়ে জনসাধারণের দুর্দশায় নতুন ফাটকা খেলার সুযোগ দেখে যারা যুদ্ধ ঘোষণা করছে, আমরা তাদের প্রতিবাদ করছি। আমরা চাই শান্তি, কাজ ও স্বাধীনতা। জার্মানীর ভাইয়েরা! আমরা বিভক্ত হয়ে পড়লে রাইনের দুই তীরেই স্বৈরাচারের পরিপূর্ণ বিজয় ঘটবে। ভাড়াটে প্রচারকদের প্রচারকে ফ্রান্সের সত্যিকার ইচ্ছে বলে ভুল করবেন না।’

যুদ্ধে কিন্ত হেরে গেল ফ্রান্স। জার্মানীর সেনাবাহিনী সীমান্তের ওপারে আলসেস ও লরেন জয় করে নিল।
হায়, সেদানে ৩য় নেপোলিয়ানকে আত্মসমর্পণ করতে হলো আশি হাজার সৈন্য নিয়ে। সেটা সেপ্টেম্বরের ২ তারিখ, তাই না ইউজিন? প্যারির বড়লোক অভিজাতশ্রেণী নয়, ছোটলোক শ্রমিকরাই তখন দেশ রক্ষায় জাতীয় রক্ষীবাহিনীতে নাম লিখাতে দলে দলে ছুটলো। ২রা সেপ্টেম্বর স¤্রাটের ভিন দেশের কাছে আত্ম সমর্পনের পর সারাদিন পার্লামেন্টের বড়লোক সদস্যরা চুপ করে থাকলো। সন্ধ্যা থেকেই সংসদ ভবনের বাইরে মানুষ জমায়েত হতে থাকলো- ‘প্রজাতন্ত্র দীর্ঘজীবী হোক!’ ৪ঠা সেপ্টেম্বর সকাল থেকেই রাজধানীর রাস্তায় বিরামহীন মানুষের ঢল। অস্ত্র হাতে শ্রমিকেরা দখল করে ফেলেছে টাউন হল। রাজতন্ত্রের অবসান ঘোষণা করে প্রজাতন্ত্রের কথা বলা হলো।

.
Du passé faisons table rase
Foule esclave, debout, debout
Le monde va changer de bas
Nous ne sommes rien, soyons tout
: C'est la lutte finale
Groupons-nous, et demain
L'Internationale
Sera le genre humain
(Of the past let us make a clean slate
Enslaved masses, stand up, stand up.
The world is about to change its foundation
We are nothing, let us be all.
: This is the final struggle
Let us group together, and tomorrow
The Internationale
Will be the human race).

কত বড় ভুল তোমরা করেছিলে ইউজিন! কেন বুর্জোয়াদের এতটা বিশ্বাস করলে? সশস্ত্র শ্রমিকদের গড়া ‘জাতীয় প্রতিরক্ষার সরকারে’ও কেন অভিজাত অর্লিয়ান্সীদের তোমাদের রাখতে হলো? আসলে এটা চোদ্দ পুরুষ ধরে অভিজাতদের হাতে শোষিত হয়েও তাদের প্রতি বিষ্ময় মাখা শ্রদ্ধার উত্তাধিকার। অথবা নিজেদের উপর পুরো ভরসাটা রাখতে না পারা। আরো কি মারাত্মক বোকামি! ধনিক অর্লিয়ন্সবাদীদের হাতে নিজেরাই তুলে দিলে ক্ষমতার মূল ঘাঁটি। সেনাবাহিনী আর পুলিশ আর শ্রমিক বা খেটে খাওয়া মানুষদের হাতে পড়লো যত বক্তৃতা দেবার দপ্তরগুলো। অভিজাতরা ত’ তলে তলে ভয়ানক সেয়ানা। বিসমার্কের সৈন্যবাহিনী ধেয়ে আসছে ফ্রান্সের রাজধানী বরাবর। শহরের অসংখ্য ক্ষুধার্ত, সাধারণ নর-নারীকে তারা বুঝ দিচ্ছে খুব শক্তভাবেই শত্রুর সাথে লড়া হবে। কিন্ত, মোটেই অভিজাতরা আত্মরক্ষার প্রস্তÍতি নেয় নি। প্রজাতন্ত্রী সরকারের শ্রমিকদের সাথে মিলে-মিশে থাকার চেয়ে তারা ভিনদেশী বুর্জোয়া, জার্মান জেনারেলদের দাসত্ব করাটা শ্রেয়তর জ্ঞান করেছিল। নগররক্ষার কাজে শহরতলির দুই লক্ষ নি¤œ আয়ের মানুষকে কাজে না লাগিয়ে উল্টো কর্তৃপক্ষ তাদের নিয়ে এলো শহরের ভেতরে। সেপ্টেম্বরের ১৯ তারিখ জার্মান সৈন্য পৌঁছে গেল রাজধানীতেই। শুরু হলো প্যারি অবরোধ। অভিজাত ফরাসী সরকার লোক দেখানো দু’একটা মেকি ‘যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা’ খেললেও সে ত’ মেকি খেলাই। তু্যঁলো আর স্ত্রাসবুর্গের ততদিনে পতন হয়েছে। প্যারির কুড়িটা মহল্লার শ্রমিকদের পক্ষ থেকে তোমরা তখন মিউনিসিপ্যাল নির্বাচনের জন্য প্যারির মেয়র জুল ফেরির কাছে দাবি তুলছো। বলছো, এক্ষুণি কমিউনের নির্বাচন দিতে হবে, প্যারিকে রক্ষার ভার প্যারির মানুষের উপরই ছেড়ে দিতে হবে। অভিজাতরা কি সেই দাবি শোনে? ৩১ শে অক্টোবরের সকালে এলো সেই ভয়ানক দু:সংবাদ। প্যারির উত্তর-পূর্ব দিকের গ্রাম ‘বুরজেৎ’ জার্মানীর অধিকারে চলে গেছে। সে যেন ছিল তোমাদের যৌবনের প্রতি নিদারুণ বিদ্রুপ, সহসা বজ্রপাত, তাই না ইউজিন? প্যারিতে সেদিন খুব বৃষ্টি হচ্ছিল। সেই বৃষ্টির ভেতরেই তোমরা টাউন হলের ভেতরে ঢুকে সরকারের অভিজাত সদস্যদের বন্দী করে ফেললে। কিন্ত রাত তিনটা নাগাদ...ঘণ্টা বারোর ভেতরেই বুর্জোয়াদের একটা ব্যাটালিয়ন জনতার হাতে বন্দী মন্ত্রীদের মুক্ত করে ফেললো। আর জনতার হাত থেকে মুক্তি পেয়েই অভিজাতরা জানালো তারা তোমাদের মানে শ্রমিকদের কোন দাবিই পূরণ করবে না।


জার্মানদের অবরোধে হু হু করে বাড়তে থাকলো ক্ষুধা। দেখতে দেখতে ঘোড়ার মাংসও দূর্লভ হয়ে উঠলো। খাবারের অভাবে কুকুর, বেড়াল, ইঁদুরের মাংসও খাওয়া শুরু হলো। দেখা দিল মেয়েদের অনাহার ভাতার বিরাট বিরাট লাইন। মায়েদের শুকনো বুকে বাচ্চারা মরে পড়ে রইতে লাগলো। ফরাসীপক্ষের অভিজাত জেনারেল ত্রশ্যু যুদ্ধের ভান করতেই লাগলেন। এসব যুদ্ধে শ্রমিক সৈন্যরা না পেল কম্বল, না তাঁবু কি নিদেনপক্ষে একটি এ্যাম্বুলেন্স। লাশ আর কঙ্কালের শহর হয়ে উঠলো প্যারি, তাই না ইউজিন?
জানুয়ারির ছয় তারিখ নাগাদ তোমরা, পারির শ্রমিকেরা, ‘লাল প্ল্যাকার্ডে’ সরকারের অবসান ও কমিউনের দাবী জানালে। শ্রমিক নেতা ফ্লুঁরাসকে গ্রেপ্তার করলো অভিজাত সরকার। শ্রমিক বস্তিগুলোয় অভিজাত সরকারের নাম হলো ‘একদল জুডাস।’ জুডাস কি সেই বিশ্বাসঘাতক নয় যে স্বয়ং যিশুকে ধরিয়ে দিয়েছিল? ফ্লুঁরাস সহ অন্য শ্রমিক নেতাদের অবশ্য দ্রুতই জেল থেকে ছাড়াতে পারলো শ্রমিকেরা। তারপর? এলো ২ শে জানুয়ারীর ভয়াল সন্ধ্যা। সরকারের পেটিবুর্জোয়া বাহিনীর সাথে লড়াইয়ে ১২জন শ্রমিককে গ্রেপ্তারের পর ১২ জন গ্রেপ্তার হলো, খুন হলো ত্রিশ জন। এর পরপরই গ্রেপ্তারের সংখ্যা আরো বাড়লো। ৮৩ জন গ্রেপ্তার হলো। সমাজতন্ত্রী সংবাদপত্রগুলো বন্ধ করে দেওয়া হলো। ২৮শে জানুয়ারী জার্মানীর কাছে প্যারির আত্মসমর্পন। বিসমার্কের শর্তমতে যদিও আট দিনের ভেতরেই জাতীয় পরিষদে নির্বাচন দিতে রাজি হলো অভিজাত ফরাসী সরকার, সেই নির্বাচনে ছিল মস্ত বড় ‘শুভঙ্করের ফাঁকি।’ নানা কলাকৌশলে ৭৫০-এর ভেতর ৪৫০-ই হলো রাজতন্ত্রী। বোর্দোতে প্রথম দিনের আইনসভা অধিবেশনেই গ্যারিবল্ডির মত সাধারণ মানুষের নেতারা বুঝলেন পদত্যাগ ছাড়া রাস্তা নেই। বড়লোকদের হাতেই সব সংবাদপত্র। শ্রমিক সৈন্যদের বাহিনী রক্ষীবাহিনীর ভাতা বন্ধ হলো, তাই না ইউজিন? শ্রমিকদের বকেয়া সব বাড়িভাড়া একবারেই আদায়ের কথাও শোনা গেল।
Il n'est pas de sauveurs suprêmes
Ni Dieu, ni César, ni tribun
Producteurs, sauvons-nous nous-mêmes
Décrétons le salut commun
Pour que le voleur rende gorge
Pour tirer l'esprit du cachot
Soufflons nous-mêmes notre forge
Battons le fer quand il est chaud
: C'est la lutte finale
Groupons-nous, et demain
L'Internationale
Sera le genre humain
(There are no supreme saviours
Neither God, nor Caesar, nor tribune.
Producers, let us save ourselves,
Decree the common salvation.
So that the thief expires,
So that the spirit be pulled from its prison,
Let us fan our forge ourselves
Strike the iron while it is hot.
: This is the final struggle
Let us group together, and tomorrow)

হ্যাঁ, এই গানের...অমরত্ব ও আশার এই গীতিকবিতা তুমিই রচনা করেছিলে, ইউজিন! যখন ২৫শে মার্চ সকালে গোটা প্যারি জেগে উঠেছিল ড্রামের শব্দে। শ্রমিকদের জাতীয় রক্ষীবাহিনী মার্চ করে এগোলো ফরাসী বিপ্লবের স্তম্ভের সামনে। ধীরে ধীরে গোটা প্যারি যেন ভেঙ্গে পড়লো সেখানে: ‘ভিভরে দো লা রিপাব্লিক! (প্রজাতন্ত্র দীর্ঘজীবী হোক)!’ হাজার মানুষের ভেতর থেকে কে যেন একজন একটি লাল পতাকা নিয়ে এসে স্মারক স্তম্ভের উপর উঠে স্বাধীনতার প্রতিমূর্তির মাথায় উড়িয়ে দিল লাল পতাকা। হৈ চৈ করে চিৎকার করে উঠলো সবাই আনন্দে।

