সত্যি কথা। এই এক কিতাব। মিথ্যে কথা। পছন্দের কবিতা বাছতে বসলে... হ্যাঁ... মনে রাখবেন ১৯৮৪-র কৌরবের মিথ্যে কথা আবার ২৭ বছর বাদে ২০১১-য় নতুন কবিতায় দ্বিতীয় প্রকাশ। কমল তো শতদল। কতো কমল পাঠক হে। কৌরবের কমল... ভালপাহাড়ের কমল... গদ্য-উপন্যাসের কমল... ওহ অলীক গসপেল... ওহ স্যার যদুনাথ... না। আজ এখানে শুধু মিথ্যে কথা আর মিথ্যে কথার কমল। সেই ১৯৮৪-র কিতাব। এইসব কবিতা তখনই। হ্যাঁ। অমূল্য। মিথ্যে কথা। সত্যি কথা।

খুনী ফিরে আসছে

গতবারের কাচা গেঞ্জি এবছর শ্রাবণে পরে এসেছি
পেঁপে বনের ছায়ায় আনন্দ আর উড়বে কুচো কাগজের ঝাঁক
জল একটা পেপারওয়েট হয়ে থাকলো অনেকদিন
জল এবার বনের ধারে ফিতে খুলতে খুলতে হারিয়ে গেছে পাতায়।

গতবারের ফাঁকা মাঠের ছায়ায় এথেলিটদের তাঁবু পড়েছে
কাছে গেলে অর্জুন ডাল কাটার শব্দ শোনা যায়
দূরে আলগুলি বেঁকে যাচ্ছে বিজনে
                                                                       মাঠাবুরুর রাজনীতি বুঝেছে পিয়াল।

সমস্ত বিফল ডালে ভুবনের ভ্রমরেরা ফুল ভ্রমে বসে
ছায়ায় বিলম্বে ওড়ে মথ
যেন দু একটি দেখা আজও মূল্যবানঃ
জল ফেলে দেওয়া, নীল আকাশের নিচে
                                                                       নুয়ে আছে ভোরের সুমতি।

গত সব দেখা সঙ্গে নেই
মত পাল্টে পাখিদের মধ্যে যারা চিল
                                                                       ওড়া শেষ হলে বসবে ঢেউয়ের ওপরে
হয়ত একটা বালুরেখা ঠোঁটের গভীর থেকে ছুটে যাচ্ছে দূরে
তবু দেখা হয়েছিল ফেরা
জাল কোকিলের ডাক
ফুল ভাবছে, মাস ভাবছে,গোধূলির জলা ভাবছে
যখন খুনীর ফেরা তাঁবু থেকে একা ছদ্মবেশে।


স্প্রিংএর পাখি

স্প্রিং ফেলে পাখি তার ওড়া রাখবে পাহাড়ের দিকে
নরম বাফারের ধাক্কা যতখানি বাতাস দিয়েছে
                                                                       যেন ডানা মোছা হল
আগের গলির থেকে আরও কিছু ওড়া হয়ে গেল।

যত দিন যায় তত পিস্টনকে পাখি ভাবে বয়স্ক লোকেরা
বসন্ত শেষের দিকে মাড় দেওয়া সাদা হাফ শার্ট
হ্যাঙ্গারে রাখার জন্য
কাছে গেলে লোহার দাঁড়ের পাশে পেতলের ধান
যুবকেরা পাখি ভেবে লণ্ঠন জ্বেলেছে একা হাতে

যখন ডানার দু তিনটে স্ক্রু আর হয়ত খুঁজেই পাবে না
রাতে যাত্রা আছে, শেষ রাতে কিছুক্ষণ নাসিকা গর্জন
সকালে বালক-নৃত্য, দুপুরে সসপ্যান
                                                                       পালকে পালকে ভরা
ফেনা ভেবে চায়ের কিয়স্ক থেকে ফের তুলে আনা হল কাপ।


আমার নিজস্ব কালার স্কিম

হিমে ভেজা একটি বার্নার এই আমার নিজস্ব কালার স্কিম
রুটি চিবিয়ে খাওয়ার অলস দাঁত
শিশুপালিকা পুস্তকের সব কটি ছড়ানো পাতা
                                                                       আমি আড়াল করে রেখেছি
ঢোলা ফতুয়া গায়ে জেগে উঠেছিলাম ঢালাই ব্রোঞ্জের মতো
জেগে উঠেছিলাম মূর্তির কালার স্কিম নিয়ে চৌমাথায়

কলাই থালার পান্তা ভাতে লাল লংকা লেবু পাতা, মনে রেখো
আমার কালার স্কিমে হ্যারিকেন জ্বলেনি
তেলের অভাবে ঘুমিয়ে পড়েছে অপুষ্ট মানুষের
                                                                                                          রোগা ছেলে মেয়েরা