. ‘এই ফাঁসি ফাঁসি চাই-রাজাকারের ফাঁসি চাই!’
‘একটাই দাবি-ফাঁসি!’
‘তোমার আমার ঠিকানা- পদ¥া-মেঘনা-যমুনা!’
‘তোমার আমার ঠিকানা-শাহবাগের মোহনা!’
গত ৫তারিখ থেকেই বন্ধুরা তাকে সমানে টেক্সট মেসেজ করছিল শাহবাগে আসার জন্য। জাদুঘরের সামনে মানব-বন্ধন। যুদ্ধাপরাধী কাদের মোল্লার ফাঁসি না দিয়ে যাবজ্জীবন কারাদ- দেওয়ার প্রতিবাদ। বেয়াল্লিশ বছর পর খোদ মুক্তিযুদ্ধের সরকার কিনা নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি দিয়ে যুদ্ধাপরাধের বিচার শুরু করে এই বিচারের হাল? এক মিরপুরেই সাড়ে তিনশো মানুষ খুন করেছে এই কাদের মোল্লা একাত্তরে। হত্যা করেছে কবি মেহেরুন্নিসা সহ কত অসহায় নর-নারীকে! ধর্ষণ করেছিল মোমেনা নামে একজনকে। লোকে তাকে ডাকত ‘কসাই কাদের।’ তাকে যাবজ্জীবন দেওয়া মানে? সরকার কি জামাতে ইসলামীর সন্ত্রাস ও সহিংসার হুমকির কাছে আগাম নতি স্বীকার করে বসলো? মুস্কিল হলো কিছুদিন হয় দীপায়ণের ফেসবুক একাউন্ট তারই ভাইয়ের ছেলে কি একটা কায়দায় বন্ধ করে বিদেশ চলে গেছে। এটা সাধারণ ডি-এ্যাক্টিভেশন না। চাইলেই আবার এ্যাক্টিভেট করা যায় না। মজার ব্যপার হলো দীপায়ণের অনুরোধেই এটা করা হয়েছিল। তাদের অফিস আগামী মাসে একটি আন্তর্জাতিক ওয়ার্কশপ করতে যাচ্ছে। ওয়ার্কশপের দু’টো পেপার লেখার দায় তার ঘাড়ে। ফেসবুক খোলা থাকলে এত বেশি সময় যায় যে কাজ হতে চায় না। এজন্যই ফেসবুক বন্ধ করা হয়েছিল। অথচ শাহবাগে নাকি নানা কিছু ঘটছে। অফিসের চাপে কৌতুহল সত্ত্বেও গত তিন দিন সে শাহবাগ যেতে পারে নি। তবে পত্র-পত্রিকায় আসছে ছেলে-মেয়েগুলো নাকি বাড়ি ফেরে নি। অল্প যে কয়টা মানুষ হাতে প্ল্যাকার্ড নিয়ে পাঁচ তারিখ শাহবাগ চত্বরে জমা হয়েছিল তারা নাকি আর ঘরে ফিরে যায় নি। বরং একটু একটু করে সংখ্যা বাড়ছেই তাদের। বলে কি? এদিকে বন্ধুদের ফোনে রীতিমতো রাগ-দু:খ-অভিমান প্রকাশ পাচ্ছে।
‘বাপরে! আমাদের বোহেমিয়ান দীপায়ণ কিনা এখন এত মন দিয়ে চাকরি করছে। এদিকে আমরা রাত জাইগা, গলা ভাইঙা, এক জামায় তিন রাত্রি পার করলাম! খাওয়া-দাওয়ার ঠিক নাই, গোসল নাই...মেয়েরা পর্র্যন্ত দিন-রাত্রি শ্লোগান দিচ্ছে...এক কাপড়ে তিন রাত্রি থাকতেছে আর তুই...আচ্ছা, রাত্রিতে থাকার দরকার নাই। লেখার হাতটা আল্লায় দিছে...একটু আইসা দেইখা যাইয়া ফেসবুকে লেখলেও ত’ হয়!’
শুক্রবার সকালে তাই বাসা সেই মেরুল বাড্ডা থেকে ¯œানÑখাওয়া সেরে, বের হয়ে শহরের এদিকটা আসতে আসতেই দুপুর একটা বেজে গেল? একি শাহবাগের মোড়েই কেন তাকে থামিয়ে দিল স্কুটার? হেঁটে যেতে হবে? এত মানুষ হয়েছে নাকি? আরে, ভিড় ত’ গিজগিজ করছে! কি মুস্কিল! এখন মধ্যদুপুর। ভিড়ের ভেতর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে যাদুঘরের সামনে আসতে আসতেই সে দ্যাখে চারপাশে শুধু মানুষের মাথা। চতুর্দিক থেকে এই ব্যস্ত মহাসড়কের সব ক’টি পয়েন্ট বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। বিশাল একটি লাল সবুজ পতাকা পত্পত্ করে উড়ছে। আর একপাশে শহীদ জননী জাহানারা ইমামের ছবি। বিপুল ভীড় পিঁপড়ার মত সাবধানে পায়ে এগোতে এগোতেই মাইক্রোফোনে মেয়েদের গলায় শ্লোগান, ‘রাজাকারের আস্তানা- ভেঙে দাও গুঁড়িয়ে দাও!’ ‘ক-তে কাদের মোল্লা, তুই রাজাকার! তুই রাজাকার! ন-তে নিজামি, তুই রাজাকার! তুই রাজাকার! ম-তে মুজাহিদ, তুই রাজাকার! তুই রাজাকার! গ-তে গোলাম আজম! তুই রাজাকার! তুই রাজাকার!’ আর একটু পরপরই হাজার হাজার মানুষ মিলে আকাশে গলা তুলছে, ‘জয় বাংলা!’ বলে কি? এ কি ১৯৭১ সাল নিয়ে নির্মিতব্য কোন সিনেমার শ্যুটিং? হ্যাঁ, শ্যুটিংয়ে এত স্বত:স্ফূর্ত মানুষের অংশগ্রহণ থাকলে কথা ছিল না।
‘তোমার আমার ঠিকানা- পদ¥া-মেঘনা-যমুনা!’
আরে, এই শ্লোগান ত’ শুধু ইতিহাস বইয়ের পাতায় পড়েছে সে এতদিন? সেই শ্লোগান আবার ফিরে এলো? সমবেত সবার সাথে দীপায়ণও গলা মেলায়, ‘ ‘তোমার আমার ঠিকানা- পদ¥া-মেঘনা-যমুনা!’ ‘জয় বাংলা! জয় বাংলা!’