আমাদের পাড়ার বৃষ্টির দিন

সারাদিন কয়েকটা খালি রঙের ড্রামের ওপরে বৃষ্টি পড়ছে
সারাদিন কয়েকটা সাঁড়াশীর ওপরে বৃষ্টি পড়ছে
সারাদিন কয়েকটা গামবুটের ওপরে বৃষ্টি পড়ছে।
যেদিন সকাল থেকে বৃষ্টি হয় রঙের ড্রামগুলি উল্টে যায়
                                                                                                          রাস্তা বাই লেনে
রেল কলোনির ফুর্তিবাজ মেয়েরা
গামবুট পায় সারারাত রাস্তা দিয়ে হেঁটে বেড়ায়
খালাসিরা মাথায় বোরা ফেলে ডুবো জাহাজের মতো বাড়ি ফেরে
বৃষ্টির মধ্যে ঠিক সময় ভোঁ বাজলে পাড়াটা জাহাজ মনে হয়
চারিদিকে সমুদ্রের আদিম বিবর্ণতা
প্রত্যেক জানালায় স্টিয়ারিং হাতে দাঁড়িয়ে থাকা যুবতী
ভারি গামবুটের পেরিয়ে যাওয়া শব্দ
                                                                            সারাদিন কয়েকটা খালি মদের বোতলে বৃষ্টি ঝরে পড়ে।


ছ’ মাস আগের বিস্মৃত বাঁকা কোমর

ছ’ মাস আগের বাঁকা কোমর এখন ভারি হয়ে উঠেছে
যখন শুধু স্যুভেনিরের জন্য একেকটা বড় বড় ফাংশন উৎরে যায়।
ছ’ মাস আগে একটা জীবন্ত স্পার্ম এই পথে টলতে টলতে
ঐ হেডলাইট থেকে সরে যাচ্ছে মাথা, বাতাসে চুল
ড্রাম থেকে সৌন্দর্যের জন্য পেট্রল গড়িয়ে পড়ুক
লিপ ইয়ারের সকালে কাপে চামচ নাড়তে নাড়তে
                                                                       বাইরে বেরিয়ে এসেছিলে
ঠোঁটের লাল শীলমোহর রুটির চেয়েও অনিবার্য জংঘায়
অথচ ছ’ মাস আগেও প্রতিরাতে সঙ্গম না হলে ঘুম আসতো না
কি করে বোঝাবো, আমি যে আর তত যুবক নই।

বন্ধুদের ফটোজেনিক স্ত্রীরা এবার ব্লাউজের বোতাম লাগান
আলোকিত বিয়াল্লিশ পঞ্চাশ পয়ত্রিশ
                                                                       বিছানার ধারে দীর্ঘ সঙ্গমহীন একা একা
কোমরের বিপরীত বাঁক
দুধে ফুলে ওঠা চকচকে স্তন
ভারি চোখের পাতা
দেখে বুঝে যাক আমাদের মধ্যে একা তুমিই সুন্দরী পারমিতা
একা তুমিই স্পার্ম নিয়ে খেলতে খেলতে গান গেয়েছিলে।


বম্বে টকি

স্ট্রাইপ পায়জামা পরে তুমি আমাদের মহৎ জীবনের দিকে নিয়ে যাচ্ছো
তোমার দু পায়ে দু রং-এর ফিতে
তোমার স্তনের মাপে ধর্মঘট শুরু হয়েছিল গত বছর
মুক্তি দশকের বড় হারমোনিয়াম নিয়ে আমরা ঘুরে বেরিয়েছি
                                                                       ত্রাণ শিবিরে ফাঁকা শালবনে
যে বাতাস গানের জন্য বেলো হয়েছিল
যে জয়গান হাত ঘড়ি, সোনার আংটি সিগারেট থেকে
                                                                       লাফিয়ে উঠেছিল

কোথায় হারিয়ে গেল
সত্তর দশকের সেই দেয়াল আলো করা কাপালিক।
মধ্যবর্তী নির্বাচনের পোলিং বুথে আমরা দুজনে শুয়ে থাকব
স্বপ্ন-ভোগ্যা যুবতীর দুই জানু বুকের ওপরে টেনে
বেড টি’র ধোঁয়ায় ভরে যাওয়া পুব আকাশের কোণ
দোতলা থেকে এক তলায় ঝরে পড়বে সেই ঝরাপাতা
সেই ব্যালট, সেই স্ট্রাইপ পায়জামা-ভেদী মহৎ যৌবন তোমার


জিরো জিরো সেভেন তোমাকে ভালবাসি

আমি যে সিগারেট খাই সেই ধোঁয়া মেঘেও জমেছে
নীল ব্র্যান্ডে বন্দী জলরাশি
অচেনা জলায় ফিরে এসো।
প্রতিহিংসার জামা কালো
আরও কালো পিস্তলের দৃঢ়তম নল স্তনে চেপে
                                                                       যুবতীরা সমুদ্রে নেমেছে।