. ২৬শে ফেব্রুয়ারি ভার্সেইয়ে বিসমার্কের সাথে ফ্রান্সের সন্ধিচুক্তিতে একগাদা শর্ত দেওয়া হয়েছিল, তাই না ইউজিন? প্রথম শর্ত আট দিনের মধ্যে ফ্রান্সে জাতীয় সভার নির্বাচন শেষ করতে হবে, ১৫ দিনের মধ্যে বিসমার্ককে ২০০ কোটি ফ্রাঁ ক্ষতিপূরণ দিতে হবে, প্যারির বেশির ভাগ দুর্গ জার্মানীর হাতে ছেড়ে দিতে হবে এবং ফরাসী সামরিক বাহিনীর সব ক’টি কামান গোলা-বারুদ জার্মানদের কাছে দিতে হবে। উপরের লোক দেখানো চুক্তির আড়ালে অভিজাতরা কিন্তÍ ঠিকই গোপনে বিদেশী জার্মানদের সাথে হাত মেলালো দেশের শ্রমিক শ্রেণীকে শায়েস্তা করতে। অভিজাতরা একটা লোক দেখানো সাধারণ নির্বাচন করলো বটে; কিন্ত কমিউনিস্ট নেতারা সবাই ছিল শ্রমিক নেতা। শ্রমিক বস্তির বাইরে কেউই তাদের চেনে না। রাজধানীতে প্রজাতন্ত্রী গ্যারিবল্ডি, গ্যামবোঁ, ফেলিক্স প্যাট, তোঁলা আর মাঁলো জিতে গেলেন। আহা, লাল পতাকার এক গুচ্ছ পপি ফুল নাম যেন! কিন্তÍ প্যারির বাইরে প্রদেশগুলোতে হাজার ক্ষুধা-বঞ্চনাতেও সাধারণ মানুষ ঈশ্বরের নামে, চার্চ আর পাদ্রিদের নামে মন্ত্রমুগ্ধ। তাদের বোঝানো হলো যে কমিউনিস্ট মানেই ঈশ্বর বিদ্বেষী আর নাস্তিক। প্রদেশগুলোতে তাই জিতল প্রতিক্রিয়াশীলরাই। গ্রামে ভূমিদাসকে শোষণ করে যে জমিদার, সেই জমিদারকেই দেবতার কাছাকাছি কিছু ভেবে ভোট দিল চাষীরা। বোর্দোতে সংসদের প্রথম দিনের অধিবেশনেই সব দেখে হতাশ হয়ে গেলেন গ্যারিবল্ডি। ভাবলেন পদত্যাগ করবেন। ওমা, পদত্যাগের কথা ঘোষণা করতেই রক্ষণশীলরা বিদ্রুপের চিৎকারে তাকে থামিয়ে দিল। অধিবেশনের পর তোমরা সবাই...মনে আছে ইউজিন...কেমন হাতে ফুল আর লাল পতাকা নিয়ে ছুটে গেছিলে গ্যারিবল্ডিকে উল্লসিত অভিবাদন জানাতে? কিন্ত তার মাঝেই এলো সেই খারাপ খবর। বোর্দো থেকে খবর এলো যে শ্রমিকদের গড়া জাতীয় রক্ষীবাহিনী নিরস্ত্র করা হবে, জাতীয় রক্ষীবাহিনীর ভাতা আদায় করা হবে আর শ্রমিকদের বকেয়া বাড়ি ভাড়া আর বিলগুলো সব একবারেই আদায় করা হবে। ফেব্রুয়ারির ২৬ তারিখ জার্মানদের প্যারিতে কুচকাওয়াজ করে ঢোকার কথা। কিন্ত ২৫ তারিখ সকালেই গোটা প্যারি ড্রামের শব্দে জেগে উঠলো। শ্রমিকদের গড়া জাতীয় রক্ষীবাহিনী মার্চ করে চললো ফরাসী বিপ্লবের স্মারকস্তম্ভের সামনে। সবাই শ্লোগান দিচ্ছে- ‘প্রজাতন্ত্র দীর্ঘজীবী হোক!’ একজন উড়িয়ে দিল লাল পতাকা।
পরের দিন অবিশ্রান্ত বৃষ্টির মত মানুষের ঢল নেমেছিল, মনে কি পড়ে ইউজিন? সবাই মিলে স্বাধীনতার স্মারকস্তম্ভের দিকে ছুটছে। সাধারণ শ্রমিক আর সমাজতন্ত্রীদের সাথে সেদিন যে পুলিশ আর সামরিক বাহিনীর লোকেরাও ছুটছিল। ছুটছে নারীরাও। গৃহবধূরা আজ সবার জন্য চা বানিয়ে নিয়ে আসছে, বাসা থেকে রুটি নিয়ে আসছে। সিন-রাইন-ভোলগা...ইউরোপে� �� সব নদীর মিলিত ¯্রােতের চেয়েও দুস্তর সে জনতরঙ্গে তুমি কি গিটার বাজাও নি ইউজিন?
L'État comprime et la loi triche
L'impôt saigne le malheureux
Nul devoir ne s'impose au riche
Le droit du pauvre est un mot creux
C'est assez, languir en tutelle
L'égalité veut d'autres lois
Pas de droits sans devoirs dit-elle
Égaux, pas de devoirs sans droits
: C'est la lutte finale
Groupons-nous, et demain
L'Internationale
Sera le genre humain
(The State oppresses and the law cheats.
Tax bleeds the unfortunate.
No duty is imposed on the rich;
The rights of the poor is an empty phrase.
Enough languishing in custody!
Equality wants other laws:
No rights without duties, she says,
Equally, no duties without rights.
|: This is the final struggle
Let us group together, and tomorrow
The Internationale
Will be the human race).
. অফিসের কাজে এখন মন বসে না দীপায়নের। আগে সে আট ঘণ্টা লাগিয়ে যে কাজ অফিসে করতো, এখন তা’ এক ঘণ্টায় ঝড়ের বেগে করে রাতদিনই পড়ে থাকে ফেসবুকে। বিকাল না হতেই দৌড় দেয় শাহবাগের দিকে। প্রতিদিন শ’য়ে শ’য়ে হাজার হাজার মানুষের ভিড় শাহবাগে। তাদের সাথে মিলে সে-ও সমানে শ্লোগান দেয়। কোন কোন রাতে বিশেষত: বৃহষ্পতিবার ও শুক্রবার রাতে সে শাহবাগেই থাকে। আন্দোলনরত ছেলে-মেয়েদের সাথে বিনিদ্র রাত শ্লোগানে-গানে পার করে। কখনো বারো টাকার পরোটা ডিম, কখনো বন রুটি-কলা-চা খেয়ে দিব্যি কাটে তার। ভোরের দিকে গান হয় ‘পূর্ব দিগন্তে সূর্য উঠেছে রক্ত লাল রক্ত লাল রক্ত লাল!’ কেমন যেন এক অদ্ভুত ঘোরের সময় কাটছে তার। প্রেমে পড়ার চেয়েও স্বর্গীয় অনুভূতির এক ঘোর। শরীর মন সব কেমন হাল্কা লাগে!
তার বাড়িতে পাশের ইউনিটে এক জামাতি সহ-ভাড়াটিয়া আছে। ফেসবুকে একদিকে সানি লিওনির পেজে লাইক দেয়, অন্যদিকে গোলাম আজম আর সাঈদির সমর্থক।
‘শাহবাগে নাকি অবাধ গাঁজা আর ড্রাগস চলে? সেক্সও নাকি চলে? হি হি হি? আপনি ওখানে যান নাকি? থাকেন নাকি? শোনেন, দীপায়ন বাবু...হাজার হোক বাংলাদেশ একটা ইসলামী দেশ। এটার একটা মূল্যবোধ আছে, বোঝেন না?’ কখনো কখনো দেলোয়ার জাহান সাঈদির কথা তোলে সে। বলে, ‘একাত্তর সালে কতই বা বয়স ছিল তার? এই সাঈদি কি সেই সাঈদি? কার দোষ কার ঘাড়ে চাপাচ্ছেন আপনারা?’ লোকটি ‘বাঁশের কেল্লা’ পেজের অনুরাগী। পড়ে ‘আমার দেশ” আর দ্যাখে ‘দিগন্ত টেলিভিশন।’ এদিকে দীপায়নের অফিসের ইমরোজও খুব অদ্ভুত সব কথা বলে, ‘আপনারা মধ্যবিত্তরা না হয় দশ টাকা দিয়ে প্রথম আলো বা সমকাল পড়েন। নি¤œ মধ্যবিত্ত রাস্তার হকার যে পাঁচ টাকায় আমার দেশ পায়, তার কাছে ত’ আমার দেশ-ই যাবে।’ ইমরোজ কট্টর বাম।
স্ত্রী তপতী বলে, ‘শোন, তুমি ঐ কাওসার সাহেবের সাথে অত কথা বলো না তো! আমার কেমন ভয় ভয় করে!’
তপতীর কিছুদিন আগে একটা মিসক্যারেজ হয়েছে। এখনো রক্তাল্পতা আর দূর্বলতায় ভুগছে সে। সে চায় দীপায়ন আরো বেশি বেশি সময় তার সাথে কাটাক। দু’এক বিকেলে তপতী নিজেও আগ্রহ ভরে দীপায়নের সাথে শাহবাগ গেছে। একদিন আন্দোলনরত ছেলে-মেয়েদের জন্য এক হাঁড়ি পোলাও আর এক বক্স পায়েসও রান্না করে নিয়ে গেছে। কত মানুষ কত কি নিয়ে আসছে। এক রিক্সাঅলা এলো একদিন পঞ্চাশটা রুটি নিয়ে। তার বয়স যখন ছয় বছর, তার বাপকে নাকি ধরে নিয়ে গেছিল আল-বদররা। পদ্মার পারে জনা বিশেক মানুষকে চোখে কালো কাপড় বেঁধে এক সাথে ব্রাশ ফায়ার করেছিল পাঞ্জাবিরা। আর তার বাপ ফেরে নি। কপালে গামছা দিয়ে ঘাম মুছতে মুছতে সেই রিক্সাঅলা বলেছিল, ‘আম্মা বাঁইচা থাকলে দেইখা যাইতে পারত তার স্বামীরে কেউ ভোলে নাই। তার স্বামীর বিচার চাইবারে আবার লক্ষ মানুষ জড়ো হইছে। ভাল থাইকেন বাবা! আল্লাহ আপনাদের ভাল করুক।’ আর একদিন দীপায়ন দেখতে পেল সুদূর সিরাজগঞ্জের এক কৃষক ঢাকার হাটে সব্জি বিক্রি করতে এসে সাথে নিয়ে এসেছে খেজুরের রসে ভিজানো এক গামলা পিঠা। শাহবাগের ছেলে-মেয়েদের খাওয়াবে। তপতী শুরুতে কয়েকদিন দীপায়নের সব আনন্দ-উচ্ছাসে তাল দিয়ে পরে দূর্বল শরীরের কারণেই একটু ক্লান্ত আর বিরক্ত হয়ে পড়েছে। আপাতত: সে বাপের বাড়ি গেছে। তপতীর শ্বশুর মেয়েকে নিতে এসে বললেন, ‘শোন বাবা- আমাদের হিন্দুদের এত লাফিয়েও লাভ নেই! খোদ শেখ সাহেবই শত্রু সম্পত্তি আইন ঠিক করলেন না। তবু আছি এই দেশে! এই দলটা ক্ষমতায় থাকলে তা-ও একরকম চলা যায়! দিন রাত্রি শাহবাগ শাহবাগ না করে চাকরি, সংসার এগুলো দেখাই একটা বয়সের পর সব পুরুষের কর্তব্য!’
এসব কথায় দীপায়নের হাল্কা দীর্ঘশ্বাস পড়ে। চট্টগ্রামের যে জগৎ বল্লভ পাড়া গ্রামে তাদের বাড়ি সেখানে সাকা চৌধুরীর লোকরা ব্রাশ ফায়ার করে যে অসংখ্য নিরীহ হিন্দু পুরুষকে হত্যা করেছিল ১৯৭১-এ, দীপায়নের আপন জ্যাঠা ও কাকা সেই গণহত্যায় মৃত। একা বাবা কোনমতে পালিয়ে বেঁচেছিলেন। এছাড়া দীপায়নের দুই মাসীকে জোর করে রাজাকাররা তুলে নিয়ে ধর্মান্তরিত করে বিয়ে করেছে। তাঁরা আর কোনদিনই স্বসমাজে ফিরতে পারেন নি। ছোটবেলায় দাদুর বাসায় গেলে মাঝে মাঝে দেখতেন সন্ধ্যার দিকে দুই বোরখা পরা মহিলা মাঝে মাঝে আসতো। মামা-মামীরা খুব ব্যজার হতো তখন। দাদু আর দিদিমা কাঁদতেন। অনেক পরে দীপায়ন জেনেছিল তারা দুই মুসলমান হয়ে যাওয়া মাসী।


শ্বশুর মশায় তার কন্যাটিকে নিয়ে দিন পনেরোর জন্য চলে যাওয়ায় একদিক থেকে ভালই হলো দীপায়নের। ঘরে বউ নেই বলে রাঁধা-খাওয়া অত হয় না। তবে সকালে অফিসে গিয়ে চা-বিস্কিট, দুপুরে অফিসেই লাঞ্চ আর সন্ধ্যা থেকে শাহবাগেই রাত কাবার। পুরণো বন্ধুদের সাথেও...চাকরি আর সংসারে যারা দূরে দূরে ছিটকে পড়ছিল...তাদের সাথে দেখা হচ্ছে তার। অবাক লাগে মেয়েদের দেখলে! কি ভয়ানক সাহস আর শক্তি এদের! ঘণ্টার পর ঘণ্টা মাইক্রোফোনে শ্লোগান দিয়ে চলছে ছেলেদের সাথে পাল্লা দিয়ে। পুরনো বন্ধুরাও চাকরি আর সংসারের জাড্য ভেঙ্গে ছুটে আসছে। কেউ দু’পাতার কবিতা-গান ভরা পত্রিকা বিলি করছে। কেউ চাঁদা তুলে প্রজেক্টরে মুক্তিযুদ্ধের সিােনমা দেখাচ্ছে। আর একটু পর পর হর্ষোৎফুল্ল মানুষের আকাশভেদী বিপুল নাদ: ‘জয় বাংলা! জয় বাংলা! জয় প্রজন্ম! জয় মুক্তিযুদ্ধ! জয় জয় জয় শাহবাগ! জয় মুক্তিযুদ্ধ!’
মূল মঞ্চের চারপাশে ত’ অসংখ্য মিডিয়ার ক্যামেরা আছেই। ক্রেনে দাঁড়িয়ে ভিডিও করছে টিভি চ্যানেলের আলোকচিত্রীরা। একটি ট্রাকের উপরেই দাঁড়ানো গণজাগরণ মঞ্চের সামনের সারির মানুষগুলো। সেখান থেকে শ্লোগান, গান, কবিতা পাঠ আর বক্তৃতা ত’ চলছেই। মূল মঞ্চ থেকে একটু দূরেই পরপর অসংখ্য ছোট ছোট বৃত্ত আর উপ-বৃত্ত গড়ে আরো অনেক তরুণ-তরুণী শ্লোগান দিচ্ছে, সন্ধ্যার পর মোম জ্বালিয়ে আর ফুলের পাঁপড়ি ছড়িয়ে গড়ছে আলো আর ফুলের শহীদ মিনার! শাহবাগ, ওপারে রমনা উদ্যান চত্বর আর সামনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অবধি ফাল্গুনের রাতের আঁধারের হাল্কা রেখা মুছে গিয়ে দূর আকাশের আলোর পরীরা এই গোটা প্রজন্ম চত্বর বুঝি আলোয় আলোয় ধ্ইুয়ে দিচ্ছে। এত আলো এতদিন কোথায় ছিল দীপায়ণ?
বুকের ভেতর জমা করে রাখা টুকরো বাংলাদেশ
সারা পৃথিবীর শাহবাগ মিলে শাহবাগে হয় শেষ।
জনতার ¯্রােতে একাকার হয়ে রাজপথ হয় নদী
একাত্তরের ধর্ষক খুনী সেইখানে আসে যদি-

. ২৬ শে ফেব্রুয়ারি বিসমার্কের সাথে ফ্রান্সের আর এক দফা সন্ধি চুক্তি। ওহ্, মাতৃভূমির কি দু:সহ অবমাননা ক্রমাগত ঘটেই চললো! নয়া চুক্তিতে বলা হয় ক্ষতিপূরণের ৫০ কোটি ফ্রাঁ না পাওয়া পর্যন্ত ফ্রান্সে অবস্থান করবে জার্মান বাহিনী। দালাল অভিজাতরা জার্মান সৈন্য আসার আগের দিন ইচ্ছা করেই রাস্তায় রাস্তায় কামান ফেলে যায় যেন জার্মান বাহিনী এসে কুড়িয়ে নেয়। তোমরা ছোটলোকের দল...হাভাতে শ্রমিক আর ঘুঁটে কুড়ুনীর ছেলে-মেয়েরাই সেই কামানগুলো সাথে সাথে চিলের মতো ছোঁ করে কুড়িয়ে নাও। মঁমার্ত, বেলভিল আর লা ভিলেতের শ্রমিক কলোনী আর বস্তিগুলোয় কামান রাখা হয়। রাজধানীর যে পথে জার্মান সেনাবাহিনী ঢুকবে, সেই পথে ৪০,০০০ লোক জমা হয়ে যায়। ফেব্রুয়ারির ২৭ তারিখ...মনে পড়ে ইউজিন...সবাই মিলে তোমরা ঠিক করলে শ্রমিকরা নিজেদের মধ্যে চাঁদা তুলেই কামানগুলো সব সারাবে, গোলা-বারুদ জড়ো করবে? কি প্রবল কাজে ব্যস্ত হয়ে গেলে তোমরা সবাই!
...এলো ১লা মার্চ। প্রুশীয় সেনাবাহিনী প্যারিতে ঢুকলো। শোকে-বেদনায়-অপমানে প্যারির প্রতিটা বাড়িতে ঝুললো কালো পতাকা। শুন্য, বিরান রাস্তা-ঘাট। দোকানপাট সব বন্ধ। রাতে বড় রাস্তাগুলোয় আলো জ্বলছে না। দরিদ্র যে গণিকারা অর্থের জন্য জার্মান সৈন্যদের কাছে গেছিল, তাদের পরে প্রকাশ্যে বেত মারা হলো। জার্মান সৈন্যদের জন্য খোলা কাফেটা লুটপাট হলো। জার্মান সৈন্যের দালাল অভিজাত সরকার মার্চের তিন তারিখ নাগাদ সংসদে বকেয়া বাড়ি ভাড়ার বিল আনলো। আগামী ছয় মাসে পরিশোধযোগ্য বাড়ি ভাড়া এখনি সব শোধ করতে হবে। মধ্যবিত্ত, চাকরিজীবী, দোকানদার, ক্ষুদে শিল্পপতি সবাই মিলে পথে বসার অবস্থা! আগুনে ঘি ঢালার মত সাধারণ, শ্রমিক সৈন্যদের ভিক্ষা দেবার মত আট শিলিং করে ছুঁড়ে দিল বুর্জোয়া সরকার। যেন কুকুরকে ছুঁড়ে দেওয়া রুটির টুকরো। ফ্লুরাস আর ব্লাঙ্কুইয়ের মত নেতাদের কোর্ট মার্শালে মৃত্যুদ- দেওয়া হলো। তোমরা প্রজাতন্ত্রীরা, শ্রমিক আর সাধারণ মানুষের দল, এর প্রতিবাদে অসংখ্য পোস্টারে-ব্যানারে ছেয়ে ফেললে শহর। সীমান্তে জার্মানদের সাথে হেরে যাওয়া ২৩,০০০ সৈন্যকে তড়িঘড়ি করে বুর্জোয়া সরকার পাঠালো প্যারিতে শ্রমিক আর বিপ্লবীদের শায়েস্তা করতে। লাভ হলো না। সৈন্যদেরও দেশের প্রতি ভালবাসা ছিল। উল্টো তারা শ্রমিকদের পক্ষে যোগ দিল। বুঝলো, মেহনতি মানুষই শেষ শক্তি। ক্ষুধা আর শীতে কাতর এই সৈন্যদের শ্রমিক-বস্তির মেয়েরা দিল গরম গরম স্যুপ আর শীতের কম্বল।
মার্চের ১৮ তারিখ ভোর রাতেই বুর্জোয়া সরকারের নাইন রেজিমেন্টের কয়েকটা বাহিনী রওনা করলো প্যারির শ্রমিক বস্তিগুলোর দিকে। জেনারলে মাসবেল ছয়শো সৈন্যের দু’টো ব্রিগেড নিয়ে যাত্রা করলেন মঁমার্তের দিকে। চারপাশে কেমন সুনসান নীরবতা! জেনারেল পাতুয়েল মু্যঁলা দ্য লা গালেৎ দখল করে নিলেন। লোকেঁৎ দখল করলেন সেলফেরিনোর টাওয়ার। তখন বাজে মাত্র সকাল ছয়টা, তাই না ইউজিন?
এদিকে একটু একটু করে শ্রমিক-বস্তিগুলো জাগতে শুরু করেছে, রাস্তায় দোকানপাট খুলছে। দুধের দোকানের সামনে, মদের দোকানের সামনে মানুষের ছোট ছোট ভিড়ের জঁলা। সবার আগে নামলো শ্রমিক-বস্তির মেয়েরা। রাস্তায় পাহারারত সৈন্যদের ঘিরে ধরে, তীক্ষ ব্যঙ্গ-বিদ্রুপে অস্থির করে তুললো তাদের। প্যারিকে জাগানোর জন্য শ্রমিকরা ড্রাম বাজানো শুরু করলো। নারী-পুরুষ-শিশুর এক দীর্ঘ মিছিল চললো মমাঁর্ত অবধি। তোমরা সেদিন ঘিরে ধরেছিলে জেনারেল লোকেঁৎ-এর বাহিনীকে, মনে পড়ে ইউজিন? ঘোড়সওয়ার জেনারেল পাতুয়েলকেও তাড়া করলে তোমার? বেলভিল, বাট্স, লুকসেমবুর্গ সবখানেই ড্রামের আওয়াজে মানুষ জড়ো হচ্ছে আর বুর্জোয়া দলের সৈন্যরাও সেই মিছিলগুলোয় যোগ দিচ্ছে। সকাল ১১টার ভেতরেই বুর্জোয়া সরকারের ঠ্যাঙারেদের তোমরা তাড়িয়ে দিলে, মনে পড়ে? মমাঁর্ত, বেলভিল সহ সব শ্রমিক এলাকাগুলোয় গড়ে উঠছে ব্যারিকেড। মেয়েরা ঘুরে ঘুরে রান্না করা খাবার খাওয়াচ্ছে সবাইকে। বিকাল চারটা নাগাদ তোমরা সবাই মিলে ক্লেমাতঁমাকে ধরে ফেললে যে কিনা ‘প্যারির ছোটলোকদের’ শেষ করে দিতে চেয়েছিল। ক্লেমাতঁমা আর লোকেঁৎকে তোমরা সেদিনই হত্যা করলে। সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা নাগাদ অভিজাত বাহিনীর সার্জেন্টরা সবাই পালালো। সেদিন রাতটা শ্রমিক কলোনীতে তোমরা সবাই ভাল ঘুমিয়েছিলে, তাই না ইউজিন?
Hideux dans leur apothéose
Les rois de la mine et du rail
Ont-ils jamais fait autre chose
Que dévaliser le travail ?
Dans les coffres-forts de la bande
Ce qu'il a créé s'est fondu
En décrétant qu'on le lui rende
Le peuple ne veut que son dû.
: C'est la lutte finale
Groupons-nous, et demain
L'Internationale
Sera le genre humain :
(Hideous in their apotheosis,
The kings of the mine and of the rail.
Have they ever done anything other
Than steal work?
Inside the safeboxes of the gang,
What work had created melted.
By ordering that they give it back,
The people want only their due.
: This is the final struggle
Let us group together, and tomorrow
The Internationale
Will be the human race).