খুনীদের প্রিয় জিরো জিরো
এই আঙ্গুলের নখে মিশে আছে ফলিত কার্বন।
সব হিসেবের রুটি পিস্তলের ছায়ায় বসে গড়া নয়
সব পর্দাই বাতাসে ওড়েনি
হত্যাকাণ্ডের রাতে রাজকন্যার প্রিয় কুকুরেরা
                                                                       আমার সঙ্গে বাগানে গিয়েছিল
আমার পায়ের ছাপ খুনীদেরই মত মায়াময়।


ন্যুড কলোনিতে একদিন

কাঠ চেরাই-এর শব্দ থেমে গেছে
নীল পেন্টালুনে আগুন ধরাবার শব্দ থেমে গেছে
কোকেনের মুঠোর ওপরে ডেয়ো হেঁটে যাচ্ছে সন্ধ্যা থেকে
যে সসপ্যান হাতে করে মেয়েরা মাঝরাতে
                                                                       আকাশের নিচে দাঁড়িয়েছিল
পাত্র ভরে উঠেছে আগুনে আর কাঠকয়লায় গড়িয়ে যাওয়া হাওয়ায়
উত্তর পাহাড় থেকে নেমে আসছে পাহারাওয়ালার
                                                                       ভারি বুটের লোকায়ত শব্দ

ড্রাম বোঝাই হয়ে এসেছে বারুদ
বারুদের টোপর পরা বাদামী ন্যুডেরা নেচে চলেছে রাতের ছায়ায়
পুরুষের ঢিলে পেশী ছিঁড়ে উড়ে যাচ্ছে চামচিকে
মেয়েমানুষের সসপ্যানে ফের গরম হয়ে এল
                                                                       সকাল থেকে ফেলে রাখা বাসি চা
কলোনির উজ্জ্বল ন্যুডেরা জড়িয়ে ধরে শেষ বিদায় জানাতে এসেছে
চোখের জলে গড়িয়ে যাওয়া যৌনতা, বিদায় সুন্দরীরা।


কবি এখন কারখানায় যাচ্ছে

কবি এখন কারখানায় যাচ্ছে
এই উঁচু নিচু বাঁকের মুখে তার সাইকেলের ঘণ্টি অনেকেই শুনতে পাবে
কবিকে একটা ঝিমিয়ে পড়া লেদ মেশিন ডাকে
একটা মিলিং কাটারের দাঁতে সারারাতের ময়েশ্চার জমেছে
দপ্তরখানার লাল হলুদ সবুজ আলো
পোড়া কার্বনের ভারি বাতাস, কবিকে গত জন্মের সরাইখানায় নিয়ে যায়।

কোক ওভেনের পাশে কালো জলের নদী, কোন শোচনীয় পরাজয়ের মতো
ক্রেনের বদলে ক্যাঙ্গারুর পেট থেকে লাফিয়ে নামছে ইনগট
লোহা টলমলে পায়ে হাঁটা, হাঁটতে হাঁটতে বিবর্তন
টাটা হৌসের পাঁচিল ফুঁড়ে উঁচিয়ে ধরা র‍্যাম্পার্ট
হুটারের বদলে গার্হস্থ্য শালিখের শব্দতরঙ্গে ভেসে ওঠা ঢেউ

কবিকে কারখানা দিয়েছে ভারি বুট
মাটি থেকে ছ’ ইঞ্চি ওপরে
টুকরো লোহা, ভাঙা মেশিনের দাঁত বাতাসে বাতাসে অস্পষ্ট কার্বন
কবিকে কাছে পেতে চায়
কবিকে কাছে পেতে চায় ঢালাই মিস্ত্রির সংযম
বন থেকে বেরিয়ে আসা ওয়াগন বোঝাই লোহাপাথর


ফের ভালোবাসার কাছে

সুন্দরী মেয়ের স্কার্ফ ঐ ঘরে শুকুচ্ছে, এইভাবে এগোই
                                                                                                         ছোট ঢেকুর তুলে
যেন কিছু হয়নি তাহলে বেল টেপা যায়
ব্যাগ থেকে এয়ারপিলো বার করে বাতাস ভরেনি
বেল টেপার আগে দেয়ালে হেলান দিয়ে সিগারেট ধরানো
মন উদাস থাকছে মানুষের মধ্যে শাসিত পুরুষদের শুধু
বাইরে থেকে দেখা যাবে দিয়াশলাই হাতে দাঁড়িয়ে আছে যুবক

আগের কয়েকবারের মতোই অমলিন রেখা মুখে
বেল টেপার আগে কখনও দশ-বারো বার ফিরে গেছি
হয়ত হ্যারিকেন হাতে দেয়ালের দিকে মুখ দাঁড়িয়ে থেকেছি
আবার ঘোড়ার পিঠে টলতে টলতে হাওয়ায় মিলিয়ে যাওয়া
চার পায়ের লোহা যখন নাল বাজতে বাজতে তিমিরে চলে যায়
                                    হঠাৎ দেখলে মনে হবে উড পেনসিল ছুলছে কিশোরী
                                                                       আগের কয়েকবারের মতোই মাথা নিচু ভঙ্গি

বেল টেপার আগে পাঁচ-সাত মিনিট দুহাতে তিমির।