.
শকুনেরা আজ শুনে রাখ শুধু সময় হয়েছে শেষ
মনীষীরা আজ জেগে আছে রাত, হৃদয়ে বাংলাদেশ।
জনতার ¯্রােতে নেশা লেগে যায় স্বপ্নমাখা ঘোর
প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম মিলে প্রজন্ম চত্বর।
...ছয়, সাত আর আট তারিখ কেটে গেছে ঘোরের ভেতর। তারপর আবার ছ/সাত দিন শাহবাগে যাওয়া হয় নি ফারহানার। বাবা আওয়ামি লীগ করতেন। কিন্ত একটু বড় হতে হতেই চারপাশে ফারহানা শোনে আওয়ামি লীগ অর্থই নাকি ‘ভারতের দালাল’ যারা মুসলমানের সাধের পাকিস্থানকে কেটে দু’টুকরো করেছে। শেখ মুজিব পাকিস্থানকে ভেঙ্গে অমার্জনীয় অন্যায় করেছে। আওয়ামি লীগকে ভোট দেয় বেশির ভাগই হিন্দুরা যারা এদেশে থেকেও ওদেশের স্বপ্ন দেখে। যাদের কখনোই আসলে বিশ্বাস করা যায় না আর উচিতও নয়। বাড়িতে ফারহানা শিখেছিল ১৯৭১-এ ইন্দিরা গান্ধীর ভারত নাকি আমাদের খাবার দিয়ে, অস্ত্র দিয়ে, সৈন্য পাঠিয়ে, দেশ-বিদেশে জনমত গড়ে তুলে বিপুল সাহায্য করেছিল। নাহলে যুদ্ধে জেতাই যেত না। কিন্ত সেই স্কুলে থ্রি-ফোরে পড়ার সময় টিচারদের কাছে থেকে শুরু করে বাইরে প্রায় সবার কাছেই ফারহানা যে শোনে ইন্দিরা গান্ধী সেই ভয়ানক চতুর মহিলা যিনি পাকিস্তানকে দু’টুকরো করেছেন। ভারতই বাংলাদেশের সব সমস্যার মূলে দায়ি। সে বাংলাদেশকে নদীর পানি দেয় না, সীমান্তে কাঁটা তার দিয়ে রাখে, ব্যবসায় ঠকায়। বাসা থেকে যে পাল্টা যুক্তিগুলো শেখে ফারহানা যেমন ভারতে কত বাংলাদেশী চিকিৎসা করতেই যায়, ভারতের গরু-চিনি-পেঁয়াজ-কাপড়-ফ� �ন্সিডিল মায় হিন্দি সিনেমা ছাড়া আমাদের একটা দিন চলে না, ওপারের বই-গান-নাটক ছাড়া জীবনই পানসে থাকে...শেষ কথাটা দাঁড়ায় আওয়ামি লীগ ক্ষমতায় এলে হিন্দুদের খুব জোর বাড়ে। তাদের মাথায় তোলা হয়। তারাই ‘সংখ্যাগুরু’ হয়ে দাঁড়ায়। অথচ, ফারহানার শ্বশুর ও বিএনপির কড়া সমর্থক মোসাদ্দেক সাহেবের চেয়ে ফারহানার বাবা সালাম সাহেব নামাজ-রোজা বেশি করেন। আবার দলের হিন্দু নেতা-কর্মীরা সারাদিনই বাসায় আসত যেত। ফারহানার বর অতীশ রাজিউলকে সে প্রথম দেখেছিল ক্যাম্পাসেই। একটি বাম দলের নেতা হিসেবে নিজেকে সে ফারহানার কাছে প্রথম পরিচিত করায়। ‘দুনিয়ার মজদুর এক হও’ বা ‘শ্রমিক শ্রেণীর আন্তর্জাতিকতা’ শুনতে শুনতেও ফারহানার মাঝে মাঝে অস্বস্তি হত যে অতীশরা যখন আওয়ামি লীগ বা ভারতের নিন্দা করতে শুরু করে, সে সমালোচনা যেন কেমন একটা পর্যায়ে বিএনপি বা জামাতের সমালোচনার মত লাগে। কেমন সাম্প্রদায়িক কুৎসার মত শোনায়! নাকি তারই ‘ভারতের দালালে’র কাণ? অতীশকে ভাল লাগার জন্যই ওদের দলের কথাগুলো সে তোতা বুলির মত মুখস্থ করে: ‘নয়া বিশ্ব কাঠামোয় মার্কিনী সা¤্রাজ্যবাদীর পাশে দক্ষিণ এশিয়ার নয়া আঞ্চলিক ভারতের ব্রাহ্মণ্যবাদী সা¤্রাজ্যবাদ ভারত তার সুচতুর বেনিয়া মুনাফা বাংলাদেশের মত ক্ষুদ্র দক্ষিণ এশীয় রাষ্ট্রগুলো থেকে আদায় করতে চায়।’ বলতে বলতে বুকে খচখচ করতো ফারহানার। ছোট ফুপুকে পাঞ্জাবি আর্মির বাঙ্কার থেকে উদ্ধার করার সময় তার নগ্ন দেহ পাগড়ির কাপড়ে ঢেকে দিয়েছিল এক শিখ সৈন্য। বেশিদিন বাঁচেন নি এরপর। নিজেই সিলিং ফ্যানের সাথে গলায় কাপড় পেঁচিয়ে আত্মহত্যা করেছিলেন। ছোটবেলা থেকেই ডাইনিং টেবিলের সামনে সাদা-কালো ছবিতে এক কুড়ি-একুশের তরুণীর সরল, আত্মভোলা হাসির ছবি দেখে মুগ্ধ হতো ফারহানা। মা’কে জিজ্ঞাসা করতো, ‘উনি কে মা?’
‘তোমার বাবার ছোট বোণ ছিল মা! তোমার হেনা ফুপু।’
‘উনি বেঁচে নাই?’
‘না-’
‘মরে গেল ক্যানো? অসুখ করেছিল?’
‘হ্যাঁ- মা-অসুখ করেছিল।’
প্রতি বছর হেনা ফুপুর জন্ম ও মৃত্যু দিবসে ফারহানাদের বাসায় কুলখানি হতো। সেমাই আর জর্দা রান্না করা হতো। দাদি মা সেদিনগুলোতে কেন জানি একদম ভেঙ্গে পড়তেন। বিছানা থেকে উঠতেই পারতেন না। অনেক বড় হয়েই আর জানতে পারে ফারহানা। মা-ই তাকে খুলে বলেছিল, ‘তোমার ছোট ফুপু...বাড়ির ছোট ছিল বলেই খুব সহজ-সরল ছিল...তোমার বড় বা মেজ ফুপুর মত না...আমাকে পরের ঘরের মেয়ে বলে কখনো অন্য চোখে দ্যাখে নি, অন্য দুই ফুপু দোষ ধরতে এলে সে-ই আমাকে বাঁচাতে আসত...আমার খুব প্রিয় ননদ ছিল...এত ভাল মানুষের কপালে আল্লা কেন এটা রেখেছিল জানি না...সে ক্যান্সারে মারা যায় নি রে! তাকে আর্মি আর রাজাকাররা তুলে নিয়ে গেছিল। বাড়িতে পুরুষ সদস্য ছিল না। ও-ই ইয়াং, অবিবাহিত মেয়ে ছিল। অন্য দুই ফুপুর ত’ বিয়ে হয়ে গেছিল। আমিও বিবাহিত, সন্তানের মা। আমাদের ত’ আর নেবে না- ওকেই তুলে নিয়ে গেল! কি মেয়ে গেল আর কি মেয়ে ফিরে আসল! পেটে বাচ্চা এসে গেছিল। সেটা জেনেই ঘরে দরজা দিয়ে- আল্লাহ গো- শোন্, বাইরে এটা বলবি না। বাইরে সবাই যেন জানে তোর ছোট ফুপু ক্যান্সারেই মারা গেছে, বুঝলি?’
শাহবাগে গেলেই তাই ফারহানার ভেতর থেকে অদেখা ছোট ফুপুর জন্য, হলদে হয়ে আসা একটি সাদা-কালো ছবির জন্য, বুক চিরে...গলা চিরে...তার সমস্ত অস্তিত্ব জুড়ে... কান্নার আর্ত ধ্বনির মত শ্লোগান বের হয়, ‘আমাদের ধমনীতে বীরাঙ্গণার রক্ত-এই রক্ত কোনদিনও বৃথা যেতে পারে না! এই রক্ত কোনদিন পরাভব মানে না! বেঈমানি করে না!’
অথচ অতীশ রাজিউলদের বাড়িতে বিয়ের পরই কেবল সে জানতে পারল তার শ্বশুর বিএনপি করেন। যৌবনে তিনিও অবশ্য আব্দুল হকের দল অর্থাৎ বামদের নানা শাখা-প্রশাখার একটি দল করতেন। অতীশের দাদা ছিলেন মুসলিম লীগের এমএলএ। অথচ, অতীশদের বাড়িতে নামাজের বালাই নেই। সন্ধ্যা থেকে স্টার প্লাসে হিন্দি সিরিয়াল। শ্বশুর মহাশয় দিব্যি স্যুটেড-বুটেড। এই বয়সেও নিয়মিত ঢাকা ক্লাবে যান, বিলিয়ার্ড খেলেন। অতীশ আর শ্বশুর মহাশয়...বাপ-বেটা মিলে একসাথে ড্রিঙ্ক করেন...অতীশের শাশুড়িও তাতে মাঝে মাঝে যোগ দেন...অতীশের ছোট ভাই একটি ব্যান্ড দলের বেইজ গিটারিস্ট। তার লাইফ-স্টাইল নিয়ে কথা না বলাই ভাল। অতীশের বোণরা সব দারুণ স্মার্ট। স্লিভলেস ব্লাউজ, এক পাল্লা শাড়ি বা গলায় ওড়না। অথচ ‘খোদা হাফেজ’ না বলে ‘আল্লাহ হাফেজ’ বলবে। কথায় কথায় ‘বিসমিল্লাহ-মাশাল্লা� �-ইনশাল্লাহ’ আছে। এদিকে সবারই ভ্রু নিপাট প্লাক আপ, বাইরে বের হতে হলেই মুখে ফাউ-েশন, ম্যাক্স ফ্যাক্টর। ফারহানা কোন তাল পায় না! খাবার টেবিলেই এদের যত ধার্মিকতা! সেটা গোটাটাই ভারত আর হিন্দুদের নিয়ে গালি-গালাজ। সারাক্ষণই শেখ হাসিনা আর আওয়ামি লীগ, বঙ্গবন্ধু ও তার নিহত পরিবারের চরিত্র হনন! বিএনপি-জামাত বিষয়ে একটি বক্তব্য নেই। ছোট ভাইয়ের হো-া দূর্ঘটনার পর ফারহানা এক বেলা নামাজ পড়ায় তারা ঠাট্টাও করেছিল। আবার ফারহানা কপালে টিপ পড়লে শাশুড়ি গম্ভীর হন; বলেন এটা ধর্ম সম্মত নয়। ফারহানা শ্বশুরবাড়ির বিজনেস পার্টিগুলোয় তিন ভাঁজ আচলের পুরু প্লিটের শাড়ি পরে, চুলে ফুল বা কপালে টিপ পরে বলে তাকে সবাই গ্রহান্তরের আগন্তকের মতো দ্যাখে। সে ছায়ানটে পঞ্চকবির গান মানে ঐ রবীন্দ্র-নজরুল-রজনীকা� ��্ত-দ্বিজেন্দ্রলাল-অত� �লপ্রসাদের গান শিখত বা এখনো মাঝে মাঝে গায় বলে তার দেবর তাকে বিদ্রুপ করে। আর অতীশও খুব অদ্ভুত। সারাদিন বাবার ব্যবসা সামলায়, একটা এনজিও-ও বোধ করি খুলছে আর সন্ধ্যার পর তার পার্টির নারী ও পুরুষ কমরেডরা আসে। নারী কমরেডরা জিন্স পরে, কপালে বিশাল টিপ আর সিগারেট খেতে খেতে তালিবান ও আল-কায়েদার গড়ে তোলা দূর্বার মার্কিনী সা¤্রাজ্যবাদ প্রতিরোধের কথা বলে, ফ্রান্সে মুসলিম নারীর হিজাব পরার মানবাধিকার লঙ্ঘনের কথা বলে, মাদ্রাসার ছাত্রদের উপর সেক্যুলার সরকারের দমন-পীড়নের কথা বলে।
‘ফরহাদ মজহারের লেখাগুলো পড়ে দ্যাখো ফারহানা! শাহবাগের এই আন্দোলন মধ্যবিত্তের আন্দোলন। গরীব, নি¤œবর্গের বা প্রান্তিক, খেটে খাওয়া মানুষের আন্দোলন নয়। আজ শিবিরের সাথে তোমাদের এই সো-কলড সেক্যুলার বাট ফ্যাসিস্ট সরকারের মারামারি...মাদ্রাসায় কারা যায়? নি¤œবিত্ত আর প্রান্তিক ঘরের বাচ্চারাই যায়। তাদেরই আজ মুখোমুখি শত্রু খাড়া করে...’
‘মানছি মাদ্রাসায় গরীব মানুষের সন্তানরাই যায়। জামাত ইসলামের বড় নেতাদের সন্তানরা ত’ সব ওয়েস্টে দামি বিশ্ববিদ্যালয়েই পড়ছে। তাদের ছেলে-মেয়েরা আরামে আছে কিন্ত এই গরীব ছেলেদেরই জিহাদ করতে হবে। জিহাদের নামে বিভ্রান্ত ছেলেরা পুলিশের মাথা ইঁট দিয়ে থেঁতলে দেবে, মানুষের হাত-পায়ের রগ কাটবে, দোষ সেক্যুলার সরকারের, তাই না?’
‘তোমার আওয়ামি ভুত ঘাড় থেকে আর নামল না।’
ফারহানা কথা না বলে ঘর থেকে বের হবার উদ্যোগ নেয়।
‘যাচ্ছ কই, শাহবাগ? যাও- চেতনার ব্যবসা চলছে ভালই। সরকারের হাজারটা দূর্নীতি চেতনার শ্লোগান তুলে আড়াল করার অপচেষ্টা!’
‘এ সরকারের দূর্নীতি আছে অস্বীকার করি না। কিন্ত বিএনপি-জামাত আমলে কি এর চেয়ে কয়েক হাজার গুণ দূর্নীতি ছিল না?’
‘মার্ক্সিস্ট পড়াশোনাটা তুমি আসলে করলে না কিনা ফারহানা!’
ফ্রিজ থেকে বের করা চিল্ড স্মিরনফ বোতলে ঢেলে তার ভেতর লেবুর রস চিপতে চিপতে বলে অতীশ রাজিউল। গত ছ’মাস হয় তারা এক বিছানায় শোয় না। নাহ্, তাই বলে রাজনৈতিক মতপার্থক্য এখনো গায়ে হাত তোলার পর্যায়ে যায় নি। ঝগড়া-মারামারি এখনো হয় নি। রাজিউলের কি কোন দরকার আছে ফারহানাকে? ফারহানা বাড়ি থেকে বের হলেই রাজিউলের সেই নারী কমরেড যে আসবে তা’ ত’ ফারহানা জানে। মেয়েটি বিবাহ বিচ্ছিন্ন। সেই সিগারেট, জিন্স, কপালে বিশাল টিপের স্মার্টনেস- সমানে ছেলেদের সাথে স্ল্যাং বলার, গাঁজা খাওয়ার বিপ্লব এবং সমানে হিজাব ও তালিবান শক্তির পক্ষে ওকালতি। ক্লান্তি এত ক্লান্তি...অথচ, মেয়েটিকে নিয়ে যৌন ঈর্ষা বা প্রতিদ্বন্দীতাকাতরতা ও তার তৈরি হয় না...কেন? অতীশের প্রতি তার কি আকর্ষণ হারিয়ে গেছে? অতীশ তার নারী কমরেডকে আসলেই কি ভালবাসে? নাকি ¯্রফে রুচি বদল?
শাহবাগ প্রজন্ম চত্বরের কাছে আসতে আসতেই অবশ্য ফারহানার সব কষ্ট এক লহমায় হাল্কা হয়ে গেল। গান বাজছে জোরে। কবির সুমনের অনবদ্য গলা:
বিমানে উড়তে তিরিশ মিনিট
এতো কাছে তবু দূর
বিলকুল নেই পাসপোর্ট ভিসা
সীমানা চেনে না সুর।
সীমানা চিনি না আছি শাহবাগে
আমার গীটারও আছে,
বসন্ত আজ বন্ধুরা দেখো
গণদাবী হয়ে বাঁচে।
...একটা রুদ্র পলাশের ডাল বাতাসে অসহ সুখে বা বিষাদে মূহুর্মূহু দোলে।
বাঁচো গণদাবী, বাঁচো গণদাবী
আসল বিচার চাই,
যার যা পাওনা তাকে সেটা দাও
গণদাবী একটাই।
...আট তারিখের পর আজ পনেরো তারিখ। সাত দিন পর আবার ফারহানা শাহবাগে! মাঝখানে কলেজের ছাত্র-ছাত্রীদের একগাদা খাতা দেখা, পরীক্ষার হলে গার্ড দেওয়া, রুটিন বা প্রায় মিউচ্যুয়াল কনসেন্টে ডিসফাংশনাল হতে থাকা দাম্পত্যের ছক...
গুটি গুটি পায়ে প্রজন্ম চত্বরের ফোয়ারার কাছে গিয়ে সবার সাথে ফারহানাও গলা মেলায়, ‘জয় বাংলা!’

. ‘প্যারির প্রলেতারীয়রা শাসক শ্রেণীসমূহের ব্যর্থতা দেশদ্রোহিতা থেকে এ কথাই উপলব্ধি করছে যে রাষ্ট্রীয় কার্যকলাপ পরিচালনার ভার স্বহস্তে গ্রহণ করে পরিস্থিতি ত্রাণের মূহুর্তটি আজ সমাগত...সরকারী ক্ষমতা দখল করে আপন ভাগ্য নিয়ন্তা হয়ে ওঠা যে তাদের অবশ্য কর্তব্য এবং পরম অধিকার এ কথা তারা অনুভব করছে।’
১৮ই মার্চই ইশতেহারে তোমরা একথা লিখেছিলে, তাই না ইউজিন? আর পরদিন সকালে গোটা প্যারি জেগে উঠলো নতুন সাজে? টাউন হলের মাথার উপর লাল পতাকা পত্ পত্ করে উড়ছে আর হাওয়ায় মিলিয়ে গিয়েছে বুর্জোয়াদের সেনাবাহিনী। তুমি, জাঁক, পিয়ের, নিকোলা সবাই মিলে সকাল থেকেই টাউন হলের সামনে। দুপুর একটায় তোমরা দখল করলে অর্থ ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। ঠিক এক ঘণ্টা পরেই জয় করে নিলে নৌবাহিনী ও যুদ্ধ দফতর। তারও কিছুক্ষণ পরে টেলিগ্রাম অফিস ও সরকারী মুখপাত্রের কেন্দ্রীয় দপ্তর। শ্রমিকদের প্রতিরক্ষা বাহিনী সেদিনই কমিউনিস্ট নেতাদের মৃত্যুদ- প্রদানকারী কোর্ট মার্শালকে বাজেয়াপ্ত ঘোষণা করলো। উল্লাসে ফেটে পড়েছিলে সেদিন তোমরা? তুমি, নিকোলা, জাঁক আর পিয়ের? শ্যাম্পেন ত’ বড়লোকের পানীয়। তবু বাড়ির পুরনো রূপার একটি বাটি বন্ধক দিয়ে সেদিন তুমি কেভিয়ার আর শ্যাম্পেন খেয়েছিলে, বন্ধুদেরও খাইয়েছিলে?
...এক সপ্তাহের মাথায় প্যারিতে ঝলমল করছে আলোর বন্যা। প্যারির স্বাধীন শ্রমিকশ্রেণী আজ তাদের সরকার নির্বাচন করবে। নির্বাচনের হলগুলোর সামনে আর কোন পুলিশ নেই, সন্ত্রাস নেই, ষড়যন্ত্র নেই। দু’লক্ষ সাতাশি হাজার ভোটারের ভেতর দু লাখ ‘ছোটলোক’ ভোটার তোমাদের ‘ছোটলোক’দের দলকেই ভোট দিল, তাই না ইউজিন? রাইফেলের বেয়নেটের ডগায় টুপি পরিয়ে হাজার হাজার শ্রমিক সেই বেয়নেট ধারী স্পর্ধিত বন্দুক তুলে ধরলো আকাশের দিকে। গোটা টাউন হলে লাল স্কার্ফের অগ্নি বন্যা। টাউন হলের মাঝখানের উঁচু পাটাতনে নির্বাচিত শ্রমিক নেতারা এলেন। প্রত্যেকের কাঁধে জড়ানো লাল স্বার্ফ। শ্রমিক নেতা রানভিয়ের বললেন, ‘বন্ধুরা, আজ আমি...আজ আমি এতটাই উদ্বেলিত যে কোন কথাই বলতে পারছি না। প্যারির সাধারণ মানুষ গোটা পৃথিবীর সামনে যে উদাহরণ রেখে গেলেন, তার জন্য আমি তাদের ধন্যবাদ জানাই। আর কিছুই আমার মনে আসছে না।’ এক সেকে- থেমে রানভিয়ের ঘোষণা করলেন: ‘সাধারণ মানুষের নামে প্যারি কমিউন প্রতিষ্ঠার কথা ঘোষণা করছি!’

‘ভিভরে দো লা রিপাব্লিক! ভিভরে লা রেভল্যুইশিও!’

গলা থেকে লাল স্কার্ফ খুলে তোমরা সবাই নাচা শুরু করলে। পিয়েরের প্রেমিকা মার্থা, জাঁকের বউ শার্লি, নিকোলার প্রেমিকা এলিজা...সবাই মিলে হুল্লোড় তুলে নাচ! জানালা, ঝুল বারান্দা, ছাদ থেকে মেয়েরা উড়িয়ে দিল লাল রুমাল। হাজার হাজার লাল পতাকা উঠে এলো আকাশে। যেন গোটা পারি এক মস্ত আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছে। সেই আগুনে যা কিছু নোংরা, মন্দ, কদর্য, পুরনো আবর্জনার স্তÍপ সবকিছু পুড়িয়ে নতুন সৃষ্টি ডেকে আনবে।
Ouvriers, paysans, nous sommes
Le grand parti des travailleurs
La terre n'appartient qu'aux hommes
L'oisif ira loger ailleurs
Combien de nos chairs se repaissent
(Workers, peasants, we are
The great party of labourers.
The earth belongs only to men;
The idle will go to reside elsewhere.
How much of our flesh have they consumed?)

. ইশসৃগত সাতদিন প্রজন্ম চত্বরে আসতে পারে নি আর এর ভেতরেই এত কিছু ঘটে গেছে? মানুষ আর মানুষ চারপাশে। আসতে আসতেই সন্ধ্যা হয়ে গেল। রিক্সা আজ তাকে থামিয়েছে চারুকলার সামনে। ওদিক থেকে ভিড় ঠেলে আসতে দম বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। তাতে আজ ফারহানা পরেছে শাড়ি। কিন্তÍ এই ভিড়টা যেন ছয়, সাত বা আটের ভিড়ের থেকে একটু কি আলাদা? সেই ভিড়গুলোতেও একাই ঢুকেছিল ফারহানা। কিন্তÍ ভিড়ের প্রতিটা ছেলে কোন সুযোগ নেবার চেষ্টা দূরে থাক, বরং বোনের মত জায়গা ছেড়ে দিয়ে, দরকারে অভয় নিরাপত্তার বেষ্টনী দিয়ে তাকে পার করিয়েছে। কিন্ত আজ যেন সন্ধ্যার অন্ধকারে না চাইতেও কেমন একটি অনাকাঙ্খিত স্পর্শ, হঠাৎই লোভী, পুরুষালি হাতের চকিত চাপের ছোঁয়া তাকে ভয় পাইয়ে দিচ্ছে। কারা ঢুকছে, কারা ঢুকলো ভিড়ে? পৃথিবীতে কিছুই কি বেশিদিন নির্মল থাকে না, থাকবে না নাকি থাকতে নেই? না, এসব কি ভাবছে ফারহানা? নাকি পুরুষের পৃথিবীতে একা মেয়ের নিত্য চলা চলতে চলতে তার ভেতরেই সব সময় তাড়া করে ফেরে এক অকারণ ত্রাস আর সংশয়? ভিড় ঠেলতে ঠেলতে যথারীতি শাহবাগের ফোয়ারার সামনে এসে বসে সে। দেখতে দেখতে অমন ভিড়েই কিছু চেনা মানুষের সাথে দেখা হয়ে যায়। যদিও প্রচুর মানুষ, শ্লোগানে-গানে আজো গমগম করছে, তবু অনেকের মুখেই ম্লান ছায়া।

‘সরকার থেকে বলছে আজই উঠিয়ে নিতে হবে মঞ্চ।’ ফারহানার ক্যাম্পাসের দু’টো জুনিয়র ছেলে জানালো।
‘কি বলছো তোমরা? অয়ন, রাশিদুল...চা খাবে?’
‘হ্যাঁ আপা...চা চলতে পারে!’

আজ ফারহানা বলেই এসেছে শ্বশুরবাড়িতে যে শাহবাগ থেকে সে সোজা বাবার বাসায় যাবে। মেজ আপা বিদেশ থেকে এসেছে।
‘মনটা খারাপ লাগছে আপা। শেষপর্যন্ত সরকার যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করবে কিনা, জামাতে ইসলামী বন্ধ করতে সরকারে আইন পাশ হবে কিনা কে জানে? জানেন, অনেক শিবিরের মানুষ ঢুকে পড়ছে ভিড়ে। আমাদের মানুষদের পকেটে গাঁজার ছিলিম ভিড়ের ভেতর ঢুকিয়ে দিয়ে ছবি তুলে পরে ওদের ওয়েব-সাইটে আপলোড করে বলছে এটা গাঁজার আড্ডা। সালোয়ার-কামিজ পরা মেয়েদের ছবি ফটোশপ করে জঘন্য পোশাকের ছবি জুড়ে দিয়ে বলছে শাহবাগে সেক্সের আড্ডা। আজ বিকেলে এক বান্ধবী বলছিল শুরুর দিকে ভিড়ের ভেতর কোন বাজে টাচ পায় নি, এখন নাকি পাচ্ছে। এটা নিশ্চিত জামাতিদের কাজ?’

‘তাই? আশ্চর্য, আজ না আমারও তেমন মনে হচ্ছিল!’

রাত প্রায় দশটার মত বাজে। বাসায় যাবার জন্য উঠবে কি ফারহানা? কাল থেকে এই মঞ্চ উঠে যাবে? হঠাৎই মূল মঞ্চ থেকে একটি ঘোষণা এলো, ‘বন্ধুরা! আমাদের কাছে একটি অত্যন্ত দু:খজনক সংবাদ এসেছে। ব্লগার রাজিব হায়দার যিনি থাবা বাবা নামে ব্লগে লিখতেন, তিনি তার বাড়ির কাছে দু:খজনক ভাবে খুন হয়েছেন। আমরা এই নৃশংস হত্যাকা-ের প্রতিবাদে মঞ্চ না উঠানোর সিদ্ধান্ত নিচ্ছি।’

অয়ন আর রাশিদুল সাথে সাথে লাফ দিয়ে উঠে নাচতে থাকে। সে কি নাচ! নাচ আর থামেই না!
‘কি আনন্দ আপা! দাঁড়ান, ঘুইরা আসি একটু!’
ওরা একটু তফাতে সরে না যেতেই জুয়েলের সাথে দেখা। কট্টর বামপন্থী ছিল। ‘জয় বাংলা’ শ্লোগান দিতে জুয়েলের কি একটু বাধে? ফারহানার নিজের বাবা আওয়ামি লীগার হলেও ক্যাম্পাসে বামপন্থীদের সাথে মেলা মেশা বেশি ছিল বলে ফারহানা ‘জয় বাংলা’ শ্লোগান দিত না। কিন্তÍ শাহবাগ আন্দোলন ত’ এই ‘জয় বাংলা’ শ্লোগান আবার ফিরিয়ে আনছে!

মূল মঞ্চের মাইক্রোফোন থেকে বিষ্মিত, শোকার্ত আর ক্রুদ্ধ গলার শ্লোগান আসছে, ‘শহীদ রাজিবের মৃত্যু বৃথা যেতে পারে না- শহীদ রাজিবের মৃত্যু বৃথা যেতে দেব না! শাহবাগ জেগে আছে- শাহবাগ ঘুমায় না! জয় জয় জয় বাংলা! জয় শাহবাগ! জয় প্রজন্ম! জয় জনতা!’

ফারহানা লক্ষ্য করলো সে ‘জয় বাংলা’ বললেও জুয়েল ‘জয় বাংলা’ বলছে না। তবে ‘জয় প্রজন্ম,’ ‘জয় শাহবাগ,’ ‘জয় জনতা’ বলছে!
মঞ্চ ভেঙ্গে যাবে বলে যারা বাসায় ফিরে যাচ্ছিল তারা আবার ফিরছে। স্তব্ধ বিষ্ময় ভেঙ্গে সবাই শ্লোগান দিচ্ছে, ‘জামাতে ইসলাম/মেড ইন পাকিস্থান/
মেড বাই পাকিস্থান/ জামাতে ইসলাম!
ই-তে ইবনে সিনা/ তুই রাজাকার, তুই রাজাকার!
ম-তে মেডিনোভা/ তুই রাজাকার/তুই রাজাকার!
দ-তে দিগন্ত টিভি/ তুই রাজাকার, তুই রাজাকার!
জেগে আছে শাহবাগ/ জেগে আছে বাংলা!
শাহবাগ জেগে থাকে/শাহবাগ ঘুমায় না!
পাকিস্থানের প্রেতাত্মারা/পাকিস্থ� �নে ফিরে যা!’

রাত প্রায় এগারোটা বাজে। বাবার বাড়ি আর শ্বশুরবাড়ি দু’টোই খুব বেশি প্রগতিশীল না। বাবার বাড়িই শাহবাগ থেকে কাছে। দ্রুত একটা রিক্সা নিয়ে বাড়ির দিকে রওনা করে ফারহানা। আধা ঘণ্টায় পৌঁছে যায়।

কলিং বেল টিপতেই মেজো আপা দরজা খোলে, ‘শাহবাগ থেকে মাত্র ফিরলি? জানিস, ব্লগার থাবা বাবা যে মারা গেছে? টিভিতে বললো!’
‘হুম- রাজিব হায়দার নামে একজন মারা গেছে জানি...’
‘সে-ই ত’ থাবা বাবা নামে লিখত। তুই ত’ আর ব্লগ পড়িস না। আমি বাবা ল-নে থাকি বলে দেশের সব পেপারের ই-ভার্সন আর ব্লগ পড়তে হয়! ছেলেটা নাস্তিক ছিল। তা’ নাস্তিক হওয়া কি দোষের? তার মতপ্রকাশের স্বাধীণতা নাই? তাই বলে তাকে খুন করতে হবে? কবে আমরা একটু সভ্য হবো?’

ভাতের থালা নিয়ে তাড়াতাড়ি টিভির সামনে বসে পড়ে ফারহানা। টক-শো চলছে। শ্লোগানকন্যা লাকি আখতার বক্তব্য দিচ্ছে। কিন্ত এর ভেতরেই শাহবাগ থেকে টিভি ফুটেজ শুরু হলো। মঞ্চে দাঁড়ানো ইমরান এইচ সরকার, ব্লগার আরিফ জেবতিক, এস এ অরণ্য, বাপ্পাদিত্য বসু আর শ্লোগান কন্যা অনিন্দ্য সাহা তুলতুল। তুলতুল কাঁদছে, ‘আমরা ত’ সাধারণ মানুষ...আমরা রাজিবের মৃৃত্যুর পর ঠিক করছি এখানেই থেকে যাব। আমরা এই শাহবাগ, এই প্রাণের প্রজন্ম চত্বর ছেড়ে যাব না!’

১০. কমিউন প্রতিষ্ঠার পরপরই প্যারিতে শ্রমিকদের বকেয়া বাড়ি ভাড়া আর বিলগুলো মওকুব করা হঢেছিল। নোটারী, উকিল, মোক্তার, রেজিস্ট্রার সবার শোষণ আর দূর্ভোগ থেকে মানুষ যেন হাঁপ ছেড়ে বাঁচলো। চোর, গু-া, বদমাশ, পুরোহিত, গণিকা থেকে শেষমেশ হয়তো মুক্তি পাবে এই প্রাণের শহর, তেমনি ত’ ভেবেছিলে ইউজিন? ‘যাকেই চুরি করতে দেখা যাবে, তাকেই গুলি করা হবে’...কমিউনের এই একটি মাত্র বিবৃতিতে থেমে গেল চুরি। গণিকাবৃত্তি বন্ধের দাবি উঠলো। মহল্লায় মহল্লায় সাধারণ মানুষ বন্ধ হয়ে যাওয়া স্কুল আবার খুলে দিল, তাড়িয়ে দিল পাদ্রিদের, মেয়েরা নিল ডাক হরকরা বা চিঠি বিলি করার কাজ। বুর্জোয়াদের মুখোশও খুলে গেছিল। জার্মানদের হাতে দেশ তুলে দেবার বিদেশী ষঢ়যন্ত্র, চার্চে ফাদার আর নানদের লাম্পট্য গোপন থাকে নি। ৬ই এপ্রিল তোমরা গিলোটিন পোড়ালে, মনে পড়ে ইউজিন?


...তবু বিপ্লবের পিছু পিছু পায়ে পায়ে নি:শব্দে হেঁটে আসে যে প্রতিবিপ্লব ক্ষুধার্ত ডাইনীর মতো, সে সহসাই পেছন থেকে ঝাঁপিয়ে পড়ে বিপ্লবের কাঁধে ছুরি বসায়। বাঘনখে বিদ্ধ করে তার হৃৎপি-। তাই কি হয় নি? মার্চের ২২ তারিখেই অভিজাতদের কিছু দাঙ্গাবাজ গায়ে পড়ে হামলা করলো কমিউনের লড়াকু শ্রমিকদের সাথে। শ্রমিকরা আত্মরক্ষা করার চেষ্টা করতেই ওরা ছুরি, পিস্তল, লাঠি রেখে পালালো। কমিউনের সেনাপতি লুলিয়ার লোকটিকে তোমাদের যে ভাল লাগত না, সেটা ত’ ঠিকই ছিল ইউজিন! অভিজাতরা তাড়াতাড়িই যে আবার দখল করে নিল দুর্গ মঁ-ভালেবিঁ। ব্যর্থতার শাস্তিতে বহিষ্কৃত হবার সাথে সাথে কমিউনের পিছু নিল সে। ভার্সেই থেকে আসা অভিজাতদের শেষ বাহিনীর পক্ষে কাজ করলো লুলিয়ার। হায়, শ্রমিক নারীরা পর্যন্ত লড়াইয়ে এগিয়ে এলো। নিজেদের দরিদ্র, নিরন্ন বস্তি রক্ষায় পুরুষের পাশাপাশি তারাও কামান চালালো। গুলি খেয়ে লুটিয়ে পড়লো রাস্তায়। নিকোলা আর জাঁকের স্ত্রী, প্রেয়সিরা খুন হলো রাস্তায়। মৃত স্বামীর শবদেহের পিছু হাঁটতে হাঁটতে শিশু সন্তানের কাণে শ্রমিক মেয়েরা শ্লোগান দিয়েছে, ‘ভিভা পারি কমিউন!’ তবু ভার্সেইয়ের সেই বিপুল সৈন্যবাহিনীর সাথে শেষরক্ষা হলো কি? শ্রমিক নেতা ফ্লুঁরাসকে পেছন থেকে খুন করলো বুর্জোয়া সেনাপতি দেসার্ত, বিক্ষুব্ধ শ্রমিকদের হাত থেকে যার জীবন বাঁচিয়েছিল ফ্লুঁরাসই। ফ্লুঁরাসের মৃতদেহ টুকরো করার দৃশ্য ভার্সেইয়ের গোলাপ বাগানে উপভোগ করলো বুর্জোয়াদের স্ত্রী ও রক্ষিতারা। ৬ই এপ্রিল শহীদ শ্রমিকদের শবযাত্রায় কফিনের পিছু পিছু দুই লাখ শ্রমিকের শবযাত্রার ঢল...শুধু পূর্ব প্রস্তÍতি ছিল না কমিউনের...ভার্সেই সৈন্যরা এপ্রিলের ৭ তারিখ দখল করে নিল নিউলি-তে সিন নদীর ঘাট। মে মাসের শেষ নাগাদ জার্মানরা বন্দী ফরাসী সৈন্যদের ছাড়ার পর বুর্জোয়াদের শক্তি আরো বাড়লো। ফরাসী বুর্জোয়াদের সাথে হাত মেলালো জার্মান বাহিনীও...আটটা দিন...আট/আটটা দিন সে কি খা-বদাহন! লোশেজের কবরখানা ভরে উঠলো নর-নারী-শিশু-বৃদ্ধের লাশের স্তÍপে। ত্রিশ হাজার মানুষ হত্যার পর শুরু হলো পাইকারি গ্রেপ্তার। লড়াইয়ের শেষ দুই দিনে হেরে যাবে বুঝে শ্রমিকেরা নিজের হাতে নিজের প্যারি প্রিয়তমার দেহে জ্বালালো আগুন। বুর্জোয়া ভার্সেই যেন পায় নিছকই এক অগ্নিদগ্ধ শহর। তিন দিন ধরে দাউ দাউ করে জ্বললো আগুনের লকলক শিখা।
Mais si les corbeaux, les vautours
Un de ces matins disparaissent
Le soleil brillera toujours.
: C'est la lutte finale
Groupons-nous, et demain
L'Internationale
Sera le genre humain :

(Workers, peasants, we are
The great party of labourers.
The earth belongs only to men;
The idle will go to reside elsewhere.
How much of our flesh have they consumed?
But if these ravens, these vultures
Disappeared one of these days,
The sun will shine forever.
|: This is the final struggle
Let us group together, and tomorrow
The Internationale
Will be the human race).

১১. বাহাত্তর দিন। মাত্র বাহাত্তর দিনের প্যারি কমিউন। এর পরপরই বুর্জোয়া সরকারের তাড়ায় তোমাকে পালাতে হলো স্বদেশ ছেড়ে। স্বয়ং কার্ল মার্ক্স কমিটি গঠন করলেন কমিউনের তাড়া খাওয়া নেতাদের আশ্রয় দেবার জন্য শরণার্থী তালিকা প্রস্তÍত করতে।

... ... Nikto ne dast nam izbavlenya:
Ni bog, ni tsar i ne geroy!
Dobyomsya my osvobozhdenya
Svoyeyu sobstvennoy rukoy.

(No one will grant us deliverance,
Not god, nor tsar, nor hero.
We will win our liberation,
With our very own hands.)

রুশীরা তোমার গানের ‘সিজার’ শব্দটি বদলে করলো ‘জার’... ইউজিন! অক্টোবর বিপ্লবের আগে ১৯০৫-এর যে ব্যর্থ বিদ্রোহে...ব্যর্থ প্রেমের মতই...খোদ ভøাদিমির উলিয়ানভের আপন ভাই ফাঁসিতে ঝুলেছিলেন, সেবার বিদ্রোহের শুরুটা হয়েছিল চারজন শ্রমিকের কারখানা থেকে চাকরি চলে যাওয়ার ঘটনায়। পাদ্রি গিপন লোকটা ছিল আসলে জারের চর। ধর্মপ্রাণ, অর্থোডক্স খ্রিষ্টান শ্রমিকদের সে বোঝাতে পারল জারের কাছে দরখাস্ত দিয়ে, কেঁদে-কেটে হত্যে দিলেই গরীবি থেকে মুক্তি মিলবে। সত্যিই, লক্ষ লক্ষ মজুর তাদের বউ-বাচ্চা নিয়ে শীত প্রাসাদের দিকে। দিনটা ছিল রবিবার। প্রার্থনার দিন। রুশী খ্রিষ্টানরা বরাবর ধর্মভক্ত। সাথে জারের ছবি আর গির্জার পতাকা নিয়ে সরল মানুষগুলো ধর্মীয় সঙ্গীত গাইতে গাইতে পথ চলছিলো। তখনি জারের সৈন্যরা ছোটালো গুলি...হাজার খানেক মানুষ ঐ দিনই মারা গেল...আহত হয়ে পঙ্গু হলো হাজার দুয়েক।
Chtob svergnut' gn'ot rukoy umyeloy,
Otvoyevat' svoyo dobro, –
Vzduvaitye gorn i kuitye

(To throw down oppression with a skilled hand,
To take back what is ours –
Fire up the furnace and hammer boldly,
while the iron is still hot!)

‘কাজি কোথায় হে? কাজি?’
‘আরে কমরেড মোজাফফর যে! আপনি নিজেই চলে এলেন? তার থেকে আপনি ডাকলেই ত’ আমি যেতে পারতাম!’
‘একটা বিশেষ কাজের অনুরোধ নিয়ে এসেছি যে? করা যায়?’
‘আপনার আদেশ কবে অমান্য করেছি?’
‘তাহলে সেকে- কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশনালের গানটি কি অনুবাদ করা যাবে? পৃথিবীর নানা দেশেই বিভিন্ন ভাষায় অনুবাদ হলেও বাংলায় যে করা হয় নি! আর এ কাজটা তোমাকে দিয়েই সবচেয়ে ভাল হবে বিদ্রোহী!’
‘ওয়েট কমরেড!’
ঝাঁকড়া চুলের কাজি তখনি বসে পড়লেন হার্মোনিয়ামের সামনে।
‘সুরটা কিন্তÍ ঐ পশ্চিমা ধাঁচের সুরটাই রাখতে হবে। বাংলা-ভারতের কীর্তন-গজল-শ্যামা সঙ্গীত-পদাবলীতে হবে না। কেমন? তবে লিরিকস বাংলায়!

কাজি হাসেন। এক খিলি পান মুখে পুরে হার্মোনিয়ামের রিডে হাত বোলান।
‘আমি উঠি। কাজের মন:সংযোগে ব্যঘাত ঘটাবো না।’

মুচকি হেসে কাজি একটি কাগজে হাতে লেখা ইংরেজি গানের লিরিকসটা দেখতে থাকেন।


Chtob svergnut' gn'ot rukoy umyeloy,
Otvoyevat' svoyo dobro, –
Vzduvaitye gorn i kuitye

(To throw down oppression with a skilled hand,
To take back what is ours –
Fire up the furnace and hammer boldly,
while the iron is still hot!)

কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশনালের এই সুরটা বিলক্ষণ জানেন নজরুল। মাথার অবাধ্য চুলে আঙুল চিরুণী চালাতে চালাতে সুরটা গুনগুন করতে থাকেন:

‘‘কাজি কোথায় হে? কাজি?’
‘আরে কমরেড মোজাফফর যে! আপনি নিজেই চলে এলেন? তার থেকে আপনি ডাকলেই ত’ আমি যেতে পারতাম!’
‘একটা বিশেষ কাজের অনুরোধ নিয়ে এসেছি যে? করা যায়?’
‘আপনার আদেশ কবে অমান্য করেছি?’
‘তাহলে সেকে- কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশনালের গানটি কি অনুবাদ করা যাবে? পৃথিবীর নানা দেশেই বিভিন্ন ভাষায় অনুবাদ হলেও বাংলায় যে করা হয় নি! আর এ কাজটা তোমাকে দিয়েই সবচেয়ে ভাল হবে বিদ্রোহী!’
‘ওয়েট কমরেড!’
ঝাঁকড়া চুলের কাজি তখনি বসে পড়লেন হার্মোনিয়ামের সামনে।
‘সুরটা কিন্তÍ ঐ পশ্চিমা ধাঁচের সুরটাই রাখতে হবে। বাংলা-ভারতের কীর্তন-গজল-শ্যামা সঙ্গীত-পদাবলীতে হবে না। কেমন? তবে লিরিকস বাংলায়!

কাজি হাসেন। এক খিলি পান মুখে পুরে হার্মোনিয়ামের রিডে হাত বোলান।
‘আমি উঠি। কাজের মন:সংযোগে ব্যঘাত ঘটাবো না।’

মুচকি হেসে কাজি একটি কাগজে হাতে লেখা ইংরেজি গানের লিরিকসটা দেখতে থাকেন।

Stand up, damned of the Earth
Stand up, prisoners of starvation
Reason thunders in its volcano
This is the eruption of the end

কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশনালের এই সুরটা বিলক্ষণ জানেন নজরুল। মাথার অবাধ্য চুলে আঙুল চিরুণী চালাতে চালাতে সুরটা গুনগুন করতে থাকেন:

‘জাগো জাগো, জাগো সর্বহারা!
অনশন বন্দী ক্রিতদাস
শ্রমিক দিয়াছে আজি সাড়া
উঠিয়াছে মুক্তির আশ্বাস।
সনাতন জীর্ণ কুআচার
চূর্ণ করি জাগো জনগণ
ঘুচাও এ দৈন্য হাহাকার
জীবন মরণ করি পণ।

গাও ইন্টারন্যাশনাল
মিলাবে মানবজাত।’

১২. অতীশের সাথে ফর্ম্যাল ডিভোর্স লেটার সই হবার পর মায়ের বাড়ি এসে উঠেছে ফারহানা। রুটিন মাফিক কলেজে পড়াতে যায়। মাঝে মাঝে মন খারাপ হলে শাহবাগ যায়। সাঈদির রায়ের পর দাঙ্গা, রাজিব-দ্বীপ-জগতজ্যোতি� ��ের মৃত্যু, আস্তিক-নাস্তিক প্রশ্নে শাহবাগের ভাগ হওয়া, সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে বিএনপি-জামাতের জয়, দেশ জুড়ে একাত্তরের মত বা তারও চেয়ে বেশি সংখ্যায় কয়েক হাজার হিন্দু মন্দির ভাঙা, হাজার হাজার গাছ কাটা, গত তিন মাস ধরে জামাত-বিএনপির টানা হরতাল, শয়ে শয়ে মানুষের পুড়ে মরা...এমন দেশ কখনো দ্যাখে নি সে! মা’র মন গতকাল থেকে খুব খারাপ। কাদের মোল্লার ফাঁসি হতেও গিয়ে হলো না। শেষমূহুর্তে জাতিসঙ্ঘের মানবাধিকার কমিশনারের চিঠি ফাঁসির রায় উল্টে দিল।

‘ক্ষমা আমি শেখের বেটিকেও করব না। আমার কুমারী ছোট ননদটাকে...তোরে এতদিন কই নাই ফারহানা...এই কাদের মোল্লার লোকরাই তুইলা নিয়া গেছিলো। আমরা ত’ তখন মিরপুর থাকতাম! তার ফাঁসি যদি না হয়, তোর আব্বার আত্মা শান্তি পাবে না!’

মা’র কথা শুনতে শুনতেই কোলে ল্যাপটপ রেখে ফেসবুকে চোখ রাখে ফারহানা। দীপায়নের পোস্ট মাত্রই ভেসে উঠলো।

কাশফুল মেঘদল: জগৎ বল্ল পাড়ার গণহত্যা

কু-েশ্বরী ঔষধালয়ের মালিক নূতন চন্দ্র সিংহের রক্ত গত বেয়াল্লিশ বছরে তোমরা অনেকটাই মুছে ফেলেছো হে আশ্চর্য কাশফুল মেঘদল! জগৎ বল্ল পাড়ার গণহত্যায় নিহত হিন্দু নর-নারীর রক্তও মুছে গেছে তোমাদের শুভ্র দেহ থেকে। আজো সেই জগৎ বল্ল পাড়ার পুরুষেরা খুনীর ফাঁসির নির্দেশে গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে যায় জঙ্গলে... সাদা মেঘ...তোমার দেহে পুড়ে যাওয়া মন্দিরের ছাই আমরা সার্ফ এক্সেলে ধুয়ে ফেলব আর ধুয়ে ফেলব নূতন চন্দ্র সিংহের রক্ত...

দীপায়নের দুই কাকা আর জ্যাঠা মারা গেছিলেন জগৎ বল্ল পাড়ায় গণহত্যায়। আরো একটা কথা জানায় না দীপায়ন লজ্জায়। কিন্তÍ দীপায়নের এক দূর আত্মীয়ের সাথে ভাগ্যক্রমে পরিচয়ের সুবাদে জেনেছে ফারহানা। দীপায়নের দুই মাসীকে জোর করে রাজাকাররা তুলে নিয়ে ধর্মান্তরিত করে বিয়ে করেছে। চট্টগ্রাম, ঢাকা, দিনাজপুর, খুলনা...কত কত কঙ্কাল আর করোটি খুঁজবে তুমি? তোমরা? হে প্রজন্ম? আরো কত ধর্ষিতার লাশ? আর কত সম্ভ্রমহাণি ও গর্ভপাতের গল্প শুনলে জাতিসঙ্ঘ সহৃদয় হবে? এডিথের যে কাকা চার্চের ফাদার আর বিয়ে করেন নি...তাঁর মাধ্যমেই বহু বাঙালী, কুমারী অন্তসত্ত্বার যুদ্ধশিশুরা বিদেশে চলে গেছে বিদেশী বাবা-মা’র আশ্রয়ে।

‘ভাবিস না আপু, আজ ফাঁসি হবেই!’
ফারহানার ছোট ভাই স্বান্তনা দেয়।
‘একটাই দাবি- ফাঁসি!’

‘ফাঁসি হয়েছে আপু- ফাঁসি হয়েছে!’
ছোট ভাই চিৎকার করে। ফারহানা মাত্রই ওয়াশ রুম থেকে বের হয়েছে।
‘ফাঁসি? হয়েছে? প্রজন্ম চত্বর যাবি?’
‘চল্ আপা- চল্’

মা উঠে দাঁড়ান। ডাইনিং রুমের দেয়ালে ঝোলানো ছোট ননদের সাদা-কালো ছবির দিকে তাকান। চোখে গাঢ় কাজল দেওয়া, দুই বেণী করা একটি মেয়ে আলাভোলা হাসছে।

‘হেনা- তোর বড় ভাই দেখছে! খুব কষ্ট ছিল লোকটার! জীবনেও ভোলে নাই তোর এই অপমান, এই অকাল মরণ!’

‘মা...এখন থেকে আমাদের বলতে দাও...বলতে দাও যে ছোট ফুপু ক্যান্সারে মরে নাই। একাত্তরে যুদ্ধের সময় রেপ হইয়া মরছে। বলতে দিবা, মা?’
‘বল্ পাগলী...বল্!’

তিরিশ লক্ষ প্রাণের শপথ, জনতা করে না ভুল
জনতার দাবি ফাঁসির মঞ্চ, নড়বে না এক চুল।
তিরিশ লক্ষ প্রাণও জেনে নিও মিছিলের পিছে আছে
শাহবাগ আজ দেশে নয় শুধু, হৃদয়ে ছড়িয়ে গেছে।
জনতার ¯্রােতে নেশা লেগে যায় স্বপ্নমাখা ঘোর,
প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম মিলে প্রজন্ম চত্বর।